হাণ্ড্রেড-টি-এই ভুলটিই বয়ে বেড়াচ্ছি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

সুব্রত গোস্বামী

এক.

ভেবেছিলাম শক্তিগড়ে এসে সকালের জলখাবারটা সারবো। সাতটায় পৌঁছে দেখি তখনও আধঘণ্টা লাগবে তাদের খাবার তৈরি হতে। অগত্যা আবার চলা শুরু করলাম। বর্ধমান ছাড়িয়ে অনেকটা এসে একটা দোকানে গরমগরম কচুরি খেয়ে নিলাম। ছ’পিস! আবার রওনা দেব এখন। সম্ভব হ’লে আজই শিলিগুড়ি, নাহলে ইসলামপুর।সাড়ে চোদ্দ ঘণ্টার সফর সেরে, দুটো রাজ্যের বারোখানা

সেলফি

জেলায় চাকার পরশ মাখিয়ে আমার বাইকটা আমায় শিলিগুড়ি বয়ে নিয়ে এলো। প্রথমবার এইপথে এসে প্রথমরাত রায়গঞ্জে কাটিয়েছিলাম। যেহেতু তিনজনের দল ছিলো, সময়ও বেশি লেগেছিলো। গতমাসে যখন একা এলাম, দেখলাম রায়গঞ্জে বেলা তিনটের মধ্যেই পৌঁছে গেছি! তাই ইসলামপুর পর্যন্ত এগিয়ে এসে সেদিনের মত হল্ট করলাম।

আজ সকালে শক্তিগড়ে একদল বাইকারের সঙ্গে হাসি বিনময় হওয়ার পর কথায় কথায় জানতে পারলাম আমি রায়গঞ্জের পরে যে’পথটা ধরি সেটা বিকেলের পর তেমন নিরাপদ নয়। মানে বোতলবাড়ি দিয়ে বেঙ্গলটুবেঙ্গল। ছিনতাই টিনতাই হয়। বললো, “তারওপর আপনি সোলো রাইড করছেন, টিম থাকলে অন্যকথা”। ভেবে দেখলাম ছেলেগুলো কথাটা মন্দ বলেনি। শীতকাল, সূর্যও তাড়াতাড়ি ডুবে যাবে দেখে আর রিস্ক নিলামনা। অতএব ডালখোলা। কিষাণগঞ্জ হয়েই ব্রুম্ব্রুম্‌। ইসলামপুর পৌঁছে ভাবলাম আর ঘণ্টা দুয়েক বরং টেনেই দিই। এর আগে কোনওদিনও আমি একদিনে এতটা বাইকিং করিনি।

৬০৫ কিলোমিটার চালাতে হলো আজ শিলিগুড়ি পৌঁছতে গিয়ে। পৌনে-আটটায় হোটেলে ঢুকে গেলাম। যদিও রাতে হাইওয়েতে বাইক চালানো আমার অভ্যেসে নেই, এমনিতে চোখে কম দেখি, তারওপর অন্ধকার পথ। তাই কাজটা খুব একটা উচিৎ হয়নি আমার।

হ্যাঁ, যেটা বলতে এতসব কপচাচ্ছি। মাসখানেক আগে কাগজে পড়ছিলাম, রাহুল বাজাজ নাকি বলেছেন তাঁর ব্যবসায় জীবনের সবথেকে বড় ভুল হলো ডিসকভার হাণ্ড্রেড-টি। এই বাইকটি নাকি তিনি লঞ্চ না করলেই বুদ্ধিমানের কাজ করতেন। সৌভাগ্যক্রমে তিনি যে ভুলটি বয়ে বেড়াচ্ছেন, সেই ভুলটিই আমায় গত পাঁচবছর ধরে বয়ে বেড়াচ্ছেন। এবং এমনভাবে বয়ে বেড়াচ্ছেন…।

রিনচেনপঙ

রিনচেনপঙ জায়গাটায় লোকজন খুববেশি একটা আসেনা। পাশেই কালুক। সেখানেও একই ব্যাপার। এলেন, চারবেলা গেলাকোটা করলেন আর পায়ের ওপর পা তুলে সাদা পাহাড়চূড়োগুলোর দিকে তাকিয়ে রইলেন, ব্যাস এইটুকুই। দার্জিলিং গ্যাংটকের মত সাইট-সিয়িং টিয়িং খুঁজতে গেলে হবেনা। আছে বলতে ওই একটা ব্রিটিশ বাংলো আর একটা লেক। তারও আবার বিটকেল নাম, ‘পয়জন’। গাড়িতে ঘণ্টাখানেক পাড়ি দিলে হি-গাঁও যেতে পারেন। সেখানে ছায়াতাল বলে একটা লেক আছে। আমি আগামীকাল যাব সেখানে। এই রিনচেনপঙের দুখানা লোকাল পয়েণ্টই নাকি হণ্টেড। হ্যাঁ, ব্রিটিশ বাংলো আর পয়জন লেক, দুটোতেই ভূত আছে। সত্যি বলতে গোটা রিনচেনপঙটাই নাকি ভূতুড়ে। যে হোটেলটায় আছি তার মালকিনটি বেজায় আলাপী মানুষ। গল্প করতে ভালোবাসেন। গল্পে গল্পে ভূতেরা এলেন। অন্তত খান পাঁচেক ঘটনা বললেন যেগুলোর উনি প্রত্যক্ষদর্শী। শুনলে আপনার ভয় পেয়ে যাবেন বলে আর বলছি না।

পয়জন লেকে নাকি মাঝেমাঝেই লোক মারা যায়। একজন জলে ডুবে মারা গিয়েছিলো কিন্তু ময়নাতদন্তে তার দেহে জল পাওয়া যায়নি। ব্রিটিশ বাংলোয় এক নববিবাহিত দম্পতি হানিমুন করতে এসে জেগে কাটিয়েছিলেন। হ্যাঁ, হানিমুন করতে এসে জেগেই কাটাবেন এটা স্বাভাবিক কিন্তু তারা ভূতের ভয়ে জেগে কাটিয়েছিলেন। সারারাত চেয়ার টেবিল আলমারি নাকি জায়গা বদল করেছিলো! একবার একটা দল শ্যুটিং করতে এসেছিলো। ক্যামেরার লেন্স দিয়ে দেখলে নায়িকার পাশে প্রচুর লোক দেখা যাচ্ছিলো। লেন্স থেকে চোখ সরিয়ে খালি চোখে দেখলেই ভূত উধাও। এগুলো ভুত নয়তো কী মশাই?

রিনচেনপঙে যেখানে আছি সেখানকার ডাইনিং রুম

এইসব শুনতে শুনতে আমি দ্বিপ্রাহরিক আহার সারলাম। ভাত ডাল আলুভাজা মাছের কালিয়া চাটনি। বড় ভালো খেলাম। একটু আগেই ভাগের ইভনিং স্ন্যাক্স মেরে দিয়েছি। মোমো আর কফি। সেটা খেতেখেতেই বাড়িতে ফোন করে গল্পগুলো বললাম। বউ বলল, “হ্যাঁ, পাহাড়ের লোকেরা খুব ভূতে বিশ্বাস করে। দেখো না, জায়গায় জায়গায় ওই পতাকা লাগানো থাকে? ওগুলোতো ভূত তাড়ানোর জন্যই।” মনে পড়ল দুপুরে হোটেলের পাশে পতাকার ছবি তুলেছি। যাক একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হওয়া গেল, পাশেই ভূতপতাকা আছে। অতএব আমাকে কেউ ভয় দেখাতে পারবে না। হা হা হা।

আজকের প্ল্যানটা যেন কেমন গোলমাল হয়ে গেল! নীচের ছবিতে পথের যে চেহারা দেখছেন, ওটাই তার কারণ। ভেবেছিলাম রিনচেনপঙ থেকে সকালে রওনা দিয়ে হিগাঁওতে ছায়াতাল দেখে পেলিং হয়ে খেচিপেরি লেক তারপর আবার ব্যাক করে উত্তারেতে এসে রাত্রিবাস। সিনশোর ব্রিজটাও আবার একবার দেখা হয়ে যাবে। রিনচেনপঙের হোটেল আমার বায়না মেনে সকাল সাড়ে ছ’টায় আমার পাওনা ব্রেকফাস্টও আমায় দিয়ে গেছে। গরমগরম আলুর পরোটা। রওনা দেওয়ার বেশ কিছুটা পর এরকম পথ শুরু হলো। ছবির মত। আরে বাবা ছবির মত বলতে নীচের ছবির মত। খানিক চলার পর সন্দেহ হলো! “ঠিক পথে আসছি তো! উত্তারে যারা যায় সবাই এই পথ দিয়েই যায়! না না এ হ’তে পারেনা।” পথে জনমানব নেই। বাইক থামিয়ে একটা বাড়িতে ঢুকলাম। দুটো বাচ্চা। ওদের আধোআধো নেপালি ভাষায় যা বুঝলাম যে ওদের মা বাড়িতে নেই, কাঠ আনতে গেছে। গুগলমম্যাপকে বিশ্বাস না করে, ব্যাক করলাম। কিছুটা এসে আরেকটা বাড়িতে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম এটাই পথ এবং আরও খানিকটা এমনই। তাদের কথা শুনে আবার চলতে শুরু করলাম ছায়াতালের পথে। এখানে গুগল আমায় একটু বিভ্রান্তই করেছে আজ। ছায়াতাল ছেড়ে তিন চার কিলোমিটার দূরে নিয়ে গিয়ে আমায় বলেছে “এই নে তোর ছায়াতাল”। অগত্যা আবার পিছনে চলা। ছায়াতাল এলাম। যতটা খেটেখুটে এলাম তেমন ভালোকিছু নয় বলে আরও মনখারাপ কয়ে গেল। কী আর করা? প্ল্যানমাফিক এবার খেচিপেরি।

রিনচেনপঙের হোটেলের বিছানায় বসে এনাদের দেখতে দেখতে

বেশকিছুটা চলে আসার পর মনে হ’ল সাড়ে ন’টা এখানেই বেজে গেছে, উত্তারে ফেরা চাপ হয়ে যাবে তাই সিনশোর ব্রিজ হয়ে উত্তারেটা ছুঁয়েই নাহয় খেচিপেরি চলে যাই। মনেমনে প্ল্যান বদলে রাত্রিবাস পেলিং-এ ঠিক করে নিলাম। আবার সাড়ে ছ’কিলোমিটার ব্যাক। আজ এই আগুপিছু করতে করতেই দিন গেল। না এখানেই শেষ নয়। উত্তারেতে ইতিউতি ঢুঁ মেরে যখন খেচিপেরি লেকের উদ্দেশে রওনা দিলাম গুগল বলল পৌঁছতে বেলা বারোটা চল্লিশ বাজবে। মানে লেক ঘুরে পেলিং-এর হোটেলে আমি তিনটেয় ঢুকে যাব। কিন্তু সুমন চট্টোপাধ্যায় লিখেছিলেননা, “একেকটা দিন মসৃণ…” একদম তাই। একেকটা দিন সত্যিই এবড়োখেবড়ো হয়। সব যেন গড়বড় হ’তে থাকে। পেলিং ছাড়িয়ে অনেকটা এসে যে পথটা ভাগ হয়ে একটা ইউকসামের দিকে চলে যাচ্ছে আর সোজাটা খেচিপেরি লেকের দিকে আসছে সেই সোজা পথটায় কাজ হচ্ছে তাই বন্ধ। যেখানে আর কিছুক্ষণের মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছিলাম সেখানে পড়লাম কেলোর মুখে। অন্যপথ, যা কিনা গুগলও এস্টিমেট করতে পারছেনা। ভুলভাল দেখাচ্ছে। বাইশ কিলোমিটার বাকি আর সময় দেখাচ্ছে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। এবং অদ্ভুতভাবে চলতে চলতে কিলোমিটার কখনও কমছে কখনও বাড়ছে। অথচ সময় সেই পঁয়তাল্লিশ মিনিটেই আটকে! সবথেকে বড়কথা যে পথটা দিয়ে চলেছি সেটা ম্যাপে দেখাচ্ছেনা। একটা রাস্তা যতই খারাপ হোক, ম্যাপের অযোগ্য কীকরে হয়ে গেল কে জানে! অ্যারোটা অর্থাৎ আমার গাড়িটা ফাঁকা জায়গা দিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছে। আশার কথা একটাই, যে ডেস্টিনেশান পয়েণ্টটা দেখাচ্ছে। আর অন্য গাড়িগুলো এই পথেই ফিরছে দেখে একটা ভরসা পাচ্ছি।
দুপুর দু’টো পাঁচ। এসে পৌঁছলাম লেকে। এবার শুরু হ’ল অন্য ভাবনা। এই পথেই ফিরতে হবে তাই লেক দেখে লাঞ্চ করে পেলিং ফিরতে ফিরতে সাড়ে পাঁচটা বাজবেই। অন্ধকারে এইপথে আমি চালাতে পারবনা। তাই আবার প্ল্যান বদল। বাইকিং-এর এই এক সুবিধে। যখন খুশি প্ল্যান চেঞ্জ। অতএব খেচিপেরিতেই থাকব। কিন্তু আমি ভাবলেই তো হ’লনা। থাকতে গেলে হোটেল চাই। অবশেষে খুঁজেখাঁজে একটা থাকার জায়গা পেলাম। ভালোকিছু নয় কিন্তু আজ এটাই মেনে নিতে হবে। ওই যে, সুমন বলেছিলেন না, “একেকটা দিন ঝড় ওঠে.. ডানা ঝাপটায় পাখি বন্ধ খাঁচায়।”(চলবে)

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]