হাণ্ড্রেড-টি-এই ভুলটিই বয়ে বেড়াচ্ছি

সুব্রত গোস্বামী

শেষ

পরশু দুপুরে চটকপুরে পৌঁছনোর পর বেশ কেলশেই গেছিলাম। ওইরকম একটা রাইডের পর হোমস্টের গরমগরম খাবার আমাকে মনেমনে “ভিউ পয়েণ্ট আউর পোখরিবোখরি কো মারো গোলি” বিড়বিড়িয়ে লেপের তলা বেছে নিতে বাধ্য করলো। নেটওয়ার্ক না থাকায় অখিলবন্ধুর সঙ্গে সই পাতালুম। অ্যালবামের সবকটা গান প্লেলিস্টে গুঁজে লেপের তলায় চাপা পড়ে রইলাম। ইভনিং স্ন্যাক্সের ডাকে ঘুম ভাঙতেই দেখি সন্ধ্যে নেমে গেছে, আর কাকতালীয়ভাবে অখিলবন্ধু গেয়ে চলেছেন, “সেদিন চাঁদের আলো চেয়েছিল জানতে…”।

এই চটকপুর জায়গাটা এলাম দেখলাম আর চলেগেলাম টাইপ নয়, বুঝলেন? ক’দিন থাকতে হবে। জায়গাটার পরতে পরতে লুকিয়ে আছে শীতল স্নিগ্ধতা। কিন্তু আমার কেন জানিনা এসে থেকেই বাড়িবাড়ি মনকেমন! “নাহ্ কালই পালাব” টাইপ কিছু একটা মনেমনে ডিসাইডেড। ভাবনা মোতাবেক আটটায় রাতের খাবার খেয়েই সকাল সাড়েপাঁচটার অ্যালার্ম। রাত ন’টার আগে শুয়ে পড়ে ভোর পাঁচটা পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকতে গেলে যে ট্যালেণ্ট প্রয়োজন তা আমার নেই। চারটেতেই ভেঙে গেল ঘুম। কিন্তু ভালোকরে আলো না ফুটলে বেরনোটা উচিৎ হ’বেনা ভেবে মটকা মেরেই পড়ে রইলাম।

বাইকের ঢাকনাটা সরাতে গিয়ে দেখলাম পাতলা বরফের আস্তরণ পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ রোদ না উঠলে রওনা দেওয়া মানে বিপদ। তিননম্বর ছবিটা দেখলে বুঝতে পারবেন এই পাতলা বরফ মোটরসাইকেলের জন্য কতটা বিপজ্জনক। তার ওপর উৎরাই পথ। রাতে এ’বাড়ির বড়ছেলে আমায় কার্শিয়ং পৌঁছনোর পথ বলে দিয়ে গেছে। গুগলম্যাপ সোনাদা হয়েই শিলিগুড়ির হদিশ দিলেও, আমি ও’পথ আর কক্ষণও মাড়াতে চাইনা।

-“ব্রেকফাস্ট করকে zaiয়ে। আট বze তক হো zaয়েগা।”
-“আরে নেহি নেহি, হামে দের হো জায়েগি। ছোড় দিজিয়ে।”
-“তো আভি এক ওয়াইওয়াই বনা দু আপকো?”
(সত্যি, এই আতিথেয়তাগুলোই হোমস্টে শব্দটাকে সার্থক করে তোলে।)
-“ফরেস্ট সেকপোস্টসে zo রস্তা বাঁয়ে ঘুম গয়া, উহাসে নিকল zaইয়ে। হর্ণ বzaতে বzaতে zaইয়েগা। zoঙ্গলকা রস্তা, zaনবর নিকল সকতা হ্যায়। থোড়া দেরসে নিকলিয়ে, থাপাzi উসি রস্তে আয়েঙ্গে আz, তকলিফ হোনে সে হেল্প হো সকতা হ্যায়।”

বেশ কয়েকবছর হয়ে গেছে আমি হর্ণ বাজাইনা। প্রাণের দায়ে হর্ণ দিতে হবে ভেবে মনটায় কেমন যেন একটা ধাক্কাই লাগল। হর্ণের সুইচটা টিপে দেখলাম বাজলনা। ছানবিন করে দেখতে পেলাম কবে যে তারটা কবে ছিঁড়ে খুলে গেছে টেরই পাইনি। অনুভব করলাম, একটা ছেঁড়া তার অন্য একটা তারকে ছিঁড়ে যেতে যেতেও বাঁচিয়ে দিলো।

সাতসতের ভাবতে ভাবতে সাড়ে সাতটায় রওনা দিয়েই দিলাম। ফরেস্ট চেকপোস্টে কোনও লোক ছিলনা যে একটু কনফার্ম হয়ে নেব ঠিক পথে যাচ্ছি কিনা। ভাগ্যের ভরসাতেই বেছে নিতে হ’ল কার্শিয়ং-এর পথ। মিথ্যে বলবনা, পথটা ধরে কিছুটা এগোতেই একটা ভয় চেপে ধরল। টানা একটা ঘণ্টা এমন একটা পথ দিয়ে বাইক চালাতে হ’ল যেখানে একটাও মানুষ দেখিনি। সেটাও বড় কথা নয়,এমনটা আগেও হয়েছে। কিন্তু পথের চেহারা দেখে ঠাহর করতে পারছিলাম যখনতখন জন্তুজানোয়ারের মুখোমুখি হতে পারি। ভয়টা বাড়তে থাকল। স্বীকার করে নিচ্ছি, যদি হর্ণের তারটা জোড়া থাকত তাহলে হয়ত প্রাণের দায়ে বাজিয়েই ফেলতাম।

গতকাল সকাল সাড়েসাতটায় চটকপুর থেকে রওনা দিলাম। ঘাসের ওপর যে সাদা আস্তরণ দেখতে পাচ্ছেন এটাকে ‘ভ্যারগ্ল্যা’ (Verglas) বলে। পাহাড়ে বাইক চালানোর অভিজ্ঞতা যাঁদের আছে তাঁরা জানেন এটা কতটা বিপজ্জনক। মনের জোরে বেরিয়ে পরলাম। জঙ্গলের পথ পেরিয়ে যখন কার্শিয়ং-এর কাছাকাছি পৌঁছেছি, ততক্ষণে আমার হেলমেটের ক্যামেরার ব্যাটারি শেষ। সকালে জার্ণি শুরু করার আগে একটা পি-টি-সি শ্যুট করতে গিয়েই অনেকটা ব্যাটারি খরচা করে ফেলেছি, তাই কার্শিয়ং-এর পরের উৎরাই পথের ছবি তোলা হয়নি। চা-বাগানের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা এত সুন্দর পথটার ছবি দিতে পারলামনা বলে আমি ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।

সাড়ে ন’টা নাগাদ মাটিগাড়া পৌঁছে ভাবলাম স্পার্কপ্লাগ দুটো পরিষ্কার করিয়ে নিই। গত দু’দিন বেশিরভাগ সময়ই গাড়িটা ফার্স্ট গিয়ারে চলেছে। আবার চালানো শুরু করে এই থামবো এই থামবো করে ইসলামপুরে এসে একটু বেলা করেই জলখাবার সারলাম। দু’চারটে ছিনতাইয়ের ঘটনা শোনার পর থেকে রসখাওয়া-ধানতোলার পথটা অ্যাভয়েড করে ডালখোলা দিয়ে যাওয়াটাই ঠিক মনে হ’ল। সে নাহয় একটু বেশি সময়ই লাগল। বাইকের হাতলে মোবাইলটা লাগানো থাকে, গাড়ি আটকে ওটা হাতিয়ে নিলেই আমি কানা। নাউএডেজ, মানিব্যাগ নিয়ে নিলেও মোবাইল দিয়ে চালিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু মোবাইল নিয়ে নিলে মানিব্যাগ দিয়ে চালাতে পারবেননা।

টার্গেট ছিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফারাক্কার ব্রিজটা ডিঙোতে হবে। সময়ের এই আকালের বাজারে জ্যামে আটকানোটা বড় দুর্ভাগ্যের। মাঝে একবার নেটে ফারাক্কা লজের রিভিয়্যুটা দেখে ভালোই লাগলো। আজ রাতটা তাহলে ফারাক্কা লজেই। দেখলাম আলো থাকতে থাকতেই পৌঁছে গেছি। ভাবলাম আরেকটু টেনেই দিই। এই সিদ্ধান্তটা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার লোভটাকে এতটা তাতিয়ে দিতে পারে ভাবিনি। সকাল সাড়েসাতটায় চটকপুর থেকে স্টার্ট করে সন্ধে সাতটায় বহরমপুর, বাড় খাওয়ার একটা সীমা থাকা উচিৎ পিক্লু! এনার্জির একটুও ঘাটতি নেই তখনও, ভয় শুধু অন্ধকারের। যেখানে দাঁড়িয়ে এই সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলাম ঠিক তার বাঁহাতেই একটা হোটেল। ঢুকে গেলেই ডিমতড়কা দিয়ে গরমগরম রুটি সাঁটিয়ে ঘুমোব, আর যদি বাড় খেয়ে নিই তাহলে রাত একটার মধ্যে বাড়ি।

মনে পড়ে গেল, এনএইচ-থার্টিফোরের অনেকটাই এখনও ফোরলেন হয়নি, উল্টোদিকের গাড়ির আলো চোখে পড়ে গণ্ডগোল হ’তে পারে। অর্থাৎ বাড়-এর পরিবর্তে তড়কা-রুটিটাই অনেক স্বাস্থ্যকর।

কাল দুপুরে বাড়ি ফিরে বৌয়ের হাতের মাছের ঝোল আর ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। তাই বাড়ি ফেরার আপডেটটা দেওয়া হয়নি। পরশু মাটিগাড়া দিয়ে শিলিগুড়িকে বাইপাস করেছিলাম বলে হংকং মার্কেটটা হ’লনা। তাছাড়া অত সকালে মার্কেট খোলেওনা যদিও। বৌয়ের আদেশ অনুযায়ী মালদা থেকে রসকদম্ব নিয়ে নিলাম। আরও আদেশ ছিল, গণেশের সীতাভোগ-মিহিদানা আর শক্তিগড়ের ল্যাংচা। যেহেতু পরশু রাতে বহরমপুরে থেকে গেলাম তাই বর্ধমানের মিষ্টি ক্যানসেল। তাতে কি আর রেহাই আছে মশাই। ধুবুলিয়া থেকে ক্ষীরসাগর তুলে নিতে হ’ল। সঙ্গে কেশরভোগও নিয়ে নিলাম দশখানা। মাক্কালীদ্দিব্বি, কেশরভোগটা যদি আপনাদের খাওয়াতে পারতাম! উফফ্! দাঁড়ান, এখানেই শেষ নয়। আমায় একেকটা ট্রিপ অনেক দাম দিয়ে কিনতে হয়। কোনওটা বালুচরি দিয়ে তো কোনওটা সম্বলপুরী দিয়ে। কাজেই ছ’সাতশ টাকার মিষ্টি মানে অনেক সস্তায় ডিলটা হচ্ছে, বুঝলেন? কৃষ্ণনগর পৌঁছেই নেধেরপাড়ায় ঢুকে গেলাম। জানি এটায় ঢুকলে একটা রেলগেট এক্সট্রা পোহাতে হবে, তবুও বৌয়ের আদেশ শিরোধার্য। অধর থেকে হাফকিলো সরপুরিয়া লোড করে নিলাম। একটা সত্য আমি মেনে নিয়েছি বস, বিবাহিত মানুষ হয়েও লাইফে এরকম একটা ব্যাচেলার ফ্লেভার ধরে রাখতে গেলে বউকে প্রচুর ঘুষ দিতে হবে।

ছবি: লেখক