স্পর্শের রঙ

ড.সেলিম জাহান

‘স্পর্শের কি কোন রঙ আছে’?, তুলি থামিয়ে কপালের চুল সরিয়ে প্রশ্ন করল শিল্পী বন্ধুটি। ইজেল থেকে একটু দূরে মোড়ায় বসে ওঁর সঙ্গে গল্প করছিলাম। প্রশ্নটা শুনে একটু থমকালাম, তারপরেই স্মিতহাস্যে বললাম, ‘থাকবে না কেন? নিশ্চয়ই আছে। রঙ না থাকুক, রঙের আভাস আছে।’ বন্ধুটি সৌৎসুকে আমার দিকে তাকালো।

‘ দ্যাখো না, আমার কোন সাফল্যের পরে বাবা যখন আমার মাথায় হাত রাখতেন, সেখানে এক আস্হার রঙ দেখতাম; অসুখ হলে মা যখন আমার জ্বরতপ্ত কপালে হাত রাখতেন, তখন সেখানে এক স্নেহের রঙ দেখতাম; কোন এক ব্যর্থতার পরে মাস্টার মশাই যখন আমার পিঠে আলতো করে হাত রাখতেন, তখন এক আশ্বাসের রঙ দেখতাম।’ বন্ধুটির দিকে চোখ রেখে আমি কথায় বিরতি দেই।

‘তারপর ধরো গিয়ে, তাঁর বাগানের ফুল চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ার পরে যোশেফ কাকু যখন শক্ত করে আমার কব্জি স্পর্শ করেছেন, সেখানে রাগের রঙ দেখেছি। পাশের বাড়ীর কিশোরীটিকে তাদের বাড়ীতে পৌঁছে দেয়ার সময়ে অন্ধকারে ভয় পেয়ে যখন সে আমার বাহু স্পর্শ করেছে, তখন সেখানে ভীতির রঙ দেখেছি। আবার নরেন পন্ডিত মশাই যখন পড়া না পারার জন্যে কান মলা দিয়েছেন, তখন অপমানের রঙ দেখেছি,’ আমার কথার ট্রেন চলতেই থাকে। বন্ধুটি মৃদু হাসে, তারপর নরম গলায় বলে, ‘কষ্টের যদি রঙ থাকতে পারে – লাল, নীল, কাঁচা হলুদের রঙ, স্পর্শের বা রঙ থাকবে না কেন’? বুঝি সে কবিবন্ধু হেলাল হাফিজের কবিতার প্রতি ইঙ্গিত করছে।

জানালা দিকে তাকাই। এক ফালি রোদ এলায়ে পড়েছে মেঝেতে – স্পর্শ করেছে বাদামী রঙ্গের কাঠকে। মনে হয়, কত জড় পদার্থকে স্পর্শ করে আমাদের মনটা কত আপ্লুত হয়ে যায়। ভুলতে কি পারি সেই ছোট বেলায় নতুন বছরে, নতুন ক্লাশে নতুন বইয়ের স্পর্শ, কিংবা ঈদের আগের রাতে নতুন জুতোকে স্পর্শের সোহাগে ভরিয়ে দে’য়া?

কোন এক প্রিয়জনের দেয়া সমুদ্রের একটা নুড়িকে আমি প্রায়শ:ই হাতে নেই, আমাদের জেষ্ঠ্য কন্যর দেয়া নোট বইটা যত না ব্যবহার করি, তার চেয়ে বেশী নেড়ে চেড়ে দেখি। খুব ছোটবেলায় আমদের কনিষ্ঠা কন্যা মাটি দিয়ে আমাকে একটা ছোট্ট বাটি বানিয়ে দিয়েছিলো কচি কচি হাতে। আছে এখনো আমার কাছে। ওই নোটবই আর বাটি ছুঁলেই মনে হয়, আমি আমাদের কন্যাদ্বয়কেই স্পর্শ করছি।

আবার জীবন্ত প্রানীকে স্পর্শ করে কি অনাস্বাদিত সুখে সুখী হই আমরা। স্মরনে আসে, আমার পিতামহী কি যে মায়ার সঙ্গে স্পর্শ করতেন তাঁর পোষা হাঁসগুলোকে! আমার মাতামহকে দেখেছি, কি মমতায় হাত বোলাতেন তাঁর রোপিত বৃক্ষগুলোর গায়ে! কিন্তু সবচেয়ে মায়াময় হচ্ছে মানুষের স্পর্শ। কেউ কে ভুলতে পারে শৈশবে মা-বাবা আর ভাই-বোনের স্পর্শ; যৌবনে ভালোবাসার মানুষের ছোঁয়া, সন্তানের স্পর্শ; বার্ধক্যে দৌহিত্র-দৌহিত্রী, পৌত্র-পুত্রীর স্পর্শ? সেই সঙ্গে সারা জীবনে অন্য সব প্রিয়জনদের ছোঁয়া, বন্ধু আর শুভানুধ্যায়ীদের স্পর্শ, এমন কি অচেনা বহু মানুষের ছোঁয়া?

এই সব স্পর্শের মাধ্যমে কি ছুঁতে চাই আমরা? ছুঁতে চাই মানবিক বন্ধন, ছুঁতে চাই মানুষের অনুভূতি, ছুঁতে চাই প্রিয়জনের হৃদয়, দিতে চাই মঙ্গলের ছোঁয়া। স্পর্শের ভাষাতো সার্বজনীন, তার জন্যে বিশেষ অক্ষর লাগেনা, কোন কথা লাগে না, কোন ভঙ্গি লাগে না। বোরুদ্যমান কাউকে যখন স্পর্শ করি, তখন সে সান্ত্বনার ভাষাটি ঠিকই বুঝতে পারে। হাস্যোজ্জ্বল উৎফুল্ল কারো দিকে যখন স্পর্শের হাত বাড়াই, তখন সে জানে, তাকে অভিনন্দিত করা হচ্ছে। মনমরা কারো পিঠে যখন হাত রাখি, তখন সে চাঙ্গা হয়ে ওঠে। আজকাল প্রায়ই অনেকেই আমাকে বলে, ‘আমার মাথায় একটু হাত রাখুন, স্যার’। আমার প্রতি এক গভীর মমতায় তারা হয়তো ভাবে আমার ছোঁয়া একটি মঙ্গলস্পর্শ।

বৃহত্তর অর্থে, জীবনকেও তো আমরা স্পর্শ করি। আমি মাঝে মধ্যেই শুনি বা চিঠিতে পড়ি, ‘আপনি যে কত জীবনকে স্পর্শ করেছেন’। জানি না, আমি এ জীবনে অন্যের জন্যে কি করেছি, কতটা করেছি; কিন্তু এ চেনা-অচেনা কতজন যে আমার জীবনকে ঋদ্ধ করেছেন সারা জীবন ধরে নানা ভাবে। তাঁদের স্নেহ-মমতার স্পর্শ, আস্হা-আশ্বাসের ছোঁয়া ভিন্ন জীবনের এ দীর্ঘ পথ তো পাড়ি দিতে পারতাম না। কি দিয়েছি, তা তো জানি না; কিন্তু নিয়েছি যে তার চেয়ে অনেক বেশী। কিন্তু ঋণের কথা বড় একটা ভাবি নে – জীবনের সব ঋণ শুধবার নয়, আর সব ঋণ শোধ করা ও যায় না এক জীবনে।

ক’দিন আগে আমার একটি লেখা পড়ে আমার এক বন্ধু লিখেছিলো, আপনার সব লেখার মধ্যে একটা স্পর্শ থেকে যায়। আপনার লেখা পাঠককে স্পর্শ করে। আমার লেখার এ এক অসামান্য স্বীকৃতি ও প্রশস্তি, যা আমাকে গভীরভাবে নমিত করে। লেখায় সেই ‘স্পর্শের প্রতীক্ষায়’ আছি যা ও শুধু পড়ার নয়, বোধের এবং অনুভবেরও।

ছবি: গুগল ও লেখকের ফেইসবুক থেকে