হলিডে ইন ওয়েলস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নূরুজ্জামান মনি

তিন.

ওয়েলসে আমাদের হলিডে’র দ্বিতীয় দিনে চমৎকার রোদ ঝলমলে সকালে ঘুম ভাঙলো। চোখ খুলেই দেখি আকাশটা নির্মেঘ গাঢ় নীল হয়ে আছে। এক টুকরো মেঘের ঢিহ্ন কোথাও নেই। প্রখর তেজি সূর্যটা তরতরিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। উইন্ডো’র কাঁচ ভেদ করে মায়াবী রোদ ঘরের ভেতরে উঁকিঝুকি মারছে। ব্রিটিশ সামার টাইমে ( BST) রাত তিনটার দিকে ভোর হয়ে যায়। চার পাঁচ ঘণ্টার বেশি রাত থাকে না। অনেক লম্বা দিন। প্রায় উনিশ বিশ ঘণ্টার মতো। এমন চনমনে রোদমাখা দিন খুব সহজে মেলে না। আমাদের ভাগ্য সুপ্রসন্নই বলতে হবে। সমুদ্রের ঢেউয়ের খেলা আর নীল আকাশ দেখতে দেখতে চায়ের পর্ব সেরে নেওয়া হলো। সকাল হতে না হতেই ইঞ্জিনচালিত ছোটো ছোটো যানে করে ভ্রমনবিলাসীদের সমুদ্রের বুকে উদ্দাম ঘোরাঘুরি শুরু হয়ে গেছে। আমাদের উড়ালপঙ্খী মনও বাইরে বের হবার লোভে ডানা ঝাপটাতে লাগলো। গুগল সার্চ দিয়ে দেখার মতো কি কি আছে এবং কোথায় কোথায় যাওয়া যায়, তার একটা ক্ষুদ্র তালিকা তৈরি করে নিলাম।

অরণ্যের প্রতি জন্মাবধি আমাদের সবারই এক ধরনের টান তো রয়েছেই। তাই প্রথমেই ঠিক হলো ওয়াইল্ড লাইফ ( Welsh Wild life) দেখতে যাবো। নেভিগেটরে পোস্ট কোড বসিয়ে আমরা রওনা হয়ে গেলাম আমাদের গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। নেভিগেটরে নারীকণ্ঠের দিক নির্দেশনা আমাদেরকে নিয়ে চললো স্থির লক্ষ্যে। গাড়ি ড্রাইভ করছে আমার ছেলে নিনাদ। দু’পাশে স্তরে স্তরে ঘন সবুজ নিসর্গ আর অবারিত সবুজ প্রান্তরে বিচরণরত নাদুস নুদুস দুধেল গাভী আর মেষের পাল দেখতে দেখতে আমরা ছুটে চললাম সামনের দিকে। কী অপরূপ সাজানো গোছানো মোহময় প্রকৃতি। যেদিকে চোখ যায় শুধু সবুজ আর সবুজ। সযত্নে ছেঁটে রাখা ঘাসের গালিচায় ঢাকা পাহাড়-টিলে-ঢালু মাঠ। থরে থরে সাজানো নয়নাভিরাম দৃশ্যের পর দৃশ্য যেনবা এক স্বর্গীয় মায়ারূপ তৈরি করে রেখেছে। কোথা দিয়ে ঘন্টা দুয়েক পেরিয়ে গেলো, টেরই পেলাম না। নেভিগেটরে নারীকণ্ঠ ঘোষণা করলো, ইউ হেভ রিচড ইয়োর ডেস্টিনেশন।

গাড়ি পার্কিংএ রেখে আমরা বনের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। আঁকাবাঁকা সরু সরু রাস্তা নাম না জানা নানান জাতের গাছের ডালপাতায় ঢাকা। দু’পাশে অনেক ছোট ছোট লাল-নীল-হলুদ বুনো ফুল হাওয়ার পরশে মাথা দুলিয়ে চলেছে। হাঁটতে গেলে দু’একটা ফুলের ডাল পায়ে জড়িয়ে যায়। কোনোটা বা অসাবধানে থেঁতলে যায় জুতোর তলায়। আমরা গভীর বনের দিকে না গিয়ে যে দিকে একটু হালকা বন, সেদিকে হাঁটতে লাগলাম। সারা বনভূমি নানান জাতের পাখির কলকোলাহলে মুখর হয়ে আছে। ঝাঁক বেঁধে ছোটো ছোটো পাখি মাথার উপর দিয়ে মনের আনন্দে উড়াল দিয়ে ফিরছে। বুনো কোনো জন্তু জানোয়ার অবশ্য আমাদের চোখে পড়েনি। হয়তোবা এদের চলাচল বনের অন্য কোনো পাশে। সেদিকে হয়তোবা আরো গভীর বন।

হাঁটতে হাঁটতে আমরা একটি নদীর তীরে এসে দাঁড়ালাম। সাইনে দেখতে পেলাম নদীটির নাম টেইফি। River Teifi হয়তো ওয়েলশ ভাষারই নাম। প্রশস্ত পাহাড়ি নদী। তীব্র খরস্রোতা। আমরা যেখানে এসে দাঁড়িয়েছি, সেখানে নদীটির গভীরতা অনেক কম। অনেকটা বাংলাদেশের জাফলং পিয়াইন কিংবা বিছনাকান্দির অথবা জল ছলছল সারী নদীর মতো। নুড়ি পাথরের গায়ে গায়ে ধাক্কা লেগে চিকন স্রোতের ধারা বয়ে যাচ্ছে। আর তাতে সঙ্গীতের মুর্চ্ছনার মতো একধরনের ঝিরিঝিরি কোমল জলো সুর উঠছে। আমরা অনেকক্ষণ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই জলের লহরী উপভোগ করলাম। কী আশ্চর্য! নদীর পাড়টাও কেমন ছিমছাম সাজানো গোছানো। বসবার জন্য বেঞ্চ-টেবিল পাতা আছে। ইচ্ছে হলে বসে চা খেতে খেতে নদী দেখা যেতে পারে। ময়লা-আবর্জনা ফেলবার জন্য প্রশস্ত ডাস্টবিন সুবিধাও রয়েছে। সবকিছু পরিচ্ছন্ন রাখার কী আন্তরিক প্রয়াস। নদীপাড়ে আমরা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রোদ পোহাতে পোহাতে অনেক ছবি তুললাম আর নদীর গা থেকে উঠে আসা বিশুদ্ধ জলো হাওয়ায় বুক ভরে শ্বাস নিলাম।

সময়টা যেন এক দ্রুতগামী ঘোড়া। কষে লাগাম ধরেও টেনে থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ছুটছে কেবল ছুটছে। আমাদের তো এখনো দেখার অনেক কিছু বাকি রয়ে গেছে। বনটাকে খুঁটে খুঁটে দেখতে গেলে আরো অনেক কিছু অদেখা রয়ে যাবে। হাতে সময় একেবারেই কম। এবার আমাদেরকে দেখতে যেতে হবে সি বিচ। বেলা পড়ে এলে রৌদ্র বিছানো সমুদ্র সৈকত পাওয়া যাবে না। আর বৃষ্টি এসে গেলে তো সবকিছু গুবলেট হয়ে যাবে। তাই তাড়াতাড়ি গাড়িতে ফিরে এসে সৈকতের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেলাম।

পপিট স্যান্ডস বিচে (poppit sands Beach) পৌঁছে দেখলাম বেলা পড়ে আসতে এখনো অনেক বাকি। আইরিশ সি’র লোনাজল পিছিয়ে অনেক দূরে চলে গিয়ে সি বিচটাকে অনেক বিশাল করে রেখেছে। কী অপরূপ মনোহর সে দৃশ্য। মনে হচ্ছে সমুদ্র তার জল সরিয়ে নিয়ে আমাদের ঘুরে বেড়ানোর জায়গা করে দিয়ে যাচ্ছে। সমুদ্রের পানিতে নামার অবশ্য আমাদের কারোই ইচ্ছে ছিলো না। এত হিমশীতল জলে গা ডোবালে অসুখ-বিসুখ বেঁধে যেতে পারে। তাতে হলিডে’র আনন্দটা মাটি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তো অবশ্যই আছে। আমরা জুতো খুলে খালি পায়ে সমুদ্র সৈকতে উদ্দাম হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিলাম। কয়েকটি যন্ত্রচালিত জলযান শুকিয়ে যাওয়া সৈকতে আটকা পড়ে আছে। জোয়ারের স্রোত ফিরে এলে এগুলো আবার ভাসবে জলে। দেখতে পেলাম এখানে ওখানে বেশ কিছু জেলি ফিস মরে পড়ে আছে। ঝিনুক কিংবা শামুকের খোল কোথাও পাওয়া গেলো না। অনেকক্ষণ সমুদ্র তীরের জলো হাওয়ায় গা ভিজিয়ে সমুদ্রকে পেছনে ফেলে আমরা গাড়িতে ফিরে এলাম। ফাঁকে ফাঁকে অবশ্য এক্সপ্রেসো (Espresso), আমেরিকানো (Americano) কিংবা ঘ্রাণযুক্ত চায়ে লাটে’র (Chai latte) স্বাদ নিতে ভুলিনি।(চলবে)

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box