স্টুডিওতে বসে আছি দাদা, আপনি কোথায়

তানভীর তারেক

 ঠিক কোত্থেকে শুরু করবো জানি না। কিছু কিছু মানুষের মোহে পড়ে মফস্বলের এই আমি ঢাকায় থিতু হয়েছিলাম। বিনোদন সাংবাদিকতা বা গান লেখার এইসব নেশাবাজিতে এমন মহীরুহ’র কাছে থাকা যায়। এরকম প্রাপ্তি হয় জীবনে।  আদর পাওয়া যায়।এতটা জানতাম না! আমাকে ভীষণ আদর করতেন , এ শহরে ভীষণ প্রশ্রয় দিয়েছেন সঞ্জীব চৌধুরী, আইয়ুব বাচ্চু ও সুবীর নন্দী। আফসোস! তাদের নামের এই ধারাবাহিক ক্রমান্বয়েই তারা চলে গেছেন পৃথিবী ছেড়ে। আমাকে ছেড়ে। আমি সত্যিই খুব একা আজ ।হৃদয়ে দারুণ এক হাহাকার বাস করে  আজকাল।
আজ থেকে প্রায় ২২ বছর আগেকার কথা। স্টুডিও অডিও আর্ট। তখন ভোরের কাগজে টুকটাক লেখালেখি প্রদায়ক হিসেবে। আর টিউশনি করি। এর বাইরে বেইলী রোডের অডিও আর্টে যেতাম শিল্পী-সুরকারদের সঙ্গে দেখা বা পরিচিত হবার লোভে। স্বার্থ ছিল গান লেখা। প্রনব’দা (প্রয়াত সুরকার প্রণব ঘোষ) আমায় ভীষণ পছন্দ করতেন। অন্য কারো শিফটে যেতে খুব ভয় পেতাম কারন তেমন পরিচয় নেই। অডিও আর্টে পান্না আজম ভাইয়ের কাছ থেকে আগেই শুনে নিতাম প্রনব ঘোষের শিফট কবে। মাসের বেশিরভাগ সময় প্রণবদা’ই এই স্টুডিওতে কাজ করতেন।একদিন  সুবীর নন্দীর আসার কথা স্টুডিওতে। প্রণব’দার সুরে গাইবেন তিনি। প্রণব’দার কাছে শুনে আমি চুপচাপ বসে আছি। ঠিক সময় মতো হাজির হলেন সুবীর’দা। প্রণব’দা পরিচয় করিয়ে দিলেন আমাকে গীতিকবি হিসেবে। আমার মতো এক বাচ্চা ছেলেকে আপনি বলে সম্বোধণ করলেন। ভীষণ লজ্জা পেলাম। এটা সুবীর’দার অনেক পুরনো অভ্যেস। সেদিন বেশি কথা হয়নি। আমি রেকর্ডিং দেখছিলাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো । সেদিন এক নতুন গীতিকারের গান করছিলেন প্রণব ঘোষ। কন্ঠ দেবেন সুবীর নন্দী। সুবীর’দা যথারীতি কয়েকবার শুনে কন্ঠ দিতে ঢুকলেন। একটা জায়গায় লিরিকে কিছুটা খটকা লাগলো দাদার।
দাদা সঙ্গে সঙ্গে প্রণব’দাকে বললেন, গীতিকার সাহেব কোথায়? প্রণব’দা বললেন,‘ও তো চাকরী করে। অফিসে। অসুবিধা নাই। আমরা ঠিক করে নিচ্ছি।’ কিন্তু সুবীর’দা কোনোভাবেই মানতে নারাজ। বললেন, ‘এটা গীতিকারের এখতিয়ার ছাড়া ঠিক করা উচিত হবে না। আমরা অপেক্ষা করি।’
খানিকটা বিপদেই পড়লেন প্রণব’দা। কারণ এরপরেই কলকাতার এক শিল্পীর শিফট রয়েছে। এদিকে সুবীর’দাকে তিনি কিছু বলতে পারছেন না। মোবাইলের যুগ তখনও শুরু হয়নি যে আজকের মতো ভিডিও কল করে সব ঠিক করে নেবেন। অগত্যা প্রায় আড়াই ঘন্টা বসে থেকে সেই গীতিকবি আসলেন তবেই গানটি ঠিকঠাক করে ভয়েস দিলেন তিনি। এরই নাম সুবীর নন্দী!

ওপরের কথাগুলো শুনে আপনাদের মনে হতে পারে সুবীর’দা বুঝি খুব একরোখা। তাকে বোঝানো যায় না। কিন্তু এরকমটা ভাবলে আপনি তাকে ভুল-ই বুঝবেন। তিনি মূলত প্রকৃত মানুষটিকে সম্মান দিতে চাইতেন সবসময়। এরকম আরেকটা ঘটনা। তখন দৈনিক যুগান্তরে কাজ করি আমি। হাসানুজ্জামান সাকী ভাই এর নেতৃত্বে তখন যুগান্তরের ‘স্বজন সমাবেশ’। এর যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলেই তার দায়িত্ব বরাবরই আমার ওপরে বর্তায়। একবার সিলেটে ‘স্বজন সমাবেশ’ এর প্রোগ্রাম। যথারীতি আমি সিনিয়র শিল্পীদের ভেতরে সুবীর’দাকে চুড়ান্ত করি। আর অনুষ্ঠান যেহেতু সিলেটে তাই দাদাও উৎসাহী হলেন। কারণ ওটা দাদার নিজ এলাকা। সিলেটের মেয়র তখন বদরউদ্দিন কামরান ভাই। মেয়র সাহেব থাকবেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি। ঠিক হলো আমরা রাতের ট্রেনে সবাই এক কম্পাটর্টমেন্টে রওনা হবো। সংখ্যায় আমরা  অনেক। পুরো একটা ট্রেনের বগি লেগে যাবে। এস আই টুটুল, ক্লোজআপ ওয়ানের মিমি, আতাহার টিটো, মডেল-অভিনেত্রী রুমানা ( তখন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে গানও গাইতো) মিউজিশিয়ান, সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ারসহ অনেকে।
সেদিন সিলেটে অনুষ্ঠান শুরু হতে খানিক বিলম্ব হলো। কারণ মিউজিশিয়ান তিনজনের সকালের বাসে রওনা হবার কথা । কিন্তু তারা আসেনি। তারা ঢাকার অন্য একটা অনুষ্ঠানের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়ে গেছেন  বেশি টাকা পেয়ে। দাদা ছাড়া তখন বাকী সব শিল্পীরা গো ধরে বসলো । তারা এলাকার অ্যামেচার মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে গান করতে পারবেন না। আয়োজক হিসেবে আমরা খুবই বিপদে পড়ে গেলাম। কারণ  প্রায় গত ১ মাস ধরে শিল্পীদের ছবিসহ পোস্টার ও মাইকিং হয়েছে সিলেট শহরে। পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে। এখন কী উপায়?
সুবীর’দা সেদিন আমাদের বাঁচিয়েছিলেন। একজন নবাগত গায়িকা যখন [নামটা না বলাই শ্রেয়] বললেন,‘ আমি লোকাল মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে গাইতে পারবো না।’ কথাটা সুবীরদার কানে গেল।দাদা আমাকে ডেকে বললেন,‘তানভীর তোমরা স্টার্ট করতে বলো। আমি উঠবো।’
আমি বললাম, ‘দাদা আপনি তো সর্বশেষ আকর্ষণ। আপনাকে এখন তুলে দিলে  অনুষ্ঠান কিভাবে সামলাবো। আর দাদা ৩ জন মিউজিশিয়ান আসেনি ঢাকা থেকে।’
দাদা ‘অসুবিধা নাই’ বলে শুধু হারমোনিয়াম নিয়ে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে গেলেন।
‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার , শত্রু বলেই গন্য হলাম।’ পুরো হলজুড়ে তখন পিনপতন নীরবতা। এতক্ষণ যারা সাউন্ড খারাপ, মিউজিশিয়ান নেই বলে চিৎকার চেঁচামেচি করছিলো- তারা চুপচাপ অডিটরিয়ামে যার যার সীটে বসে পড়লেন। টানা  ১ ঘন্টা গাইলেন সুবীর’দা। গ্রীন রুমে বসা অন্য শিল্পীরা যারা এই স্টেজে গাইবেন না বলে ‘গো’ ধরে বসেছিলেন। তারাও তখন কখন স্টেজে উঠবেন তাই জানতে চাইলেন। শুধু একা  হারমোনিয়াম বাজিয়ে ৮ টি গান গেয়ে দর্শক মাতিয়ে নামলেন সুবীর নন্দী। এরপরে যে কোনো শিল্পীর জন্য ঐ মঞ্চে দর্শকদের মন জয় করা ছিলো খুব কঠিন ।
শিল্পীদেরও বিনয়ী হতে হয়। এই শব্দ শুধু টকশো’তেই আমরা শুনতে পাই। কিন্তু প্রকৃত অর্থে বিনয় কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী তা দেখিয়েছেন সুবীর নন্দী। সহশিল্পীদের প্রতি তার অকুন্ঠ শ্রদ্ধা। কখনও  মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন এমন নজির নেই। একুশে টিভিতে আমি যখন মিডিয়া গসিপ অনুষ্ঠানটি করি। তখন প্রায় সময় অনুষ্ঠান অন এয়ারের দিনে আমাকে ফোন দিয়ে আমার অনুষ্ঠানের গঠনমূলক সমালোচনা করতেন। আমি মনে মনে বিষ্মিত হতাম। এত বড় মাপের মানুষ আমাকে ফোন করে অ্যাপ্রিশিয়েট করছেন! এটা করবা, ওটা করবানা বলছেন! এক জীবনে আমার হয়তো কোনোই প্রাপ্তি নেই । কিন্তু এই যে সুবীর নন্দী আমাকে আদর করেন। সেই আপনি থেকে পরিচয়ের শুরু হয়ে ‘তুমি’ বলে  স্নেহভরে  ডাকেন। শাসন করেন। প্রশংসা করেন। পরামর্শ দেন এর চেয়ে বেশী আর কী লাগে!
আপনাদের হয়তো কারো কারো মনে থাকবে আজ থেকে প্রায় ১ যুগেরও বেশি সময় আগে সুবীর নন্দী একটি জটিল অপারেশনে জীবন সংকটে পড়েছিলেন। এরপরে ঈশ্বরের কৃপায় আবারও গানে ফিরে এসেছেন। তাই সুবীর’দা  বলতেন ‘এটা তো আমার দ্বিতীয় জীবন।’ শারীরিক অসুস্থতা, ডায়ালিসিস থেকে শুরু করে সব ভয়াবহ প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে গেলে একজন সাধারণ মানুষ হয়তো জীবনের বেশিরভাগ সময় বিছানাতেই কাটিয়ে দিতেন। কিন্তু সুবীর’দাকে দেখেছি গানের অনুষ্ঠান হলে । ভালো একটি আয়োজন হলে  অফুরান প্রান শক্তি পেতেন । একবার ঈদের একটি অনুষ্ঠানে একুশে টিভিতে এক শিল্পী শিডিউল মতো আসতে পারেননি। অনুষ্ঠানটি আমার না। কিন্তু প্রডিউসার জানেন যে, আমাকে দিয়ে দাদাকে বললে হয়তো কাজ হবে। তাই আমাকে দিয়ে ফোন করালেন।
আমি বললাম, ‘দাদা অমুক শিল্পী তো ফাঁসিয়ে দিয়েছেন। আপনি যদি অনুষ্ঠানটি করে দেন তাহলে ওরা বেঁচে যেতো। দাদা ফোনে বললেন,‘ তুমি বলেছো তো,তাই যাবো।’
এরকম অনেক হয়েছে। এছাড়া এ কথা লেখাটা শোভন হবে কি না জানি না। তবুও বলছি , অধিকাংশ অনুষ্ঠান আয়োজন করতে টিভি প্রযোজকদের  ঘাম ঝরাতে হয় শিল্পীদের পারিশ্রমিক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে। কিন্তু সুবীর’দা এসব বিষয়ে ছিলেন ভীষণ খামখেয়ালী মানুষ। কারো কাছে হয়তো অল্প টাকা আছে। তিনি একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে দাদাকে দিয়ে গাওয়াতে চান। দাদাকে মিনতি করে বললেই তিনি চলে যেতেন। নিজের পারিশ্রমিক নিয়ে কখনও কারো সঙ্গে দ্বিতীয় কোনো কথা বলতে শুনিনি তাকে। তিনি চাইতেন তাকে যেন যোগ্য সম্মানটা দেয়া হয়। হয়তো শিল্পী জীবনের এই খামখেয়ালী ‘পেশাদারিত্বের’ প্রশ্নে বিরাট ভুল। আর একারণেই হয়তো দাদা সবার প্রাণের সুবীর’দা। একারনেই তার মৃত্যুতে আজ সবার মন  হু হু করে কেঁদে উঠছে। এ কারনেই মনে হচ্ছে খুব পরমাত্মীয়ের বিয়োগ ব্যথায় মনটা বিষন্ন হয়ে আছে।

সুরকার সুবীর’দার সঙ্গী

মাঝখানে খুব সুরের খেয়াল হলো দাদার। তখন সুবীর’দা  নিয়মিত সুর করছেন। প্রতিদিন কমপক্ষে ৬/৭ ঘন্টা গান শুনতেন । বিভিন্ন ধরণের গান। সকাল থেকে শুরু হতো।  সে সময় তাকে বিরক্ত করা যেতো না। নিজের সুরে বিভিন্ন শিল্পীকে দিয়ে গান গাওয়ানোর কথাও ভাবছেন। এর ভেতরে শাকিলা জাফরের একটা গোটা অ্যালবাম সুর করলেন ।  শাকিলা আপা-ই একমাত্র শিল্পী যার সুবীর নন্দীর সুরে পূর্ণাঙ্গ একটি অ্যালবাম রয়েছে বাজারে। সেই রেকর্ডিং এর কাজে ব্যস্ত তখন দাদা। আমিও খবর পেলাম। আমাকে তিনি বাচ্চার মতো আদর করেন। তাই তখন বলতেও ভয় পাচ্ছি যে দাদা আমিও আপনার সুরে গান লিখতে চাই। মন থেকেই চাইতাম দাদা-ই আমাকে ফোন দিক। এই চাওয়াটাও খুব বেশি আমার জন্য। কারণ এতসব বরেণ্য গীতিকবিদের সঙ্গে দাদার চলাফেরা। সেখানে আমি তো কোন নস্যি। তাই আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম। খবর পেলাম শাকিলা আপার অ্যালবামের ৬ টা গান শেষ। মনটা ভেতর থেকে মোচড় দিয়ে উঠলো। দাদা আমাকে ডাকলো না! এই যখন ভাবছি তখন একদিন দাদার  ফোন । বললেন,‘ তানভীর, তুমি পরশু প্রমিক্স এ আসো তো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’
আমি আবারও হতাশ। দাদা তো আমাকে লিরিকের কথা কিছু বললেন না।  মন খারাপ আর অভিমান নিয়ে গেলাম স্টুডিওতে। দেখি স্টুডিওর এক কোনায় হারমোনিয়াম নিয়ে বসে আছেন দাদা। আমি ঢুকতেই স্টুডিও সহকারী একজনকে বললেন,‘এই তানভীরকে একটা কাগজ কলম দে।’এটা বলেই বললেন,‘ শোনো তো এই সুর টা। আমি কয়েকবার গাইবো সুরটা। তুমি মনের ভেতরে নিবা। কোনো রেকর্ড করা যাবে না। এখানে বসে লিখে ফেলো। যদি তুমি ভুলে যাও আমার সুর, তাহলে বুঝবো সুরটা ভালো হয়নি। আর যদি ঠিক ঠাক মিটারে ফেলে লিখে ফেলো তাহলে গানটা করবো।’
আমি লিখলাম ‘ও চাঁদ ও জোছনা, বলে দাও আমায়।’
টানা তিনদিনে দু’টি গানের লিরিক লিখলাম। অসাধারণ সেমি ক্লাসিক্যাল সুরের ওপরে লেখা এই গানটি শাকিলা আপা গাইলেন তার মোহনীয় কন্ঠে। সুবীর’দা বললেন, এটা এ অ্যালবামের শ্রেষ্ঠ গান। আমাকে পিঠ চাপড়ে ঘাড় ধরে একটা আদুরে চাপ দিলেন। ‘ভালো লিখেছো তানভীর।’ এখনও সেই আদর যেন গায়ে লেগে আছে দাদা।
এই গানটি নিয়ে অবশ্য একটি মন খারাপের ঘটনা আছে। তা হলো – অ্যালবামটি রিলিজের পর বিটিভির একটি অনুষ্ঠানে শাকিলা আপা গানটি গাইলেন। কাকতালীয় ভাবে গানটি অন এয়ারের দিনে আমি আর সুবীর’দা একসঙ্গে কোনো এক স্টুডিওতে। আমি ভীষণ এক্সাইটেড। সুবীর’দার সুরে গীতিকার হিসেবে আমার নাম যাবে। কিন্তু বিঁধি বাম। বিটিভি ভুল টেলপ দেখালো। গীতিকার হিসেবে অন্য আরেকজনের নাম গেলো। আমার নাম নেই! আমার চেয়ে সুবীর’দা-ই ভীষণ লজ্জা পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে শাকিলা আপা, টিভি প্রডিউসারসহ অনেককে ফোন করলেন।
কত কত স্মৃতি! একবার এটিএন বাংলায় প্রয়াত কিংবদন্তী আব্দুল লতিফ স্যারকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারী নির্মান করার দায়িত্ব আমাকে দিলেন নওয়াজিশ আলী খান। আমার লেখা আব্দুল লতিফের একটা ইন্টারভিউ পড়েছিলেন তিনি। তা দেখেই আমার ওপরে দায়িত্ব পড়লো। কারণ আব্দুল লতিফ পরিবারের সঙ্গে আমার বেশ জানা শোনা ছিলো। আমি স্ক্রীপ্ট সাজালাম। আমাকে এটিএন বাংলার কারিগরী টীম দেয়া হলো। যথারীতি ঠিক করলাম যে, ভাষা সৈনিক আব্দুল লতিফ স্মরণে একটি গান তৈরি করবো। আর তাতে শিল্পী হিসেবে রাখবো সুবীর নন্দী ও ফাহমিদা নবীকে। নুমা’পা (ফাহমিদা নবী) ততদিনে আমার সুরে বেশ কিছু গান করেছেন। কিন্তু সুবীর’দার আমার সুরে সেই প্রথম কোনো গান । আমি তাকে বলতে ভয় পাচ্ছি যে আমার সুরে গান করবেন কী না। অবশেষে ঠিক হলো। মগবাজারের তান স্টুডিওতে রেকর্ডিং। আমার কথা আর সুর। রুমী রহমানের কম্পোজিশনে দু’জনের গানের মাঝে তাজিন আহমেদ এর একটি আবৃত্তি পাঠ থাকবে। প্রায় মধ্যরাত অব্দি গানটির রেকর্ডিং হলো -গানটির কথা ছিলো – কতটুকু আর শান্তনা দেবো শহীদ নেতার জননী… রেকর্ডিং শেষে সুবীর’দা আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। ‘এত দারুণ সুর করেছো তুমি! তানভীর, তুমি আমার জন্য গান বাঁধো, আমি গাইবো।’ আব্দুল লতিফ স্যার মারা যাবার বছর একুশে ফেব্রুয়ারিতে প্রচার হয়েছিলো অনুষ্ঠানটি।
পরবর্তীতে গানটির ডকুমেন্টারীর জন্য শুটিং করলাম চারুকলা চত্ত্বরে। ২৫ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারী তৈরি করতে প্রায় ১৫ দিন যে পরিশ্রম করলাম, তা স্বার্থক হলো যখন অন এয়ারের পর অনেক গুনীমানুষের সঙ্গে সুবীর’দাও বললেন,‘ দারুণ একটা কাজ করেছো তুমি।’
এরপর সেই গানটি আমার একটা মিক্সড অ্যালবাম ‘দুয়ার’ এ সংযুক্ত করি। সেই অ্যালবামটিতে সুবীর’দার এই গানটির জন্য আমি সিটিসেল চ্যানেল আই অ্যাওয়ার্ডে সেরা সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে পুরস্কার পাই। তার চেয়েও বড় পুরস্কার এই অ্যাওয়ার্ডের সম্মানিত জুরি সুধীন দাস স্যার আমাকে ডেকে বলেছিলেন ‘তুমি নিয়মিত গান করো। থেমো না। গানটি কথা-সুর আমার কাছে অসাধারণ লেগেছে।’
আজ ভাবি। জীবনে আমার কোনো দামী মিউজিক ভিডিও নেই। তেমন কোনো গানের প্রচারণাও পাইনি। কিন্তু আমার এই সঙ্গীত চর্চার ছোট্ট জীবনে এসব প্রাপ্তি আমাকে গর্বিত করে।
আমার জীবনের মূল লক্ষ্য ছিলো আমার সুরে সুবীর’দার একটি অ্যালবাম করা। সেই লক্ষ্যে আমার ছোট্ট একটা প্রাইভেট কারে প্রায় প্রতি সপ্তাহে সুবীর’দাকে সন্ধ্যায় তার গ্রীন রোডের বাসা থেকে তুলে আমার স্টুডিওতে নিয়ে আসতাম। এই ছিলো নিয়মিত রুটিন। সুুবীর’দা কখনওই স্টুডিওতে এসেই মাইক্রোফোনের সামনে বসে পড়তেন না। এমনও অনেক গান তৈরি হয়েছে টানা ৮/৯ দিন ধরে। স্টুডিওতে এসে আড্ডা দিয়ে তারপর ভয়েস দিয়েছেন। গ্রীন রোড টু বাসা কাম স্টুডিও জিগাতলায় আমার গাড়িতে চেপে সুবীর দা’কে নিয়ে আসার এই সময়টুকু আমার জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সময়। সেলফি ফ্রিক ছিলাম না বলে খুব বেশি ছবি তোলা হয়নি। আফসোস হচ্ছে আজ! কেন তুললাম না আরো কিছু ছবি । মনে পড়ছে খুব। আমি ড্রাইভ করছি সুবীর’দা পাশের সীটে বসে গুন গুন করে গুলাম আলীর গজল গাইছেন। এমন বিকেল সন্ধ্যা কেটেছে অনেক।
আহ! দাদা। এভাবে কে গাইবে। কে শোনাবে! গ্রীন রোড টু জিগাতলা খুব অল্প পথ। কিন্তু রাস্তায় ট্রাফিক জ্যাম লাগলে আমি খুব খুশী হতাম। দাদাকে বলতাম, আরো কিছুক্ষণ জ্যাম থাকুক। তাহলে আপনাকে এভাবে আরো কিছুক্ষণ পাবো আমি দাদা। সুবীর’দা আমার কথায় তার চিরচেনা মৃদু হাসি হাসতেন।
টানা ৩ বছর সময় নিয়েছি দাদার ৮ টি গান রেকর্ডিং এ। কারণ আমাদের দুজনারই প্ল্যান ছিলো  কোনো তাড়াহুড়ো করবো না। নিজের মতো  করে অ্যালবামটি সাজাবো।
তবে একটা আক্ষেপের কথা বলি। এই অ্যালবামটির অ্যাকুস্টিকের কাজ করেছি কলকাতার উষা উত্থুপ দিদির স্টুডিওতে। সব বাঘা বাঘা মিউজিশিয়ানরা বাজিয়েছেন। তাতে আমারও কম খরচ হয়নি। কারণ নিজের জমানো টাকা খরচ করে এই কাজটি করেছি আমি। দেশে ফিরে বেশ ক’টি চ্যানেল আর স্পন্সরের কাছে গিয়েছি কিন্তু তারা ফিরিয়ে দিয়েছে। এ কথা কখনও বলিনি সুবীর’দাকে। পাছে তিনি কষ্ট পাবেন ভেবে। আজ হয়তো সেই সকল চ্যানেল কর্তা, প্রডিউসার, স্পন্সররা খুব মায়া কান্না কাঁদবে জানি। কিন্তু বাস্তবতা কত আলাদা!
সুবীর’দাকে নিয়ে স্মৃতিগদ্য লিখতে হলে গোটা  একটা গ্রন্থ লিখলেও শেষ হবে না।তবে আজ অ্যালবাম রেকর্ডিং নিয়ে কিছু কথা বলে  আমার কথা শেষ করছি- জিগাতলা আমার স্টুডিও কাম বাসাতে যথারীতি এক সন্ধ্যেবেলা গান রেকর্ডিং চলছে। এর মাঝে ইন্টারকমে  ফোন। ওপাশ থেকে সিকিউরিটি বলছেন, ‘স্যার নিচে র‌্যাব এর গাড়ি এসেছে। আপনারে নাকি অ্যারেস্ট করবো। আপনারে বুলাই।’
আমার তো চোখ- কান- গলা শুকিয়ে এলো। বিগত দিনে কি কি অন্যায় করেছি মনে করতে লাগলাম। নাহ। এমন কিছু করিনি যে র‌্যাবের গাড়ি আসবে! আমার কিম্ভুতকিমার চোখ মুখ দেখে সুবীর’দা বললেন,‘ কী কোনো সমস্যা তানভীর। কী হয়েছে বলো?’
আমি সব বললাম তাকে। সুবীর’দা বললেন, ‘চলো দু’জন মিলেই নীচে যাই। দেখি কে তোমাকে ধরতে এসেছে।’ নীচে নামতেই র‌্যাব এর এক সুদর্শন অফিসার সুবীর’দাকে  সালাম দিয়ে বললেন, স্যার আপনি এখানে? আমরা আসলে এই বাসার সামনে এতগুলো চ্যানেলের গাড়ি দেখে নক করেছি। এখানে কি কোনো অনুষ্ঠান?
আমি তখন বুঝলাম কাহিনী কী? ঐদিন বেশ ক’টি চ্যানেরের বন্ধুদের এক সঙ্গে ডেকেছিলাম। অ্যালবামটি নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য। তারা প্রায় একই সময়ে এসে হাজির ছিলো নীচে। চ্যানেল রিপোর্টার বন্ধুরা আমাকে ফোন দেবার আগেই র‌্যাব অফিসাররা হাজির।
পরে ঘরে ফিরে দাদা অনিমাকে বলতে লাগলেন,তোমার বরকে তো আজ পুলিশে ধরেই নিয়ে যেতো। এ যাত্রায় রক্ষা করলাম। পরে কী হয় জানি না। হাহাহাহ ।এ নিয়ে সুবীর’দা খুব মজা করতেন আমার সঙ্গে!
আহা ! সুবীর দা। আমার প্রাণের দাদা। এমন করে কে বলবে? আজ আমার স্টুডিওতে আপনার গান শুনি আর মনের অজান্তেই চোখ ভারী হয়ে আসে। বাবার মৃত্যুর পর কোনো মৃত্যু আমাকে এইভাবে ছুঁয়ে গেলো। প্রতিবার আমার স্টুডিওতে ঢুকতেই পা ছুঁয়ে সালাম করে কাজ শুরু করতাম। দাদা মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। আমরা দুু’জন মিলে একটি শব সঙ্গীত তৈরি করেছিলাম এই অ্যালবামে।গানটির প্রথম লাইন ছিল ‘আমি বৃষ্টি হয়ে কাঁদবো যেদিন’ ।
সুবীর’দা বলেছিলেন আমার মৃত্যুর পর এই গানটি  চ্যানেলে চ্যানেলে বাজবে।অথচ আমি এখনও গানটি কাউকে শুনাইনি। গানটি শুনলেই  আমার মন ভারী হয়ে আসে। অ্যালবামটির নাম ঠিক করেছিলাম ‘মুগ্ধতা নেব বল’। দাদা আপনি এক অপার মুগ্ধতার নাম। আপনার মনের জমিনে আমার প্রতি ভালোবাসা ছিলো এই বোধটাই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে। আমাকে শক্তি দেয়। আপনাকে কখনও সেভাবে বলা হয়নি দাদা। আপনাকে আমি কি ভীষণ ভালোবাসি। বাবা চলে যাবার পর আপনাকে যখনই দেখতাম মনে হতো বাবার পাশেই আছি। আপনি কি আঁচ করতে পারতেন আপনার এই সন্তানের সেই অভিব্যাক্তি? জবাব দিন দাদা?
শেষ কথা বললেন নিউইয়র্ক থেকে এসে। ‘তানভীর , গানগুলো একটা সিডিতে করে রাখো। একদিন এসে একটানা শুনবো আর অণিমা হাতের রান্না খাবো। তারপর সিরিয়াল করবো। মিক্স মাস্টারে আমি থাকবো।
কই দাদা? আমি সেই যে বসে আছি। গানগুলোর আগে পিছে কিছু কথাবার্তাও রেকর্ড হয়ে আছে ভুলবশত। সেগুলোও কাটতে ইচ্ছে করছে না আর। অথচ আপনার এখন আমার স্টুডিওতে থাকবার কথা ছিলো দাদা !

ছবি: লেখক ও গুগল

লেখক : সঙ্গীত পরিচালক, উপস্থাপক ও গণমাধ্যমকর্মী