স্মৃতির শহর…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

(নিউইয়র্ক থেকে): সিলেট শহরে আমার স্মৃতির অন্ত নেই। খুব ছোট্ট বেলায় মার খেয়ে, প্রতিবাদে চোখ কচলে লাল করতাম। বাবা ভেবেছিলেন ছেলের কী-না-কী চক্ষু ব্যারাম! হবিগঞ্জ শহরে সে সময় কোনো চক্ষু ডাক্তার ছিলেন না। ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছিলেন সিলেট শহরের নূরজাহান চক্ষু ক্লিনিকে। সময়কাল ১৯৭৩-৭৪। একই দিনে শাহজালাল মাজার মসজিদে বাবার সঙ্গে জোহরের নামাজ পড়ার প্রথম স্মৃতি।

১৯৭৫ সালে প্রায় ৬ মাসের জন্য একেবারে চলে এসেছিলাম সিলেটের এইডেড স্কুলে। থাকতাম মীরের ময়দানে ভাইয়ের বাসায়। বিশাল স্কুলে হাজার হাজার ছাত্রের উপস্থিতি, আর পড়াশুনার নিম্নমানের কারণে আমরা দুই ভাই আবার ফিরে গিয়েছিলাম হবিগঞ্জের সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে।

সিলেট শহরে শ্বশুর বাড়ি হলেও স্মৃতি হাতড়াতে ভালোবাসি আমার বাল্য ও কৈশোরের। সকালে হযরত শাহজালালের মসজিদের মাইকের আওয়াজ আমার ঘুম ভাঙায়। সিঁড়ি ভেঙে মসজিদের ভেতর ঢুকলেই বাবার কথা মনে পড়ে। পরম স্বত্ত্বায় বাবার বিশ্বাস আর আত্ম নিবেদনের কথা স্মরণ করে আমিও নত হই।

নামাজ শেষে শহর পরিদর্শনে বের হই ভোরের নিস্তব্ধতায়। গত দু’দিন থেকেই এটা করেছি। প্রথম দিন উত্তর দিকে। দ্বিতীয় দিন দক্ষিণে। দক্ষিণে মাদ্রাসা ময়দানকে বাঁয়ে রেখে এগিয়ে যাই স্টেডিয়ামের দিকে। রাস্তার ডানদিকে মাদার কেয়ার ক্লিনিক। ১৯৯৮ সালে এখানেই জন্ম নিয়েছিলো আমার প্রথম সন্তান অনন্যা। ডাক্তার ফরহাত মহলের সাইনবোর্ড এখনো ক্লিনিকের দেয়ালে ঝুলছে।

বাঁদিকে স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলেছি বহু সকালে। বিকেলে গ্যালারিতে বসে লীগ ফুটবলের খেলাও দেখতাম নিয়মিত। আরেকটু এগিয়ে গেলে রিকাই (রিকাবী) বাজার। এই বাজার থেকে মাছ-তরকারি কিনেছি বহুদিন। বাজারের মোড় এখন অনেক আকর্ষণীয় আর প্রশস্ত। এই আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য যার নামটি খোদাই করা আছে মার্বেলে, তাঁর নাম আবুল মাল আব্দুল মোহিত।

একটি শহরের একটি রাস্তার প্রশস্তকরণের কাজে দেশের অর্থমন্ত্রীর নাম ফলকে আমার বিস্ময়। অবশ্য বিএনপির অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন প্রয়াত সাইফুর রহমানও একই কাজ করতেন। তারমানে দেশের মানুষের করের টাকায় নাম ফাটানোর উৎকট রীতি থেকে কেউ বেরিয়ে আসতে পারেননি। এরা কেউই উদারতার বড় উদাহরণ তৈরি করতে পারেননি!

বিস্ময় জাগে বড় বড় বিলবোর্ডে ক্ষমতাসীন দল এবং এর অঙ্গ সংগঠনের নেতাদের বড় বড় দৃষ্টিকটু বিজ্ঞাপণ দেখে। দেশের দুর্নীতি দমন বিভাগ এই সব বিজ্ঞাপণদাতাদের আয়ের উৎস খোঁজ করলে দুর্নীতি অনুসন্ধানের আর কোনো পথে হাঁটতে হবে বলে আমার মনে হয় না।

পুলিশ লাইন ধরে এগিয়ে যাই মীরের ময়দানের দিকে। রাস্তাটি এখন অনেক প্রশস্ত ও দৃষ্টি নন্দন সন্দেহ নেই। কিন্তু আরো বিস্ময় অপেক্ষা করছিল সিলেট বেতারের সামনে এলে। দেয়ালে ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর বিশাল চিকা। গোটা নগরে আর কোনো দলের চিকা না থাকলেও ছাত্রলীগের এমন চিকায় নতুন রঙ করা বেতারের দেয়ালটি তার সৌন্দর্য হারিয়েছে।

শুধু প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল করার আহবানই নয়, সম্মেলনের জন্য চাঁদা সংগ্রহের নেতৃত্ব যিনি দেবেন, সেটি সন্দেহমুক্ত করা হয়েছে- ছাত্রলীগের সভাপতির নামটি যুক্ত করে।

প্রথমত, দেয়াল লিখন একটি অপরাধ। দ্বিতীয়ত সংগঠন চলে নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে। কোনো ব্যক্তির নাম প্রচারের উদ্দেশ্য যথার্থ কি-না তার উত্তর দেয়া উচিত ক্ষমতাসীন দলকে। কারণ এ ধরণের ব্যক্তিবাদ নিপীড়কের জন্ম দেয়। যার কুফল ইতিমধ্যে সামাজ জীবনে নাভিশ্বাসের সৃষ্টি করেছে!

মীরের ময়দানে আর ময়দান নেই। নতুন দালান ভবনের স্তুপ। গলির সামান্য ভেতরে ঢুকতেই জাহাঙ্গীরের সঙ্গে দেখা। চার দশকেরও বেশি সময় পর জাহাঙ্গীরকে চিনতে যেমন আমার সামান্যতম ভুল হয়নি, তেমনি জাহাঙ্গীরও স্মৃতি হাতড়ে আমাকে আবিষ্কার করলো। তাদের দোকানটি এখনো আছে। খোঁজ পেলাম ছেলেবেলার সাথীদের। ফেরদৌস, শওকত লন্ডনে, আতিক কানাডায়। মারুফ ভাই, মোমেন ভাই কেউই আর মাটি কামড়ে পড়ে থাকেন নি!

ফিরে আসছিলাম আবার স্টেডিয়ামের পথ ধরে। একটি চশমার দোকানের ডিজিটাল বিজ্ঞাপনেও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং যুবলীগ নেতাদের দোকান উদ্বোধনের খবর! রাজনীতি আজ জীবন যুদ্ধের হাতিয়ার কিংবা বেঁচে থাকার মন্ত্র নয়। বরং সম্পদ অর্জন এবং লুন্ঠনের একচ্ছত্র অধিকার।

সমাজে মানুষ কতটা রাজনৈতিক স্বাধীনতা ভোগ করে তা উপলব্ধি করা যায় নগর পরিদর্শনে। দেশে অভাব দারিদ্র কমেছে। তাই বলে লুন্ঠন থেমে নেই। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, এর মানে দুর্বলের পক্ষে আইন ও প্রশাসন নয়। নগরের চাকচিক্য বেড়েছে। তাই বলে অপরিচ্ছন্নতা এবং নর্দমার দুর্গন্ধ একটুখানি কমেনি। বিত্তবানদের আরাম আয়েশ বেড়েছে। এর অর্থ এই নয় যে সবার জন্য সুযোগ অবারিত হয়েছে।

নগরীর যেসব স্থানে আগে কোনো দিন ময়লার স্তুপ দেখিনি, এখন সেসব স্থানেও ময়লা এবং আবর্জনা একেবারে ফেনায়িত। এই নগরে কোনো পরিচ্ছন্নতা কর্মী আছে বলে মনে হয় না। অথবা নাগরিকদের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে পাঠ দানেও কেউ মনোযোগী আছে বলে মনে হয় না।

প্রধান সড়কগুলোতে যানজট নিত্য দিনের ঘটনা। আম্বরখানা থেকে বন্দর পর্যন্ত যানজট মুক্ত একটি দিন কামনা করা দুঃস্বপ্নের মত। ঘুষ বিহীন কোনো সরকারি অফিস কল্পনা বিলাস। বরং সিলেটের অর্থমন্ত্রীর অধিনস্ত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান দুর্নীতির ডিপো। নাগরিকরা কর দিতে গেলে প্রথমেই ঘুষের দফারফা হয়। জমি রেজিষ্ট্রি করতে গেলে ঘুষ, ব্যাংকের ঋণ পেতে চাইলে ঘুষ। এসব জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরাই।

ছবি: লেখক ও গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]