হাণ্ড্রেড-টি-এই ভুলটিই বয়ে বেড়াচ্ছি

সুব্রত গোস্বামী

দুই.

পৌঁছতে এতটা বেলা হয়ে গেল বলে একটু ভয়ই পেয়ে গেছিলাম। পেলিং ফিরতে গিয়ে যদি মাঝপথে অন্ধকার হয়ে যায় বিপদে পড়ে যেতে পারি! আসলে আমি অন্ধকারে ভালো বাইক

হোটেলের খাবার

চালাতে পারিনা। খুব ভয় করে। তাই এখানে পৌঁছেই আগে হোটেলের খোঁজ শুরু করে দিলাম। ভাবলাম হোটেল পেয়ে গেলে লেকটায় একটু সময় কাটাতে পারবো। খেচিপেরি লেকে ১৯বছর আগে যখন এসেছিলাম, তখনকার থেকে অনেক বদলে গেলেও হোটেল ফোটেল তৈরি হয়নি। কেনই বা হবে? কোন পাগলে এখানে থাকতে আসবে শুনি! দেখলাম একটা বাড়িতে হোটেল অ্যাণ্ড রেস্টুরেন্ট লেখা আছে, কিন্তু তালা দেওয়া। যাও বা পেলাম সেটাও ছাই বন্ধ! একজন বলল জিগমি রেস্টুরেন্ট চলে যাও,উধার মিলেগা।

জিগমি থেকে এক বালিকা এসে হোটেলটির তালা খুলে ঘর দেখালেন। পাঁচটি ঘর এবং একখানি কমন বাথরুম। তবে পরিষ্কার। উপায় নেই, আমায় এটাই স্বীকার করে নিতে হবে। লেক দেখে এসে ওদের জিগমিতেই লাঞ্চ করে হোটেলে সেঁধিয়ে গেলাম। গোটা হোটেলে আমি ছাড়া কেউ নেই, কাজেই বাথরুম আর কমন রইল না। সন্ধ্যেয় এসে মেয়েটি বলে গেল রাতের খাবার সাতটায় দেবে। এরপর সবাই ঘুমিয়ে পড়ে। তাই হ’ল। সাড়ে সাতটায় খাবার এলো। খেয়েদেয়ে হোটেলের মেনগেট আমিই বন্ধ করলাম। এখন আমি লেপের তলায়। নীচে যে খাবারের ছবি দেখছেন এর কম্বিনেশান বড় অদ্ভুত। আমার মেয়ের কথায়, “আজীব”। এগ-ফ্রায়েডরাইস আর ডাল। এই কম্বিনেশান আমি জীবনে দ্বিতীয়বার খেলাম। প্রথমবার কোথায় জানেন? আজ বেলা তিনটের সময়, জিগমি রেস্টুরেন্টে। শুভরাত্রি।

খেচিপেরি লেক

ডিয়ার গুগলমম্যাপ,স্যাটেলাইট দিয়ে রাস্তা জরিপ করে সেটাকে “শর্টেস্ট রুট” বলে তারমধ্যে লোকজনকে লেলিয়ে দেওয়ার আগে নিজে একবার সেই পথে ঘুরে যাবেন প্লিজ। আরে মশাই কী বলি আপনাদের! পরশু রাতে তো খেচিপেরির ওই গোটা হোটেলবাড়িটায় একা রাত কাটালাম, বললাম না আপনাদের? সে যাই হোক, কাল সকালে উঠেই প্ল্যান ছিল কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাতটা ঢুঁ মেরে পেলিং-এ গিয়ে জলখাবার খাবো। মূল পথ বন্ধ থাকার জন্য পরশু যে ঘুরপথটা ধরে এখানে এসেছি, সেটা ধরে গেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা জলপ্রপাত কাছে পড়বে। উনিশ বছর আগের স্মৃতিটা একটু উস্কে নেব আরকী। বাইকে স্যাড্ল ব্যাগ বাঁধতে বাঁধতে দেখলাম একটা গাড়ি রওনা দিচ্ছে। ড্রাইভারের কাছ থেকে জানতে পারলাম সকাল আটটা পর্যন্ত মূল পথটা খোলা থাকবে। তার আগে গেলে যাওয়া যাবে। অতএব জলপ্রপাত দেখার লোভ সামলে নিয়ে ভালো রাস্তাকেই বেছে নিলাম। পেলিং-এ এসে গরমগরম হাতরুটি দিয়ে একটা জমাটি জলখাবার সেরে চটকপুরের উদ্দেশে আবার ব্রুমব্রুম।

ছায়াতাল।

প্রথমদিকটায় পথটা দারুণ এনজয়েবল ছিল! রিনচেনপঙ যাবার দিন জুম-এর পথটা যেমন চড়াই ছিলো। এবারে জোরথাং-এর আগে ঠিক তেমন উৎরাই! বাপরে! তবে বেশ মজার! এরপর বেশকিছুটা পথ খারাপ হলেও চড়াই বা উৎরাইয়ের মধ্যে নয়। এই করতে করতে চা বাগানের মধ্যে দিয়ে দোল খেতে খেতে দার্জিলিং এসে পৌঁছলাম। পথে কয়েকটা পোড়া গাড়ি পড়ে থাকতে দেখে বুঝতে পেরেছিলাম দার্জিলিং ঢুকছি। চটকপুরের হোমস্টের মালিকটি আমায় বলেছিলেন বটে বটে, “zoর বাংলা শে তিন মাইল হোকে আইয়ে, পুরা zoঙ্গল কা রশতা হ্যায়। সোনাদা সে মত আইয়ে।” কিন্তু ওই যে, গুগলবাবু। উনি আবার “শর্টেস্ট রুট” ছাড়া

কথা বোঝেননা। আমিও লোভে পড়ে সোনাদা থেকে বাঁদিক নেব ঠিক করলাম। সোনাদায় এসে গুগলের নারী কণ্ঠ আমায় “টার্ণ লেফট ইন টু হাণ্ড্রেড মিটার” বলে কাকুতিমিনতি করলেও আমি লেফটে টার্ণ নেওয়ার মত কোনও রাস্তা খুঁজে পেলামনা। এক দোকানিকে জিজ্ঞাসা করায় তিনি দেখিয়ে দিলেন। দেখে চমকে গেলাম! ভেতর থেকে আবার বেরিয়ে এল, “এটা রাস্তা #@!” অগত্যা, এশিই যকোন পড়িচি উঠতে হবেই। উঠলুম, এবং কেন উঠলুম। বছর দশেক আগের মন্দারমণি ট্রিপটা ধরলে এটা আমার ষষ্ঠ বাইকট্রিপ। আমি এত খারাপ পথ এর আগে কোনওদিনও ফেস করিনি। পথই বা বলছি কেন ওটাকে আমি। কোনও বর্ণনা নেই আমার কাছে ওটার। শুধু বলতে পারি আমি কাল ফেঁসে গেছিলাম। জানিনা কোন মনের জোরের দেবতা ভর করেছিল কাল আমার ওপর। আসলে একা থাকলে মনে হয় এমনই হয়। একটা জেদ চেপে যায়। শালা তুলেই দিলাম বাইকটাকে! চটকপুর পৌঁছে বাইকটাকে দেখে আদুরে কুকুরের মত মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল অনেক কষ্ট দিলাম আজ ওকে।

থাকার জায়গা

যে হোমস্টের সঙ্গে ফোনে কথা বলে সেই ভরসায় চটকপুর পাড়ি দিয়েছিলাম সে ফোনই ধরেনি। ভাগ্য ভালো পঁচিশে ডিসেম্বরের পুণ্যলগ্নে হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডায় একটা মাথা গোঁজার আস্তানা পেয়ে গেলাম। এখানেও মহিলা মালিক। এই ট্রিপের আপাতত সবকটা হোমস্টেতেই মালিক নয়, মালকিন পেলাম। সন্ধের ভেজপকোড়া আর চা নিয়ে এল মহিলার পুত্র। নেপালে টুয়েলভ পর্যন্ত পড়ে এখানে চলে এসেছে। আবার যাবে। “অউর তিন সাল পড়েঙ্গে হাম”। আমি পথের গল্প করছিলাম ওর সঙ্গে। বললো, “বাইক লেকে তিন মাইল হোকে নেহি আয়ে তো অচ্ছা হ্যায়। উয়ো পুরা zoঙ্গল হ্যায়। zaনবর কভি ভি অ্যাটাক কর শকতা হ্যায়। ফোর হুইলার হোনেসে থোরা সেফ হ্যায়। অউর সোনাদা কা রস্তা…” বলে হাসতে থাকে। “মেরা মামা মেরা ভাইকো ফরেস্ট সেকপোস্ট তক সোড় দেতা হ্যায়, ও উহাসে পেদল zaতা হ্যায়” আবার হাসতে থাকে। আমি বললাম তাহলে আসব কোন পথে। “আপ ইয়ে মোটর সাইকেল লেকে আয়ে হি কিউ। গাড়ি মে আইয়ে ইয়া সোনাদা সে ট্রেকিং করকে আইয়ে, মোটরসাইকেল লেকে মত আইয়ে।” আবার হাসতে থাকে। “রাত মে কিতনা রোটি দু? সার ইয়া পাস?” (চলবে)

ছবি: লেখক