হলিডে ইন ওয়েলস

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

নূরুজ্জামান মনি

এক.

আমাদের গন্তব্যে পৌঁছতে পৌঁছতে সাড়ে পাঁচটা বেজে যায়। ব্রিটিশ সামারের দিন গড়িয়ে গেলেও সূর্যটা তখনো আকাশের অনেক ওপরে। কড়া রোদ ঢেলে যাচ্ছে। সকালে কিন্তু এরকম ছিলো না। ছিলো মন ভার করা দিন। আকাশ ঢাকা ছিলো মেঘে মেঘে।থেমে থেমে টিপ টিপ বৃষ্টিও হচ্ছিলো। মনে হচ্ছিলো বুঝি বৃষ্টি আমাদের হলিডে ট্রিপটাই মাটি করে দিলো। কিন্তু না। যতই আমরা আমাদের গন্তব্যের দিকে এগুচ্ছিলাম, ততোই মেঘ মুক্ত আকাশ পাচ্ছিলাম। আকাশের মেঘ গুলো একপাশে সরে গিয়ে সূর্যের জায়গা করে দিচ্ছিলো। আমাদের ডেস্টিনেশনে পৌঁছতে পৌঁছতে মন ভালো করা দিন এসে নামলো।  ছাব্বিশ মে মধ্যাহ্নে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। এবারকার হলিডে ডেস্টিনেশন ওয়েলস এর কার্ডিগান বে। আইরিশ সাগরের পারে শান্ত নিরিবিলি একটি স্থান। কটেজ বুকিং দেওয়া হয়েছিলো আগেই। সমুদ্র তীরে অনুচ্চ সবুজ ঘাসে ঢাকা টিলের ওপর সুদৃশ্য কটেজ। বুকিং দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ছবি আমরা পেয়ে যাই। সাগরমুখো ডিটাচড একটি কটেজ। ড্রইং রুমে বসে বসে দু’চোখ ভরে সমুদ্র দেখা যায়।

কটেজের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে পরিপাটি সাজানো সবকিছু পেয়ে মনটা ভালো হয়ে গেলো। এদিকে ড্রইং রুমে বসে চা খেতে খেতে সমুদ্র দর্শন। দৃশ্যটি অতুলনীয়। মনোমুগ্ধকর। এবারের হলিডেতে আমাদের পরিবারের চার রাত পাঁচ দিনের সফর। গত প্রায় দেড় বছরের লকডাউনে দমবন্ধ অবস্থায় সবার প্রাণ মন হাঁপিয়ে উঠেছিলো। এবার সেই লকডাউন একটু শিথিল হতেই এই হলিডে’র আয়োজন। আমি, আমার স্ত্রী, আমাদের এক ছেলে, দুই মেয়ে এবং মেয়েদের জামাই মিলে সাত সদস্যের আমাদের এই টিম।

ডেস্টিশনে পৌঁছেই সম্মুখে দিগন্তবিস্তৃত সমুদ্র আর দিলখোলা হাওয়া পথের ক্লান্তি দূর করে দিলো। মনে হতে লাগলো যেন বা বর্ষাকালে বিশাল জলমগ্ন টাঙ্গুয়ার হাওরের পাশে এসে পৌঁছে গেছি। ফেনা মুখে নিয়ে ছোটো ছোটো ঢেউ এসে সৈকতে আছড়ে পড়ছে। যতদূর চোখ যায় শুধু পানি আর পানি। অনেক দূরে আকাশ আর সমুদ্র যেন এক রেখায় এসে মিলে গেছে। মাঝে মাঝে সমুদ্রপিপাসুদের নিয়ে স্পিডবোটগুলো সমুদ্রের গভীরের দিকে ছুটে যায় দু’পাশে জলের রেখা এঁকে এঁকে। প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি, ব্রিটেনে সামারের দিনগুলো অনেক লম্বা হয়। সন্ধ্যা হতে হতে সাড়ে ন’টা দশটা বেজে যায়।

ছেলেমেয়ে আর মেয়ে জামাইরা ব্যাগগুলো ছুঁড়ে ফেলে কাছে থেকে সমুদ্র দেখার লোভে পাগলের মতো ছুট দিলো সৈকতের দিকে। জল ফিরে এলে এই শুকনো সৈকতটা পাওয়া যাবে না। আমরা বুড়ো বুড়ি রয়ে গেলাম কটেজের ভেতরেই। দু’ কাপ চায় চুমুক দিতে দিতে ওদের ছেলেমানুষী আর উইণ্ডোর কাঁচে চোখ রেখে পড়ন্ত বেলার সমুদ্র দেখতে লাগলাম। ইতোমধ্যে সূর্যটা অনেক নিচে নেমে আসে। সাগরে সূর্য ডোবার দৃশ্যটা অনেকদিন দেখা হয়নি। আর কিছুক্ষণ পর গোলাকার লাল চাকতির মতো সূর্যটা আইরিশ সমুদ্রে ডুবে যাবে।

চা শেষ করে দরজা খুলে লনের সবুজ ঘাসে পা রাখতেই পাশের কটেজের বাসিন্দারা এগিয়ে এসে আমাদের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিলো। দু’তিনজন ইংরেজিভাষী বয়স্ক মহিলা। ওরা জানতে চাইলো কখন এসেছি। বললাম ঘণ্টাখানেক হবে। ওরা বললো, তোমরা ভাগ্যবান। আমাদের জন্যও সৌভাগ্য বয়ে নিয়ে এসেছো। আজ মঙ্গলবার। আমরা শনিবার থেকে এসে বসে আছি। রোদ পাচ্ছি না। আমাদের হলিডেটা বোরিং হয়ে গেছে। বৃষ্টি আর বৃষ্টি। রোদের ভেতর গা এলিয়ে দিয়ে ওরা বার বার থ্যাঙ্ক গড থ্যাঙ্ক গড বলছে।

ছবি: লেখক


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box