হাওয়া বদল ও রবীন্দ্রনাথ

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মাসুদুল হাসান রনি

দুই.

একবার তিনি আর্জেন্টিনা ভ্রমনে গিয়ে দীর্ঘদিন ছিলেন। এর কারন অবশ্য হঠাৎ অসুস্থতা। এ বিষয়ে চমৎকার একটি লেখা সম্প্রতি পাঠ করেছি। কবি রাজু আলাউদ্দিনের লেখা “রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দেড়শ বছর”রক্তমাংসের রবীন্দ্রনাথ। তিনি কবিগুরুর আর্জেন্টিনা ভ্রমনে অসুস্থতা ও হাওয়া বদল সম্পর্কে লিখেছেন, ‘‘রবীন্দ্রনাথ আর্হেন্তিনা পৌঁছাবার আগে থেকেই ওকাম্পো তাঁর লেখার সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং ২ নভেম্বর ১৯২৪ সালে লা নাসিয়ন পত্রিকায় লিখলেন ‘রবীন্দ্রনাথ পাঠের আনন্দ ‘ (La alegria de leer a Rabindranath Tagore)। তিনি জানতেন যে রবীন্দ্রনাথ লিমা যাচ্ছেন। এই উপলক্ষেই হয়তো তাঁর বহু দিনের রবীন্দ্র-পাঠকে স্মরণ করেছেন। কিন্তু তিনি কখনো কল্পনাও করেন নি রবীন্দ্রনাথকে দু’মাসের জন্য তাঁর আতিথ্যে বন্দি করে ফেলতে পারবেন। রবীন্দ্রনাথের অসুস্থতা তাঁর এই সৌভাগ্য প্রাপ্তিতে সাহায্য করেছে—তাতে কোনো সন্দেহ নেই।’ রবীন্দ্রনাথকে সুস্থ্য করার জন্য হাওয়া বদল এবং হাওয়া বদলের জন্য অন্যত্র স্থানান্তর অর্থাৎ সান ইসিদ্রো, লা প্লাতা এবং চাপাদ মালালে তাঁর আবাস নিশ্চিত করার জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করেছিলেন ওকাম্পো। রবীন্দ্রনাথের অবস্থান দীর্ঘ করার বাসনায় নিজের বহুমূল্য অলংকার–হিরের টায়রাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভালোবাসার এই দানের বাইরেও আর্হেন্তিনার কাছে রবীন্দ্রনাথের আরও একটি ঋণ আছে যার কথা তিনি এক চিঠিতে স্বীকার করেছেন এইভাবে: ‘‘আর্জেন্টাইনের কর্তৃপক্ষ পেরুর সমস্ত ঋণ আমার তরফ থেকে শোধ করে দিতে প্রস্ত্তত আছেন। তা ছাড়া আমার দেশে ফিরে যাবার পাথেয় এখান থেকেই পাওয়া যাবে।

আমি এদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা যে কত অকৃত্রিম ও গভীর তা অনুভর করে আমি বিস্মিত হই। আমি যাতে আরামে থাকি সুস্থ্য থাকি তার সমস্ত দায়িত্ব যেন এদের সকলেরই।’’ (প্রশান্ত পাল, রবিজীবনী, ৯ম খণ্ড, ২০১০, পৃ. ১৬৪) রাজু আলাউদ্দিন লিখেছেন, “তবে বস্তুগত এই ঋণের চেয়ে বেশি যে-ঋণটি রবীন্দ্রনাথের কাছে বড় হয়েছিলো তা অবশ্যই ওকাম্পোর ভালোবাসার ঋণ। পরস্পর চিঠিপত্রে এবং সাক্ষাতে সেই ভালোবাসার প্রকাশ দেখিয়েছেন নানাভাবে। বুয়েনোস আইরেসে পৌঁছানোর প্রায় ৮ দিন পরেই, ১৪ নভেম্বরে ২৪ সালে ওকাম্পোকে লেখা রবীন্দ্রনাথের এক চিঠিতেও সেই একই প্রতিধ্বনি লক্ষ করবো আমরা: “This can be had only from a women’s love and of have been hoping for long time that I do deserve it. I feel today that this precious gift has come to me from you…” (Ketaki Kushari Dyson, In your blossoming Flower-Garden, 1996, Sahitya Akademi, পৃ. ৩৭৪) পরস্পরের সম্পর্ক যে নিছক সৌজন্যস্নাত ছিলো না, বরং তারও চেয়ে বেশি কিছু, তার বাস্তব সাক্ষী লিওনার্দ এলমহার্স্টের এই ভাষ্য: “Besides having a keen intellectual understanding of his books, she was in love with him (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-লেখক)”। (প্রশান্ত পাল, রবিজীবনী, ৯ম খণ্ড, আনন্দ পাবলিশার্স ২০১০, পৃ. ১৭৭) ২. ১৯০৩ সালের কথা। কবিপত্নীর মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই কবির মধ্যমা কন্যা রেণুকা গুরুতর অসুখে পড়লেন। হাজারিবাগ ও আলমোড়ায় হাওয়া বদল করেও বিশেষ উপকার হয়নি , বরং অসুখ বেড়েছে। আলমোড়ায় কন্যার শয্যার পাশে বসে, তার মনকে একটু প্রফুল্ল করার চেষ্টায় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ কয়েকটি কবিতা রচনা করে শুনিয়েছিলেন। পরে অবশ্য সেগুলি ‘শিশু’ বইতে স্থান পেয়েছে। কদিন বাদে, মেয়েকে নিয়ে কলকাতায় ফিরেছিলেন কবি।এর কিছুদিন পর লোকান্তরিত হন রেণুকা। রেণুকার মৃত্যুতে কবির তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া কী ছিলো, আমরা জানি না।

বহু বছর পরে, নির্মলকুমারী মহলানবীশের কাছে কবি সেদিনের স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, “মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে আমাকে বললে- বাবা, পিতা নো’সি বলো। আমি মন্ত্রটি উচ্চারণ করার সঙ্গে সঙ্গে তার শেষ নিঃশ্বাস পড়ল। তার জীবনের চরম মুহূর্তে কেন সে ‘পিতা নো’সি’ স্মরণ করল, তার ঠিক মানেটা আমি বুঝতে পারলুম। তার বাবাই যে তার জীবনের সব ছিল, তাই মৃত্যুর হাতে যখন আত্মসমর্পণ করতে হল, তখনো সেই বাবার হাত ধরেই সে দরজাটুকু পার হয়ে যেতে চেয়েছিল। তখনো তার বাবাই একমাত্র ভরসা এবং আশ্রয়। বাবা কাছে আছে জানলে আর কোনো ভয় নেই। সেইজন্য ভগবানকেও পিতারূপেই কল্পনা করে তাঁর হাত ধরে অজানা পথের ভয় কাটাবার চেষ্টা করেছিল। এই সম্বন্ধের চেয়ে আর কোনো সম্বন্ধ তার কাছে বেশি সত্য হয়ে ওঠেনি। …তার সেই শেষ কথা যখন-তখন আমি শুনতে পাই – বাবা, পিতা নো’সি বলো।” এরপর আমরা কবিগুরুকে আরো শোকের সাগরে ভাসতে দেখি। ১৯০৭ সালে মৃত্যুবরণ করে কবির কনিষ্ঠ পুত্র শমীন্দ্রনাথ। পুজোর ছুটিতে বন্ধুপুত্র সরোজচন্দ্রের সঙ্গে মুঙ্গেরে বেড়াতে গিয়েছিলো শমী। সেখানেই তার কলেরা হয়। টেলিগ্রাফ পেয়ে কবি কলকাতা থেকে মুঙ্গেরে রওনা দেন। বোলপুর থেকে ভূপেন্দ্রনাথ কবির সঙ্গ নিয়েছিলেন। মুঙ্গেরে শমীর মৃত্যু হয় ৭ অগ্রহায়ণ। পাঁচ বছর আগে, ঠিক এই দিনটিতে কলকাতায় অকালে প্রয়াত হয়েছিল কবিপত্নী মৃণালিনী দেবী। মৃত্যুর সময় শমীর বয়স ছিলো তেরো বছর মাত্র। সে বাবার বড়ো আদরের ছেলে, আকৃতিতে রবীন্দ্রনাথের অনুরূপ। এই শোক কবিকে নিদারুণভাবে আঘাত করেছিলো, কিন্তু শোকের অসংযত প্রকাশ কোথাও নেই। কবির সেই নিরুদ্ধ শোক আধ্যাত্মিক সান্ত্বনারূপে নবকলেবর ধরে প্রকাশ পেয়েছিলো সাহিত্যের অঙ্গনে। কন্যা, পুত্রশোক কাটাতে তিনি হাওয়া বদলে চলে এসেছিলেন শিলাইদহে। এখানে এসেই লিখলেন একের পর এক গান- ‘অন্তর মম বিকশিত কর’, ‘প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে’। সম্ভবত ‘তুমি নব নব রূপে’ গানটিও এই সময়েই লেখা।

শিলাইদহ বাসকালেই কবি রচনা করলেন মাঘোৎসবের ভাষণ, তার শিরোনাম ‘দুঃখ’। এই ভাষণের অন্তর্গত প্রার্থনায় কবি তাঁর সদ্যোপ্রাপ্ত দুঃখের সান্ত্বনা চেয়ে বলেছেন, “হে রাজা, তুমি আমাদের দুঃখের রাজা; হঠাৎ যখন অর্ধরাত্রে তোমার রথচক্রের বজ্রগর্জনে মেদিনী বলির পশুর হৃৎপিণ্ডের মতো কাঁপিয়া উঠে তখন জীবনে তোমার সেই প্রচণ্ড আবির্ভাবের মহাক্ষণে যেন তোমার জয়ধ্বনি করিতে পারি; হে দুঃখের ধন, তোমাকে চাহি না এমন কথা সেদিন যেন ভয়ে না বলি; সেদিন যেন দ্বার ভাঙিয়া ফেলিয়া তোমাকে ঘরে প্রবেশ করিতে না হয়- যেন সম্পূর্ণ জাগ্রত হইয়া সিংহদ্বার খুলিয়া দিয়া তোমার উদ্দীপ্ত ললাটের দিকে দুই চক্ষু তুলিয়া বলিতে পারি, হে দারুণ, তুমিই আমার প্রিয়।” হাওয়া বদল নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন ১৯২৪ সালে।তিনি তখন কোলকাতা ছেড়ে কার্সিয়াং যাওয়ার পথে ও কার্সিয়াংয়ে বসে কিছু লেখা লিখেছিলেন । ছোট ছোট সেই সব লেখা ভাষা, বর্ণনায় অনবদ্য। “আমার সকালে ঘুম ভাঙে না দেখে আমি নিজে থেকে একটা প্রহরী ঘড়ি (Alarm Clock) কিনে মাথার শিয়রে রেখেছিলেম, ঘড়ি রোজই ঠিক সূর্যোদয়ে চেঁচিয়ে ঘুম ভাঙায়, ঠিক যেভাবে নেতা ঘুম ভাঙাতে চলে ঘুমন্ত জাতির! তেমন করে জেগে দেখি সকাল ভালো লাগে না, কাজ ভালো লাগে না, মাথা ধরে। জাগার পরে, ঘুম যেন আরো বেশি করে জড়িয়ে আসে দেহে মনে! এমনি ভাবে জেগে আমার কোনো ফল হল না, শরীর মন দুইই খারাপ হয়ে উঠল দেখে প্রহরী ঘড়িকে ঘরে পাহাড়া দিতে রেখে আমি পাহাড়ে গিয়ে বাসা নিলেম। সেখানে জাগরণ একটি অজানা পাখির ডাকে মধুর হয়ে এল রাত্রিশেষে, তেমন করে জেগে আনন্দে ভরল প্রাণ, স্ফূর্তি পেল দেহ, ফিরে পেলেম অনেক দিনের হারানো স্বচ্ছন্দতা।”(হাওয়া বদলের অন্তর্গত টুকরো রচনাবলী, অবনীন্দ্রনাথঠাকুর,১৯২৪) অবন ঠাকুর কোলকাতা থেকে হাওয়া বদলে যেতে যেতে লিখেছিলেন শিয়ালদহ,শহরতলি,পদ্মা, জলপাইগুড়ি ,শিলিগুড়ি, সুকন্যার জঙ্গল, বনপথ, তিস্তা,পাহাড়তলি,পাহাড় নিয়ে। সেইসব বর্ণনা এককথায় অসাধারণ। সাহিত্য ছেড়ে এবার হাওয়া বদল নিয়ে অন্যদিকে চোখ ফেরানো যাক। ভ্রমণ বিষয়টি মূলত হাওয়া বদল! নাগরিক জীবনের একঘেয়েমি দূর করতে, একটু ছুটিছাটা বা অবসর মিলিয়ে কোথাও ঘুরতে যাওয়া। প্রিয়জনকে একান্ত কিছু সময় দেয়া।নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া।এক কথায় আমার কাছে ভ্রমণের যথাযথ অর্থ এটাই। ভ্রমণে যারাই যে কারণে যায়, তার প্রায় সবগুলোকেই ‘হাওয়া বদল’-এর মধ্যে ফেলা যায়। নিজের ভেতরের গুমোট আবহাওয়ার পরিবর্তন! ব্যস্ত নাগরিক জীবন থেকে হাঁপিয়ে উঠা মানুষ আসলে কিছুটা ক্লান্তি দূর করতে পাহাড়, সমুদ্র কিংবা নিরিবিলি কোথাও ছুঁটে যেতে চায়, দু’চারটে দিন নিজের মতন কাটিয়ে সতেজ হয়ে ফিরতে চায় অভ্যস্ত জীবনে।

আজকাল হাওয়া বদল পালটে গিয়ে হয়ে গেছে প্যাকেজ ট্যুর। আসা-যাওয়া,থাকা, খাওয়া, ওখানে বেড়ানো সব কিছুই হয় ট্র্যাভেল কোম্পানির ব্যবস্থাপনায়। কিছু নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনও দরকার নেই। শুধু মাথাপিছু নির্ধারিত অর্থ হাতে দিলেই হবে। সেকেলে মানসিকতার অনেকেই ভ্রু কুঁচকে বলবেন, এটা কেমন বেড়াতে যাওয়া? নিজের পছন্দে কিছুই হবে না? আরে ভাই, প্যাকেজের সব কিছু কি আর মনের মত হবে? হয়তো যাওয়া আসার ব্যবস্থা পছন্দ হবে, কিন্তু গিয়ে দেখব হোটেলের ঘরটা ভালো না। যা খাওয়াচ্ছে তাতে মন ভরছে না। তারপরও শান্তি যে, কিছুতেই আমার মাথাব্যাথা থাকছে না, সব দায়িত্ব ট্যুর অপারেটরের। আজকাল কিন্তু ব্যস্ত মানুষ এসব প্যাকেজের ওপর ভরসা করছে। ভিসা, টিকেট, হোটেল, যানবাহনের টেনশান নিতে হচ্ছে না। এভাবেই শুরু হয়েছে পুর্ব পশ্চিমে হাওয়াবদল করতে যাওয়ার গল্প। একেকটা ট্যুর মানেই কত কথা, কত মধুর স্মৃতি জমিয়ে শিকড়ে ফেরা । সঙ্গে ক্যামেরা না হোক, নিদেন পক্ষে একটা ভাল এন্ড্রয়েড ফোন থাকলে স্মৃতি ধরে রাখায় কোন সমস্যা হবে না। এখন যেখানেই ঘুরতে যাও, সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড করো। তা না হলে যে বন্ধুমহলে আর মান থাকে না৷ রবীন্দ্রনাথের সময় এসবের বালাই ছিল না বলেই আমরা সেই অর্থে বিদেশ ভ্রমনরত রবিবাবুর ছবি খুব একটা পাইনি। (শেষ)

ছবি: গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box