হর্নবিল ফেস্টিভ্যালের আখড়া কিসামায়

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

( কলকাতা থেকে): রাত বারোটা হবে, ফোনটা করেছিল সুপ্রিয়া । নভেম্বরের শেষ দিক…। সে দিন যে কোনও কারণেই হোক, অফিস থেকে ফিরে সাড়ে দশটা-এগারোটার মধ্যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম আমি…। ঘুমচোখে, প্রচণ্ড বিরক্তি নিয়ে স্ক্রিনে নামটা দেখেই কান্না পেয়ে গেল…। এত রাতে ফোন করেছে, নিশ্চয় সহজে ছাড়বে না খেপি…।

— শোন না, ডিসেম্বরের গোড়ায় গৌহাটির টিকিট খুব সস্তা দিচ্ছে ইন্ডিগো। কাটব? (নিন্দুকেরা বলে, সুপ্রিয়ার ফোনবিল খুব কম আসে, কারণ ও জানলা দিয়ে গলা বার করে কথা বললেই সারা শহর শুনতে পায়। আমি অবশ্য এ সবের কিছু জানি না।)
— যা পারিস কর…। (ফোনটা কান থেকে হাতখানেক দূরে সরিয়ে বললাম।)
— এত সস্তা আর হবে না মনে হয়, যাওয়া আসায় অনেকটা সময় বেঁচে যাবে…। যাবি? ছুটি পাবি? (টোনটা এ রকম, তোর ছুটি পাওয়ার জন্য কাকে কাকে ক্যালাতে হবে বল।)
— এখন থেকে কী করে বলব?! কর না যা পারিস।
— এত তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিস কেন তুই!! (রীতিমতো হুমকি এ বার।)
— ঘুমোতেও পারব না…!? যা প্রাণ চাই কর প্লিজ়, আমায় ঘুমোতে দে। (ঘুমচোখে ফোনের স্ক্রিনে লাল গোলটা খুঁজছি, কাটব বলে।)
— শোন না, ওই সময়টায় হর্নবিল ফেস্টিভ্যাল চলবে নাগাল্যান্ডে…। পাহাড়ি আদিবাসীদের সেই ফেস্টিভ্যালটা রে! সেই তোকে বলেছিলাম না, অনেক দিন আগে এক বার? সেই তুই ছবি দেখলি… বল না, যাবি?

(এ বার ঘুমন্ত মস্তিষ্কের অ্যান্টেনাটা একটু একটু করে ফোল্ড খুলতে শুরু করল। নাগাল্যান্ড… হর্নবিল… গান… আদিবাসী… আর, আর…পাহাড়…
মাথার মধ্যে তখন আগুন জ্বালিয়ে, দ্রিমি দ্রিমি বাজিয়ে, বর্শা ছুটিয়ে, হৈ হৈ করে নাচতে শুরু করেছে এক দল আদিবাসী…। পাহাড়ি পথে চুঁইয়ে যাচ্ছে সূর্যের তেরছা আলো…। পথের ধারে গিটার নিয়ে সুর তুলছে অসম্ভব সুন্দর দেখতে নাগা ছেলেরা…।)

হর্নবিল ফেস্টিভ্যালের আখড়া কিসামায় ঢোকার মুখে

— এই, দু’তিন দিনে হয়ে যাবে? কত দিন ছুটি নেব বল? কবে যাব? কবে আসব? (ঝড়মড়িয়ে উঠে বসেছি বিছানায়।)
— ব্যস, অত তোকে জানতে হবে না, তুই ঘুমো। ঘুমিয়েই যা। (নির্লিপ্ত ব্ল্যাকমেলিং।)
— বল না প্লিজ়, বল না… পাহাড় যাব, প্লিজ় বল ভাল করে… (আমার গলায় মধু।)
— চারে গিয়ে নয়ে ফিরে যাব…।
— আর কাউকে নেব না কিন্তু, কাউক্কে না…।
— এত হিংসুটে কেন তুই, কিংশুককে অন্তত বলি…!
— ওর নিশ্চয় হবে না এটা। সিল্করুট যাবে তো ডিসেম্বরের এন্ডে। বলে দেখ…

তিন ডিসেম্বর মাঝরাত পার করে অফিস থেকে ফিরে, স্যাক প্যাক করে, নির্ঘুম রাত কাটিয়ে, পরের দিন অর্থাৎ চার তারিখ, ভোর পাঁচটার মধ্যে, স্যাক চাগিয়ে, ক্যামেরা ঝুলিয়ে এয়ারপোর্ট…। প্রবল দুঃখ এবং হিংসা বুকে চেপে রেখে আমাদের দু’জনকে এয়ারপোর্টে ছেড়ে দিয়ে গেল কিংশুক…। আমি ওর শোকস্তব্ধ এবং হিংসাচ্ছন্ন হুব্বাবস্থার সুযোগ নিয়ে ওর নতুন কেনা একটা ন্যাপস্যাক ঝেঁপে নিলাম। আর ‘রাখ এটা’ বলে হাতে গুঁজে দেওয়া কিছু টাকা এক বারও রিফিউজ় না-করে নির্লজ্জের মতো নিয়ে নিলাম…। তার পর ওকে দিয়ে আমার আর সুপ্রিয়ার কয়েকটা ছবি তুলিয়ে, ছবি পছন্দ না-হলে তা নিয়ে যথেষ্ট বকাবকি করে, আবার নির্লজ্জের মতো ওকে টা টা করে দূর করে দিলাম…।

চেক-ইন পর্ব পার করে নির্দিষ্ট সময়ে একটা এত্ত বড় বাসে করে গিয়ে আমি আর সুপ্রিয়া দু’জন মিলে ঢুকে গেলাম প্লেনের পেটে…। তার পর নাকি প্লেনটা এক ঘণ্টা লেট করেছিল…। ‘নাকি’ বললাম, কারণ আমি উঠেই নিজের সিটে বসে, সিটবেল্ট বেঁধে, মুখে জ্যাকেট চাপা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম…। লেটের হিসেব সুপ্রিয়া রেখেছে…। আর কয়েক ঘণ্টা লেট করলেও আমার কোনও সমস্যা ছিল না…। যাই হোক…

গৌহাটিতে নেমেই একটা ঝকঝকে সকাল…। ঠিক পাহাড় নয়, আবার পাহাড় থেকে খুব দূরেও নয়… এই শহরগুলোর একটা অন্য রকম মন ভাল করা ব্যাপার থাকে…। ভিড়, বাজার, গাড়ি— সব থাকলেও, সব কিছুর মধ্যে যেন একটা আশ্বাস থাকে…। যেন পাহাড়ি হাওয়া কানে কানে স্তোক পাঠায়, ‘‘কাছেই আছি তো, একছুট্টে ছুঁয়ে দিতে পারো…।’’

এয়ারপোর্ট থেকে বাস ধরে গৌহাটি স্টেশন এলাম…। তখন সকাল আটটা হবে…। পরপর বেশ কয়েকটা ট্রেন আছে, দিমাপুর যাওয়ার…। দিমাপুর থেকেই গাড়িতে করে যেতে হবে কোহিমা, নাগাল্যান্ডের রাজধানী…।
বাসে বসে বসে সুপ্রিয়া অনর্গল বকতে লাগল, ‘‘ওই দেখ গাছ, ওই দেখ রাস্তা, ওই দেখ মানুষ, ওই দেখ লেক, ওই দেখ পাখি, ওই দেখ দোকান, ওই দেখ দোকানে দোকানদার’’……ইত্যাদি প্রভৃতি বলে বলে…। আমি ওরই পয়সা দিয়ে কেনা কেক-বিস্কুট সাঁটিয়ে অসভ্যের মতো ঘুমের ভান করে পড়ে রইলাম…।

স্টেশনে পৌঁছনোর পর জানতে পারলাম, একটা ট্রেন একটু আগেই চলে গিয়েছে…। আর পরের ট্রেনটা এত লেট, সেটা আসার আগে তারও পরের যে ট্রেনটা সেটা ছেড়ে দেবে…। ১১:৪৫-এ সময়…। অপেক্ষা করে ছাড়া উপায় নেই…। আরও ঘণ্টা তিনেক সুপ্রিয়ার বকবক সহ্য করতে হবে…!!
কিছু পরে স্টেশনে দেখা করতে এল বিশ্বদেব’দা…। আমি সেই কবে যেন কথায় কথায় বলেছিলাম আসার কথা, ঠিক মনে করে দেখা করতে চলে এসেছে…! বিশ্বদা ওখানকার কী একটা মারকাটারি মদের কোম্পানিতে চাকরি করে, খায় দায় আর প্রতি সপ্তাহান্তে যেখানে সেখানে ঘুরে বেড়ায়…। কত্ত গল্প…! সেই সঙ্গে আমাদের যাদবপুরের পুরনো গল্প তো আছেই…

সময়মতো ট্রেনে চড়ে বসলাম…। প্যাসেঞ্জার ট্রেন…। একটা বাঙ্ক বাগিয়ে নিলাম অভ্যাসবশত…। আমি ট্রেনে চড়লেই অবধারিত ভাবে ঘুমিয়ে পড়ব এটা জেনে, সুপ্রিয়া নীচে বসে থেকে রুকস্যাকগুলো চোখে চোখে রাখল…। রাস্তাটা নাকি ভারী সুন্দর ছিল, মাঝেমধ্যেই পাহাড় দেখা গিয়েছে…। আমি সুপ্রিয়ার খিস্তি খেয়ে, পাহাড় দেখার জন্য অনেক বার উঠে বাঙ্ক থেকে গলা ঝুলিয়ে জানলায় চোখ রাখলেও, কিছু দেখতে পাইনি…। কিন্তু ট্রেনে ঘুম ভাঙলেই তো চা খেতে হয়…। আর সঙ্গে ঝালমুড়িওয়ালা থাকলে তাকেও নিরাশ করতে নেই…।

দিমাপুর পৌঁছলাম, সন্ধে সওয়া ছ’টা…। আমাদের আগের প্ল্যান ছিল, (মানে প্ল্যান তো কিছুই ছিল না, জাস্ট ভাবনা ছিল আর কী) চার তারিখ রাতটা দিমাপুরেই থাকব। পরের দিন ভোর ভোর কোহিমা…। কিন্তু দিমাপুরে নেমেই দেখলাম অজস্র শেয়ার ট্যাক্সি ছাড়ছে কোহিমা যাওয়ার…।
ঠিক করলাম, চলে যাব কোহিমা…। সুপ্রিয়া চাইছিল না একদম…। আমি জেদ করলাম…। ঘণ্টা আড়াই-তিনেকের রাস্তা খুব বেশি হলে…। রাতটা কোহিমাতেই থাকব…। যে গাড়ির সঙ্গে কথা বললাম, সেই ড্রাইভারদাদা খুব কনফিডেন্টলি বলল, ‘‘কোনও চিন্তা কোরো না দিদি, আমি থাকার জায়গা মিলিয়ে দেব ঠিক।’’
ওখানে সবাই বেশ ভাল বাংলা বলে…। কারণ অনেকের শরীরে বাংলা রক্ত বইছে…। যেটাকে এখন ও-পার বাংলা বলে, সেই বাংলার…। তা ছাড়া অহমীয়া প্রায় সকলেই জানেন, যার সঙ্গে বাংলা প্রায় মিলে যায়…। ট্যাক্সিতে আর এক জন যাত্রী হচ্ছিল না কিছুতেই…। আমরা সেই সময়টা স্টেশনের ধারে একটা ঠেলাগাড়িতে, দিদির হাতে বানানো অসাধারণ মোমো আর চাউমিন খেয়ে নিলাম…।
তখন বুঝতে পারলাম, সারা দিন ভাল করে কিছু খাওয়াই হয়নি…!

ট্যাক্সি ছাড়ল প্রায় সাতটায়…। আমরা দু’জন ছাড়া আর একটা রোগা মতো বাচ্চা ছেলে…। নাম বাবু…। গৌহাটিতে থাকে, উৎসবের মরসুমে কোহিমা যাচ্ছে মামার সঙ্গে তাঁর দোকানে কাজ করবে বলে…। পড়াশোনা করত, বারো ক্লাসের পর ছেড়ে দিয়েছে…। দিব্যি বাংলা বলে…। আমরা সমানে বকবক করতে থাকলাম…। প্রচুর জ্ঞান দিলাম, কেন ওর পড়াশোনা ছাড়া উচিত নয়— এ সব নিয়ে…। কলকাতার গল্পও হল…। তা ছাড়া নাগাল্যান্ডের খুঁটিনাটি নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন তো আছেই…
ছেলেটাও বেশ দিদি-দিদি করতে লাগল আমাদের…।

গাড়ি ছুটছে অন্ধকারের বাঁক পেরিয়ে পেরিয়ে…। শহর ছাড়ার মুখে আর্মি চেকিংয়ের জন্য গাড়ি দাঁড়াল…। সে কী চেকিং! চেকিংয়ে মন দেব, নাকি চেকারকে দেখব…! অসামান্য সুন্দরী একটা নাগা মেয়ে, ফিটফাট আর্মি আউটফিটে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে নির্বিকার মুখে আমাদের রুকস্যাকগুলোতে লাঠির বাড়ি মারছে…। এত সুন্দর দৃশ্য যেন আর জীবনে দেখিনি…! মেয়েটি যেমন দেখতে, তেমনি চাবুক চেহারা…! এত সুন্দর চেকিং দেখে তো সুপ্রিয়ার অবস্থাও তথৈবচ…। সব দেখে নিয়ে, ‘মার ডালা’ মার্কা একটা হাসি ছুড়ে দিয়ে আমাদের টা টা করল সেই মেয়ে…উফফ্…!!
পরের জন্মে নাগা ছেলে হয়ে জন্মাতে অনেক দেরি হয়ে যাবে বলে আমি আর সুপ্রিয়া বেশ কিছু ক্ষণ আলোচনা করলাম, এই জন্মেই কোনও ভাবে নাগা ছেলে হয়ে যাওয়া সম্ভব কি না…।

খানিক পরে রাস্তার ধারের একটা ছোট্ট দোকানে চা-ব্রেক নেওয়া হল…। গাড়ি থেকে নামতেই ঝাঁপিয়ে পড়ল ঠান্ডা হাওয়া…। পাহাড় যেন জানান দিল, আমি আর খুব বেশি দূরে নেই… পাহাড় যে সত্যিই আর দূরে নেই, টের পেলাম আর একটু ক্ষণ পরেই…। ড্রাইভার দাদা, বাবু, আমি আর সুপ্রিয়া চা খেয়ে, গজা খেয়ে টাকা দিতে যাব, দোকানদার বললেন ‘‘ওই বাচ্চা মতো ছেলেটা দিয়ে দিয়েছে তো..!’’

— বাবু…! তোমায় টাকা দিতে কে বলল! আমরাই তো দেব তোমাদের চায়ের দাম…!
— কী কইলাম তোমাদের?
— কী কইলে..!?
— দিদি কইলাম না…?
— সে কও না, কিন্তু দিদিদের চায়ের দাম কেন দেবে…!?
— দিদিরা প্রথম বারের জন্য ভাইয়ের শহরে আসছে তো…ভাই দিদিদের চা খাওয়াব না…?

এই ছোট্ট ছোট্ট আন্তরিকতার রুমালগুলো পাহাড় ছাড়া অন্য কোথাও ওড়ে না এমন সহজ করে… বারবার পাহাড়ে এসে এই রুমালে মুখ মুছি বেখেয়ালে…। মোলায়েম স্পর্শে বারবার অবাক হই…। বারবার ছেয়ে যাই বেহিসেবি কিছু ভাল লাগায়, ভালবাসায়…। বারবার মুখ নিচু করে সামতলিক স্বার্থ গোপনের ব্যর্থ চেষ্টা করি…। বারবার…

কোহিমা ঢোকার মুখে অদ্ভুত এক সুন্দর দৃশ্য…। পাহাড়ের গায়ে লম্বা হয়ে জ্বলজ্বল করছে গোটা শহরটা…। এত বার পাহাড়ে গিয়ে রাত-শহর তো এত দেখেছি… মুগ্ধতাও রেখেছি বারবার…। তবে কোহিমা সব পূর্ব-মুগ্ধতাকে বলে বলে গোল দিল…। এখনও পর্যন্ত আমার দেখা সেরা রাত শহর…। যেন একটা লম্বা নেকলেস পাহাড়ের গায়ে কেউ বিছিয়ে রেখেছে…। মাল্টিকালার্ড নেকলেস…। রাতের অন্ধকারে রামধনু-রং ঝকঝক করছে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে…। নেকলেসে কোনও খুঁত নেই…! কোথাও বেঁকে যায়নি, কোথাও নিভে যায়নি…! হাঁ করে দেখছি আমি আর সুপ্রিয়া…। হাঁ করে ছিল বলে এই সময়টা অনেক ক্ষণ কথা বলতে পারেনি সুপ্রিয়া…।

মজা শুরু হল কোহিমা পৌঁছনোর পর…। বাবু নেমে চলে গেল…। তখন ন’টা বেজে গিয়েছে…। ঘুমিয়ে পড়েছে পাহাড়ি শহর…। ড্রাইভার দাদা আমাদের নিয়ে চলল আস্তানার খোঁজে…। এবং সেই মুহূর্তে বুঝতে পারলাম, ঠিক যতটা কনফিডেন্স নিয়ে ও আমাদের এই রাতে কোহিমায় নিয়ে এসেছে, আসলে ঠিক ততটাই কনফিউজ়ড ও নিজে…। না-চেনে কোনও হোটেল, না-জানে কোনও হোম স্টে-র খোঁজ…। প্রথমে গাড়ি স্ট্যান্ডের কাছাকাছি কয়েকটা হোটেলে খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, কোথাও জায়গা নেই…। আর দুয়েকটায় থাকলেও, সেগুলোতে দু’টো মেয়ে থাকতে পারে না..। এর পর প্রায় ঘণ্টা খানেক ধরে প্রায় একই জায়গায় গোল গোল করে চক্কর খেলাম আমরা…। সুপ্রিয়া এবং আমার যৌথ এবং লাগাতার বকুনির মুখে আত্মসমর্পণেরও সুযোগ পাচ্ছে না ড্রাইভার দাদা…। সে কী কাণ্ড…!

আমি আর সুপ্রিয়া ইন্টারনেটে হোটেলের খোঁজ শুরু করেছি তত ক্ষণে, কিন্তু কিছুই পাচ্ছি না ঠিকঠাক…। এক সময় গাড়িটা দাঁড় করিয়ে দিল ড্রাইভার দাদা…। সুপ্রিয়া বলল, ‘‘এক কাজ করো, আমাদের থানায় নিয়ে চলো…। রাতে থানায় থাকব…।’’ নির্বিকার মুখে গাড়ি স্টার্ট দিল ড্রাইভার…। ঠিক তখন, একটা হোটেলে কপাল ঠুকে ফোন করে বসলাম আমি…। মালিক বললেন, ‘‘রুম হবে, তবে ডর্মেটরি..।’’

সৌভাগ্যক্রমে, কাছেই ছিল হোটেলটা…। রাস্তায় গাড়ি ছেড়ে, টাকা মিটিয়ে, ড্রাইভারকে একটা লম্বা নমস্কার ঠুকলাম…। সারা দিনের ক্লান্তিতে আমি আর সুপ্রিয়া দু’জনেই তখন প্রায় টলছি…। রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা নেমে, গলিপথ পেরিয়ে হোটেল…। মালিকের নাম আতো…। ডর্মেটরি খুলে দেখাল আতো…। তিন জন মুশকো মতো লোক সেখানে আগে থেকেই ঘুমোচ্ছে…। আমি ভীষণ করুণ চোখে আতোর দিকে তাকালাম…।

‘‘ওকে ম্যাম, কাম উইথ মি‘‘— বলে আমায় পাশের বাড়িতে নিয়ে চলল আতো…। এই গোটা সময়টায় হোটেলের ঠিক মুখটায় ঢাউস রুকস্যাক এবং ঢাউসতর ন্যাপস্যাক এবং কম ঢাউস ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে জ্বলন্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল সুপ্রিয়া…। আমি ভুল করে তাকিয়ে ফেললেই ভস্ম হয়ে যেতাম…। ও দিমাপুর পৌঁছে বারবার বলেছিল, এত রাতে কোহিমা আসবে না…। আমিই জোর করে…

পাশের বাড়ির দোতলায় উঠে নক করতেই ঘুম ভেঙে উঠে এল গোটা পরিবার…। কিছু কথাবার্তার পর ঘুমচোখে একটা রুম খুলে দিলেন এক দিদি…। ওটা হোটেলের অংশ নয়…। স্থানীয় একটা বাড়ি…। ঘরটায় কাঠের মেঝে, একটা দোতলা খাট, তাতে গোলাপি সিল্কের চাদর পাতা, কোণ ঘেঁষে আয়না লাগানো একটা আলমারি রয়েছে…। অত রাতে অত ক্লান্তি অত টেনশনের মধ্যেও সুপ্রিয়া প্রায় মিনিট পনেরো আমার মাথা খেলো, কে খাটের কোন তলায় শোবে সেটা ঠিক করতে গিয়ে…।

ইতিমধ্যে আতো এসে হাজির, হাতে মেনুকার্ড। দেখে বললাম নুডুলস…। রিসেপশনে খেতে গেলাম…। ওটাই ডাইনিং…। দু’চামচ মুখে দিয়ে একটু শক্তি ফিরে পেতেই সুপ্রিয়া এ বার তেড়েফুঁড়ে মুখ খুলল আমায় বকবে বলে…। সবে বলেছে, ‘‘দেখেছিস, আমি আগেই বলেছিলাম এত রাতে….’’ ওকে থামিয়ে দিল আতো। ‘‘শশশশ্…সবাই ঘুমোচ্ছে। চিৎকার করে তাড়াবে নাকি সব গেস্টকে!’’
উহ্…ভাগ্যিস! নইলে কি ওই রাতে আমায় আর কেউ কি বাঁচাতে পারত, সুপ্রিয়ার বকা খেয়ে কালা হয়ে যাওয়ার হাত থেকে?
নুডুলসের শেষ চামচটা মুখে দিয়ে তখনও মুখ থেকে বার করিনি, আতো বলল, ‘‘টু প্লেট নুডুলস। গিভ মি ওয়ান সিক্সটি রুপিজ়।’’ টাকাপয়সার ব্যাপারে আতোর এই ‘পাংচুয়ালিটি’র পরিচয় এর পর প্রতিটি পদক্ষেপে পেয়েছিলাম আমরা…।

এর পর আমার আর ভাল মনে নেই, হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকেই ঘুম….

পরের দিন, পাঁচ তারিখ…। সকাল সকাল উঠে তৈরি হয়ে ব্রেকফাস্ট…। এবং সঙ্গে সঙ্গে টাকা মিটিয়ে বেরিয়ে পড়া…। গন্তব্য কিসামা…। কোহিমা থেকে বারো কিলোমিটার দূরের এই গ্রামটিতেই হর্নবিল ফেস্টিভ্যালের আখড়া…। পৌঁছেই চোখ ঠিকরে গেল আমাদের…। এত রং, এত স্বর, এত এত এত জীবন…!! কোন দিক ছেড়ে কোন দিক দেখব…! এই অংশটার বর্ণনা সত্যিই আমার ভাষার বাইরে…। খানিকটা হয়তো ছবি দেখে বোঝা যাবে…। বা কিছুই বোঝা যাবে না… জানি না…। ক্যামেরা হাতে সারা চত্বর জুড়ে বিহ্বল হয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি দু’জনে দু’দিকে…। দুপুরের পর ভারী খিদে পেতে লাগল…

তার পর…….

ছবি: লেখক