স্মৃতি কখনও পোড়ায়…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আশিকুজ্জামান টুলু

টোরান্টোতে একটা বাংলা দোকান ছিলো যেখানে সব সময় যেতাম, যেতে ভালোলাগতো । একদল তরুন দ্বারা পরিচালিত ছিলো দোকানটা এবং প্রত্যেকে অসম্ভব মিশুক আর ভদ্র ছিলো । ওদের সঙ্গে কথা বলতে ভালো লাগতো, ওরা সবার সঙ্গেই ভালো ব্যবহার করতো । এ কারনে ওদের দোকানে প্রচণ্ড ভিড় লেগে থাকতো এবং ব্যবসাও ভালো জমে উঠেছিলো । ওদের মধ্যে তিনজনকে খুব ভালো লাগতো, ওরা একটু বেশিই ভালো ছিলো । গেলেই ওরা বেছে সবচাইতে ভালো মাছটা, ভালো মাংসটা দিতো । মাঝে মাঝে নিজে এসে গাড়িতে উঠিয়ে দিতো বাজার যেটা ওদের করার কথাই নাই ।
ভালই কাটছিলো ওদের ওখানে যাওয়া আসা । একদিন জানতে পারলাম ওদের একজনের কাগজ হয় নাই অর্থাৎ ও যে পলিটিক্যাল অ্যাজাইলেম সিক করেছে, সেটা জানতাম না । ওকে ফেরত চলে যেতে হবে দেশে । খুব মন খারাপ হলো ওর জন্য । ছোটখাটো একটা ভদ্র ছেলে, মিষ্টি চেহারা । একদিন ও চলে গেলো, যাওয়ার আগে আমাকে ও বলেনি কবে যাবে, হয়তো লজ্জায় আর বলতে পারেনি । আমার মন খারাপ হলো, ওকে নিয়ে স্ট্যাটাস লিখলাম ফেসবুকে ।
আবার চলতে থাকলো দিন । দোকানের আরেকজন প্রিয় তরুনের ব্যাপারে আবার জানতে পারলাম যে ওরও কাগজ হয় নাই অর্থাৎ ওই ছেলেও পলিটিক্যাল অ্যাজাইলেমে ছিলো যেটা আমি জানতাম না । এবার ওর যাওয়ার পালা এলো । ও যাওয়ার দু’দিন আগে শেষ দেখা হলো । অসম্ভব হ্যান্ডসাম ছিলো এই ছেলেটা, আগে আর্মিতে ছিলো ও । চলে গেলো হ্যান্ডসাম ছেলেটা । ভীষণ খারাপ লাগলো ওর জন্য । অস্বাভাবিক ভদ্র একটা ছেলে ছিলো ও । আমি জানতাম যে, যারা একবার ডিপোর্ট হয়, তারা আর ঢুকতে পারেনা কানাডাতে, তার মানে এদের কেউ আর ফিরে আসবেনা ।
এবার তৃতীয় তরুনের টার্ন । এই ছেলে সিটিজেন ছিলো । এর বিষয়টা আলাদা । এই ছেলেটা দোকানের মালিকানায় পার্টনারও ছিলো আরেকজনের সঙ্গে । অন্য মালিকের সঙ্গে ওর আন্ডাস্ট্যান্ডিংটা নষ্ট হয়ে গেলো যার কারনে ওকেও চলে যেতে হলো । ও আমাদের কাউকে বলে গেলোনা ।
ওরা চলে যাওয়ার পর অন্য কিছু ছেলে এলো পরিচালনায়’ যাদের সঙ্গে আমাদের আত্মাটা সিঙ্ক করলো না । ওখানে যাওয়ার ইচ্ছা ক্রমেই নষ্ট হতে থাকলো । অন্য দোকান খুঁজতে থাকলাম যেখানে গেলে একটু ভালো লাগবে কথা বলে বা ট্র্যানজেকশন করে । ভালো একটা দোকান পেলাম কিন্তু ওই ছেলেদের মতো নম্র ভদ্র ছেলে আর পেলাম না যদিও মাল পত্র ভালই ছিলো দোকানের ।
প্রায় ৩ বছর হয়ে গেছে ওই ছেলেগুলো চলে যাওয়ার । আর যাওয়া হয় না ওই দোকানটায় । সেদিন হঠাৎ একটা কারনে এক নিমেষের জন্য যেতে হয়েছিলো আমাকে । গিয়ে দেখলাম খুবই সঙ্গিন অবস্থা দোকানের, নতুন একটা ছেলে কাজ করছে, প্রচণ্ড বিরক্তি চেহারায় । এক মুহূর্ত ইচ্ছা করলো না থাকতে ।
মনে পড়ে গেলো ওই তিনজন টকবগে তরুনের কথা যাদের মুখ ভর্তি ছিলো হাসি, মন ভর্তি আনন্দ, চোখ ভর্তি আশা আর অসাধারণ ভালো ব্যাবহার । আজ একজন হারিয়েছে ঢাকার মিরপুরে, একজন হারিয়েছে খুলনার কোথাও আর আরেকজন হারিয়েছে এখানকার এজ্যাক্সে । দোকান সেই আগের মতই রয়ে গিয়েছে শুধু নাই সুন্দর মনের তিনজন মানুষ যাদের পকেট ভর্তি টাকা ছিলোনা কিন্তু ছিলো ভালোবাসা দেয়ার মতো একটা মন । আল্লাহ্‌র কাছে দোয়া করি তোমরা সবসময় ভালো থাকো আর অনেক মানুষের মন ভরে দাও তোমাদের ভালো ব্যাবহার দিয়ে, ছড়িয়ে দাও তোমাদের পবিত্র আত্মার সুবাস চারিদিকে ।

ছবি: সজল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]