হাতের লেখায় মননশীলতা

বিশিষ্ট শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখবেন তার জীবনের কথা।কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো। পড়ুন কাটাঘুড়ি বিভাগে।

কনকচাঁপা

 ক্লাস ফাইভ এ পড়াকালীন সময় পড়ার এতো চাপ বেড়ে গেলো, পড়ে এবং লিখে কুল পাচ্ছিলাম না।হাতের লেখার অবস্থা খুবই খারাপ।খুবই বিপাকে পড়লাম।অথচ আমার পুরো মানে পিছনের তিন পুরুষ এর যত শিক্ষিত মানুষ ছিলেন সবার হাতের লেখা ঝকঝকে। আমার দাদাভাই জলপাইগুড়ি জিলা স্কুলের শিক্ষক ছিলেন,তার অত্যাশ্চর্য হাতের লেখার খেরো খাতা তখন আমার হাতে।আর নানাভাই গোঁসাই বাড়ি হাইস্কুলের সহকারী প্রধান শিক্ষক। ওনার কাছে প্রায়শ:ই আমি পড়ালেখা করি এবং উনার হাতের লেখায় মুগ্ধ হই।আমার দাদীমার হাতের লেখাও ঝকঝকে।মায়ের হাতের লেখাও অপূর্ব। আর আব্বার হাতের লেখার কথা কি বলবো! হাতের লেখা তো নয়,আঁকা ছবি যেন! কতরকম হরফেই না আব্বা লিখতে পারতেন! সাইনবোর্ড যারা লেখে তারাও কোন অবসরে আব্বার কাছে অক্ষরের আঁক বাঁক শিখে যেতেন।আব্বার অফিসের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার সার্টিফিকেট আব্বা লিখে দিতেন। তো সেই ঘরের কন্যা আমি, আমার হাতের লেখা কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যং,আব্বা আম্মা ভর্ৎসনা করার আগেই আমি লজ্জিত।নিজেই নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা শুরু করে দিলাম।বেছে নিলাম বন্ধু আফরিনের হাতের লেখা,নকল করা শুরু করলাম। কয়েকদিন পর বুঝলাম আমি সফল হয়েছি কারন আমি নিজেই আর বুঝতে পারছিলাম না কোনটা আমার আর কোনটা আফরিনের হাতের লেখা।আমার সেই চেষ্টা সেখানে থেমে থাকেনি।হাতের লেখার দখল নিয়েই আমি ক্ষ্যান্ত দেইনি,চেষ্টা করেছি নিজের লেখায় নতুন স্টাইল আনতে,এবং আফরিনের লেখার চেয়ে অক্ষরগুলোকে অন্যরকম করে ফেলতে।এবং আব্বার লেখাতো কপি করা সম্ভব না কিন্তু অন্তত কাছাকাছি যেতে।চেষ্টা করছিলাম লেখার স্পীড বাড়িয়ে নিতে,লাইন সোজা করতে,এবং নির্ভুল বানান শিখতে।এবং শব্দ দখল বাড়াতে।শুধু বাংলা ইংরেজি গ্রামার শিখে আমার পোষাচ্ছিল না।আমি নিয়মিত আব্বা ও নানাভাইয়ের কাছে কঠোর অনুশীলন নিতে থাকলাম।আমার কষ্ট বিফলে যায়নি।আমার পরীক্ষার খাতায় তার ছাপ পড়লো। একটা পরীক্ষা শেষে স্কুলের হেডস্যার ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন,নানাভাইকে দেখতে চাইলেন।আমি একদিন আমার নানাভাই কে আমার স্কুলে নিয়ে গেলাম।তাঁরা নানাভাই যথাযথ সম্মান করলেন এবং আমার প্রশংসা করলেন।আমার জীবন আবার ধন্য হল।নানাভাই বাসায় এসে বললেন এভাবে যদি শিক্ষকদের আদর স্নেহ পেয়ে ভাল ভাবে পড়াশোনা করো তাহলে তোমার গানে আমার কোন আপত্তি নেই।আব্বা বেজায় খুশী হয়ে গেলেন।এখন তো ছেলেমেয়েরা হাতের লেখার দিকে মনোযোগই দেয়না।কিন্তু আমি জানি এই হাতের লেখা আসলে একান্ত ব্যক্তিগত মননশীলতা, রুচি, চরিত্রের ছাপ বয়ে বেড়ায়।একজন মানুষের দৈহিক মানসিক সুস্থতা এমনকি মনের গোপন ভাবনার ছাপ ও হাতের লেখায় পাওয়া যায়।তাই আসলে আমাদের এদিকে অনেক খেয়াল দেয়া উচিত।বিশেষ করে অক্ষর একটা নিজস্বতা পায় যাতে সে খেয়াল অবশ্যই রাখা উচিত।এই ব্যপারেও আমি আমার নানাভাই,আব্বা,এবং আমার বন্ধু আফরিনের কাছে কৃতজ্ঞ।এতো ভালো ভালো মানুষ জীবনের চলার পথে আলো করে নিতে পেরে আমি আসলেই ধন্য।আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখক