হতেম যদি আজীজ কিংবা শফি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

কাজী জাওয়াদ

কাজী জাওয়াদ বাংলাদেশের বিশিষ্ট সাংবাদিক। লুপ্ত সাপ্তাহিক বিচিত্রার প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন কাজী জাওয়াদ। কাজ করেছেন দেশের আরও কয়েকটি গণমাধ্যমে। বিবিসিতে চাকরির সুবাদে চলে যান ইংল্যান্ডে। এখনও সেখানেই স্থায়ী ভাবে বসবাস করছেন।

ইচ্ছে হতো শফির মতো হতে। নামটা কাল্পনিক, আসল নাম মনে নেই। বাকেরগঞ্জের পুরান লঞ্চঘাটে যে দু’তিনটি চায়ের দোকান ছিলো শফিকে সেগুলোর আশে পাশে ঘোরাঘুরি করতে দেখা যেতো। ওর বাসা বা বাড়ি কোথায় ছিলো, কারাই বা ওর মা-বাবা তা জানিনা। শফির তখনও গোঁফ গজায়নি। নাকের নিচে সামান্য কালো ছায়া দেখা যায়। গলার স্বরও না-পুরুষ-না-কিশোর।

ঘাটে লঞ্চ এলেই বোঝা যেতো শফির আসল কাজ কী। লঞ্চ ডাঙ্গা ছুঁতে না ছুঁতেই খালাসীদের গ্রাহ্য না করে ও এবং আরও দু’তিনজন মোটবওয়া কিশোর পাড় থেকে লাফ দিয়ে লঞ্চে উঠতো। যাত্রীদের বোঝা বা বরিশালের ভাষায় ‘ফুল খারা টিনের বাশকো’ নিয়ে টানাটানি শুরু করতো – ‘মাশ্যাইব দেন, নামাইয়া দেই, দুই আনা দিয়েন’। মোট পেলো কি না পেলো তাতে ওদের কিছুই এসে যায় না। ওদের চরম আনন্দ হতো লঞ্চ ছাড়ার পর। (মাশ্যাইব শব্দটা মনে হয় ফরাসী মঁশিউ মানে জনাবের বরিশালী সংস্করণ।)

তখনকার সাধারণ লঞ্চের একদম পিছনে ‘পাঙ্খা’ এবং ‘হালের’ উপরে ঝুল বারান্দার মত ঝুলে থাকতো তৃতীয় শ্রেণীর যাত্রীদের ‘পায়খানা’, ‘মহিলা’ এবং রান্নার জায়গা। মুখোমুখি দু’টো বাক্সের মত জায়গায় চা-বিস্কুট ও সিগারেটের দোকান। দুয়ের মাঝখানে দু’জন মানুষ পাশাপাশি দাঁড়াতে পারে এমন ফাঁকা জায়গা। তার দু’পাশে লঞ্চ বেঁধে রাখার জন্য লোহার খুঁটি বা মুরিং বোলার্ড। এর সঙ্গে মোটা শক্ত দড়ি দিয়ে বাঁধা থাকতো ছোট একটা বালতি। সেই বালতি ছুঁড়ে নদী থেকে পানি তোলা হতো। পানি তোলার সময় লঞ্চের গায়ে লেগে লেগে সেটা এক বাঁকাচোরা ভাস্কর্যের রূপ নিতো।

লঞ্চের ছাদ থেকে সেই গুহায় নামার জন্য ছোট একটা দরজা দিয়ে দু’হাতে প্যারালেল বারের কসরত করে ঝাঁপ দিতে হতো। উপরে ওঠার কায়দাটা ছিলো আরও কঠিন। দু’হাতে ভর করে শরীরটাকে লক্ষ্মণ দাসের সার্কাসের মেয়েদের মত বাঁকিয়ে ছাদে পা ঠেকাতে হতো। তারপর মাথাটাকে নিরাপদে বের করে আনা। এই অংশের ছাদে ছিলো নামাজের জায়গা। রং শিল্পীরা মসজিদের গম্বুজ ও মিনারের ছবিকে ‘ন’ অক্ষরের মত ব্যবহার করে নির্দিষ্ট করে দিতেন ‘নামাজের স্থান’।

লঞ্চ ছাড়ার সময় ‘বাগের’ দিয়ে মাঝ নদীতে যেয়ে ‘দুই ঘন্টি’ মেরে সোজা সামনের দিকে এগু্তো। শফি ও তার দুঃসাহসী বন্ধুরা তখন নামাজের জায়গা থেকে ঝাঁপ দিতো পিছনের উদ্বেলিত ফেনার সাগরে। তারপর সাঁতরে আসতো তীরে। ওদের সেই আনন্দ দেখে অবাক

হয়ে তাকিয়ে থাকতাম। শুধু আমি নয়, পাড়ে থাকা অন্যেরাও। অমন ঝাঁপ দেয়ার কল্পনা করার সাহসও আমার ছিলো না।

আমি মুগ্ধ ছিলাম শফির পানিতে লাফ দেয়ার দক্ষতার জন্য নয়। শফি ছিলো ‘টাস-চারা’ আর মার্বেলের দুর্দান্ত খেলুড়ে। হাতে সুঁতো দিয়ে বাঁধা একতাড়া টাকা আর লুঙ্গির কোঁচর ভর্তি মার্বেলের ঝন্‌ ঝন্‌ শব্দ তুলে ও দান মারতো। সেই শব্দই প্রতিদ্বন্দি খেলোয়াড়ের বুকে কাঁপন ধরিয়ে দেয়ার কথা। আর দু’চার জনের মত শুধু সেই খেলার দর্শক ছিলাম। ওগুলো ছিলো আমাদের নিষিদ্ধ খেলা। তখনকার ‘জাতির পিতা’ জিন্নাহ্‌‘র মার্বেল না খেলার গল্প আমাদের শোনানো হতো।

‘টাস-চারা’ আসলে হওয়া উচিত ‘তাস-চারা’। আর এই তাসগুলো বানানো হতো সিগারেটের প্যাকেটের চওড়া দিকটা তাসের মত করে ছিড়ে। তাসগুলোর আর্থিক মূল্য ধরা ছিলো। সিজর্সের তাস এক টাকা, কিংস্টর্কের পাঁচ টাকা ক্যাপস্ট্যানের একশো টাকা এই রকম। প্লেয়ার্স নাম্বার থ্রি এবং থ্রি ক্যাসলসের কোন দামই ছিলো না। ওগুলো গ্রামে গঞ্জে পাওয়া যেতো না। খেলার অর্থনীতিতে যুক্ত কেউ ওগুলো চিনতোও না। আব্বা মাঝে মাঝে বরিশাল থেকে নিয়ে আসতেন বলে আমি চিনতাম। কিন্তু ঐ বাজারে আমার কথার কোন দাম ছিলো না।

শফি এই রকম গাঁট গাঁট টাকার মালিক ছিলো। সবাই তা দেখে ঈর্ষায় জ্বলতাম। মনে হয় মার্বেল ছিলো শত শত। আর আমি কখনো একসঙ্গে চার/পাঁচটার বেশি মার্বেলের মালিক হতে পারিনি। ওর ঘুঁটি মার্বেলটা ছিলো সাদা রংযের। ও বলতো পাথরের। ওটা দিয়ে দূর থেকে ‘কোপ’ মেরে ও অন্যদের মার্বেল টুকরো টুকরো করে ফেলতে পারতো।

লঞ্চের মুটেগিরি থেকে কোনদিন ভালো পয়সা পেলে ও চায়ের দোকান থেকে দুধ কিনে খেতো। কাঁচের ছোট্ট গেলাসে দুধ নিয়ে বাইরে দাঁড়িয়ে ঠোঁট চুবিয়ে একটু একটু করে খেতো। যেন ওই তরল একবারে একফোঁটার বেশি মুখে যেয়ে তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে না যায়। খুব লোভ হতো অমন করে খেতে। শফি সবার সামনেই বিড়ি খেতো, কাউকে ভয় না করেই। যে স্বাধীনতা বা অভ্যাস কোনটাই আমার ছিলো না।

এহেন শফি একদিন কোথায় হারিয়ে গেলো। তারপর থেকে ওকে আর দেখিনি। হয়তো দূরে শহরে বা অন্য কোথাও জীবিকার সন্ধানে যেতে হয়েছে ওকে। খেলায় জিতে অনেকদিন না-ছাঁটা চুলের কেশর দুলিয়ে ও আবার মার্বেলের দান মারতে আসতো। যেন যুদ্ধজয়ী বীর। ও কি দারিদ্র্যকে হারাতে পেরেছিলো? না কি তারই চাপে নিষ্পেষিত নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিলো? বছর দু’য়েক পরে আহসান হাবীবের কিশোর উপন্যাস ‘রানীখালের সাঁকো’ পড়েছি। পড়বার সময় কল্পনায় দিঘাই নদীকে রাণীখাল আর শফিকে আজীজ হিসেবে মনের পর্দায় দেখেছি। শফি কি আজীজের মতই কোন প্রতিজ্ঞা-পূরণের স্বপ্নে হারিয়ে গিয়েছিলো?

গল্পের আজীজ থেকে সত্যিকার আজীজের গল্প। যে আজীজ ছিলো আমাদের ক্লাসের ক্যাপ্টেন। শুধু পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার সুবাদে নয়। ভোটের মাধ্যমে সবচেয়ে জনপ্রিয় হিসেবেও।

আব্বার চাকুরীতে বদলির কারনে আমাদের সাধারনতঃ বছরের শুরুর দিকে স্কুল বদলাতে হতো। ঐ স্কুলে ফেব্রুয়ারী মার্চে কোন এক সময়ে ভর্তি হয়েছিলাম। কাজেই আগের বার্ষিক পরীক্ষার কার কী ফল জানতাম না। অথচ পারিবারিক নির্দেশ ছিলো ভালো ছেলেদের সঙ্গে মেশার। আর ভালো ছেলে চেনার উপায় তাদের পরীক্ষার ফল।

তখনও চতুর্থ শ্রেনীর ছাত্রদের মধ্যে ‘রাফ খাতা’ ব্যবহারের খুব চল ছিলো না। অনেকেই স্লেটে লিখতো। কাঠের কাঠামোয় আটকানো স্লেট পাথরের উপর স্লেটের পেন্সিল দিয়েই লিখতে হতো। ছাই-রূপোলী লেখাগুলো একটু ভেজা কাপড় দিয়ে মুছে নেয়া যায়। অনেকের স্লেট বহু ব্যবহারে মসৃণ হয়ে যেতো। স্লেট এবং পেন্সিল খুব ভঙ্গুর। পেন্সিলগুলো পটপট করে ভেঙ্গে খাটো হয়ে যেতো। কারো কারো স্লেটের কাঠামো চারকোনায় তার দিয়ে বেঁধে মজবুত করা হতো। কেউ কেউ রাফ খাতা ব্যবহার করতাম। আধা দিস্তা মানে ১২টি ডিমাই আকারের কাগজ কিনে চার ভাজ করে সেলাই করে নিতে হতো। সেজন্য কাগজ ছেঁদা করার ফুরুনি ও লাল-সাদা সূতা কিনতে পাওয়া যেতো।

ক্লাসের সামনের বেঞ্চগুলোয় বসতাম যারা একটু লম্বায় কম ছিলাম। ‘ফাস্ট’ ক্যাপ্টেন বসতো প্রথম প্রস্থের প্রথম সারির ডানদিকে। আর তার পাশেই দ্বিতীয় প্রস্থের বামদিকে বসতো ‘ছেগেন্ট’ ক্যাপ্টেন বিমল। আমার জায়গা ছিল তার পাশে। একদিন কী কারনে বিমল স্কুলে আসেনি। তাই আজীজ আর আমি প্রায় পাশাপাশি বসেছিলাম। মাঝখানে শুধু পিছনে যাওয়ার পথ।

ক্যাপ্টেনদের দায়িত্ব ছিলো দুই পিরিয়ডের ফাঁকে কেউ গোলমাল করলে বা জায়গা ছেড়ে উঠলে তাদের নাম টুকে রাখা। আর ক্লাসে কোন কিছু লিখতে দেয়া হলে সবার কাছে থেকে খাতা বা স্লেট নিয়ে স্যারদের দেয়া এবং তা আবার ফিরিয়ে দেয়া। আর ফিরিয়ে দেয়ার সময় প্রত্যেকের পাওয়া নম্বর জোরে জোরে পড়ে সবাইকে জানানো। সেদিন আমি একটু বেশি নম্বর পেয়েছিলাম। এমনিতে দশের মধ্যে তিন/চার পেতাম। আজীজ তাই দুই পিরিয়ডের ফাঁকে আমার সঙ্গে কথা বলেছিলো। তাতেই আমি বর্তে গিয়েছিলাম।

আজীজ লুঙ্গি পরে আসতো। হয়তো হাল্কা নীল একটা জামা পরতো। তার কাঁধের কাছটায় ঘামে ভিজে অনেক চিতে পড়ে গিয়েছিলো। ও অনেকদূর থেকে হেঁটে আসতো। স্কুলে বই নেয়ার জন্য আমার মোটা রেক্সিনের ব্যাগ ছিলো। আজীজ বই নিয়ে আসতো সিগারেটের কার্টন মোড়ার মোটা কাগজ পেঁচিয়ে। হাতের ঘামে ঘষায় বইয়ের মলাটগুলো যেন নষ্ট হয়ে না যায়। ওর কোন নতুন বই ছিলো না। অর্ধেক দামে পুরান বই কিনতো। বেশির ভাগই বেশিদিন টিকিয়ে রাখার জন্য শক্ত করে সেলাই করা।

দায়িত্বের কারনেই আজীজ হয়তো ক্লাসে কম কথা বলতো। আর এমনিতেই ও একটু চুপচাপ থাকতো। নাদুস-নুদুস ধরণের ছেলেটির মুখটা ছিলো ভরাট। হাসতো খুব মিষ্টি করে। আমাকে ও জিজ্ঞেস করেছিলো আমরা ক’ ভাইবোন। কে কোন ক্লাসে পড়ে এইসব। জিজ্ঞেস করেছিলামঃ

  • তোমার আব্বা কী করে?
  • তোমরা বাসায় দুধ রাখো?
  • হ্যাঁ।
  • ওইতো।

প্রথমে বুঝিনি ও কী বলছিলো। পরে পরিষ্কার করে দিলো আমাদের বাসায় যিনি প্রতিদিন দুধ দিয়ে যেতেন তিনিই ওর আব্বা। আমি আকাশ থেকে পড়েছিলাম- “দুধআলার ছেলে আমাগো ক্লাসের ফাস্ট বয়!” মনে হয়েছিলো, ওর আব্বাকে কখনও গুরুত্ব দিতাম না। প্রতিদিন সকালে যখন দুধ নিয়ে আসতেন সেটা জানান দিতাম জোরে চীৎকার করে – “করিম, দুধআলা আইসে।’ বোঝাই যায় আজীজদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো না। এই কারণেই ওকে স্কুলের কোন চাঁদা দিতে হতো না।

বাসায় ফিরে ঐ বিরাট খবরটা মা-কে দিতে তর সইছিলো না। বইপত্র টেবিলে ছুঁড়ে ফেলেই দৌঁড়ে গিয়েছিলাম মায়ের কাছে।

  • মা, মা জানো আমাগো ক্লাসের ফাস্ট বয় না দুধআলার ছেলে।

খবরটা যতো বড়ই হোক মা-র কাছে তা মোটেই আনন্দের ছিলো না। নিজ সন্তানের ফলাফল অতি সাধারণ হওয়ার হতাশা ও ক্ষোভের কারণে বিদ্রুপের সূরে মা বললো,

  • হ্যাঁ, দুধআলার ছেলে ফাস্ট হয় আর তুমি দুধ খাইয়া লাস্ট হও। (মা ক্ষুব্ধ হলে তুমি করে বলতো)।

ফাস্ট বয়ের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার উচ্ছাস আমার নিমেষে চুপসে গেলো। এরপর আরো বহুবার আজীজের সঙ্গে তুলনার গঞ্জনা শুনতে হয়েছিলো। মা হয়তো জেদ উস্কে দেয়ার জন্য একথা বলতো। কিন্তু বলাই বাহুল্য তা আমাকে পাঠ্যবই পড়ার দিকে মোটেও আগ্রহী করেনি।

পরে একদিন আজীজের আব্বা দুধ নিয়ে এলে জিজ্ঞেস করেছিলাম, “আপনে আজীজের আব্বা?”

  • হ, বাবা। আজিজ আর তুমি এক কেলাসে?
  • হ্যাঁ।

পরিবার থেকে পরীক্ষার ফলাফলের জন্য আজীজকে ‘আদর্শ’ ঠিক করে দেয়া হয়েছিলো। তাই আজিজের প্রতি এক ধরণের ঈর্ষা ছিলো। কারণ আমার ফলাফল ওর কাছেও যেতো না। শান্ত ভদ্র মেধাবী হিসেবে আজীজ ছিলো ‘ভালো ছেলে’। আমারও কখনো কখনো ‘ভালো’ হওয়ার ক্ষণস্থায়ী ইচ্ছে হতো। সে সময় আজীজের মতো হতে চাইতাম, পারতাম না। ক্লাসের কামরায় ওর উপস্থিতি, দাঁড়িয়া বান্ধা খেলায় ওর ছোটাছুটি মনে আছে। মনে আছে ওর মিষ্টি হাসি।

আজীজ কি পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছিলো? জানি না। আজীজের সঙ্গে জীবনে আর কখনো দেখা হয়নি।

­­­­­­­­­­­ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box