সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

লুৎফুল কবির রনি

উর্দু চাপিয়ে দিলে পূর্ব পাকিস্তান (এখন বাংলাদেশ) পাকিস্তান থেকে আলাদা হয়ে যাবে, এ কথা ভাষা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতাদের মাথায় ছিলো না, ছিলো সৈয়দ মুজতবা আলীর, যিনি পাকিস্তানের জন্মের ১০৫ দিন পরে এই সতর্কবাণী করেন। আলী সাহেব ৩০ নভেম্বর ১৯৪৭ সিলেট মুসলিম সাহিত্য সংসদে বলেন ‘যদি উর্দুকে আমাদের রাষ্ট্রভাষা করা হয় তবে এর ভবিষ্যৎ কখনই ভালো হবে না। বাংলা ভাষাকে বাদ দিয়ে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করা হলে একদিন আমাদের জনগণ পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবে।একদিন বিদ্রোহ করে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।’’

সেই ভবিষ্যদ্বাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্য প্রতিপন্ন হয়।

‘পেটের দায়ে লিখছি মশাই, পেটের দায়ে! বাংলা কথা, স্বেচ্ছায় না লেখার কারণ-
আমার লিখতে ভালো লাগে না। আমি লিখে আনন্দ পাই নে।
এমন কোনো গভীর, গূঢ় সত্য জানি নে যা না বললে বঙ্গভূমি কোনো এক মহাবৈভব থেকে বঞ্চিত হবেন।
আমি সোসাল রিফর্মার বা প্রফেট নই যে দেশের উন্নতির জন্য বই লিখব।’

-সৈয়দ মুজতবা আলি।

তিনি চাকরী পেলে লেখেন না !
চাকরী না থাকলে লেখেন। এই চাকরী তিনি বারবার কেন খুইয়েছেন, সেটাও খুব সহজ ! কয়েক ডজন গণ্ডমূর্খের সঙ্গে তিনি চাকরী করতে পারতেন না !
আর অবধারিত ভাবে তার উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষই হতেন সেই ছাগল !
স্বাভাবিক ভদ্রতাবশে তিনি ঝগড়া না করে, চাকরীই ছেড়ে দিতেন !

ভাগ্যিস ছাড়তেন !

ফলে, তাঁর অনবদ্য রচনা আমরা পেয়েছি !

গীতা তার সম্পূর্ণ মুখস্ত ছিলো । এমনকী রবীন্দ্রনাথের গীতিবিতানও টপ টু বটম ঠোটস্ত ছিলো তার। একবার এক অনুষ্ঠানে এক হিন্দু পুরোহিত গীতা সম্বন্ধে বক্তব্য রাখছিলেন। সেই সভায় সৈয়দ মুজতবা আলী উপস্থিত ছিলেন। দূর্ভাগ্যক্রমে সেই পুরোহিত যে সব রেফারেন্স গীতা থেকে সংস্কৃত ভাষায় দিচ্ছিলেন তাতে কিছু ভুল ছিলো । সৈয়দ মুজতবা আলী অবশেষে দাঁড়িয়ে উনার সমস্ত রেফারেন্স মূল সংস্কৃত ভাষায় কি হবে তা সম্পূর্ণ মুখস্থ বলে গেলেন। সমস্ত সভার দর্শক বিস্ময়ে হতবাক।

‘এই যে ছেলে ছোকরারা মদ্যপান নিয়ে দাপাদাপি করে, ওরা তো মদ খেতেই পারে না। বাংলায় গত শতাব্দীতে মদ খেত মাইকেল, তারপর গিরিশ ঘোষ, তারপর শিশির ভাদুড়ি আর এখন খাচ্ছে তোমার এই সৈয়দ মুজতবা আলী।’ এই বলেই তিনি বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে তাঁর বুকে তিনবার ঠুকতেন। সীমা পেরিয়ে গেছেন মদ্যপানের অথচ আলী সায়েবের ভেতরকার অনিন্দ্য সুন্দর রূপটি কখনও নষ্ট হয় নি, এমন কি পার্ল রোডে ছেঁড়া লুঙ্গি আর গেঞ্জী পরে থাকলেও।

আনন্দ বাজারের অন্যতম স্বত্ত্বাধিকারী – প্রফুল্ল চন্দ্র সরকারের শ্রাদ্ধ বাসরে গেছেন নিমন্ত্রণ পেয়ে। উপস্থিত ব্রাহ্মণরা নাক সিঁটকেছে তাঁকে দেখে । গীতা পাঠে ভুল হচ্ছে দেখে বলাতে শুনতে হলো – তুমি মুসলমানের বাচ্চা , গীতার কি জানো হে ? অনর্গল মুখস্থ বলে গেলেন বই না দেখে । এমনই ছিলো  তাঁর স্মৃতি শক্তি !!! সব চুপ !

এভাবেই চুপ করে রেখে তিনিই কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতেন। এই হল সৈয়দ সাব!

একবার তিনি জার্মানীতে, রবি ঠাকুরও গেলেন সে দেশে। ভরদুপুরে গুরুর কাছে গেলে হোটেলওয়ালারা বাধ সাধলো। কে শোনে কার বারণ। রবীন্দ্রনাথও বললেন, আসতে দাও তাকে। দুপুরের তন্দ্রা লেগে আসা চোখে গুরু বললেন, এরা আজ দারুণ মুরগী রেঁধেছে। খেয়ে যেও।

তিনি লিখলেন, সক্রেটিস আর আমার গুরুতে তফাৎ কোথায়? নিদানকালে দু’জনই মুরগীর কথা ভোলেনা।

রবীন্দ্রনাথের প্রতি ছিলো  এক আশ্চর্য অধিকারবোধ। কবিগুরুর প্রথম মুসলিম ছাত্র ছিলেন চাচা। প্রথম তাঁকে দেখে নাকি রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘ওহে, তোমার মুখ থেকে তো কমলালেবুর গন্ধ বেরোচ্ছে!’ কমলালেবুর জন্য বিখ্যাত ছিল সিলেট, আর চাচার বাংলায় তখন সিলেটি টান! নিজে রবীন্দ্রনাথের অনেক লেখার সমালোচনা করেছেন, সে বিষয়ে খোদ কবিগুরুকেই চিঠি লিখেছেন। কিন্তু অন্য কারও মুখে রবিঠাকুরের সামান্য সমালোচনা শুনলেও ক্ষিপ্ত হতে দেখেছি তাঁকে।

‘বই কিনে কেউ কখনও দেউলিয়া হয় না’
‘আমার চাকরের নাম কাট্টু, কেননা সে পকেট কাটে, মাছের মাথা কাটে, আর প্রয়োজন হলে মনিবের মাথা কাটে’
‘যে ডাক্তার যত বড় তার হাতের লেখা তত খারাপ’ কিংবা ‘ওষুধ খেলে সর্দি সারে সাত দিনে না খেলে এক সপ্তায়’

-এই কথাগুলোর মালিক আর কেউ নন, তিনি আমাদের রম্যসাহিত্যের দিকপাল সৈয়দ মুজতবা আলী। তার লেখার বাচনিক তৎপরতা পাঠককে এক আলাদাভাবের জগতে নিয়ে যায়। তিনি তার লেখায় শুধু হাসান না, মানুষকে ভাবান। গদ্যের সত্যিই তিনি এক দারুণ ওঝা। কীভাবে খেলতে হয় গদ্য নিয়ে, তা তিনি দেখিয়েছেন তুমুল মুন্সিয়ানায়। এটা একমাত্র সম্ভব হয়েছে বিপুল জ্ঞানরাশির কারণে।

তিনি তার গদ্যে যে রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছেন তা অনায়াসে সাধ্য নয়। শিল্প বা সাহিত্যের ইতিহাস মূলত তার আঙ্গিকগত নিরীক্ষারই ইতিহাস। এ সত্য কথা যথার্থ আলাদাভাবে প্রতিপন্ন করেছেন সৈয়দ মুজতবা আলী। এ কারণে সমালোচকরা বলতে বাধ্য হয়েছেন, বাংলা গদ্যের প্যাটার্ন তছনছ করে দিয়েছেন তিনি। সত্যি বলতে কি বাংলা ভাষার সব প্রচলিত বাক্য বিন্যাসকে তছনছ করে, যে অনবদ্য সাহিত্য সম্ভার সৃষ্টি করেছেন মুজতবা আলী, তার তুলনা আজও অমলিন।

লাট সাহেবের ৩ ঠ্যাং ওয়ালা কুত্তার পিছনে মাসে খরচ ৭৫ টাকা এবং ৮ সদস্য বিশিষ্ঠ বাংলার ব্রাক্ষ্মন পন্ডিতের বেতন ২৫ টাকা হলে, পন্ডিতের সমস্ত পরিবার লাট সাহেবের কুকুরের কটা ঠ্যাং এর সমান ?

-পাদটীকা, চাচা কাহিনী

পড়ে চোখ জলে ভরে যেত। পরক্ষণে
যেদিন গিন্নী আমাকে বললেন, আমার ড্রিংক করা দেখে নাকি ছেলেরা এসব শিখবে, আমি তখন তাঁকে বললাম, কেনো আমি যে বাইশটা ভাষা জানি সেখান থেকে দু’চারটা ভাষা ওরা শিখুক না??

হাসতেই হয় ।

সৈয়দ মুজতবা আলী তখন বেশ বিখ্যাত লেখক। প্রতিদিনই তাঁর দর্শন লাভ করতে ভক্তরা বাসায় এসে হাজির হয়। একদিন এক ভক্ত মুজতবা আলীর কাছে জানতে চাইলেন, তিনি কোন বই কী অবস্থায় লিখেছেন। মুজতবা আলী যতই এড়িয়ে যেতে চান, ততই তিনি নাছোড়বান্দা।

শেষে মুজতবা আলী সরাসরি উত্তর না দিয়ে বললেন, ‘দেখো, সুইস মনস্তত্ত্ববিদ কার্ল গুসতাফ জাং একদা তাঁর ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলেন, কিছু লোক আমাকে জিজ্ঞেস করে, আমি কীভাবে লিখি।

এ ব্যাপারে আমাকে একটা কথা বলতেই হয়, কেউ চাইলে তাকে আমরা আমাদের সন্তানগুলো দেখাতে পারি, কিন্তু সন্তানগুলো উৎপাদনের পদ্ধতি দেখাতে পারি না।’

বিশ্বভারতীতে পড়াশুনা করার সময় একবার রবীন্দ্রনাথের হাতের লেখা নকল করে ভুয়া নোটিশ দিলেন, ‘আজ ক্লাশ ছুটি’ .. ব্যাস যায় কোথায় সবাই মনে করল রবীন্দ্রনাথ ছুটি দিয়ে দিয়েছেন ।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখেছেন ‘লেখক সৈয়দ মুজতবা আলীর চেয়েও মানুষ সৈয়দ মুজতবা আলী কম বিস্ময়কর ছিলেন। যাঁরা দীর্ঘকাল ধরে তাঁর অন্তরঙ্গ ছিলেন, তাঁরা নিশ্চয়ই পরে সে সম্পর্কে লিখছেন। অত্যন্ত চঞ্চল এই মানুষটিকে কিছুতেই সাধারণ সংসারী মানুষদের মাপে আঁটানো যায় না।

প্রতিভা জিনিসটা খুব সুখের নয়; বরং এর জ্বালা আছে, এই জ্বালাতেই ইনি সারা জীবন ছটফট করেছেন।’

জীবনের গভীরতর ভেতর থেকে জীবনকে পর্যবেক্ষণের অন্তর্দৃষ্টি মুজতবার ছিলো  বলেই তাঁর পরিবেশিত হাস্যরসের মধ্যে পরিমিত জীবনময়তা ছিলো ।

এক ড্রয়িংরুম-বিহারিণী গিয়েছেন বাজারে স্বামীর জন্মদিনের জন্য সওগাত কিনতে । দোকানদার এটা দেখায়, সেটা শোঁকায়, এটা নাড়ে, সেটা কাড়ে, কিন্ত গরবিনী ধনীর কিছুই আর মনঃপূত হয় না । সব কিছুই তার স্বামীর ভাণ্ডারে রয়েছে । শেষটায় দোকানদার নিরাশ হয়ে বললেন, ‘তবে একখানা ভাল বই দিলে হয় না ?’ গরবিনী নাসিকা কুঞ্চিত করে বললেন, ‘সেও তো ওঁর একখানা রয়েছে ।

—– এটা সৈয়দ মুজতবা আলী’র ‘বই কেনা’ প্রবন্ধের ।

বাঙালির বই কেনার প্রতি বৈরাগ্য দেখে মনে হয়, সে… মরার ভয়ে বই কেনা, বই পড়া ছেড়ে দিয়েছে।

-সৈয়দ মুজতবা আলী

বাঙালির দৈনতাকে যেমন জানতেন তেমনি বাঙালির সত্যিকার রসবোধ কি তিনি দেখিয়ে গিয়েছেন।

তাঁর লেখা পড়ে হাসেননি এমন পাঠক আদৌ আছে কি-না সন্দেহ; ঘরকুনো-নিভৃতচারী বইপ্রেমী কিংবা বোদ্ধা পাঠককেও আপনমনে দু’দণ্ড প্রাণ খুলে হাসতে বাধ্য করতে সৈয়দ মুজতবা আলীর রম্যরচনা পারঙ্গম! যশস্বী ও কিংবদন্তি সৈয়দ মুজতবা আলীর সৃষ্ট সাহিত্য সংখ্যায় সীমিত হলেও অপার সৃজনশীলতা, জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের বিশালতায় বাংলা সাহিত্য ভুবনে তার তুলনা শুধু তিনিই।

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, অনুবাদক ও রম্যরচয়িতা সৈয়দ মুজতবা আলীর জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধা জানাই।

ছবি: গুগল

 

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]