স্বপ্ন, দু:স্বপ্নের পুরুষ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পুরুষ কি নারীর কাছে দিন দিন অস্বস্তিকর এক অস্তিত্বের নাম হয়ে দাঁড়াচ্ছে? পুরুষের বলশালী শারীরিক উপস্থিতি অথবা মানসিক আগ্রাসনের রূপরেখা এই একবিংশ শতাব্দীর নারীকে ক্রমাগত আরো বেশি বিপদাপন্ন করে তুলছে? নারীরা বলছেন, পুরুষের এই আগ্রাসী রূপ চিরকালই ছিলো। কখনো তা ছিলো আড়ালে আবার কখনো সে রূপের হিংস্র উপস্থিতি লণ্ডভণ্ড করেছে নারীর মন ও শরীরকে। পৃথিবী যত সামনের দিকে এগুচ্ছে, সময় যত আধুনিক চেতনার রাজ্যে প্রবেশ করছে পুরুষের দখলদারির রশি ততো যেন এঁটে বসছে। যে সমাজে আমরা বসবাস করি সেখানে নারীর বিরুদ্ধে প্রতিদিন ঘটে যাওয়া হিংসাত্নক ঘটনাপ্রবাহ এমন বক্তব্যকেই সমর্থন করছে।

নারীরা পুরুষকে তাদের পাশে একজন বন্ধু হিসেবেই দেখতে চান। চান সেই বন্ধুটি ভালোবাসায়, মমতায়, সহায়ক একটি অস্তিত্ত্ব হয়ে তার হাত ধরে থাকুক একটি জীবন। কিন্তু তেমনটা ঘটছে কি? ঘটছে না বলেই নারী বিদ্রোহী হচ্ছেন। কখনো জোর গলায় নিজের অধিকারের কথা বলতে পারছেন আবার কখনো পুরুষের নিষ্পেষণে সে কন্ঠ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। তাহলে পুরুষরা কি আর নারীকে ভালোবাসেন না?নাকি কখনোই বাসেননি?

এই বিষয়গুলো নিয়েই প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে ফেসবুকে পরিচিত পেইজ ‘পোস্টবক্স’-এ নিয়মিত লেখালেখি করা সচেতন নারীদের কাছে তাদের প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিলাম। তাদের সেই প্রতিক্রিয়া নিয়েই এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ প্রতিবেদনে রইলো ‘স্বপ্ন, দু:স্বপ্নের পুরুষ’।

ফারহানা নীলা

(চিকিৎসক, লেখক)

হাসপাতালে নির্জীব শুয়ে আছে যে দেহ, ধুকপুক বুকের স্পন্দন চলে ধুঁকে ধুঁকে, তিনি আমার নির্ভরতা।  একদিন এই মানুষটার হাত ধরে স্পর্ধিত আমি জীবনের পথে পা ফেলি। তাঁর কাঁধে সংসারের জোয়াল, তিনি এগিয়ে নিয়ে যান পুরোটা পরিবার। তাঁর চোখে জীবন চিনেছি, তাঁর মন্ত্র আজও জপে যাই। তিনি পুরুষ…. পুরুষ বলতেই এই চেহারা আমার চোখে ভাসে।

স্যানিটারি ন্যাপকিনের মত জিনিসও তিনি কিনে দিয়েছেন। তাঁর কাছে শিখেছি ছেলে মেয়ে ভেদাভেদ নেই।  চার ভাই বোনের মাঝে যৎসামান্য সম্পদ করেছেন সমবন্টন। তিনি পুরুষ….

ভাইদের সঙ্গে সমঅধিকারে বেড়ে উঠেছি। একবার বইমেলায় যাই। তখন আমি মেডিকেল কলেজে পড়ি, বড়ভাই পেছন থেকে এসে পিঠে ফুঁ দিয়ে বলেছিল…. ছেলেরা এমন দুষ্টামি করে। ছেলেরা আরো কত কিছু করে,কিভাবে করে… ভাইদের কাছে শিখেছি,জেনেছি। ভাইদের বন্ধুদের দেখেছি,এখনো দেখছি…. তাঁরা সকলেই পুরুষ।

কো এডুকেশনে লেখাপড়া করায় ছেলেদের সঙ্গে এক কাতারে বেড়ে উঠেছি। বন্ধুরা পরম নির্ভার করেছে বিপদে। বন্ধুরা আত্মার সঙ্গে মিশে আছে…. তাঁরাও কেউ কেউ পুরুষ।

ছেলে আমার বড় হয়েছে। মেয়ে আর ছেলের পার্থক্য করা শিখিনি। একই জঠরে বেড়ে ওঠা সন্তান ওরা,ওরা সহোদর। ভাই যখন বোনের স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনে আনে, যখন বলে আপুর পেটে ব্যথা…. তাকিয়ে অবাক হই! ছেলেটা তো পুরুষ…..

নাহ্ আমি নারীবাদী নই। তবে নারী স্বাধীনতার জন্য প্রতিদিন কথা বলি নিজের বলয়ে। ছাত্র,ছাত্রী, রোগী, আমার কর্মক্ষেত্রে….

কারণ আমরা সবাই জন্মগতভাবে নারী কিম্বা পুরুষ। নারীর এক রূপ, পুরুষের অন্যরূপ। তবে পুরুষ কখন সামন্তশাসক হবে,কখন প্রভু হবে,কখন নিপীড়ক হবে….  তা নির্ধারিত হয় বেড়ে ওঠার পরিবেশে। পরিবারই একেকটা দেবশিশুকে শেখায় পুরুষতন্ত্রের মন্ত্র। পরিবার,সমাজ, স্কুল,কলেজে তৈরী হয় আগামীর সামন্তবাদের বীজ।

পরবর্তী জীবনে তারাই হয়ে ওঠে শাসক,প্রভু। চায় আনুগত্য, চায় নিবেদন।

একজন পুরুষের কাঁধে সংসারের বোঝা আমরাই তুলে দেই। ভেবেও দেখি না তাঁর সাধ্য অথবা সামর্থ্য। নিজের শখ আহ্লাদ জলাঞ্জলী দিয়ে পুরুষ ঘানি টানে। আমাদের সমাজ পুরুষকে কাঁদতেও দেয় না, ভাঙতেও দেয় না।তাদের বলা হয় পুরুষের চোখে জল বড় লজ্জার! আমরা পুরুষদের কষ্টের কথা জানতে চাই না। তারা কতটা একা হয় জীবনের প্রান্তে আমরা জানি না। পুরুষ হতে হলে কঠিন হতে হবে, কাঠিন্যের বর্মে নিজেকে সাজাতে হবে…. এমনটাই বলে সমাজ।

বার্ধক্য আর যৌবনের ফারাকে অস্তমিত পুরুষটাও জানে না কতটা একা হয় মানুষ সময়ের পথ পরিভ্রমণ শেষে।

এক সময়ের দাপুটে পুরুষ হতে থাকে তেজহীন শীত বিকেলের সূর্য।

পুরুষ বলতে বয়োঃসন্ধিকালে কতজনের ক্রাশেই তো পড়েছি। পুরুষের এলোমেলো চলন, একটু অগোছালো, একটু খেয়ালী টানতো আমায়। নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা পুরুষের চোখেও দেখেছি কোমল চাহনী। অত্যন্ত ভদ্র পুরুষের চোখেও দেখেছি নিষ্পাপ চাহনী। আসলে আমরাই নারী পুরুষের বিভেদ রেখা টেনে গড়ে তুলেছি একটা দেয়াল। নারী পুরুষের বিভেদ সৃষ্টি করেছে সমাজ নিজ প্রয়োজনে।

জন্মগতভাবে নারী পুরুষের আলাদা করে বলতে হয় না নিজ পরিচয়। বরঞ্চ আলাদা করে বলতে হয় মানুষ পরিচয়।

নিজেকে নারী নয়, পুরুষ নয়…. মানুষ তৈরী করাটা জরুরী। জন্মের সূত্রেই তো নারী পুরুষ পরিচয় তৈরী হয়। তবে বিভাজনটা নিজেদের তৈরী করা….. বিভাজনের মধ্যেও একটা থাকুক মানুষ আদল,থাকুক মানুষের আচরণ। পুরুষ নয়, নারীর সমতা নয়,…..  চাই নিপাট সোজা মানুষ। মানুষ বাঁচলে পুরুষ বাঁচে,নারী বাঁচে।বাঁচে জীবন….

জেরীন আফরীন

(অস্ট্রেলীয়া প্রবাসী)

(লেখক,আবৃত্তিকার,উদ্যোক্তা)

“পুরুষ”! জানিনা কোন সুদূর শৈশব থেকেই আমার কাছে পুরুষ ছিলো একটা অধরা প্রজাপতির মতো। আমার বাবা তার কাঙ্ক্ষিত প্রথম সন্তান হিসেবে একটি পুত্র সন্তান আশা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর আশা জলাঞ্জলি দিয়ে পরপর আমাদের চার বোনের জন্ম।একটা পুত্র সন্তান জন্ম দিতে না পারার কারণে সারাটা জীবন দেখেছি আমার বাবাকে মাথা নিচু করে থাকতে। আমার বাবার এক বন্ধু ছিলেন, নাম মাসুদ ,আমরা তাকে মাসুদ কাকু ডাকতাম। আমি তখন নেহায়েতই শিশু ;হঠাৎ একদিন মজা করে আমার সামনেই আমার বাবা কে বলেছিলেন। “ দোস্ত বাড়ী ,গাড়ী দিয়া কি হইবো এই সব দেখনের জন্য যদি পোলাই না থাকে।কচি দেইখ্যা একটা বিয়া করো , তাইলে যদি পোলা হয়।” আমি সেই না বুঝা বয়স টাতেই কি ভীষণ আঁতকে উঠেছিলাম।

আমার মাকে  ছেলে জন্ম দিতে না পারার ব্যর্থতা আর গ্লানি লুকাতে দেখেছি আজীবন।তাঁর  বরাবরই বাগান করার শখ।সেবার কোত্থেকে যেন জোগাড় করেছিলো বড় পেঁপের বিচি। একেকটা পেঁপে লম্বায় এক হাতের সমান। গাছ ভর্তি পেঁপে হলো। পেঁপের গায়ে রং ধরলো। আব্বা প্রতিদিন আম্মাকে বলে পেড়ে রাখি পেঁপেটা ।আম্মার শখ গাছ পাঁকা পেঁপে খাবে। হঠাৎ একদিন পাড়ার উঠতি মাস্তানরা এসে চোখের সামনে ছিড়ে নিয়ে গেলো সেই পেঁপে। আবারো শুনলাম আমার বাবার ছেলে নেই বলেই এমনটা হচ্ছে।আব্বার তখন বয়স পঞ্চাশ আমরাও বেড়ে উঠেছি অনেকটাই। তবু আবারো কানের সামনে চুপে চাপে অনেকেই বললো এখনো সময় আছে নতুন করে চেষ্টা করুন মোজাম্মেল সাহেব একটা ছেলের জন্য। আমি বুঝে গেলাম পুরুষ তথা ছেলে মানে সাহস ,ছেলে মানে শক্তি ,ছেলে মানে প্রতিরক্ষা।

 আমার বাবা-মা সারাটা জীবনই পরোপকারী। ঢাকতে তারা প্রথম প্রজন্ম বলে সারা বছরই আমাদের বাসায় ঢাকার বাহিরের অতিথির ঢল লেগে থাকতো এবং এই বিষয়টি তাঁদের জন্য ভীষণ আনন্দেরও ছিলো বইকি।আমরা বোনেরা তখন খানিকটা বড়ো। সবাই ঢাকার নামী স্কুল কলেজে পড়ছি। পরিচিত মহলে মেয়েদের রেজাল্ট নিয়ে আব্বা-আম্মার একটা চাপা আনন্দ কাজ করে। আব্বা তখন প্রায়ই বেশ গর্ব করেই বলতেন আমার ছেলে নেই বলে যারা আমাকে ছোট করে দেখে ,তারা দেখুক আমার মেয়েরাই আমার ছেলের থেকে বেশি কিছু। ওই  সময়টাতে আমাদের এক নিকট আত্মীয় ভীষণ অসুস্থ হয়ে আসলেন আমাদের বাসায়। পথে তাঁর ম্যাসিভ স্ট্রোক হয়েছে।পুরো শরীর অবশ। তার বাড়িতে খবর দেয়া হলো ,তার স্ত্রী চাকুরী থেকে হঠাৎ আসতে পারলেন না ,তারপর এসেও বেশি দিন থাকতে পারলে না।আমার মা এবং আমরা বোনেরা মিলে রোগী সামলাই। রোগী খানিকটা স্ট্যাবেল হবার পর তার ছেলেরা আসলেন। ভীষণ আন্তরিকতা আর কঠোর পরিশ্রমের পর উনি যখন সম্পূর্ণ সুস্থ হলেন তখন আশপাশ থেকে গুঞ্জন উঠলো। চার মেয়ে নিয়ে আমার বাবা যেহেতু কন্যা দায় গ্রস্থ তাই পুত্র সন্তানের জনক ওই ভদ্রলোকের জন্য আমরা এতটা পরিশ্রম করেছি। ভীষণ স্তম্ভিত হয়ে তখন জানলাম সামাজিক অবস্থান আপনার যাই হোক না কেন পুরুষ মানেই আপনি নমস্য।

 এর পর ধীরে ধীরে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে জানলাম পুরুষ কি ? নারী যেমন মানব হয়ে জন্মেও মানুষ হতে পারেনি তেমনি সমাজের প্রোথিত নিয়ম আর অভ্যেসের দৈব জালে পুরুষ প্রজাতি মানব থেকে দেবতা হয়েছে বহু আগেই।

আমার ভাবনায়  ‘পুরুষ ’ কোন একক শব্দ নয় , নয় কোনো শারীরিক  বৈশিষ্ট কিংবা মানব ধরণ  ,বরং আমি ‘পুরুষ’ একটি ডিসকোর্স হিসেবে ভাবছি , যেখানে সংস্কৃতির অধিপত্যবাদী চিন্তা দ্বারা  সময়ের বিবর্তনে নারী ক্রমশ প্রান্তিক হয়েছে খুব সযত্নে  প্রতিটি ক্ষনে প্রতিটি মূহুর্তে। আমার কাছে ‘পুরুষ’ কোনো ব্যক্তি নয় বরং একটি বোধ যা মিলে যায় অনেকটা ঈশ্বরের নিরাকার ধারণার সঙ্গে।

মৌসুমী দাশগুপ্তা

(ইউকে প্রবাসী)

(চিকিৎসক,লেখক)

“সম্বর, সম্বর, মহিমা তব

হে ব্রজেশ, ভৈরব
আমি ব্রজবালা
হে শিবসুন্দর, বাঘছাল পরিহর
ছাড় নটবর বেশ, পর নীপমালা”

বিদ্রোহী কবি নারীকে জানতেন, জানতেন পুরুষকেও।
আমাদের ছোটবেলায় কিছু কমিক বই খুব প্রচলিত ছিলো। নন্টে-ফন্টে বা সাবু আর চাচা চৌধুরী কেনার জন্যে গুরুজনদের অনুমতি পাওয়া মুশকিল হলেও মহাপুরুষদের জীবনী বা ধর্মবই এর গল্পগুলো নিয়ে লেখা কমিক গুলো কেনার অনুমতি সহজেই মিলতো।
একটা কমিক এখনও চোখে ভাসে। গল্পের শুরুতে পার্বতী সবেমাত্র স্নানঘরে ঢুকেছেন, তখন শিব এসে সেখানে ঢুকে পড়লেন। পার্বতী আপত্তি জানালেন, কিন্তু শিবসুন্দর মানতে চাইলেন না, স্বামী স্নানঘরে থাকলে আপত্তি কী!
পরবর্তীতে শিব তপস্যায় চলে গেলে পার্বতী ভাবলেন আমার যদি একটি পুত্র সন্তান (কন্যা নয় কিন্তু!) থাকত তাহলে সে আমার পাহারায় থাকতো আর যে কেউ আমাকে বিরক্ত করতে পারতো না। তিনি আপন মহিমায় অনিন্দ্যসুন্দর এক পুত্র সন্তান সৃজন করলেন।
তপস্যা শেষে ফিরে এসে শিব নিজ বাসভবনে ঢুকতে গেলে এক তরুণ তাঁকে বাধা দিলো। “আমার মা ভিতরে আছেন, আপনি মায়ের অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারবেন না।” রাগাণ্বিত শিব ত্রিশূলাঘাতে তরুণকে তৎক্ষণাৎ হত্যা করলেন। পরবর্তীতে দেবতারা একটি হাতির মাথা জুড়ে দিয়ে তাকে বাঁচিয়ে তুললে গণেশের সৃষ্টি হয়।
কমিক বই এর বেশির ভাগ গল্পই আমি ভুলে গেছি, কিন্তু এ গল্পটা মনে আছে। পুরুষ বলতেই মনে হয় প্রতাপ প্রদর্শনকারী, অধিকারকামী একজন আর নারীর আপত্তি বোধহয় তাতেই। “সম্বর সম্বর মহিমা তব”, আমার ভালবাসার জন হয়ে আমার সমতলে নেমে এসো, ” ধর নটবর বেশ, পর নীপমালা”। শক্তিশালী বাহুতে আপত্তি নেই, কিন্তু মননে প্রেমিক হও।
প্রাগৈতিহাসিক যুগের নারীরা পুরুষের সঙ্গে পাল্লা দিয়েই পশু শিকার করতো, খাবার যোগার করতো, শক্তির মূল্য সে জানে। যখন কৃষি যুগ শুরু হলো তখন আসল নারী আর পুরুষের কর্মবিভাজন, নারী ক্রমশই গৃহবন্দি হয়ে পড়লো। কিন্তু তাতে তার শক্তির মাত্রা পরিবর্তন হলো কেবল। প্রকৃত পুরুষ চিরকালই শক্তিমতী নারীকে সমীহ করেছে, দেবতা, দানব অথবা মানব যেই হোক না কেন।
“গর্জ, গর্জ ক্ষণং মূঢ়
মধু যাবৎ পিবাম্যহম”
এক শক্তিমতী প্রত্যয়ী নারীরই উচ্চারণ, স্নানঘরে নিজের প্রাইভেসি ক্ষুণ্ণ হতে দিতে যিনি রাজি ছিলেন না, এমনকি অনুপ্রবেশকারী তাঁর স্বামী হলেও।
নারী কেমন পুরুষ চায়? সেটা নারীভেদে ভিন্ন, ঠিক উল্টোটাও যেমন সত্যি।
প্রযুক্তিগত উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শারীরিক শক্তির প্রয়োজন কমে আসছে। খুব ধীরে হলেও কমছে নারী আর পুরুষের ক্ষমতার বিভাজনও। নারী আবারও প্রস্তর যুগের মতই নিজের খাদ্যসংস্থান নিজেই করতে সক্ষম, নিজের মহিমায় (IVF with sperm bank) পুত্র সন্তান জন্ম দিয়ে নিজের চেষ্টায় বড় করাও যথেষ্টই সম্ভব।
Hugh grant না Idris Elba, George Clooney না সত্যজিত রায় সে পছন্দ যার যার, কিন্তু সবাই চায় compassion, companionship আর সেই বিমূর্ত অনুভূতি, যার নাম ভালবাসা।
“হে গিরিজাপতি, কোথা গিরিধারী?”
আমার বাদল দিনে ভরসা হবে যে মানুষটি, সে কই?
“When rain starts to pour…
I’ll be there for you
Cause you were there for me too…”

নুসরাত নাহিদ

(বহুজাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত)

উনিশশো ছিয়ানব্বই। এসএসসিতে মেধা তালিকায় স্থান পেয়ে উত্তীর্ণদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠান, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নিজেই থাকবেন। পুরো ওসমানী মিলনায়তনজুড়ে ছাত্রছাত্রীদের কলরব। এরই মাঝে শক্ত মুখ করে জলপাইরঙা জ্যাকেটে সেই আবছায়ার মাঝেও রোদচশমা চোখে সেঁটে দুর্ধর্ষ কিছু পুরুষ দেখা। প্রথমেই মনে হলো এঁরা কোথায় থাকে, কী খায়, কোন বাড়িটায় ঘুমায়! ঘোর লেগে গেলো চোখে, সেই ঘোর এসে কাটলো নিজের ঘরেই যখন একজন এমন কিছুতে রূপান্তরিত হয়ে গেলো। কী খুঁজছিলো সেদিনের প্রায়-ষোড়শী? নিরাপত্তা? সবল বাহুতে ভরসা? ক্ষিপ্রতায় সুরক্ষা? হয়তো।

পাঁচ বছর যখন প্রায়শই স্বপ্ন দেখতাম একা একা ঘুরতে বেরিয়ে গেছি, ব্যাকপ্যাক সাথে, কোন এক অচিনপুরের ধবধবে শাদা রঙের বাসে। চারগুণ বয়সে এসে একা একা ঘুরবার স্বাধীনতা দুষ্প্রাপ্য মনে হওয়ায় অভিযাত্রিক মনের ক্যানভাসে স্টিয়ারিং হুইলের পেছনে বসা তরুণের ছবি এসে সেঁটে গেলো, যার সাথে নরকে যেতেও প্রস্তুত। শর্ত একটাই নরকে নিয়ে যেতে হলেও ড্রাইভ করেই নিয়ে যেতে হবে। কেমন পুরুষ চাই, সেই সংজ্ঞায় তখন একটিই মাত্রা, প্রচুর ঘুরতে রাজী থাকতে হবে। পায়ের তলায় শর্ষে দানা বেঁধে ওঠেনি তখনও, তবুও ইচ্ছেঘুড়ির ষোল আনা জুড়ে একটিই চাওয়া৷

 আরেকটু বেড়ে উঠতেই শক্তিমত্তার পাশাপাশি পুরুষের কেজো কর্মঠ রূপ দারুণভাবে টানতে থাকে। প্যাটেক ফিলিপের চাইতে ক্যাসিও প্রোট্রেকে বাঁধা হাত শরীরে অনায়াসে বাঁশী বাজাতে শুরু করে। ঘন হয়ে আসা চোখে লজ্জা আবীর ছড়ায় সেই কর্মঠ পুরুষেরই জন্যে। নিজের পরিশ্রমী রূপের প্রতিফলন যে তার মাঝেও দেখা চাই।

জীবনকে আরেকটু কাছে থেকে দেখতে শুরু করার পর আরও দানা বেঁধে ছড়িয়ে যেতে থাকে প্রশ্নেরা। পুরুষ মানে কী শুধুই শক্তপোক্ত বুকের অধিকারী? সবল পদযুগল? মেদহীন নিপাট তলপেট? ভরসার বাহু? টল ব্রাইট/ডার্ক হ্যান্ডসাম ইন্টেলিজেন্ট থটফুল হিউমরাস? নাকী সে গভীর এবং সংবেদনশীল? পুরুষ মানে এসবকিছুরই এক সুষম রূপ।

 পুরুষ মানে কালজয়ী স্পার্টাকাস মহাউপাখ্যানের গ্যানিকাস, দ্য আনডিফিটেড কিং অফ দ্য রিঙ, যে কী না অপরাজেয় হবার কারণেই জয় করে নিয়েছিলো দাসত্ব থেকে নিজের স্বাধীনতা। লড়াই

করে বেঁচে থাকবার মুন্সিয়ানা আর নারীর শরীরে কোন কবিতা কোন সুরে রচিত হয় তা’ যার হাতের তালুর মতোই চেনা, সে-ই গ্যানিকাস। এই গ্যানিকাসই তার বন্ধুত্বের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে ফিরে এসেছিলো যুদ্ধের ময়দানে, নিজের স্বাধীনতা ভুলে, পুরো দাসপ্রথা রুখে দেবার ‘কজ’ এ সাড়া দিয়ে। চরম সুরাসক্তি আর বহুগামিতা যে ছেড়ে দিয়েছিলো এক শুদ্ধ ভালোবাসার কারণে৷

পুরুষ মানে অনুপম, যেকোন বিপত্তিতে বন্ধুর মতো পাশে এসে দাঁড়াতে পারে এমন কেউ। পুরুষ মানে অনিমেষ, অসম্ভব মেধাবী অথচ জীবনের বাজিকর, বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত, ঘুনে ধরা সমাজ বদলে দেবার স্বপ্ন দেখে যে। তার পুরু চশমার পেছনে বুদ্ধিদীপ্ত, অভিজ্ঞ, শিল্পিত দৃষ্টি। তার রৌদ্রে পুড়ে যাওয়া মন, বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া চোখ। পুরুষ মানে মানুষ। ভালোবাসতে পারার মতো, প্রেমে পড়ার মতো মানুষ৷

শায়িমা আক্তার রুমা

(কবি, উদ্যোক্তা)

কন্যা হয়ে জন্মের পর, “আমার ঘর আলো করে চাঁদ এসেছে “ বলে পরম আদরে কোলে তুলে নিয়ে পুরো কামরায় ছুটোছুটি করা অস্থির যে মানুষটি তিনি একজন পুরুষ ।একজন চরম নিখুঁত আর পরিপাটি, সেল্ফলেস মানুষ ! পৃথিবীর সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজ মেলে, প্রশস্ত বৃক্ষের মতো ছায়াদানকারী যে মানুষটির বুকে, শত আবদার আর নির্মল শান্তির এ গন্তব্যটি কারোই অজানা নয় ।শত রাগ, গাম্ভীর্য আর অনুশাসনের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা কোমল স্নেহময় যে মানুষ, হাজারো জড়তা ভেঙে জীবনের অলিগলি আর আঁকা বাঁকা বন্ধুর পথ কীভাবে পাড়ি দিতে হয় যিনি শিখিয়ে দেন, যার রক্তচক্ষু দেখতেই অন্তর ছিঁড়ে কুটিকুটি, আর যার হাসিতে স্বস্থির বৃষ্টি নামে যেনো ভুবন জুড়ে, সন্তানকে বুকে নিয়ে আগলে রাখা, সেই ছায়াদানকারী বিশাল মহিরূহ স্বরূপ যাকে নিয়ে অম্লমধুর অনুভূতি সেই পুরুষই আমার বাবা !!!

জীবনের নান্দনিক পর্যায়ের এই স্তরে এসে কন্যা থেকে আমি যখন একজন মায়াময়ী স্ত্রী তখন সহচর হিসেবে যে মানুষটিকে পেয়েছি তিনি একজন বন্ধুসুলভ, আত্নবিশ্বাসী, পৌরষদীপ্ত পুরুষ ! যে কিনা আমার নির্ণয় করা সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেন শতভাগ, দৃঢ়তাহীন ও দ্বিধাগ্রস্থ কোনো চরম মুহূর্তেও যিনি মনে অসীম সাহস জাগিয়ে তোলেন, আমার সম অধিকার, পূর্ন স্বাধীনতায় বিশ্বাসী, জীবনের সব কাজের অন্যতম সহযোগী, বৈবাহিক সুত্রে সেই পুরুষটিই আমার জীবন সঙ্গী !!!

জীবনের পরতে পরতে দুত্যি ছড়িয়ে যাওয়া এরাই পুরুষরূপি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ মানুষ !!!

কিন্তু আমরা অনেক ক্ষেত্রেই দেখছি পুরুষশাসিত সমাজে অধিকাংশ নারী মাত্রই শোচনীয় অবস্থানে আছে, শারীরিক ও মানসিক ভাবে তারা অবরুদ্ধ মনের কোনো এক কোনে পুরুষের প্রতি অনুরাগ, বিরক্তি অবদমন করেই সব কিছু মানিয়ে চলা ! বলা হয় পুরুষের বুদ্ধি খড়গের মতো, বেশি শান না দিয়েও কেবল ভারেই অনেক কাজ করতে পারে, আর নারী হয় কলম কাটা ছুরি, যতোই ধার দেয়া হোক না কেনো, তাতে যেনো কোনো বৃহৎ কাজ হয় না, এমন বিশ্বাসেই অন্ধ কিছু পুরুষ !

নারীর উপর যেমন কঠিন শাসন, পুরুষের উপর যেনো তেমন কিছুই নেই, দেখা যায় ভ্রষ্ট পুরুষের যেনো কোনো সামাজিক দন্ডও নেই। একজন নারী সতীত্ব সম্বন্ধে কোনো দোষ করলে পরিস্থিতি যখন তাকে টেনে হিচড়ে চরম অনুশোচনায় বাধ্য করে ঠিক তখনই  একজন পুরুষ প্রকাশ্যেই সেই সব কাজ করে রোশনাই করে জুড়ি হাকিয়ে রাতশেষে স্ত্রীকে চরণরেণু স্পর্শ করিয়ে আসেন ।

বুদ্ধিদীপ্তভাবে যোগ্যতার যথাযথ নির্নয়ে শত বাধা এড়িয়ে আজকাল নারী যখন কর্পোরেট জগতে অনুপ্রবেশ করে তখনও যেনো নারীর কাজ কে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেখা আমাদের দেশের প্রায়ই পুরুষের সহজাত ধর্ম । রূপ দেখিয়ে কাজ হাসিল করিয়ে নিয়েছে এমন বাজে মন্তব্যেও জর্জরিত অনেক নারী। আর যারা শতভাগ গৃহিনী, সকাল থেকে রাত অব্দি নিরলস নিঃস্বার্থ পরিশ্রম করে চলেছেন, “ঘর সংসার চালানো কোনো কাজের মধ্যেই পড়ে না” পুরুষের এমন বাজে মন্তব্যের রোশানলে পড়তে হয় তাদেরও।

তবে মানসিকতার পরিবর্তন নারী পুরুষ দুদিক থেকেই হতে হবে। হুমায়ুন আজাদ তার কোনো এক বইতে লিখেছেন- “একটা ছেলে যখন প্রাতঃকালে ঘুম ভেঙেই বিছানা গুছিয়ে না রাখে, একজন মা দূর থেকে দেখে খুশি হন, দেখতে পায় একজন পুরুষের জন্ম হচ্ছে, কিন্তু মেয়েটি বিছানা না গোছালে নারীর মৃত্যু দেখে মা আতংকিত হয়ে পড়েন”.. এটা সত্যিই দুঃখজনক !!!

সর্বপরি একজন পুরুষ যথার্থই এমন মানুষ হয়ে উঠুক, যে বাবা, স্বামী, ভাই, সন্তান বন্ধু হিসেবে অশংসয়ে অকুন্ঠিত ভাবে নিজেদের পুরুষালী অমিয় ব্যক্তিত্বের ন্যায় আর সঠিক প্রকাশ করবে।

 

শেখ সাবিহা

(সাংবাদিক, লেখক)

দিনভর দোটানায় ছিলাম। লিখবো, না কি লিখবো না। শেষ পর্যন্ত জেনেশুনে বিষপানের সিদ্ধান্ত নিলাম। জানি, তাজ্জব বনে যাবেন কেউ কেউ, কৈশোরের মাঝামাঝি পর্যন্ত নিজেকে ছেলে ভাবতে ভালবাসতাম আমি। এখন বুঝি সমাজে যাকে বলে মাসকুলিনিটি  সেটাই টানতো। ওই ভাল লাগাটা বহাল ছিলো বলেই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুর দিকে মাচোম্যান খুঁজতাম। হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন টল অ্যান্ড হ্যান্ডসাম। আস্তে আস্তে পুরুষের সংজ্ঞা বদলাল। শরীরের জায়গাটা দখল করে নিল অন্যকিছু। ভীষণ কেজো আমি অবসরে স্ক্রিনে ছবি দেখছিলাম, আমি তখন মধ্য কুড়ির এপাশে। খুব কম কথা বলা কেউ, কথায় কথায় মাইকেল অ্যাঞ্জেলো, ফ্রা লিপো লিপি, অ্যান্দ্রেয়া দেল সার্তো নিয়ে এত্ত কথা বলে গেল! অনেক অনেক বছর পর এক খালা শাশুড়ির কাছ থেকে পেলাম তার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ডায়েরি।  তাতে আঁকিয়েদের চিত্রকর্ম আর স্টাইল নিয়ে ছোট ছোট লেখা। ততদিনে আমি জেনে গেছি  পুরুষ সেই যার কাছে গেলে জানার তৃষ্ণা মেটে। কেবলই শুনতে ইচ্ছে হয়। আর এই বয়সে এসে আমার কাছে পুরুষ মানে, বহুদূর হেঁটে এসে যার বুকে নির্দ্বিধায় ক্লান্ত অগোছালো আমাকে সমর্পণ করা যায়।

ছবি : গুগল

অলংকরণ: প্রাণের বাংলা

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]