স্মৃতির ভায়োলিনে সুর

শেখ রানা

গান লেখার গল্প। গীতিকার হবার উপাখ্যান।সে গল্পও মন্দ নয়।কেবল তাকে পেছনে ফেরানো। ফেরার কালে মনে হবে খুলে গেছে আস্তএক জাদুর বাক্স।উনিশ বছর পূর্তিতে ভাবলাম গান লেখার গল্প হোক কিছু। ইদানিং অনুজ গীতিকারদের জানতে চাওয়া কিছু প্রশ্নের উত্তরও হয়তো এসে যাবে আলগোছে।এভাবেই আমাদের প্রাণের বাংলায় শুরু করলেন গীতিকার শেখ রানা তার গান লেখার গল্প…

(এডিনবরা, স্কটল্যান্ড): ছোটোবেলায় আমি বড় ছিলাম, ইদানিং বড়বেলায় এসে মনে হয় আমি ছোটো হয়ে গেছি।

ভালোবাসাবাসি দিন, অফুরান আনন্দ মেখে নির্ভার পথ চলা, কিংবা নিখাদ একাকীত্বের সেই দিনগুলো আমি ফেলে এসেছি সেই কবে।

ফিরে দেখা সেই স্মৃতির  ভায়োলিনে সুর করুন হলেও সুন্দর হয়ে অনুরণন জাগায়। মন্দ্রসপ্তকের নাম না জানা কোনো এক গহীন কোণে চুপটি মেরে বসে থাকে। তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।

আমার গান লেখালেখির সেই অর্থে তারিখ দিন বেঁধে শুরু নেই। আমি নিতান্ত অশিক্ষিত গীতিকার। এলোমেলো আর ছন্দ মেলানো শব্দ ছাড়া আক্ষরিক অর্থেই আমার রসদ ছিলো না শুরুর দিকে।

প্রচুর গান শুনতাম। কি চমৎকার সব নাগরিক গীতিকার ছিলো সেই ৯০ আর ৯০ পরবর্তী সময়টায়। হাত খরচ আর ঈদের বাজেট থেকে টাকা বাঁচিয়ে  ব্যান্ডের ক্যাসেট কিনতাম পল্টন থেকে, মাঝে মাঝে নিউমার্কেট গিয়ে। বাসায় ফিরেই গোগ্রাসে লিরিক দেখে গান শোনা শুরু হয়ে যেত। গানের সঙ্গে একাত্ম ছিলাম লিরিক পড়ে গান শোনার সেই সময়ে।

এখনকার সময়ে ডাউনলোড করে গান শুনে সেটা কখনই সম্ভব নয়। আধাখেঁচড়া করে এক গান শুনে আর এক গানে যাওয়া হয় শুধু, শোনা আর যাওয়ার ব্যবধানের ফাঁকে আত্মার খোরাক হিসেবে অস্থিরতা ছাড়া আর কিছুই পরে থাকে না উচ্ছিষ্টের ভাগাড়ে।

এই অস্থির ডাউনলোডেড নাগরিক চারপাশে আমি সেই স্থির, শান্ত সময়গুলো খুঁজে বেড়াই।

হাইকোর্ট কলোনিতে সবুজ নির্ভার শৈশব কেটেছে আমার। শৈশব তারপর ‘মনে পড়ে যায় আমার কৈশোর’- এর ছায়ামেঘে ভেসে ভেসে আমি ভেসে বেরিয়েছি এ বেলা থেকে ও বেলা, এ শহর থেকে অন্য শহর।
এই ভেসে বেড়ানো বেলায় হাইকোর্টের সেই অফুরান সবুজ সৌন্দর্যকে এক জায়গায় চুপকথা করে রেখে দিয়েছি আমি, অতি সযতনে।

নির্ভার দিন শেষে আমার জীবনটা বোহেমিয়ান হয়ে গিয়েছিলো। গীতিকার হবার বোকা বোকা স্বপ্ন আবেশিত হয়ে আমি খানিকটা প্রথাবিরুদ্ধ হয়েছিলাম। এখন বোহেমিয়ান শব্দটা শুনতে চমৎকার শোনালেও, বোহেমিয়ান সেই মানুষটাকে অনেক বিপত্তির স্পিডব্রেকারের সামনে দাঁড়িয়ে যেতে দেখেছি। খানিক বিহবল হয়ে এদিক-ওদিক বন্ধুর খোঁজ করতেও দেখেছি।
সেটাও ঝা চকচকে ফাঁকা রাস্তায় নয়, চারপাশে কালো ধোঁয়ার ভাঙ্গাচোরা দরিদ্র যানবাহনের আসা যাওয়ায় বৃত্তবন্দী দৃশ্যকল্পে। সেই দৃশ্যকল্প খুব বেশি অনুকূল ছিলো না বলাই বাহুল্য।

ধারাপাতের জীবনযাপন! আহ… সেই ধারাপাতের অশ্লীল জীবনযাপন থেকে আমি গুটি শুটি মেরে আশ্রয় খুঁজে বেড়াতাম  স্মৃতির ফ্রেমে। আমার শৈশব-কৈশোরের হাইকোর্ট কলোনির সবুজের কাছে।

গান লেখা শুরু দিনে আমি এ স্টুডিও-ও স্টুডিও যাওয়া আসা করিনি খুব বেশি। কাঁচা হাতের লেখা লিরিকগুলো নিয়ে বাপ্পা মজুমদারের কাছে গিয়েছিলাম। ততদিনে এল আর বি, সুমন চ্যাটার্জি, মহিনের ঘোড়াগুলো, ওয়ারফেজ শুনে আমি দলছুটের ফ্যান হয়ে গেছি সঞ্জীব’দার লিরিক পড়ে। মনে পড়ে দলছুটের ‘আহ’ এ্যালবাম হাতে আসার পর অনেকদিন টানা শুনে গেছি। ঘোর লেগে গিয়েছিলো আমার ‘সানগ্লাস’ শুনে। ‘দেয়ালে তোমার ছবি অন্ধকার/তুমি ছায়াঘেরা সুদূরের মুখ’  কিংবা ‘ ওরে রক্তচোষা/ ডাকলো পেঁচা/ অলুক্ষুনে রাত’-এইসব শব্দচয়ন, সঞ্জীব’দার ভরাট কন্ঠস্বর, বাপ্পা ভাইয়ের অপুর্ব যন্ত্রানুসঙ্গ আমার ভিতরে আলোড়ন তুলেছিলো। হাইকোর্টের এক বড় ভাই এর কাছ থেকে বাপ্পা ভাই এর ফোন নাম্বার যোগার করে সোজা চলে গিয়েছিলাম বাপ্পা ভাই এর বাসায়, সিদ্বেশ্বরীতে। দেখা হলো সঞ্জীব’দার সঙ্গে। বাপ্পা ভাই এর সঙ্গে পরিচয় শেষে বন্ধুত্বও হলো বেশ।
তারপর পথ চলায় অনেক গান হলো, অনেক অভিমান হলো, গান বেড়ে গেলো, গান কমে গেলো, অনেক মানুষ এলো, বন্ধু মিলিয়ে গেলো-নাগরিক দেয়া নেয়ার নিয়ন্ত্রিত হাসিতে।

শুধু  হিরের আংটি হয়ে রইলো কয়েক পশলা গান। সেই গানগুলোর আমৃত্যু জীবন। না ফুরোনো নিঃশ্বাস। সেই গানগুলোর জন্য আমার বুক পাঁজরে ভালোবাসা এক আকাশ।

মিরপুরে নিজেদের বাসায় চলে আসার পর কলোনির সেই টিনের চালা বাসা হয়ে গেলো চার দেয়ালে বন্দী ভোরের ঘুম।  বৃষ্টির রুমঝুম শব্দ নাই, ইট বেছানো মেঠো পথে পাশের বাড়ির প্রিয়মুখ নাই, রাত-বিরেতে বেড়িয়ে একা একা ‘আন্ধার বিছরানো নাই’, ভোরবেলায় কদাচিৎ ঘুম ভেঙে শিশিরে পা ভেজানো নাই, এমনকি পলেস্তারা খসে পড়া মধ্যবিত্তের নিমীলিত হাসিও নাই। এই নাই এর বাজারে আছে শুধু কলাপসিবল গেইট, অচেনা মুখ চোখ নাক-টাক। আছে শুধু দুম করে হারিয়ে ফেলা চেনা শহরে অচিন এক মানুষ। আমি।

আমি তখন নিতান্ত মনের অনিচ্ছায় রাজশাহীতে ভর্তি হয়েছি ইঞ্জিনিয়ার হবো বলে। কিন্তু ইলেকট্রিক সার্কিটে কোনোভাবেই মন বসাতে পারিনা। পড়াশোনা বাদে ভালোলাগে সবকিছু। ছুটি-ছাটায় ঢাকায় ফিরে এলেই ছুট দেই বাপ্পা ভাই এর স্টুডিয়োতে। আর ছুটে যাই হাইকোর্ট কলোনিতে। তখনও কলোনি আছে, প্রিয় গাছ, প্রিয় সবুজ, প্রিয়মুখ-সবাই আছে।  শুধু আমি নেই। আমি কোথাও নাই, শূন্য আমি তাই, শূন্যে চলে যাই …

আমার নির্বাসন দন্ড শুরু হয়েছে কেবল। হাইকোর্ট কলোনিতে এসে নস্টালজিক হই,সবুজে ঘুরে বেড়াই। শব্দ খুঁজে বেড়াই। গান লেখার শুরু জীবনে আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে, সবুজের বাহুবন্ধনে শব্দ খোঁজা অনুপল পার করেছি অনেক। ইদানিং মনে হচ্ছে, সেই দিনগুলোতে ফিরে যাবার সময় এসেছে আবার।

যা বলছিলাম, ঢাকায় এসেই চলে যাই নিজের পরিচিত বৃত্তে। সারাদিন ঘুরে বেড়িয়ে রাতের বেলায় লিখতে বসি। চোখ বন্ধ করে সবুজ দেখি, আর সেই অনুভূতিকে শব্দে ধরার চেষ্টা করি। শব্দপাখির দল আসে, আসে না…চলে যায়, ফিরে আসে। এই ঘূর্ণাবর্তে আমার মেধা সঙ্কট বেলা তখন।

হাইকোর্টে আমাদের বাসার সামনে এক চিলতে বারান্দা ছিলো। বহু রাত-দিন-ভোর সেই বারান্দাতে আমি একা একা বসে সবুজ দেখতাম। বৃষ্টি দেখতাম। ছন্দ-টা বোঝার চেষ্টা করতাম না বুঝেই। প্রকৃতির হারমোনিতে আনন্দের পসরা, বিষাদের হাহাকার, বাতাসের কান্না, সবুজ পাতার বিবাগী জীবন-এইসব  আস্বাদন করতে চাইতাম। কোন কোনোদিন দুজনের টিউন হয়ে যেতো এক হারমোনিতে। একই স্কেলে তখন  গান শুরু হতো সবার অলক্ষ্যে।
কেউ না জানুক, আমি জানি সেই সব একা একা দিনের কথকতা। সেই একা দিনের শব্দপাখিরাই আমাকে উজার করে দিয়েছিলো শব্দকল্প।

শব্দ খোঁজার সেই দিনগুলোতে আমার বন্ধুতা হয়ে গিয়েছিলো একটা গাছের সঙ্গে। কিচ্ছু না বলে অনেক সময় আমি গাছটার দিকে তাকিয়ে থেকেছি। একটা মাথা উঁচু করে থাকা কড়ই গাছ। রোদের সাথে, ছায়ার সঙ্গে, বৃষ্টির সঙ্গে, খোলা আকাশের সাথে কি দারুন মিলেমিশে থাকতো আমার বন্ধু  ‘একটি গাছ’।
২০০০ এর দিকে হাইকোর্ট  কলোনি ভেঙ্গে দেবার পরে, বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবার জন্য একবার গিয়েছিলাম আমি।  অতলান্তিক বিষাদ আমার বুকের বাম পাশে ধুকপুক হয়ে জানান দিয়েছিলো- স্মৃতির বৃক্ষ, পাতারা জানে মেঘের চাষবাস।

সেই গাছ-কে নিয়েই আমার গাছ লিরিক লেখা। লেখা শেষ করেই বাপ্পা ভাইকে দিয়ে এসেছিলাম। সেটা বোধহয় ৯৯ এর শেষদিকে। দলছুট তখন হৃদয়পুর নামে একটা অসাধারণ এ্যালবামের কাজ করছে। আমি আসলে ভাবিনি যে গাছ লিরিকটা বাপ্পা ভাই সুর করবে। এত চমৎকার একটা গান হয়ে যাবে সঞ্জীব’দার বিষাদী গলায়। লেখা শেষ করে বাপ্পা ভাইকে দিয়ে আমি রাজশাহীর ইচ্ছেবিরুদ্ধ পাঠশালায় ক্লাস করতে বাসে চেপে বসেছিলাম।

মনে আছে, হৃদয়পুর রিলিজ হবার পর সঞ্জীব’দা মাঝে মাঝেই আমাকে বৃক্ষ রানা বলে ডাকতেন। এই গানে একোর্ডিয়ানের একটা অসাধারন পিস আছে। সেটা বাজিয়েছিলেন বাংলাদেশের বিখ্যাত একজন মিউজিশিয়ান, একজন লিজেন্ড। তার নাম -লাকি আখন্দ।

গান টা প্রথম যখন শুনেছি, এক ধরণের আনন্দ অবিমিশ্রিত দুঃখ হয়েছে আমার। শব্দে ধরা আদতেই কঠিন। শুধু মনে পড়ে গানটা বাপ্পা ভাই এর বাসায় প্রথমবার শুনে বাড়ি ফেরার পথে পুরো যাত্রাপথ আমি কেমন হতবিহবল হয়ে গিয়েছিলাম। সেই সবুজ হাইকোর্ট কলোনি, সেই মেঠোপথ, এক চিলতে বারান্দায় আমার একা একা বসে থাকা, বন্ধু গাছ- সব মিলেমিশে একাকার হয়ে ফিরে ফিরে আসছিলো ভেজা চোখের পাতায়।

‘গাছ’ কিন্তু খুব আলোচিত হয়নি। হৃদয়পুরে এত চমৎকার সব গানের ভিড়ে গাছ গানটা অন্তরালেই থেকে গেছে। আমার অবশ্য এক বিন্দু দুঃখ নেই তাতে। আমার খুব একান্ত এই শব্দগুলো বরং একটু আড়ালেই থাকুক, ভিড় বা কোরাস এড়িয়ে শান্ত হয়ে কেউ খুঁজে পাক। বিষাদের সন্তরণে।

আমি আবেগী মানুষ। গীতিকার জীবনের এই সতেরো বছরের মাথায় এসে আমার মনে হয়, আমার লেখা সবচেয়ে সুন্দর লিরিক এর একটি হলো গাছ। বোধ করি একটা গান বেছে নিতে বললে আমি গাছ গানটাই বেছে নিবো। অনেক দিন ধরে আমার ইচ্ছে ছিলো আমার এপিটাফে লেখা থাকবে  গাছ গানের এই পংতিগুলো-

ভালোবাসা দাও
সবুজ বৃক্ষ
দুঃখে মাতাও
ক্লান্ত বৃক্ষ

একটি শৈশব
কিছু চিহ্ন
একটি কৈশোর
কিছু চিহ্ন
ঘিরে থাকে
এই যে বৃক্ষ…
কই সে বৃক্ষ?

এপিটাফ আবেগ এখন আর নেই। শুধু ভালোবাসা আর বিষাদে মাখামাখি হয়ে সেই গাছটা আমার বুক পাঁজরে স্মৃতি হয়ে আছে, থাকবে…  চলমান মুহূর্ত থেকে এপিটাফ মুহূর্ত পর্যন্ত।

ছোটোবেলায় আমি বড় ছিলাম, একটা বিশাল বড় কড়ই গাছের সঙ্গে বন্ধুত্ব ছিলো আমার। নিঃশব্দের,শান্তির।

ছবি: সৌজন্যে শাহানা হুদা

পড়ুন

মনে মনে বলি, আমার নাম দুখু মিয়া

ফিরে দেখা সব সময় আনন্দের…
আনন্দ-বেদনার আসা যাওয়াতেই জীবন