হাতে বোনা সোয়েটার আর…

ভোরবেলা ঘুম ভেঙে উঠে আজও কখনও চোখের সামনে তাকে দেখতে পাই। ঘন নীল সোয়েটার গায়ে, কোঁধে স্কুল ব্যাগ-সে স্কুলে যাচ্ছে। রিকশায় বসে শীতের হাওয়ায় উড়ছে তার চুল। বেইলি রোডে সারারাত গায়ে-গা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে শীত সামলানো গাছগুলো তখন আড়মোড়া ভাঙছে শীতের ফিনফিনে নীল বাতাসে। তাদের মাথার উপর ঝলমলে আকাশ। তখন শীত আসতো ক্ষাপা পাগলের মতো। শহর আর গ্রামের পাড়ায় পাড়ায় হুড়মুড় করে শীত ঢুকে পড়ে বলতো-ভাত খাবো ডিম ভাজা অথবা বাসি তরকারি দিয়ে। শীতের ধাক্কায় তখন সবাই শীতবস্ত্র উঠানে, বেড়ার ওপর অথবা ছাদে রোদ লাগাতো। আজও দেখতে পাই, সে ওইরকম ভয়ংকর ঠাণ্ডায় হাওয়া ভেদ করে স্কুলে যাচ্ছে। তার গায়ে হাতে বোনা ঘন নীল সোয়েটার। ‍

সুপারকুল হুডি, জ্যাকেট, ব্লেজার, অফ-শোল্ডার সোয়েটারের নামচিহ্ন তখন কোথাও ছিলো না। শীত আসার আগে থেকেই সোয়েটার বানানোর ধুম পড়ে যেতো বাড়িতে বাড়িতে। যখন তখন বারান্দায় দাঁড় করিয়ে গায়ে ছোট্ট এক টুকরো উলেবোনা কাজ ধরে মাপ নেয়া হতো আমাদের। আর অবিশ্রাম চলতো কারো আঙুলে ধরা দুটি কাঁটার ঘর গুনে এগিয়ে চলা। উলের দোকান, ডিজাইনের বই আর বিভিন্ন নম্বরের কাঁটা নিয়ে কতো তোলপাড়!

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো সেই হাতে বোনা সোয়েটার নিয়ে ‘হাতে বোনা সোয়েটার আর…’

ভোগ পত্রিকায় আরান সোয়েটার

কোথায় গেলো সেই উলের দোকানগুলো? উল বোনার কাঁটা এখন কেউ খুঁজতে যায় নিউমার্কেটে? দুপুরবেলা ছাদের রোদে কাউকে দেখা যায় না নিবিষ্ট মনে উল বুনে চলতে। চোখেই পড়ে না সোয়েটার বুনতে বুনতে ক্লান্ত আঙুল তুলে নিচ্ছে গরম চায়ের কাপ, জড়াচ্ছে শরীরে চাদর। সেই নিবিষ্ট বুনে যাওয়া থেকে তৈরি হবে হয়তো সোয়েটার অথবা বাঁদর টুপি, হাত মোজা। ‘আ টেল অব টু সিটিজ়’ উপন্যাসে আছে,- ফরাসি বিপ্লবের সময় প্যারিসের রাস্তায় বিপ্লবী জনতার হাতে নিহত অভিজাতদের কাটামুন্ডু নিয়ে শোভাযাত্রার সময় মাদাম দেফার্জ চরিত্রটি উল বুনতে বুনতে কাটা মাথার নিঃস্পৃহ গণনার কথা। বাড়িতে মা অথবা ফুপুরা মাদাম দেফার্জের মতো বড়লোকদের কাটা মুণ্ডু না-গুনলেও শীতের বেশ খানিকটা আগে থেকেই উল কাঁটার ঘর গোনার কাজটা শুরু করে দিতেন। সেগুলো ছিলো শীত আসার অনিবার্য চিহ্ন। ঘরে ঘরে সংসারের নানা গল্প আর কূটকচালিরর ঝাল গন্ধ মেখে সোয়েটারগুলো ধীরে ধীরে একটা কাঠামোয় দাঁড়িয়ে যেতে থাকতো।

এখনকার ব্যস্ত জীবনের শীতগুলো রেডিমেড দোকানের ঝকঝকে শো রুমের ম্যানিকুইনের শরীরে জড়ানো সোয়েটারে ঝাঁপ দিয়ে হারিয়ে যায়। শীতের দাপটের অনুপস্থিতি সেই দৃশ্যগুলোকেও্র উধাও করে দিয়েছে। শীত এখন পাঁচতারা হোটেল অথবা কোনো আলো ঝলমল রেস্তোরাঁয় স্টেকে কামড় বসাতে বসাতে, পানীয়র উত্তাপে তুমুল আলোড়িত হতে হতে হাঁসফাঁস করে।আর সঙ্গে দমবন্ধ হয়ে মরে যায় স্মৃতিও; হাতে বোনা সোয়েটারের স্মৃতি।

যে ছেলেটি স্কুলে যেত সেই কত বছর আগে তার পরনে হাতে বোনা সোয়েটার গল্প বলতো শীতের দিনের। সেই গল্পগুলো সস্তায় উল কেনার দোকানের, সেই গল্পগুলো উল কাঁটা নম্বর মিলিয়ে কেনার, সেই গল্পগুলো স্নেহ আর ভালোবাসায় জড়ানো। সেই ঘন নীল সোয়েটার সময়ের ধাক্কায় কত পথ পিছিয়ে গেলো! এ তো আসলে স্নেহ, মমতার গল্পগুলোরও পিছিয়ে যাওয়া। সেই কবেকার সোয়েটার সংসারের মমতা মেখে তৈরি হতো। আমাদের একান্নবর্তী পরিবারগুলোতে সেই সোয়েটার ভ্রমণ করতো জেষ্ঠ্যদের থেকে অনুজদের কাছে। মনে হতো, সোয়েটারগুলোর আয়ু বেড়ে যাচ্ছে প্রতি বছর। ওরাও গল্প শুনছে নতুন নতুন মানুষদের।

ইংল্যান্ডের কয়েকটি দ্বীপে হাতে বোনা ‘আরান’ সোয়েটারের এখন অনেক নামডাক। ফ্যাশন দুনিয়ায় উচ্চমূল্যে বিক্রি হয় এই সোয়েটার। কিন্তু ১৯৪০ সালে আটলান্টিকের এই দ্বীপগুলোর জেলেরা ঠাণ্ডা আর তীব্র হাওয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করতে প্রথম তৈরি করেছিলো এই সোয়েটার। এই সোয়েটারে প্রায় এক লক্ষ সেলাইয়ের ফোঁড় থাকে এবং বুনতে সময় লাগে দু’মাস। হলিউডের তারকা গ্রেস কেলী, স্টিভ ম্যাকুইন থেকে শুরু করে হালের তারকা মডেল ও অভিনয় শিল্পীরা পরিধান করেন এই বিশেষ ব্র্যান্ডের সোয়েটার। ১৯৫৬ সালে ফ্যাশন ম্যাগাজিন ‘ভোগ’-এর মডেলরা এই সোয়েটারের পরে ছবি তোলেন। আর তারপর থেকেই রাতারাতি আরান সোয়েটার বিখ্যাত। কিন্তু সেই স্কুলগামী বালকের কাছে তো সেই হাতে বোনা সোয়েটার আরানের চাইতেও বেশি মূল্যবান। তার স্মৃতির ভেতরে শীতের হাওয়ায় উড়তে থাকে নীল সোয়েটার অদ্ভুত সব গল্প নিয়ে। হাতে বোনা সোয়েটার পুরনো হয়ে কখনো কখনো রাস্তার ধারে শীতে কষ্ট পাওয়া ছেলেটির গায়েও উঠতো। সেই জীবনের শীতে ওই সোয়েটারের গল্পটাও কিন্তু একেবারেই আলাদা হয়ে উঠতো।

সম্প্রতি ইংল্যান্ডে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উলের নরম স্পর্শ মস্তিষ্কে সেরাটোনিন নামে এক ধরণের হরমোনের ক্ষরণ ঘটায়। এই হরমোন মন ভালো রাখতে সহায়তা করে। সহায়তা করে মানুষের হৃতস্পন্দ নিয়ন্ত্রণেও। কিন্তু এখন তো হাতে বোনা সোয়েটার ঘুমিয়ে পড়া এক অ্যালবাম। অনেকগুলো শীতের স্মৃতি বুকে নিয়ে হারিয়ে গেছে তারা। হারিয়ে গেছে শীতের ফিনফিনে হাওয়ায় শরীর ধোয়া  উজ্জ্বল আকাশ।পাগলের মতো ঝাঁপিয়ে পড়া শীত আটকাতে ভালোবাসা মাখা হাতে বোনা সোয়েটারের গল্প বোধ হয় ফুরিয়েই গেছে অনেকদিন আগে।

ইরাজ আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


https://www.facebook.com/aquagadget
Facebook Comments Box