স্টোরিজ অব আর্টিস্ট ড্রিমস…

হাসানুজ্জামান সাকী

(নিউইয়র্ক থেকে) : রেখা আহমেদকে কে না চেনেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি বসবাস করছেন নিউইয়র্কে। সম্প্রতি এ শহরে বসতি গড়েছেন শিরিন বকুল। টিটু গাজী এবং গোলাম সারোয়ার হারুনও আছেন এ শহরে অনেকদিন। নাট্যজন গাজী রাকায়েতের বড় ভাই টিটু গাজী অভিনয়ে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করেছিলেন কয়েক বছর আগে নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত সাউথ এশিয়ান থিয়েটার ফেস্টিভালে। টিটু গাজী ও গাজী রাকায়েত পরিবারের দ্বিতীয় প্রজন্ম মিথিলা গাজী। মিথিলার স্বামী জেরিমি পেরেজও অভিনয় করছেন। আছেন এজাজ আলম, বসুনিয়া সুমন, প্রতিমা সুমি, রেশমা চৌধুরী, জেফ হোসেন, শিশুশিল্পী দয়িতা তালকুদারসহ আরও অনেকে। আর আছেন বিশেষ একজন— ভারতীয় অভিনয়শিল্পী গার্গী মুখার্জি। এরা সবাই নিউ ইয়কের্র নাট্য গ্রুপ ঢাকা ড্রামার সদস্য।

২৭ মার্চ ছিল ওয়ার্ল্ড থিয়েটার ডে। এই উপলক্ষে ঢাকা ড্রামার উদ্যোগে ৩১ মার্চ অনুষ্ঠিত হলো নাট্য উৎসব। প্রতি বছরই ঢাকা ড্রামা অন্য আরো সংগঠনকে সঙ্গে নিয়ে বড় আয়োজনে দিবসটি উদযাপন করে থাকে। জ্যামাইকা পারফরমিং আর্টস সেন্টারে আয়োজিত এবারের উৎসবে ঢাকা ড্রামা ছাড়াও আরও পাঁচটি নাট্য সংগঠন অংশ নেয়। সংগঠনগুলোর মধ্যে ছিলো নিউ ইয়র্কের ড্রামা সার্কল, কৃষ্টি, শিল্পাঙ্গন, নিউ জার্সির ভারতীয় কলা কেন্দ্র ও ব্যক্তিগতভাবে আলাদিন উল্লাহ। আলাদিন উল্লাহ নিজেই স্বনামে খ্যাত। সম্প্রতি নিউ ইয়র্কের বিখ্যাত ব্রডওয়ে শোতে তাঁর ‘ডিশওয়াশার ড্রিমস’ সুনাম কুড়িয়েছে। তিনি এখন হলিউডের বড় বড় ছবিতে অভিনয় করছেন।

উৎসবে ঢাকা ড্রামা তাদের নতুন নাটক ‘স্টোরিজ অব জ্যাকসন হাইটস’ মঞ্চস্থ করেছে। বাংলাদেশি এক অভিবাসীর অভিবাসন-সংগ্রামের কাহিনী নিয়ে মঞ্চায়িত এ নাটকটি রচনা ও পরিচালনা করেছেন গোলাম সারোয়ার হারুন। মূল ভাবনা, নাট্যায়ন ও অনুবাদ গার্গী মুখার্জীর।

আপনারা নিশ্চয়ই ভাবছেন, অনুবাদের বিষয় এলো কোথা থেকে। আসলে পুরো নাটকটি ইংরেজিতে মঞ্চস্থ হয়েছে। ভারতীয় গার্গী মুখার্জিরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রক্তকরবী, বিসর্জন, স্ত্রীর পত্র ইংরেজি ভাষায় মঞ্চস্থ করেছেন এর আগে। মহাশ্বেতা দেবীর নাটক কিংবা সৈয়দ শামসুল হকের নূরুলদীনের সারা জীবনও ইংরেজিতে মঞ্চস্থ করেছে পশ্চিমবঙ্গের নাট্য সংগঠন। এমন উদাহরণ আরও আছে। কিন্তু নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কোনো নাট্য দলের এটিই প্রথম ইংরেজি নাটক মঞ্চায়ন। এখানেই ঢাকা ড্রামার উপস্থাপনার ভিন্নতা।

নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকা পারফরমিং আর্টস সেন্টারটি খুবই আকর্ষণীয়। এখানে এলে এর বাইরের-ভেতরের পরিবেশ দেখে মন ভরে ওঠে। প্রতিটি নাটক শেষে সামান্য বিরতিতে ছোলা, চানাচুর, মুড়ি আর চায়ের স্বাদ নিতে নিতে নীচের ক্যান্টিনে খানিক আড্ডা জমে ওঠে। সেই আড্ডায় উঠে আসে কত কত প্রসঙ্গ। এদিনের আয়োজন যত সুন্দর ছিলো সেই তুলনায় দর্শক সমাগম যে আরও একটু বেশি হতে পারতো সেই আক্ষেপ করছিলেন কেউ কেউ।

নিউইয়র্কে নাট্যশিল্পীদের অনেকেরই এখন স্থায়ী বসবাস। প্রতিনিয়ত এখানে নানাবিধ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে কিংবা বেড়াতে আসছেন ঢাকার নাট্যজগতের অনেকে। এবার ঢালিউডে অংশ নিতে ইতোমধ্যে নিউইয়র্কে এসেছেন এক সময়ের তুখোড় থিয়েটারকর্মী জাহিদ হাসান, সাজু খাদেম। এসেছেন অভিনেত্রী সাদিয়া ইসলাম মৌ, অভিনেতা আরফান আহমেদ। টিভি নাটকেই তাদের সবার এখন ব্যস্ততা। জাহিদ-সাজুরা এখন সেলিব্রেটি। সেলিব্রেটি হলে কী থিয়েটারকর্মী পরিচয়টা লুপ্ত হয়ে যায়? এজন্যেই কী নিউইয়র্কে নাটক নিয়ে এমন অনিন্দ্য সুন্দর আয়োজনে তাদের পাওয়া গেলো না। নাকি আয়োজকরা তাদের আমন্ত্রণ জানাতে ব্যর্থ হয়েছেন। এসব নিয়েও আড্ডায় কিছুক্ষণ তর্ক-বিতর্ক চললো।

নিউ ইয়র্কে টিভি নাটক খুব একটা হয় না। এখানে শুটিং করা বেশ কঠিন ও ব্যয়-সাধ্য ব্যাপার। কিন্তু এখানে থিয়েটারটা বেশ চালু রেখেছেন রেখা আহমেদ, শিরীন বকুল, মুজিব বিন হক, সুলতান বোখারী, শিবলী নোমানী, গোলাম সারোয়ার হারুনরা। লং আইল্যান্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নজরুল ইসলামও সেই বন্ধুর পথে হাঁটছেন। এক সময় যেমন হেঁটেছেন জামালউদ্দিন হোসেন-রওশনআরা হোসেন কিংবা নার্গিস আহমেদ, জহির মাহমুদ ও মোস্তাক আহমেদরা।

থিয়েটারকর্মী খাইরুল ইসলাম পাখি এখন নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসে থাকেন। অন্যপ্রান্ত লং আইল্যান্ডে থাকেন এক সময়ের থিয়েটারকর্মী টনি ডায়েস। অনুজকে নিয়ে অগ্রজ পাখির মনটা স্বপ্নে উড়ে উড়ে বেড়ায়। থিয়েটার নিয়ে পুরো আমেরিকা ঘুরে বেড়াতে চান তিনি। পাখির স্বপ্ন কতটা বাস্তবতা পাবে সময়ই হয়তো তা বলে দেবে। তবে তাঁর স্বপ্নের সারথী হতে চাই আমরা।

থিয়েটারকর্মীরা নিউইয়র্কে সতীর্থ হিসেবে পেয়েছেন নিবেদিতপ্রাণ আরও কিছু নাট্যকর্মীকে। রোববার নাট্য উৎসবে যাদের পরিবেশনা দেখেছে থিয়েটারপ্রেমী নিউ ইয়র্কবাসী। এই নিবেদিতরা কেউ চাকরি ছেড়ে, পরিবারকে সময় না দিয়ে, নিজেদের শারীরিক অসুস্থতাকে অবজ্ঞা করে থিয়েটারকে সময় দিয়েছেন, এখনও সময় দিচ্ছেন। কেউ কেউ নিজের পকেটের টাকা ঢালছেন শিল্পের পিছনে।

ঢাকা ড্রামা যে নাটক মঞ্চস্থ করেছে তাতে তারা অভিবাসন-সংগ্রামীদের গল্প তুলে এনেছে। তা দেখে কখনো দর্শকদের চোখে জল এসেছে, কখনো উপস্থাপনার ঢঙে ঠোঁটের কোণে ফিক হাসি ফুটেছে। কিন্তু যারা অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষায় অভিনয় করে যাচ্ছেন তাদের সংগ্রামের কাহিনীটা কিন্তু কোনো অংশে কম নয়।

স্টোরিজ অব জ্যাকসন হাইটস-এর মতো কেউ একদিন হয়তো শিল্পীদের বেদনা নিয়ে লিখবেন নতুন কোনো নাটক—স্টোরিজ অব আর্টিস্ট ড্রিমস।

ছবি: লেখক