স্কুলবেলা তো ফুরিয়েছে কবে!!

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুমন সুপান্থ

বড় রাস্তা থেকে নেমে কিছুদুর গেলেই সাঁড়িয়ার রাস্তার সেই বিখ্যাত বাঁক। এ বাঁক এমন বাঁক — ওপাশের কিছুই দেখা যায় না দিন দুপুরেও। ব্লাইণ্ড স্পটে কতো রিক্সা গাড়ি যে উঠে যেতো এ ওর গায়ে…. মুখোমুখি। আজও তেমনই আছে, দেখলাম। রাস্তায় বরং খানাখন্দ বেড়েছে আরও। ডান দিকে ছিলো শিবু কাকাদের বাড়ি। লোকে ডাকতো শিবু ডাক্তার। গ্রাম্য চিকিৎসক ছিলেন। বেঁচে আছেন কি না, খবর নেয়া হলো না! প্রায়ই ভাবি, গাড়ি থেকে নেমে কাউকে জিজ্ঞেস করবো তাঁর কথা। ভারী আদর করতেন আমায়,কেন জানি! তাদের বাড়ি-লাগোয়া পথ ধরে ছিলো আমাদের নিত্যদিনের স্কুলযাত্রা। পরের বাড়িটা কার — জানা ছিলো না। তারপরে, ঠিক রাস্তার উপর উঠে আসা বাড়িটার নাম আমরা দিয়েছিলাম “ফুলের বাড়ি”। কতো হাজার রকমের ফুল-বৃক্ষে ছাওয়া সে বাড়ি! রাস্তার একেবারে লাগোয়া বড় একটা শিউলি ফুলের গাছ। ফুল ফোটার মৌসুমে বহুদূর থেকেই নাকে এসে লাগতো ভুবনমোহিনী এক ঘ্রাণ। চারপাশটা ম ম করে রইতো। বাড়ি ফেরার পথে লিপি আপা, গুলশান আপা আর তাদের সহপাঠী বালিকাদেরকে দেখতাম দু`হাত ভরে কুড়িয়ে নিচ্ছেন শ্বেতশুভ্র সেইসব ফুল! সেই সুবাদে অপার্থিব সেই ঘ্রাণ বাড়ি পর্যন্তও পৌঁছে যেতো। পরেরদিন আবার একই রুটিন। ঘ্রাণসমেত বাড়িফেরা।

নলদাড়িয়া মোল্লা বাড়ির পুকুরের মাঝখানটায় লাল পদ্মের বিশাল এক সাম্রাজ্য ছিলো। টকটকে রক্তলাল পদ্ম ফুটে থাকতো প্রায় সারা বছর। আমরা ওদিকে তাকিয়ে থাকতাম না বেশিক্ষণ। পদ্ম-ঝাড়ের ভেতরে না কি বিশাল বিশাল সব সাপেদের সংসার। বাবা মা তো বটেই, তাদের শ’য়ে শ’য়ে বাচ্চা কাচ্চাও আছে। বেশিক্ষণ তাদের দিকে নজর দিলে, তাদেরও নজর নাকি পড়ে যায় অপরপক্ষের দিকে। তারপর গভীর রাতে, সবাই মিলে পথ চিনে বাড়ি এসে দংশন করে চলে যায়,— এই নিয়ম। তো কার আছে এতো সাহস, মৃত্যুভয় ভুলে পদ্মের সৌন্দর্যে দৃষ্টি দিতে পারে? সম্ভব হলে আমরা দৌড়েই এই জায়গাটা পেরিয়ে যাই, এমন! তবু কোনও কোনও বালক কি বালিকা আড়চোখে এক আধবার চায়….. চায়ই ওইদিকে। এতো টকটকে হয় ফুল! এতো উজ্জ্বল! এতো আকর্ষণীয়!
তার মন ভরে না। তার দেখা শেষ হয় না……..!

অল্প অল্প হাওয়া ছেড়েছে। জগতের সুন্দরতম সন্ধ্যা নেমেছে বাংলায়। আম্মা আর প্রমিতের সঙ্গে বাড়ি ফিরছি শহর থেকে। ‘ফুলের বাড়ি’পেরিয়ে যাচ্ছে গাড়ি। শিউলি তো দূর অস্ত, গাছ কেটে প্রায় বিরান ভিটা পড়ে আছে। একটু এগুছি। দেখছি, মোল্লাবাড়ির পুকুর প্রায় মজে এসেছে — সর পড়ে, শ্যাওলা পড়ে, পানায়। কোথাও পদ্মের চিহ্নটি পর্যন্ত নেই! পাশে ঘন বাঁশবন। দূরে কেউ বাতি জ্বালিয়ে ঘর গেরস্থালী করছে। হাঁকডাক শোনা যায়, কি যায় না। বাকী সমস্তটা জুড়ে আছে সন্ধ্যার নিজস্ব নৈঃশব্দ্য । কে যেন ডাকলো। “ভাতিজা, স্কুলে যাইরায় নি, বাবা?” ভারী মিঠে লাগল ডাকখানি। শিবু কাকার গলা! স্পষ্ট দেখলাম, এক সরলমতি স্কুলগামী বালক— ধূলামলিন পথে,`ফুলের বাড়ি`র দিকে চেয়ে আছে অবাক বিস্ময়ে। ফাটা বিল ছুঁয়ে আসা উথালিপাতালি হাওয়ায় টলমল করছে তার দুটি ভ্রমরকালো চোখ। বালকটির দেশ হারিয়ে গেছে কবে। মা আর সন্তানের মাঝখানে বসে, কাতর হয়ে ভুলতে চাইছে সে দুঃখ। আপনমনে বাতাস বইছে— তাতে শিউলি ফুলের ম ম গন্ধ…শিবু কাকার ডাক… পদ্মের ব্যাখ্যা-অসম্ভব রঙের খেলা।

স্কুলবেলা তো ফুরিয়েছে কবে!!

হে ভুবনডাঙার বালক, অকাল সন্ধ্যায় তাহলে যাচ্ছো কোথায় ?

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]