হলিডেতে স্কটল্যান্ড…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নুরুজ্জামান-মনি

ইচ্ছে ছিলো খুব ভোরে বেরিয়ে পড়বো। ধুলোবালিমুক্ত সবুজ নিসর্গের সঙ্গে মিশবো। কিন্তু সব ইচ্ছে দমিয়ে দিলো বৃষ্টি। শেষরাত থেকে টিপটিপ বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই। মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ব্রিটেনে সামারটাই মোটামুটি হলিডে করার সময়। বৃষ্টি থাকে না। ঝলমলে রোদ পাওয়া যায়। ঠাণ্ডাও কম থাকে। আমাদের কপালটাই বোধহয় খারাপ। বসে বসে জানালার বড় কাঁচের দিকে তাকিয়ে সবুজ সবুজ গাছগুলোর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নাওয়া দেখতে লাগলাম।

ছেলে বললো, হোক বৃষ্টি। আমরা বেরিয়ে পড়বো। গাড়িতে বসে বসেই দেখা যাবে। বৃষ্টির ভয়ে দুয়ার এঁটে ঘরে বসে পচার তো কোনো মানে নেই। সবাই একমত। কিন্তু ছবি তোলা যাবে না বলে মেয়েদের মন খারাপ। বাইরের দিকে তাকিয়ে “যা বৃষ্টি ধরে যা” টাইপের আকুতি মেয়েদের। কিন্তু বৃষ্টি তো থামছেই না। আবহাওয়ার পূর্বাভাসও বলছে, আজ সারাদিন বৃষ্টি। সন্ধ্যার আগে থামবে না।

এরকম মনখারাপের মেঘ মুখে নিয়ে সকালের চা নাস্তা হলো। আমরা যেখানে হাউস ভাড়া নিয়েছি, সেটা ডাণ্ডি (Dundee) শহরের কাণ্ট্রি সাইড। চারদিকে সবুজের সমারোহ। জনমানবশূন্য বললে অত্যুক্তি হবে না। অনেক দূরে দূরে এক একটা ফার্মারের বাড়ি। আর মাঠের পর মাঠ শুধু ঘাস বিছানো সবুজ। এখানে ওখানে সবুজ ঘাসের ওপর লোম’অলা ভেড়া আর বড় বড় ওলান’অলা গাভীর অবাধ বিচরণ। নেই কোনো রাখাল। নেই সীমানা বেড়া-বেষ্টনি। মাঝে মাঝে টুকরো পাথর স্তরে স্তরে সাজিয়ে সীমানা প্রাচীর। কোনো কোনো মাঠে আলু-গম-স্ট্রবেরি ইত্যাদির চাষ। শুনলাম হার্ভেস্টিংএর সময় দু’পাউণ্ডের বিনিময়ে ফার্মে ঢুকে ঝুড়ি ভর্তি করে ইচ্ছে মতো স্ট্রবেরি পেড়ে আনা যায়। অবশ্য এখন হার্ভেস্টিংএর সময় নয়। তাই যাচাই করে দেখা হয়নি।

বৃষ্টি মাথায় নিয়েই ডাণ্ডি শহরের উদ্দেশ্যে গাড়িতে চেপে বসলাম। ঐ শহরের নামটা বাল্যকালেই শুনেছি। পাটের রচনা মুখস্থ করতে গিয়ে জেনেছি, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে ব্রিটেনে যত পাট রপ্তানি হতো, তার পুরো চালান জাহাজে করে ডাণ্ডি পোর্টে আসতো। পাটকে তখন বলা হতো গোল্ডেন ফাইবার অব পাকিস্তান। এখন তো পাটের সেই পাট চুকে গেছে। যাক সে অন্য প্রসঙ্গ। ভাবলাম ডাণ্ডি পোর্টটা দেখেই যাই। কিন্তু ভাগ্য খারাপ। ডাণ্ডি পোর্টের একেবারে কাছে গিয়েও দেখা হলো না। বৃষ্টির জন্য গাড়ির কাঁচ নামানোও মুশকিল। বাইরে বের হওয়া তো দূর কি বাত।

যাক। কি আর করা। ডাণ্ডি শহর পেছনে ফেলে আমাদের গাড়ি ছুটলো স্কটল্যান্ডের ক্যাপিটাল সিটি এডিনবরার উদ্দেশ্যে। অনেক দূরের পথ। কিন্তু সমস্যা নেই। মোটরওয়েতে নামলেই গাড়ি সত্তর আশি মাইল গতিতে উল্কার বেগে ছোটে। খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। আমাদের এবারের গন্তব্য স্কটল্যান্ডে পর্যটকদের সবচেয়ে আকর্ষনীয় স্পট এডিনবরা ক্যাসেল। আমরা এই ক্যাসেলে প্রথমবার যাবো। আমার মেয়ের জামাই আকিব আরো দুয়েক বার দেখে গেছে। তার মুখে ক্যাসেলের বর্ণনা শুনে আগ্রহ কেবল বেড়েই চললো।

অনেক নির্জন পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে আমাদের গাড়ি মোটরওয়েতে এসে পড়লো। সাঁই সাঁই করে ছুটতে লাগলো এডিনবরা অভিমুখে। ইংল্যান্ডের তুলনায় স্কটল্যান্ডের রাস্তায় ট্র্যাফিক কমই মনে হলো। রাস্তা অনেক জটিল। ড্রাইভিং এ দক্ষ না হলে পদে পদে বিপদ। আমার ছেলের ড্রাইভিং স্কিলস আমাকে মুগ্ধ করছে।

শেষ পর্যন্ত এডিনবরা ক্যাসেলে আমরা এসে পৌঁছলাম। পাথুরে পাহাড়ের উপরে এত বিশাল পুরাতন ক্যাসেল। সারা বছরই এখানে পর্যটকের সমাবেশ হয়। আজ করোনাতঙ্ক আর বৃষ্টির কারণে বোধকরি জনসমাগম একেবারেই কম। ক্যাসেলটা কি কারণে জানি আজ বন্ধ। ভেতরে ঢোকার পারমিশন নেই। আঙিনায় দাঁড়িয়ে চারদিকে চোখ ফেলে মনে হলো আমরা স্কটল্যান্ডের কোনো এক উঁচু টাওয়ারে দাঁড়িয়ে আছি। এখান থেকে পুরো এডিনবরা সিটি দেখা যায়। অনেকক্ষণ চারদিকে ঘুরে ঘুরে অনেক ছবি তুললাম। ভাগ্যিস বৃষ্টি থেমে আমাদেরকে এই সুযোগটা করে দিয়েছিল।

এডিনবরা ক্যাসেলটির সঙ্গে ব্রিটেনসহ পুরো ইউরোপের প্রাচীন ইতিহাসের অনেক ঘটনা জড়িয়ে আছে। এটি নির্মাণের ইতিহাস ধূয়াশাপূর্ণ। তাম্রযুগ কিংবা লৌহযুগের কোনো এক সময় কোনও এক নৃপতি এই ক্যাসলটি নির্মাণ করে থাকবেন। কখনো রাজপ্রাসাদ কখনো সামরিক প্রতিরক্ষা দূর্গ হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়েছে। পঞ্চদশ শতক পর্যন্ত ব্রিটিশ রয়েল ফ্যামিলি এই ক্যাসেল তাদের বসবাসের জন্য ব্যবহার করেছেন। দুয়েক ছত্রে এডিনবরা ক্যাসেলের ইতিহাস তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব বর্ণনা সম্ভব নয়। সময় পেলে তা কোনো এক সময়ে তুলে ধরার চেষ্টা করবো।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments