স্বাধীনতা পেয়েছি; এটাই পরম সত্য

 

আন্জুমান রোজী,
(টরন্টো প্রতিনিধি)

কিছু মানুষের স্বভাবই আছে সবকিছুর মধ্যে দোষত্রুটি খুঁজে বেড়ানো। মূলউদ্দেশ্য হলো ব্যতিক্রম কিছু বলে অন্যের দৃষ্টিতে নিজেকে আকর্ষণীয় করে পরিস্থিতি জটিল করে তোলা। এতে তারা একধরণের আনন্দ খুঁজে পান বৈকি! এমন অনেক মূঢ়-পণ্ডিত দেখেছি; যারা দিনশেষে মুখ থুবড়ে  পড়ে থাকেন। এরা জীবনের বিস্তার, বৈচিত্র, যুক্তির বাইরে কিছু অনুভূতি যে আছে তা   বুঝেন না। এই মানসিকতার পরিচয় আর যে কোনো বিষয়েই দেখানো হোক না কেন; স্বাধীনতা বা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যখন দেখায়; তখন আর মেনে নেয়া যায় না! সবকিছুরই ভালমন্দ দুটি দিক আছে। কিন্তু বাস্তবতার নিরিখে কোন দিকটি বেশি ফলপ্রসূ;  অর্থাৎ ইতিবাচক অর্থে আছে যেদিকটি; সেইদিকটির গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে,  এটাই স্বাভাবিক। এরমধ্যে যদি যৌক্তিক অর্থে লঘু গড়পড়তায় কোনো নেতিবাচক দিক থেকেও থাকে; তা কিন্তু সময়ের ধোপে টেকে না। পর্যবেক্ষণ সামর্থ্য দিয়ে বুঝতে হবে  জনগণ কী চায়। যুগের ইতিহাসে জনগণের রায়ই শেষপর্যন্ত  চূড়ান্ত রায় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মোদ্দাকথা আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। সাড়ে সাতকোটি মানুষ একাত্তরে জেগেছিল। দেশকে শত্রুমুক্ত করেছিল। ছিনিয়ে এনেছিল বাংলার স্বাধীনতা।  ত্রিশলক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত এই স্বাধীনতা হেলাফেলা করে যারা মূল্যায়ন করেন- তাদের জন্য আমার করুণা হয়। 

একাত্তর-পূর্ববর্তী,  একাত্তর এবং একাত্তর-পরবর্তীকালে স্বাধীনতা,  মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনেকে বিতর্ক তুলেছেন, করেছেন অনেক বিষয়কে প্রশ্নবিদ্ধ। কী হলে কী হতে পারতো; এটা না হয়ে ওটা হওয়া উচিত ছিল; এই জাতীয় যুক্তিতর্কে অনেকে লিপ্ত হন ঠিকই কিন্তু সবশেষে চূড়ান্ত কথা আমাদের স্বাধীনতা অর্জন; এই বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়েই তারা দিন কাটান। অথচ স্বাধীন দেশেই তারা বাস করছেন। দেশের সবরকম সুযোগসুবিধা নিয়েই বাস করছেন। হয়তো বলবেন, কী সুযোগসুবিধা দিচ্ছে সরকার! এক্ষেত্রে দেশটা যে সবকিছুর ঊর্ধ্বে  তাকে রক্ষণাবেক্ষণে আমাদের কিছু করণীয় থাকতে পারে; তা তারা ভাবতে পারেন না। কিন্তু যেকোনো বিষয়ে জটিলতা তৈরিতে তারা মহা-ওস্তাদ।  একাত্তর-পরবর্তী একশ্রেণীর বামপন্থীদের মধ্যে এই মানসিকতা প্রকট আকারে দেখা যায়। বিভিন্ন বিশ্লেষণে ইতিহাস পর্যালোচনা হতে পারে; তাইবলে স্বাধীনতা অর্জনকে একেবারে ধোঁয়াশা করে দেওয়ার মানসিকতাকে ঘৃণা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।

স্বাধীনতা,  মুক্তিযুদ্ধ শব্দ দুটির ওপর সূর্যের মতো জ্বলজ্বল করছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নাম।  যার ডাকে স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব হয়। এই চিরন্তন এবং শাশ্বত সত্যটি যারা অস্বীকার করেন; তাদের কীভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব, আমি বুঝি না। বাংলা ভাষাভাষী বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন যার কারণে হলো; তাকে অস্বীকার করার মানসিকতা যে পুরো জাতিকে অস্বীকার করার সমান… এটা হয়তো তারা বুঝতে পারেন না। ইতিহাস যেভাবেই কথা বলুক না কেন; আমি একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পেয়েছি, এটিই আমার কাছে মুখ্যকথা।   স্বাধীনতার জন্যেই তো ছাত্র, শিক্ষক, কৃষক, শ্রমিক, মজুর… সবাই মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল এবং তা বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্বেই সম্ভব হয়েছিল।  মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; এই শব্দগুলো একে অপরের পরিপূরক।  এর একটিকে বাদ দিয়ে কথা বললে একাত্তরের ইতিহাস বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যেতে বাধ্য। সেইসঙ্গে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিতও নড়ে উঠবে।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তোলেন, বিতর্ক করেন।  হয়তো তাদের অনেক যুক্তি আছে এই ব্যাপারে। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে গেলো, এটাকে তারা কীভাবে খণ্ডন করবেন!? দেশ তো বঙ্গবন্ধুর ডাকেই স্বাধীন হলো। তখন তারা কোথায় ছিলেন? জনগণকে তো তারা থামাতে পারেননি!  সবকিছু যেন প্রকৃতির নিয়মেই ঘটে গেলো। দেশ স্বাধীন হলো, মানুষ পেলো জাতির পিতাকে। আজও এই বিশ্বাস নিয়ে মুষ্টিমেয় জনগণ বেঁচে আছে;  বাংলাদেশকে দেখছে তার নিজস্বত্তায়। অথচ এই সত্যকে ঘোলাটে করার মানসিকতার চর্চা দিব্যি কিছু মানুষ করে যাচ্ছে। তাদের অবস্থা দেখে মনে হয়… এদের বিশ্বাসে জনগণের আস্থাহীনতা যেন পাপ! এরা গলাবাজিয়ে পরিস্থিতি গরমও করে রাখেন।

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা চাননি, তিনি স্বাধীনতার ডাক দেননি এই জাতীয় বিতর্কের সৃষ্টি করে যারা দেশের সার্বভৌমত্বের হুমকি দেন; তাদের আস্তাকুড়েই ছুড়ে মারা উচিত। যুক্তিতর্কের খাতিরে বা ইতিহাসের বাস্তব প্রেক্ষাপটে এমন কোনোকিছু যদি থেকেই থাকে; তা আর এইসময়ে গ্রহণযোগ্যতা রাখে না। যা সত্য তা আটচল্লিশ বছর ধরেই সূর্যের মতো জ্বলছে এবং যতদিন পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ থাকবে ততদিন এই সত্য এভাবেই সমুজ্জ্বল থাকবে। যারা স্বাধীনতার বিষয়ে বিভ্রান্তি ছড়াতে চান; তারা তাদের  বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হলে বা পাণ্ডিত্য জাহির করতে হলে দেশ ও জাতির জন্য গবেষণালব্ধ যেকোনো কাজে নিবেদিত হন, অন্তত মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতার বিষয়ে কুতর্ক থেকে বিরত থাকুন।  ইতিহাস নিয়ে আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনা,  বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। কিন্তু আজ  স্বাধীন দেশ পেয়েছি এটাই  বড়কথা। এখন দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে কি কি করণীয় আমাদের, তা ভেবে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়া উচিত।

ছবি: গুগল