স্টেশনে লাইব্রেরী

ঊর্মি রহমান

আমার বই পড়ার নেশা। মনে পড়ে যখন আমি বিলেতে থাকতাম, তখন বই পাবার নানা রকম বন্দোবস্ত ছিলো। প্রতিটি এলাকায় বইয়ের দোকান। এছাড়া মধ্য লন্ডনে বড় বড় দোকান তো ছিলই। আশির দশকে আমি যখন লন্ডনে আসি, তখন সেখানে কোলেট নামে একটি দোকান ছিলো, যার বেসমেন্টে সেকেন্ড হ্যান্ড বা পুরনো বই পাওয়া যেতো। লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্সের যে বইয়ের দোকান ছিলো, তারও পুরনো বইয়ের একটি বিভাগ ছিলো। টেমস্ নদীর তীরে,ন্যাশনাল থিয়েটার আর ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটারের সামনে বিরাট পুরনো বইয়ের বাজার। তখনো বসতো, এখনও বসে। অক্সফ্যাম বা সেরকম চ্যারিটির দোকানেও পুরনো বই পাওয়া যায়। আমি সেখানে থেকে একবার ওরিয়ানা ফালাচির ‘ইন্টারভিউ উইথ হিস্ট্রি’ কিনেছিলাম। তার মানে সিরিয়স ভাল বইও এসব জায়গায় পাওয়া যায়।
আর ছিল পাড়ায় পাড়ায় লাইব্রেরী, যা এখনো আছে। পরের দিকে এসব লাইব্রেরীতে বিভিন্ন ভাষার বই রাখা শুরু হয়, যার মধ্যে বাংলা বই অন্যতম। তার ওপর আরো অনেক সুবিধা আছে বিলেতের লাইব্রেরীতে। আমি যদি অন্য কোন লাইব্রেরীতে কোন বই দেখি যা আমি যে লাইব্ররীর সদস্য, সেখানে নেই; তাহলে আমি আমার লাইব্রেরীকে বলতে পারি সেটি আনিয়ে দিতে। আমার পড়া হয়ে গেলে সে বইটি আবার যথাস্থানে ফেরত চলে যাবে। পরের দিকে যখন আমাজনে বই কেনা শুরু হল, এখন তো সেখানে অনেকগুলো বইয়রেই নতুন সংস্করণরে সঙ্গে ‘ইউজড্ বুক’ পাওয়া যায়। সেটির আবার অবস্থাটাও জানানো থাকে, তার মানে কতটা ভাল অবস্থায় সে বইটি আছে – ৮০%, ৯০% না ১০০%। একবার তো আমি এক পেনী (মানে বিলেতের এক পয়সা) দিয়েও একটি বই কিনেছিলাম। আমার পোস্ট ও প্যাকেজের খরচই বেশী লেগেিেছল। বইয়ের দাম ১ পেনী, পোস্ট ও প্যাকেজে লেগেছিল ২.৭৫ পাউন্ড অর্থাৎ বইটার দাম লেগেছিল মোট ২.৭৬ পাউন্ড!
এরপর বিলেত থেকে চলে গেলাম। পরে আবার যখন এলাম, ছেলের বাড়ি যে এলাকায় সেখান থেকে ট্রেনে ফিরতে গিয়ে দেখি ওদের স্টেশনে একটা টেবিলে বেশ কিছু বই রাখা। একটা বই পছন্দ হলো। তুলে নিয়ে কাউন্টারে বসা ভদ্রলোককে জিজ্ঞাসা করলাম, এই বইটার দাম কত আর কোথায় দাম দেব? তিনি বললেন, দাম দিতে হবে না। আমি বইটা নিয়ে যেতে পারি। পরে দেখলাম, অনেক স্টেশনেই এ ব্যবস্থা চালু হয়েছে। আপনি যে কোন একটা স্টেশন থেকে একটা বই পড়তে নিলেন, সেটা সেখানেই যে ফেরত দিতে হবে, তা নয়। আপনি যে কোন স্টেশনে সেটা ফেরত দিতে পারেন। আপনার কাছে যদি এমন কোন বই থাকে, যা আর আপনি রাখতে চান না, আপনি সেটাও এসব স্টেশনের লাইব্রেরীতে দান করে দিতে পারেন। ভাববেন না যে, এসব বই পড়েই থাকে। প্রতিদিন বই নিয়ে যায় যাত্রীরা। আবার বই দানও করে। এবার আমি যে পাড়ায় আছি, তার নাম উইলিসডেন গ্রীন। সখোনকার মেট্রো (এদেশে যা আন্ডাগ্রাউনাড বা টিউব নামে পরিচিত) স্টেশনে গতকাল দেখলাম তেমন বেশী বই নেই। আজ গিয়ে দেখি বইয়ের র‌্যাক পুরো ভর্তি। আমি সেখানে আলেকজান্ডার ম্যাককলস্মিথের একটা বই নিয়ে এলাম। অনেকদিন আগে আমার ছেলে এই লেখকের ‘নাম্বার ওয়ান লেডিজ ডিটেকিটিভ’ বইটা পড়াবার পর থেকে এই লেখকের বই পেলেই আমি পড়ি। আর কলকাতা থেকে লন্ডন আসার সময় যাত্রাপথে যে বইটা পড়তে পড়তে এসেছিলাম, সেই ম্যারি হিগিনস্ ক্লার্কেও বইটা দান করে দিলাম। আজ তো ডরিস লেসিং’এর মত লেখকের বইও চোখে পড়লো। কত সুবিধা ভাবতে পারছেন? দেশে আমাদের সবারই কাছে প্রায় এমন অনেক বই থাকে, যা আমরা রাখতে চাই না। কিন্তু সেগুলো নিয়ে কি করবো? বই এমন জিনিস, যত নম্নিমানরে বই-ই হোক, ফেলে দিতে মন চায় না। সের দরে বিক্রি করতেও মন চায় না। সে ক্ষেত্রে যদি লন্ডনের মত এমন ব্যবস্থা থাকতো, তাহলে কত ভাল হতো। তাই না?

ছবিঃ লেখক