সৌরভের সেই শহরে

ইরাজ আহমেদ

স্মৃতির মধ্যে থেকে যাওয়া সেই এক শহরের ঘ্রাণ মাঝে মাঝে টের পাই। পথ চলতে অথবা বাসের ভীড়ে আবার কখনো কোনো নির্জন গলিতে, বৃষ্টিতে, শীতের রেখায় আচমকা ফিরে পাই পুরনো গন্ধমাখা এক শহর, ঢাকা।  আচম্বিতে ভেসে আসা পুরনো ঘ্রাণ মনে করিয়ে দেয় তেমন একটা শহর একদা বেঁচে ছিলো। এখন ঝকঝকে আলো, দামী সুগন্ধ আর অচেনা মানুষের অথৈই ঢেউয়ের ধাক্কায় সেই শহরটা বেমালুম হারিয়ে গেছে।

হেয়ার রোডের মোড় ঘুরতেই ছায়া হয়ে থাকতো বিরল প্রজাতির ‘ক্যাননবল’ গাছটা। বর্ষাকালে ঝুপসি গাছটার কাছে এলে অদ্ভুত সুগন্ধ টের পাওয়া যেতো।একদিন সেনাশাসকের নির্দেশে কেটে ফেলা হলো সেই গাছ। হারালো সেই মন মাতাল করা ঘ্রাণ। তখনকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের পাশে পুরনো রেডিও অফিসের রাস্তা আলো করে একদা ফুটতো কৃষ্ণচূড়া ফুল।শাহবাগের মোড় পর্যন্ত একটার পর একটা গাছ সাধ্যমত ফুল ফুটিয়ে যেতো যেন কোনো উৎসবের দিনে সেই শহরকে সাজাতে এসেছিলো তারা। কাটা পড়লো সেই কৃষ্ণচূড়ার উৎসব সেনাশাসকের রক্তচক্ষু নির্দেশে।

একদা কার্জন হলের পাশ ঘেঁষে ছিলো রিকশা চলাচলের পথ। আমরা বলতাম রিকশাপাত। সাদা সিমেন্ট অথবা কংক্রীটে তৈরী সেই পথ ধরে সার বেঁধে রিকশা চলতো। গ্রীষ্মের দিন ফুরিয়ে প্রথম বৃষ্টি নামলে সেই ভেজা পাথুরে রাস্তার অদ্ভুত এক গন্ধ আচ্ছন্ন করতো আমাকে। অপেক্ষা করে থাকতাম বৃষ্টির দিনে ওই পথ ধরে রিকশা ভ্রমণের জন্য।

বছর চল্লিশ আগে নিউমার্কেটে ঢুকলে গন্ধ পেতাম নতুন বই, রঙ আর খেলনার দোকানের। গন্ধ তো ব্যাখ্যা করা যায় না। শুধু গন্ধের স্মৃতি রয়ে যায় মাথায়। ডিসেম্বর মাসে ক্লাসের নতুন বই কিনতে যেতে হতো নিউমার্কেটে। নতুন বই আর খাতার কাগজের খুব সুন্দর গন্ধ ভেসে থাকতো তখন নিউমার্কেটের বারান্দায়। পাওয়া যেতো রঙ বিক্রির দোকানের ঝাঁঝালো ঘ্রাণ।বিদেশ থেকে আমদানী হয়ে আসা গল্পের বইয়ের পৃষ্ঠার সুঘ্রাণ আজো নাকে লেগে আছে। আমি এই গন্ধটাকে বলতাম বিদেশী গন্ধ। এই শহরের গন্ধের কথা লিখতে বসে মনে পড়লো বায়তুল মোকাররমে একদা তিনটি বিখ্যাত বেকারী ছিলো-লাইট, অলিম্পিয়া আর ক্যাপিটাল কনফেকশনারী।অলিম্পিয়া বেকারী এখনো টিকে আছে। বাকী দুটি ব্যবসা গুটিয়ে উধাও। একটা সময়ে দুপুরবেলা বায়তুল মোকাররম ছিলো ঢাকার ব্যস্ত কেনাকাটার জায়গা। নানা কাজে ওখানে যেতে হতো। দুপুরবেলা সেই তিন বেকারীতে এসে নামতো বিস্কুট আর চানাচুর। গরম বিস্কুটের ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়তো গোটা এলাকায়। এমন মন উচাটন করা গন্ধ এখন আর কোথাও পাই না।যেমন পাই না বিকেলে পাউরুটির ঘ্রাণ। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে পল্টন এলাকায় ‘শিয়েস্তা’ নামে একটা পাউরুটির দোকান ছিলো। বিকেলবেলা নতুন বানানো রুটি আসতো দোকানে। কিনতে গিয়ে সেই গরম গরম রুটির গন্ধ নিতে দাঁড়িয়ে থাকতাম দোকানের কাছে।তরুণ বয়সে হাঁটতে হাঁটতে চলে যেতাম ঢাকা স্টেডিয়ামে খেলা দেখতে।সন্ধ্যাবেলা স্টেডিয়ামের দোকানে দোকানে বিক্রেতারা জ্বালতো আগরবাতি। অন্ধ একজন মানুষ স্টেডিয়ামের বারান্দায় আগরবাতি বিক্রি করতো।কাঁধে ঝোলার ভেতরে আগরবাতি আর হাতে একটা প্রজ্জ্বলিত কাঠি।সেই সুগন্ধ আর অন্ধ লোকটাও হারিয়ে গেছে জীবন থেকে।হারিয়ে গেছে পাড়ার কালী মন্দিরে সন্ধ্যাবেলা আরতি দেয়ার সময় ধূপের গন্ধ, গোপীবাগে কাঠ আর তুষের ভারী সুঘ্রাণ।

আশির দশকেও ঢাকায় হাতেগোনা কয়েকটা ফুলের দোকান ছিলো। ঢাকা ক্লাবের দেয়াল ছুঁয়ে একটা চমৎকার ফুলের দোকান তৈরী হয়েছিলো।ওই দোকানের সামনে দিয়ে রিকশায় যাবার সময় ভেসে আসতো রজনীগন্ধা ফুলের সৌরভ। এখন শাহবাগে সারবেঁধে ফুলের দোকান। শুনতে পাই মন ধরে ফুল বিক্রি হয়। কিন্তু সেই সৌরভ? কেবল ফেরারী।

মাঝে মাঝে মনে হয় ফেরারী সৌরভের শহর এই ঢাকা। কৈশোর অথবা তরুণ বয়সে ভালোলাগার সেইসব ঘ্রাণ জীবন থেকে বিদায় নিয়েছে। এখনকার বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে ছিলো সলিমাবাদ রেস্তোরাঁ। দুপুররোদে মোড়ের মাথায় দারুণ সব সুস্বাদু খাবারের সুগন্ধ মেখে দাঁড়িয়ে থাকতো রেস্তোরাঁটি। শহরের চীনা খাবারের দোকানের খোলা দরজা দিয়ে ফুটপাতে আছড়ে পড়তো ঝিমধরানো ফ্রেশনারের ঘ্রাণ। মহাখালীর রাস্তা মঁ মঁ করতো কারখানা থেকে ভেসে আসা সাবান আর বিস্কুটের গন্ধে। সেই কবেকার রেসকোর্স পাতা পোড়ানোর গন্ধের গল্প নিয়ে বেঁচে থাকতো। পাড়ায় ঢুকলে পাওয়া যেতো প্রতিবেশী বাড়ির রান্নাঘরে খাবারের ঘ্রাণ।

সেই এক পুরনো শহর মনের মধ্যে গন্ধের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে রইলো। আর ঘরবাড়ি, মানুষ নিয়ে দুর্দান্ত গতিতে বেড়ে উঠে নতুন এক শহর মুছে দিলো সেইসব সুঘ্রাণের ইতিকথা।

ছবিঃ গুগল