স্ক্যালপেল-দুই

ডা: অনির্বাণ ঘোষ

(ইংল্যাণ্ড থেকে): পরের কয়েকটা দিন আমার ছুটি ছিল। সত্যি কথা বলছি ওদের কথা আমার আর মাথায় ছিল না। বাড়িতে ঢুকলে হাসপাতালের কথা মনে থাকেও না। কিন্তু ছুটি কাটিয়ে ওয়ার্ডে পা দিতেই মনে পড়ল বুড়োর কথা। বেডে তখন অন্য রুগী। জুনিয়রকে জিজ্ঞাসা করলাম আন্দ্রেয়ার কোলনস্কপির রিপোর্ট কি ছিলো। ও বললো ভাল, কোন টিউমার মেলেনি। ছোট্ট একটা পাইলস পাওয়া গেছে, ওইটুকুই। যাক, ভাল খবর তাহলে।

সেদিন দুপুরের দিকে রাউন্ডের শেষে হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হাঁটছি এমন সময় পিছন থেকে কে ডাকলো,

-কি হে ছোকরা, কেমন আছো?

পিছনে ঘুরে দেখি আন্দ্রেয়া! আমি একটু অবাকই হলাম। সদ্য ছুটি হয়েছে ওর। আউটপেশেন্ট ডিপার্টমেন্টে ফলো আপে আসতেও অন্তত সপ্তাহ তিনেক দেরী।

-আপনি কি করছেন এখানে?

-আমি এখন রুগীর বাড়ির লোক বুঝলে।

-মানে?

-মানে রোল রিভার্সাল, বলেই হাহা করে হাসতে লাগল আন্দ্রেয়া।

ওর পিছু পিছু রেসপিরেটরি ওয়ার্ডে এলাম। আন্দ্রেয়ার যেদিন কোলনস্কপি হয় তারপরের দিনই সারার মুখ দিয়ে হঠাৎ কাশির সঙ্গে রক্ত ওঠে। ওয়ার্ডের লোকেরাই ওকে ভর্তি করে দেয়। তারপরে সারার বুক পেটের সিটি স্ক্যান হয়েছে। লাঙ ক্যান্সার, ছড়িয়ে গেছে লিভারে। শেষ স্টেজ।

আমি হতভম্বের মতো সারার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। মুখ দিয়ে কোন কথা বেরচ্ছিলো না। প্রৌঢ়া যখন সৌজন্যবোধ থেকে জানতে চাইলেন কেমন আছি তখন শুধু ঘাড়টাই নাড়তে পারলাম। এই কদিনে চেহারায় তেমন কোন তফাৎ চোখে পড়ছে না। বোঝার উপায়ই নেই যে মানুষটা আর কয়েক মাসের মধ্যেই আর থাকবে না। সারার বিছানায় ব্রিসকোলার তাস ছড়ানো। আর সেই খাতাটা খোলা।

দম্পতির খেলা থামেনি।

আমি আমতা আমতা করে আমার মেকী ডাক্তারি স্বরে বললাম,

-অঙ্কোলজিস্ট দেখে গেছেন? কেমোথেরাপিতে লাইফ এক্সপেন্টেন্সি একটু হলেও…

আমাকে থামিয়ে দিয়ে আন্দ্রেয়া বললো,

-না না, কেমোথেরাপির দিকে আমরা যাব না ঠিক করেছি। ওসব করলে আমার সারা আর সুন্দরী থাকবে না। চুল উঠে যাবে, চামড়া কালো হয়ে যাবে। কাল একটা বায়প্সি হওয়ার কথা আছে। তারপরেই আমি ওকে বাড়ি নিয়ে যাবো। বাড়ি গিয়ে অনেক কাজ, খাতা গুলো খুলে হিসাব মেলাতে হবে। এই বুড়ি পালাবার আগেই জানতে হবে না কে জিতলো!

এবারে স্বামী স্ত্রী এক সঙ্গে হাসছিলো। আমার মুখেও হাসি ছিলো একটা। কাঠের পুতুলের গায়ে একটা বাঁকা দাগ টেনে যেভাবে হাসি আঁকে, তেমন। দুজনকেই বাই বলে বেরিয়ে এলাম ওয়ার্ড থেকে। দেখি পিছন পিছন আন্দ্রেয়া আসছে।

-ডাক্তার তুমি আমার কোলনস্কপির রিপোর্টটা দেখেছো?

-আমি নিজে দেখিনি, আমার কলিগ বলেছে, নর্মাল আছে তো সব।

-তুমি শিওর নর্মাল আছে? ওরা কিছু মিস করে যায়নি? আরেকবার করে দেখবে প্লিজ?

বুড়ো আন্দ্রেয়া তখন হয়ত মনে প্রাণে চাইছিল যদি ওর কোলনস্কপিতেও একটা ক্যান্সার ধরা পড়ত, তাহলে আর একা থাকতে হত না।

একা থাকার চেয়ে ভয়ঙ্কর রোগ তো আর কিছু নেই।

প্রেম, ভালবাসা, এগুলোর সংজ্ঞা আমার কাছে পরিষ্কার নয়। শরীর, যৌনতা বাদ দিয়ে দিলে ভালবাসাটা কেমন থাকে আমি সত্যিই জানি না। এই বয়সে হয়ত সেই উপলব্ধিটা হওয়ার কথাও নয়। কিন্তু আমি আন্দ্রেয়া আর সারাকে দেখেছিলাম। ওদের সম্পর্কের উষ্ণতাটা অনুভব করেছিলাম। সেখানে কেউ বলে না ‘ভালবাসি’। কোন কাম আর অবশিষ্ট নেই সেই প্রেমে। এই ভালবাসাটা একটা রোজের অভ্যাসের মতো। যা নিজের অবচেতনেই বয়ে যায়। এই অভ্যাসটার সৌভাগ্য কত জনের হয় জানি না। তার জন্য হয়ত বুড়ো হতে হবে।

বুঝলাম শরীর ন্যুব্জ হলে মনের ওজন বাড়ে।
বাড়েই।

ছবি:মারজারে হাসিন মুরাদ