স্মৃতির মতোই অকেজো আই ডি গুলো ধরে রাখি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

রুমা মোদক

বাবু ভাইয়ের সঙ্গে আমার ফেসবুকেই পরিচয়। ফেসবুকে সংযুক্ত কয়েক সহস্র মানুষের মাঝ থেকে কেউ ব্যক্তিগত পরিচয়েও যুক্ত হয়ে যান নানা অনিবার্য কারণে। বাবু ভাইয়ের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় আর দেখা হওয়াটাও খুব মজার। যার সঙ্গে তিনি আমার হবিগঞ্জ বাসায় এলেন, তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন হবিগঞ্জের রুমা মোদককে চেনো?  আমার খুব পরিচিত হয়েও সেদিন সে বাবু ভাইয়ের কাছে অস্বীকার করলো। বললো, আমাকে চিনে না। বাবু ভাই তাকে ধমক দিয়েছিলেন,হবিগঞ্জ থাকেন রুমা মোদককে চিনো না! ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারতো, কিন্তু বাবু ভাই হবিগঞ্জ এসে সেই লোককে নিয়ে আমার বাসায় এলেন আর চা খেতে লোকটির সামনেই ঘটনাটা আমাকে বলে দিলেন।

 শুনে আমি যতোটা অবাক হয়েছি,তার চেয়ে বেশি বিব্রত হয়েছিলো লোকটি। বাবু ভাই হয়তো জেনেছিলেন, হবিগঞ্জ থাকলে রুমা মোদককে চিনতে হয়। আর সেই লোক জেনেছিলেন, হবিগঞ্জ থাকলে রুমা মোদককে অস্বীকার করতে হয়। সংগত কারণে তার পরিচয় গোপন থাক। তাতে ব্যক্তি রুমা মোদকের কোন ক্ষতিবৃদ্ধি হয় না। বরং বাবু ভাইদের মতো ঋদ্ধ মানুষের সঙ্গে ঋদ্ধতা বাড়ে। বাবু ভাই এক অকপট কালের সাক্ষী। কতো সত্য তিনি জানেন আর বলেন, অবাক হয়ে শুনি। তার মুখে শোনা কাজী সব্যসাচীর স্ত্রীর করুণ জীবন গাথা নিয়ে আমার লেখার ইচ্ছে ছিলো।

প্রতিদিন নিয়ম করে ম্যাসেঞ্জারে শুভ সকাল,শুভ সন্ধ্যা জানাতে ভুল হতো না বাবু ভাইয়ের। আরো কতো ইন্টারেস্টিং ভিডিও ক্লিপ্স।কথা ছিলো জাহাঙ্গীর নগরে তার বাসায় গিয়ে গল্পটা শুনে আসবো সময় নিয়ে। এরই মধ্যে দু’তিনদিন বাবু ভাইয়ের শুভ সকাল, শুভ সন্ধ্যা আসা বন্ধ হয়ে যায়। জীবনের ব্যস্ত দৌড়ে ঠিকঠাক খেয়াল করাও হয় না। হঠাৎ একদিন তাঁর আই ডি থেকে তার ছেলে স্ট্যালিন স্ট্যাটাস দিলেন ,বাবু ভাই নেই। এভাবে প্রতিদিন যুক্ত মানুষটি, ফেসবুকে প্রচণ্ড এক্টিভ মানুষটি একদিন নাই হয়ে যায়! তাঁর আই ডি থেকে আর কোন মেসেজ আসে না। কোন স্ট্যাটাস এসে টাইমলাইনে ভীড় করে না। বাবু ভাই নেই,তাঁর আই ডি টা রয়ে গেছে।

ক্যামেলিয়া কাঁকন,আমার ক্যাম্পাসের বন্ধু। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন এর আমি কুয়েত মৈত্রী হলের সভাপতি আর কাঁকন শামছুন্নাহার হলের। বিশ্ববিদ্যালয় সম্মেলন, কেন্দ্রীয় সম্মেলন, মিছিল মিটিং, মধুর কেন্টিন কতো হাজার হাজার স্মৃতি আমাদের! ৬০ তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে দেখা হলো রাজু ভাস্কর্যের সামনে। আমরা রাজুকে নিয়েই কথা বলছিলাম। সেই মিছিলে রাজুর আশে-পাশেই ছিলাম আমরা।

ছয় মাস পর কেউ একজন ফোন দিয়ে বললো,কাঁকন আপা নেই। নেই মানে? মাত্র মাস চারেক আগে দেখা হলো তো। হ্যা ক্যান্সার লাস্ট স্টেজ ছিলো। সিংগাপুর গিয়েছিলেন। কিন্তু অমোঘ মৃত্যু! কাঁকন নেই। ওর আই ডি টা আছে। রব চাচা। প্রাবন্ধিক এম এ রব। ব্যক্তিজীবনে পিতৃব্যের ভূমিকায় ছিলেন তিনি। লেখালেখির সহযাত্রার পাশাপাশি তাঁর এবং আমার পারস্পরিক ব্যক্তি সংকটে বয়সের ব্যবধান পেরিয়ে আমরা ছিলাম একজন অন্যজনের পরিপূরক। ফেসবুক আই ডি খুলে যখন বন্ধুতালিকায় সংযুক্ত হলেন, প্রায় সব স্ট্যাটাস, ছবিতে কমেন্ট করতেন। বিশেষত আমার কাব্য,পদ্যর খুব প্রিয় নানাভাই ছিলেন তিনি। ওদের ছবিতে এমনভাবে লিখতেন যেনো পাশে বসে বলছেন।

 রব চাচা নেই। তাঁর আই ডি রয়েছে। কেউ আর আমার কাব্য পদ্যর ছবির নীচে লিখে না,নানাভাই মা কে আরো বেশি বেশি জ্বালাতন করো। মাকে জ্বালাতন করার মতো আনন্দময় কাজ আর কিচ্ছু নেই।

 বাবাকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দিয়েছিলাম পূজার বোনাস পেয়ে। খুলে দিয়েছিলাম ফেসবুক আই ডি। খুব একটা শিখে উঠতে পারেননি এর নানা বিষয়াদি। লাইক টাইক দিতেন না। কমেন্ট করার তো প্রশ্নই উঠে না। বুঝতামই না তিনি আমার লেখাগুলো পড়তেন কিনা! দেখা হলে ঠিক বলতেন,এটা লিখেছি, ওটা লিখেছি।বুঝতাম তিনি দেখেন,পড়েন।আমাদের গান শোনার নেশা তাঁর কাছ থেকে পাওয়া।ইউটিউব আবিষ্কারের পর তাঁর আনন্দ ছিলো দেখার মতো। আমি মাঝে মাঝে এটা সেটা পাঠাতাম মেসেঞ্জারে। তাঁর আই ডিতে ঢুকে দেখতাম আত্মীয় পরিজনরা কুশল জিজ্ঞেস করছেন। তিনি সব দেখছেন। কিন্তু রিপ্লাই দেন না। বোধহয় বুঝেননি কীভাবে রিপ্লাই দিতে হয়। ছুটি ছাটায় কাজিনরা এলে দেখতাম তাদের কাছে শিখছেন।

 বাবা নেই তিনবছর হতে চললো। আইডিটা রয়েছে। তাঁর স্মার্টফোনে ঢুকে অনেককে নানাকিছু লিখেছি কয়েকদিন। বাবার আইডি থেকে নিজের মেসেঞ্জারে মেসেজ পাঠিয়েছি। মনে হতো যেনো বাবা আছেন। তিনিই লিখেছেন। তারপর আর লিখি না। মানুষ চলে যায়। আইডির মৃত্যু হয় না।আমরা এদের ডিলিট করে দেয়ার মতো মায়াহীন নিষ্ঠুর হতে পারি না। সত্যকে অস্বীকৃতি জানাই। তাঁদের স্মৃতির মতোই তাঁদের অকেজো আই ডি গুলো তালিকায় ধরে রাখি পরম মমতায়।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]