হলিডে ইন ওয়েলস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নূরুজ্জামান মনি

দুই.

যে কোনো স্থান ভ্রমণ করতে গেলে শুধু এর সৌন্দর্য দেখেই মন ভরে না। সেই স্থানের ইতিহাস-ঐতিহ্য সম্পর্কেও মোটামুটি একটা ধারণা নিতে খুব ইচ্ছে হয়। আমি ভালো করেই জানি ইতিহাস বিষয়ে আমার অর্জিত জ্ঞান শূন্যের কোঠারও দু’এক ডিগ্রি নিচে। কিন্তু আগ্রহ এবং কৌতুহল শতভাগেরও ওপরে। ওয়েলসে পা রেখেই সে আগ্রহ ও কৌতুহল জেগে উঠবে, এটি খুবই স্বাভাবিক। এর আগেও দু’একবার ওয়েলস ভিজিট করতে এসেছি বটে, তবে সেই ভিজিটগুলো ছিলো খুবই সংক্ষিপ্ত। ইতিহাস বিষয়ে ঘাঁটাঘাঁটি-মনোনিবেশের অবকাশ হয়নি। এবার একটু ঘেঁটে ঘুটে দেখার ইচ্ছে মনে জাগলো।

তাছাড়া ওয়েলশ (Welsh) লেঙ্গুয়েজটাও আমার এই কৌতুহলের মাত্রা আরেক ডিগ্রি বাড়িয়ে দেয়। ইউকে’র মধ্যে থেকেও তাদের একটি নিজস্ব লেঙ্গুয়েজ রয়েছে এবং এই লেঙ্গুয়েজটি ওরা সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতে পারছে, এটি বিস্ময়কর। যেখানে চারদিকে ইংরেজি ভাষার বলশালী আধিপত্য, সেখানে কি করে যে তাদের মুখের এই প্রায় অচল ভাষাটিকে আজো বাঁচিয়ে রেখেছে, তা ভেবে বিস্মিত হতে হয়। ওয়েলসের টেরিটোরিতে ঢুকলেই যত সাইন চোখে পড়ে, সবগুলোতেই ইংরেজি শব্দের পাশাপাশি ইংরেজি অক্ষরে ওয়েলশ শব্দ দেখতে পাওয়া যায়। সঙ্গত কারণেই মনে হয় ওয়েলশের নিজস্ব কোনো বর্ণলিপি হয়তো নেই কিংবা ছিলো না। তাই ইংরেজি বর্ণ দিয়ে এ ভাষার ব্যবহার চলে। গাড়ির উইন্ডোতে তাকিয়ে যে শব্দগুলো দেখলাম, তার দু’একটি এখানে উল্লেখ করছি। যেতে যেতে এক জায়গায় চোখে পড়লো, রাস্তার পাশের সাইনবোর্ডে ইংরেজিতে লেখা school, তার নিচে লেখা ysgol. বোঝা যাচ্ছে এটি ওয়েলশ। তেমনি রাস্তার ওপরে slow শব্দের নিচে লেখা ARAF. End শব্দের নিচে লেখা DIWEDD. এরকম আরো বহু শব্দ দেখতে পেলাম। সবগুলোই দুর্বোধ্য এবং মনে রাখার পক্ষেও প্রায় অসম্ভব। প্রশ্ন জাগলো মনে, ইংরেজি যেখানে সবাই বলতে লিখতে ও পড়তে পারে এবং বোঝে, সেখানে ওয়েলশ ভাষায় লেখার কি আদৌ কোনো প্রয়োজন আছে?

পরক্ষণেই ধারণা হলো, হয়তোবা ওয়েলসের মানুষ তাদের নিজস্ব ইতিহাস-ঐতিহ্যের পাশাপাশি তাদের বহু প্রাচীন বিলুপ্তপ্রায় ভাষাটিকেও সযত্নে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। ইংরেজি ভাষার প্রবল আধিপত্যের মধ্যে তাদের নিজস্ব ভাষা রক্ষা হয়তোবা তাদের কাছে একটি আত্মশ্লাঘার বিষয়। রাষ্ট্রীয়ভাবেও তাদের ভাষা যথেষ্ট সম্মান ও মর্যাদা পায়। জানি না স্কুল-কলেজে এই ভাষার কোনো চর্চা আছে কিনা, কিংবা ওয়েলশ শেখানোর আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান আছে কি না। তবে মৌখিক ভাষা হিসেবে তাদের ভাষা সর্বত্র সম্মানিত। তা নইলে সাইন, রোডমার্ক ইত্যাদিতে এ ভাষা লেখা হবে কেন?

প্রথমে মনে হয়েছিলো এককালে এই ভাষার কোনো বর্ণলিপি ছিলো হয়তোবা। ইংরেজি ভাষার আধিপত্যে তা আজ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অথবা আদিকাল থেকে এভাবেই এই ভাষার লেখ্য রূপ চলে আসছে, কে জানে। ইতিহাসের খানিকটা তথ্য উপাত্ত ঘাঁটতে গিয়ে বুঝলাম আমার ধারণা পুরোপুরি না হলেও আংশিক সত্য। ওয়েলশ ভাষাটি ইউরোপের দু’একটি প্রাচীনতম এবং অদ্যাবধি জীবিত ভাষার মধ্যে একটি। একসময় এ ভাষার একটি নিজস্ব ভিন্ন বর্ণলিপি ছিলো। সেই লিপিতে অনেক আগে এই ভাষা লিখিত হতো। কালের বিবর্তনে কিংবা অপরাপর ভাষার আগ্রাসন-মিশ্রণে ইউরোপের অনেক ছোটো ছোটো ভাষার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গেলেও ওয়েলশ ভাষাটি এখনও স্বমহিমায় ওয়েলসবাসীর মুখের ভাষা হিসেবে আজো চালু রয়েছে। ব্রিটিশ পেনিনসুলায় রোমান শাসনের অবসানের পর ওয়েলস ব্রিটিশ শাসনের আওতাধীন হয়ে গেলেও সেই ভাষার বৈশিষ্ট্য ও স্বাতন্ত্র্য-স্বকীয়তা আজো বিলুপ্ত হয়নি। আমরা সকলেই জানি ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, নর্দান আয়ারল্যাণ্ড ও ওয়েলস এই চারটি স্টেট নিয়ে যুক্তরাজ্য তথা গ্রেট ব্রিটেন গঠিত। ইউকে’র অন্যান্য স্টেটের মতো ওয়েলসেরও নিজস্ব সার্বভৌম পার্লামেন্ট রয়েছে। যার নাম ওয়েলশ পার্লামেন্ট। সীমিত আকারে তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিধি-বিধান প্রণয়ন-সংশোধন ও পরিবর্তন-পরিমার্জনের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। এই পার্লামেন্টের নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা ষাট। অন্যদিকে ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সে তাদের নির্বাচিত সদস্য সংখ্যা চল্লিশ।

ধান ভানতে শিবের গীত নয় মোটেই। প্রায় ৩০ লাখ (৩ মিলিয়ন) নাগরিক অধ্যুষিত উঁচুনিচু পাহাড়-পর্বত, সবুজ সমতলভূমি, চড়াই উতরাই, নদী-নালা ও সমুদ্রবেষ্টিত এই অঞ্চলটি নৈসর্গিক সৌন্দর্যসুধায় ভরপুর। এককালে সোনা-রুপো ও লোহা-তামা-দস্তা প্রভৃতি মূল্যবান খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ ওয়েলস এখনো প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদের যোগান দিয়ে চলেছে পুরো ব্রিটেনে। গবাদিপশু ও পোলট্রি ফার্মগুলো পুরো ব্রিটেনবাসীর সুষম খাদ্যের সংস্থান করছে। কোনো প্রকার অঞ্চলগত বৈষম্য-ব্যবধান আছে বলেও মনে হলো না।

আমার ধারণামতে ওয়েলসে বাংলাদেশি বাঙালিদের বসবাস ইংল্যান্ডের তুলনায় অনেক অনেক কম। সারা ইউকে জুড়ে প্রায় এগারো হাজারেরও অধিক বাংলাদেশি বাঙালি ব্যবস্থাপনার ইণ্ডিয়ান রেস্টুরেন্ট রয়েছে। ওয়েলসের প্রধান দু’টো সিটি কার্ডিফ ও সোয়ানসিতে বাংলাদেশি বাঙালির মালিকানাধীন কিছু রেস্টুরেন্ট ও টেকওয়ে আছে। অন্যান্য টাউনেও ছিটেফোটা বাঙালির বসবাস হয়তো আছে, কিন্তু কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা রেস্টুরেন্ট-টেকওয়ে চোখে পড়েনি।(চলবে)

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box