হাত মোজা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

জহিরুল চৌধুরী

( নিউইয়র্ক থেকে): স্ত্রী দেশে গেলেন। হাটতে গেলাম প্রকৃতির কোলে। শুধু হাঁটা নয়, মনে হলো এবার উড়ি। স্বাধীনতারও সীমা আছে। স্বাধীন হয়ে আকাশে ওড়ার সুযোগ নেই। নেই ফড়িং হওয়ার মত পালকও। স্বাধীন হয়ে বেশি দূর ঝাঁপ দেয়ারও সুযোগও নেই। তাতে হাড্ডি ভাঙার ঘটনাও ঘটতে পারে!

একটু দেরিতে ঘুম ভাঙলেও সকালটা ছিলো আরামপ্রদ। সূর্যের কিরণ ঠিকরে পড়ছে জানালা ঠেলে। আবহাওয়ার এপ থেকে জেনে গেছি তাপমাত্রা ৮ থেকে ১০ ডিগ্রী পর্যন্ত উঠবে। শনিবার ছুটির দিন। কিছু জমানো কাজ আজ না করলেই নয়।

আমার একটি ছোট্ট ব্যক্তিগত লাইব্রেরি ছিলো বাড়িটিতে। অক্টোবর মাসে দেশে থাকার সময় স্ত্রী পুরো লাইব্রেরিটিকে কেটে স্লিম করে দিয়েছেন। আগামী মে মাসে ছেলেটি ১৪ বছরে পা দেবার সঙ্গে সঙ্গে এটি হবে তার নিজস্ব ঘর।

আগে ছিলো পুরো তিন দিকের দেয়াল জুড়ে, এখন মাত্র এক দিকের দেয়ালে লাইব্রেরি। ফলে প্রায় আটটি বাক্সে হাজার খানেক বই দান করার জন্য প্রস্তুত। বইগুলো বেছে আমি চারটি বাক্স স্থানীয় পাবলিক লাইব্রেরিকে দান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

বাকি চারটি বাক্সে শিশুতোষ বইগুলো আলগা করে রেখেছি। যুক্তরাষ্ট্রে এসে ইংরেজী বিদ্যা শুরু করেছিলাম ঐ বইগুলো পড়েই। কিছু বই কিনেছিলাম বইয়ের দোকান থেকে। আবার অনেক বই কিনেছি “গ্যারেজ সেল” থেকে খুব অল্প দামে। আমার সন্তানরাও সেগুলো পড়েছে। বাংলাদেশের যে কোনো স্কুলে সেগুলো দান করে দেব। (কেউ চাইলে ইনবক্সে যোগাযোগ করবেন)।

বাক্সগুলো গাড়িতে তুলে রওয়ানা দিলাম স্থানীয় লাইব্রেরির উদ্দেশে। আমাদের বাড়ির পাশে দুটো লাইব্রেরি। একটির নাম এড্রিয়েন্স, আরেকটি বোর্ডম্যান। আমরা এড্রিয়েন্সে যাই নিয়মিত। বহুতল লাইব্রেরি। ঢাকার কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির চেয়েও বড় এটি। এরা বই ডোনেশন নেয় সপ্তাহে মাত্র একদিন। কিন্তু বোর্ডম্যান নেয় সপ্তাহের প্রতিদিন।

বোর্ডম্যান লাইব্রেরিতে আগেও এসেছি বহুদিন। কিন্তু আজকের মত এমন উদ্দেশ্যে কখনো আসিনি। কিয়স্কে আলোচনা করে গাড়ি নিয়ে পার্ক করলাম পেছন দিককার একটি দরজার কাছে। সেখানে অশিতিপর এক মহিলা দরজা ঠেলে দাঁডিয়ে থাকলেন। আমি গাড়ি থেকে একেকটি বাক্স নামিয়ে রাখলাম। তিনিই বইগুলো বাছাই করে বিভিন্ন সেকশনে পৌঁছে দেবেন।

আমি আরো চারটি বাক্স আছে বলতেই ভদ্রমহিলা আঁৎকে উঠলেন। কারণ বাছাইয়ের বাড়তি বোঝা বইতে হবে তাকেই। লক্ষ্য করলাম- অসংখ্য বইয়ের বাক্স ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সর্বত্র। অবশ্য পাশেই বই বিক্রির কেন্দ্র। সেখানে তাকে তাকে সাজানো আছে ডোনেশন কেন্দ্রের সব বই। শক্ত মলাটের বই ২ ডলার, পেপার ব্যাক ১ ডলার।

বইগুলো নামিয়ে দিলাম। ঝটপট ছবিও তুললাম। হাতে পর্যাপ্ত সময়। এই সময়ে হাঁটবো। বোর্ডম্যানের চারপাশ আজ হেঁটে ঘুরবো। গাড়ি পার্ক করা থাকলো। লাইব্রেরি থেকে বেডিয়ে ডান দিকে হাঁটা দিলাম। হাতের ডানে ক্যানিয়ন পার্ক। সেখানে একসঙ্গে বয়স্ক ও শিশুদের ডে কেয়ার সেন্টার। অদ্ভুত সুন্দর তিনটি ভবন। কাঠের খিলান। শত বছরের পুরনো নিশ্চয়।

ডানদিকে আরেকটু এগোলে বৃদ্ধ নিবাস। অনেক বড়। নিশ্চয় কয়েক’শ লোক বাস করে। যুক্তরাষ্ট্রে বৃদ্ধ নিবাস বাড়ছে সর্বত্র। আমাদের এই হাডসন ভ্যালিতেই অন্তত দশটি নতুন বৃদ্ধাশ্রম হয়েছে গত পাঁচ বছরে। তার মানে বৃদ্ধের সংখ্যা বাড়ছে দিনদিন!

বৃদ্ধাশ্রম ঘুরে ডানদিকে এগিয়ে গেলে বাঁ দিকে পুকেপ্সি ডে স্কুল। এটি প্রাইভেট স্কুল। বড়লোকের সন্তানরা পড়ে। ছবি তুলতে যেয়ে জ্যাকেটের পকেট থেকে মাথালি আর হাতমোজা বের করে রাখলাম টেবিলের উপর। হায়! একটি মাত্র মোজা! জোড়ার বাকিটা নিশ্চয়ই ফেলে এসেছি রাস্তায়!

কতক্ষণ হাঁটলাম। মোবাইলের এপ জানিয়ে দিল ইতোমধ্যে সাড়ে তিন কিলোমিটার হেটে ফেলেছি। তার মানে মোজাটি পেছন দিকে খুঁজতে গেলে আমাকে আরো সাড়ে তিন কিলোমিটার পথ হাঁটতে হবে! মাত্র দেড় ডলার হিসেবে দুই জোড়া কিনেছিলাম।

শীত জাঁকিয়ে বসার আগেই গত সপ্তায় হারিয়ে ফেলেছি এক জোড়া পকেট থেকে। কাজেই জোড়ার বাকি একটা যে করেই হোক আমাকে খুঁজে পেতে হবে। মনে হচ্ছে বইয়ের বাক্স গাড়ি থেকে নামানোর সময় হাত মোজা খুলেছিলাম। তখন একটি পকেট থেকে পড়ে যেতে পারে। কাজেই হাটতে লাগলাম ঐ পথে।

আরো প্রায় এক কিলোমিটার হেটে ফেলেছি। পেছন ফিরে চলতে মন চাইছে না মোটেও। কিন্তু আমাকে হাঁটতেই হবে। এটিই আমার শেষ জোড়া। প্রতিবছর শীত আসার আগে মাথালি আর হাতমোজা কিনি। কিন্তু শীতের আগেই হারিয়ে যায়! অনেকেই চামড়ার দামিটা কিনে। আমি সস্তায় কিনি কয়েক জোড়া হারিয়ে যায় বলে।

ফেরার রাস্তা ধরে হাটছি। হঠাৎ মনে হলো প্যান্টের বাঁ দিকের পকেটটা ফোলা ফোলা। হাত গলিয়ে দেখি মোজাটি সেখানে লুকিয়ে আছে। তার মানে কাল নিউইয়র্ক সিটিতে যেতে আর কোনো বাঁধা নেই! আটলান্টিকের হিমেল হাওয়ায়ও খোলা আকাশের নীচে পথ চলতে পারবো।

ক’দিন আগে তুষার ঝর হয়েছিলো। সেই তুষার জমে বরফ হয়ে পড়ে আছে রাস্তার দু’পাশে। গত কতদিনের উষ্ণতায় বরফ অনেকটাই গলে গেছে। হাটতে হাটতে ৫ কিমি ছাড়িয়ে গেছি। পৌঁছে গেছি আওয়ার লেডি অব লর্ড ক্যাথলিক স্কুলের সামনে।

এতদিনের একটা ভুল ভাঙল আজ। এতদিন ক্যাথলিক স্কুল আর পুকেপ্সি ডে স্কুলকে একই স্কুল মনে করতাম। আজ দু’টির পৃথক ক্যাম্পাস আবিষ্কার করলাম। গাড়িটি রেখে এসেছি আরো দেড় কিলোমিটার দূরে। তার মানে আজ সাড়ে ছয় কিলোমিটার হেটে ৪’শ ক্যালোরি ধ্বংস করছি।

এরপর যেতে হবে আব্বাস ভাইয়ের টেইস্ট অব ইণ্ডিয়া রেস্তরায়। India নামের একটি বাণিজ্যিক মূল্য আছে। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা যুক্তরাজ্যে বহু বাঙালি দেশি খাবারের ব্যবসা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা রেস্তরাকে পরিচয় করিয়ে দেন ইণ্ডিয়ান নামে! এর থেকে মুক্তি মিলবে কবে?

সম্ভবত মশলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে ইণ্ডিয়ার নাম। আব্বাস ভাইয়ের রান্নার সুনাম অনেকের মুখে শুনেছি। স্ত্রীর রান্না না ফুরালে হয়তো আমার আসা হতো না।

হঠাৎ মনে হলো হাতমোজার কথা। জ্যাকেটের পকেটে হাত দিয়ে দেখি মোজা জোড়া এখনো আছে। জীবনটা হাত মোজার মতই। প্রয়োজনের সময় এটি ছাড়া চলে না। প্রয়োজন না হলে এর খবরও কেউ নেয় না।

ছবি: লেখক

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]