হাতের মুঠোয় সময়ের শুকিয়ে যাওয়া গোলাপ

সময় এক আশ্চর্য সমন্বয় প্রক্রিয়া। কাটাছেঁড়া, ব্যর্থতা, সফলতা, আনন্দ, বিষাদ, হেরে যাওয়া, জিতে যাওয়া-কতকিছুই যে জুড়ে রাখে সময়! সূর্যকে আরেকবার গুনে গুনে প্রদক্ষিণ করলো পৃথিবী, তিনশ পয়ষট্টি দিনের প্রায় পুরোটাই শেষ হবার মুখে। আরেকটা বছর আমরা পেছনে ফেলে যাচ্ছি। এগিয়ে আসছে নতুন সময়, আসছে নতুন প্রেক্ষাপট। এবার বদলে যাবে ক্যালেন্ডার। বদলাবে চায়ের ব্র্যান্ড, পারফিউম, হাসি, পোশাকের রঙ, এমনকি লিপস্টিকও।বদলপ্রয়াসী সময়!

আচ্ছা, সময় কাকে বলে? সময় আসে কোত্থেকে? বছর ফুরিয়ে সময় যায়-ই বা কোথায়?

একবার বসে ভাবি তো তিন’শ পয়ষট্টির ছক কাটা এই ঘর লুডোর দানে ছক্কা ফেলে না হয় এগিয়ে গেলাম, যেমন যায় সবাই বলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এগোয়? ঘড়ির কাটা টিক টিক করে, বারান্দায় বুলবুলি আসে, কাকের বদলে কোকিল ডাকে, শীত বদলে বসন্ত। তারপর? আবার তো সেই চক্কর। অফিস, বাসা, বাস, ভীড়, কম দামে আলু, মূলা, সীম, চুপসানো ইলিশ শীতের কুয়াশামাখা রাতে। ‘ফাঁকে খানিকটা প্রেমকে জায়গা না দিলে চলে না’, চায়ের দোকানের বেঞ্চে বসে মন্তব্য ছুঁড়ে দেয় নিলু। তাই ! বছর ঘুরে সময় ফুরিয়ে ফেললেও প্রেমের পেছনে ছোটার কোনো শেষ নেই। ‘প্রেম চে গুয়েভারার মতো। বদলায় না। যতো যাই বলেন চে গুয়েভার যৌবন যেমন ফুরায় না, প্রেমেরও না। পাশ থেকে আবার কথা জুড়ে দেয় নিলু। ভাবি, কথা সত্য। কিন্তু যে দেশে আলুর কেজি চল্লিশ টাকা সেখানে চে সাহেবের যৌবন দেখার সময় কোথায় আমাদের? সেই ঘুরেফিরে আবার সময়ের প্রসঙ্গ ফিরে আসে। হাতের মুঠো খুলে দেখি শুকিয়ে গেছে একটি গোলাপ। আমার কাঁধে হাত রাখে সময়। বলে-আমি কিন্তু তোমাকে ফেলে কোথাও যাই না।সময় আসলে আমাদের সঙ্গেই থাকে। আমরাই নানা ঘাত প্রতিঘাতের ভেতর দিয়ে সময়কে সাজাই।

ওই যে বলছিলাম, সময় আসলে সমন্বয় প্রক্রিয়া। জড়িয়ে প্যাঁচ খেয়ে থাকে। আমরা ভাবি সময় চলে গেলো। কিন্তু সে যায় না। শুধু আমাদের স্মৃতির উপরে ধূলো জমে।

কত যে ঘটনা একটা বছরের ফ্রেম জুড়ে। মৃত্যু আছে, আনন্দ আছে, যুদ্ধ আছে, শান্তি আছে, বেদনাও আছে, আছে আন্দোলনও। আন্দোলনের কথায় মনে পড়লো #MeToo-এর কথা। ঝোড়ো বাতাসের মতো নারীদের প্রতিবাদ নাড়িয়ে দিলো এ বছর পৃথিবীর মানুষকে। যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে এসে নারীরা জানালেন তাদের অভিযোগ। হলিউড থেকে বলিউড হয়ে আমাদের বাংলাদেশও ছুঁয়ে গেলো সেই উত্তাপ আর প্রতিবাদের আগুন।

উত্তাপ ছড়িয়েছিলো বছরের মাঝামাঝি সেই চিরকালের চর্মনির্মিত গোলকটি, মানে ফুটবল। বিশ্বকাপ ফুটবল গোটা পৃথিবীর ফুটবল পাগল মানুষদের দুঃখ বেদনা ভুলিয়ে রেখেছিলো এক মাস। ফুটবল জ্বর মানুষকে বিভেদ থেকে সরিয়ে এনে এককাট্টা করেছিলো খেলার প্রেমে। ব্রাজিল বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়ার পর আমাদের এই দোকানের শামসু আপনার চায়ে চিনি কম দিয়েছিলো না? পাশ থেকে ফোড়ন কাটে নিলু। আমি হাসি। সে তো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আর উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন যুদ্ধ প্রায় বাঁধিয়েই দিয়েছিলো এ বছর।এসব তো সব খেলার স্বার্থে খেলা।

এ বছর আলোচিত একটা বিয়ে ছিলো রাজবাড়িতে। বাকিংহাম প্যালেসের বিয়ে। রাজপুত্র হ্যারি দুম করেই বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন চলচ্চিত্র অভিনেত্রী মেগান মারকেলের সঙ্গে। চারদিকে হৈ চৈ। রাজপরিবারে অভিনেত্রী! কিন্তু ওই যে শুরুতে নিলু বলছিলো, প্রেম হচ্ছে চে গুয়েভারার মতো একরোখা। এই বিয়ে নিয়ে অনেক শংকা থাকলেও তাদের শক্তিশালী ভালোবাসা সব শংকা আর গুজবের বেলুন ফুটো করে দিয়ে মিলনের সিঁড়ি পেয়ে গেছে।

অক্টোবর মাসে বেশ বড় আকারের সামুদ্রিক ঝড় তছনছ করে দিয়েছে মেক্সিকো উপকূল আর আমেরিকার ফ্লোরিডা রাজ্য।

এ বছর আমাদের পৃথিবীর একমাত্র প্রেমিকা চাঁদ অনেকবার সংবাদের শিরোনাম হয়েছে।‘সুপার মুন’ নিয়ে মানুষের উৎসাহ ছিলো চোখে পড়ার মতো। এই ঢাকা শহরে তো বাঁশবাগান নেই। বাঁশবাগানের মাথায় চাঁদও ওঠে না। উঁচু উঁচু বাড়িঘরের মাথায় চাঁদ ওঠে! নিলুর কথা শুনে ভাবি, তাই তো! ইট কাঠ আর কংক্রিটের এই জঙ্গলের মাথায় তো চাঁদে উদিত হয়। আর সে চাঁদ দেখা নিয়ে ছিলো আমাদের কনে দেখা আকূলতা।তবে শুধু চাঁদের সৌন্দর্য নিয়ে আমাদের মুগ্ধ থাকতে দেয়নি প্রকৃতি। নানা দেশে ঝড় হয়ে বয়ে গিয়ে প্রকৃতি তার রাগ প্রকাশ করেছে। হয়েছে অকাল বন্যা। নড়েচড়ে উঠেছে পৃথিবীর মাটি ভূমিকম্পে।বছর শেষে বহু মানুষের প্রাণ গেছে সুনামির আঘাতে।

আমাদের জীবনের পথে শোকও একটি বড় অধ্যায় হয়ে থাকে। নতুন সময়ের আশায় আমরা ভুলে থাকতে চেষ্টা করি সেই শোকের অধ্যায়গুলো।

বইপত্রের পৃথিবীও এ বছর নড়ে বসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিন্টনের লেখা বই নিয়ে। না, আত্নকথা লেখেননি তিনি। ‘প্রেসিডেন্ট ইজ মিসিং’ নামে একটি থ্রিলার লিখেছেন যৌথ উদ্যোগে। তার সহলেখক জেমস প্যাটারসন। সাইবার সন্ত্রাসের আতঙ্ক নিয়ে এই উপন্যাসে গল্প ছড়িয়েছে ডালপালা। বইটি বেস্ট সেলারের তালিকায় রয়েছে। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সভা থেকে রাজনৈতিক ঝগড়ায় ছিটকে পড়া দুজন সহচরও বই লিখে পাঠকে মহলে আলোড়ন তুলেছেন।

বছরের একেবারে শেষ প্রান্তে এসে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা ছবি দেখিয়েছেন মঙ্গল গ্রহে বরফ ভর্তি গহ্বরের। চমকে ওঠার মতো ছবি। নিলুও খবরটা শুনে চমকে উঠেছিলো। তাহলে কি অজানা মহাকাশে মানুষের দেখা মিলতে পারে? সেখানে কি বহু বহু বছর আগে ছিলো প্রাণের অস্তিত্ব? নিলুর প্রশ্নের উত্তর নেই এখন পর্যন্ত। তবে আমরা চায়ের দোকানে বসে গল্পের চিনাবাদাম ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে ভাবতেই পারি সেই অদেখা সময়ের কথা।

পৃথিবীজুড়ে কত ঘটনা, কত গল্প। ক্যালেন্ডারের বারোটা পাতা উল্টে যে সময়ের ভ্রমণ আমাদের তার মাঝে কত বিস্ময়ই তো লুকিয়ে থাকে।ঘটনার পর ঘটনা আমাদের বিস্মিত করে, অবাক করে। আমরা ভাবি এমনটাও ঘটে! তারপর ঘটনাগুলো স্মৃতি হয়ে জমা হয় ঝুলিতে। তারপর এক সময় স্মৃতির ওপর ধূলো জমে। ভুলে যাওয়ার হাওয়া আসে। আমরা ভুলে গিয়ে আবার অপেক্ষা করি সময়ের অন্য উদ্দীপনার জন্য।

কথায় কথায় রাত বাড়ে। হাই তুলে আমি আর রন্টু রওনা দিই বাড়ির দিকে। এতোক্ষণ চয়ের দোকানের বেঞ্চের পাশে বসে থাকা কুকুরটিও উঠে আমাদের সঙ্গে রওনা হয়। আবার আরেকটি নতুন বছরের জন্য অপেক্ষা। বিদায় ২০১৮। স্বাগতম ২০১৯।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া
ছবিঃ গুগল, প্রাণের বাংলা