হাছনজানের রাজা নাটকে নতুন হাছন রাজা

সৈয়দ মুনজের হোসেন বাবু: বাউল তথ্য এবং তাঁর জীবনদর্শ খোঁজার জন্য প্রায় ১৫ বছর ধরে এক লালন শিষ্যের সঙ্গে ছেউড়িয়া- ঢাকা ছুটে চলা নাবিকপুত্র শাকুর মজিদের দেখার হাওড়ে এক সময় বজরা ভিড়ান পাঁচ লাখ বিঘার জমিদার, লম্পটিয়া, মাতৃভক্ত, শৌখিন এবং মরমি সাধক হাছন রাজা। কোনো এক ভরা বর্ষার নীল পূর্ণিমার রাতে একানত্ম সাঙ্গাৎ মিলে বর্ষায় মাতাল হাওরে। সেই অলীক সাক্ষাতে শাকুর মজিদকে হাছনরাজা খুলে বলেন নানান অজানা এবং মরমি কথা; যা ক্যামেরায় ধারণ করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু শাকুর মজিদের মস্তিষ্কে সকল তথ্য-উপাত্ত, কথোপকথন নিখুঁতভাবে প্রোথিত হয়। সেই মোহে ডুবে থাকা শাকুর মজিদ ২০১৫ সালে লেখা শুরু করেন হাছনজানের রাজা, যেখানে এক হাছনের দুই অস্তিত্ব-  হাছন রাজা এবং হাছন জানের যাপিত জীবনকে ঘিরে সকল মিথ্যাচার, প্রশ্ন এবং উত্তর তুলে ধরেন অত্যন্ত নিখুঁতভাবে।

সম্ভবত আমি তখন ক্লাস চতুর্থ অথবা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ছি । হুমায়ূন আহমেদ এর ‘আজ রবিবার’ নাটকের মধ্যে দিয়ে প্রথম হাছনরাজার গান শুনতে পারি। বিশেষ করে ‘আমি যাইমু আল্লাহ’র সঙ্গে’, ‘বাউলা কে বানাইলোরে’, ‘কানাই তুমি খেইড় খালাও কেনে’, ‘লোকে বলে বলেরে’ গানের লাইনগুলো আমাকে খুব ভাবিয়ে তুলে এবং আরো কয়েকটা বছরের জন্য মস্তিস্কে এ লাইনগুলো থেকে গিয়েছিল । যার ফলশ্রুতিতে আমার চিন্তায় হাছনের অধঃ প্রতিকৃতি অঙ্কিত হয়ে ওঠে ।

এরপরে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাছনের গানগুলো শুনে, হাছনকে নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘হাসন রাজা’র মাধ্যমে যে হাছনরাজাকে আমার সামনে তুলে ধরা হয়; তাকে কোনোভাবে নিজের মধ্যে থাকা হাছনরাজার সঙ্গে মেলাতে পারিনি । তবে বলাবাহুল্য হাছনের পূর্ণ প্রতিকৃতি অঙ্কিত হয় শাকুর মজিদ এর রচিত ‘হাছনজানের রাজা’র মধ্য দিয়ে।

বিগত ৭/৮ মাস থেকে ক্যামেরা নিয়ে শাকুর মজিদকে আমি অনুসরণ করছি, তার জীবন এবং কর্ম নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি নির্মানের লক্ষে । সেই সুবাদে শাকুর মজিদ স্যার আমাকে উনার  গুরুত্বপূর্ণ কর্মকান্ড এবং অনুষ্ঠানাদিতে উপস্থিত থাকার সুযোগ করে দেন । এরই ধারাবাহিকতায়  চলতি মাসের ১৯ তারিখ ‘হাছনজানের রাজা’র টেকনিক্যাল শো-এবং ২০ এপ্রিল মঞ্চনাটকের প্রথম প্রদর্শনীর ফটোগ্রাফি করার সুযোগ হয়ে ওঠে ।

হাওরের জোছনা ভেজা বাতাসে আজো নাকি বেজে ওঠে বাজনার সুর। করতাল বাজাতে বাজাতে বর্ষায় মাতাল করা হাওরে আজো নাকি সখীগণকে নিয়ে এপার ওপার করেন এক মরমি রাজা হাছন রাজা…।

২০১৮ সালের হাওর বিহারী কতোগুলো নাগরিক ছেলে মেয়ের কাছে হাজির হয়ে যান এভাবে –

উনিশশো বাইশের তিরোধান পরে

নানা লোকে নানাভাবে দেখেছে রাজারে

কেউ নাকি দেখেছে তারে সুরমার পাড়ে

কেউ দেখেছে বলে কুড়া শিকারে

কেউ নাকি পেয়েছে তারে লাউড়ের বনে

ডুগ ডুগি বাজায়া নাচে অষ্টসখী সনে

কেউ নাকি শুনেছে এমন

ভরা কোনো বর্ষায় মহা পূর্ণিমা যখন

ঝিকি মিকি রোশনাই দেয় দেখার হাওরে

আচানক কোনো রাতে ভরা সে বহরে

হাছন রাজার নাও ঘুরিয়া বেড়ায়

কাছে গেলে এই নাও আকাশে মিলায় ।

এ দুর্দিনে খুব কাছ থেকে দেখা প্রাঙ্গণেমোর এর প্রযোজনায় এবং রচয়িতার শিল্পযজ্ঞের মোহে আবদ্ধ হয়ে যাওয়া এই আমি কিছুতেই এর ভেতর থেকে বের হতে পারছিলাম না; তাই ২১ এপ্রিল সিলেটে ফেরার কথা থাকলেও সে মোহে দ্বিতীয় প্রদর্শনী দেখতে ক্যামেরা নিয়ে চলে যাই শিল্পকলা একাডেমিতে। মানুষের চিন্তা শক্তি যে এত গভীরে যেতে পারে শাকুর মজিদের হাছনজানের রাজা তার অনন্য উদাহরণ । এমন চিন্তা শক্তির অন্তরালে লুকায়িত কি ছিল ? কোনো এক সময়ে যখন এমন অভিপ্রায় নিয়ে তার কাছে জানতে চাই তখন তিনি জানান কঠোর পরিশ্রম, তপস্যা এবং সাধনার আদ্যোপান্ত ।হাছনকে জানতে দীর্ঘ বছর চারেক থেকে তিনি গবেষণাধর্মী যে কাজ করেছেন তা আমাকে ভাবিয়ে তুলে, বিভিন্নগ্রন্থ, ডকুমেন্টারি থেকে শুরু করে পত্রিকায় প্রকাশিত হাছনকে নিয়ে যা কিছু প্রকাশিত তা কত নিঁখুতভাবে সংগ্রহ করেছেন এবং পড়েছেন তিনি ।

নাটকটি উপভোগ এবং নাটকের ফটোগ্রাফি শেষ করে যখন আমার নিজ প্রকোষ্টে অবস্থান করি এবং ব্যস্ত হয়ে পড়ি এই ছবিগুলো পোস্ট প্রসেসিং নিয়ে কিন্তু কেন জানি হাছনরাজার চরিত্রের রামিজ রাজুর কন্ঠের সংলাপ –
সেকি আমি জানি নাই ? বুঝি নাই ? বাপ

জমি-জমা সম্পদ কাল হয়ে যায় যেনো পোষা কোন বিষধর সাপ

নিজের কপালে মারে বিষের ছোবল

যখন ভাগের থালা হাতে বসিবে সকল

চেনেনা কে ভাই-বোন-পুত্র-কন্যা-মাতা-পিতা- কিংবা পরিজন

বড় ভাগ সকলের পাইতে চায় মন

সম্পদের ভাগে বসে মানুষ যখন

নিমেষেই বনে যায় শৃগাল তখন

অথচ ভুলিয়া যায় জনমে তাহার

খালি হাতে দেখা পায় জগত সংসার

এর ওর কাছ থেকে যাহা কিছু  পায়

এই নিয়ে কিছুদিন ফুটানী মারায়

যেসব সকলই ছিলো অন্য কারো ধন

পাইবার পরে ভাবো ইহাই জীবন

তারপর কিছুদিন পর

পালা শেষে পর্দা পড়ে খালি হয় ঘর

আবার পরের রাতে শুরু হলে নতুন আসর

তোমার লেবাসে নাচে অন্য নটবর

এই সময়ের মানুষের কাছে শত বছর আগে গত হওয়া একজন মানুষ মঞ্চে এসে দাপাদাপি করে আবার মিলিয়ে গিয়ে তাক লাগিয়ে দেন মঞ্চের বাকী অভিনেতা আর উপস্থিত দর্শকদের। এর আগের দেখা অন্য কোন মঞ্চ নাটকে এমন যাদু আমি দেখিনি। এ যেন এক নতুন নাটক, নতুন রূপে দেখা এক কিংবদন্তি জমিদার হাছন রাজার নতুন রূপ।

ছবি: লেখক