হারিয়েছে সেই ঘরের স্মৃতিও

ইরাজ আহমেদ

বাড়ির বসবার ঘরে থাকার অনুমতি পেলাম ১৯৭৮ সালে।ঘটনাটাকে মনে হলো ফিদেল ক্যাস্ট্রোর কিউবা জয়ের মতো। বসবার ঘরে বসার জন্য প্রয়োজনীয় আসনের আড়ালে এক কোণে একটা ছোট চৌকি আর মাথার কাছে পড়ার টেবিল, পায়ের কাছে জানালা। মনে হলো আমার রাত্রিগুলো স্বাধীন, দুপুরগুলো অশ্বারোহী। এই শহরে একতলা ভাড়াটে বাড়ি।সে বাড়ির প্রায় আলোহীন বসবার ঘরে স্বতন্ত্র অবস্থান লাভ বেশ অনেকটাই বিদ্রোহী করে তুললো আমাকে। পয়ত্রিশ বছর আগে এই শহরে যেসব কিশোররা এমন ঘরের ঠিকানা দখল করতে পেরেছিলো তাদের সবারই বোধ হয় এমন মানসিক অনুভূতিই হতো। তখন বাড়ির গোনাগুন্তি ঘরের মধ্যে সেই বসবার ঘরেই তরুণ অথবা কিশোরদের আলাদা থাকার ব্যবস্থা হতো। ওই বসার ঘরই তখন হয়ে উঠতো তাদের নিজস্ব নির্জন।

আমি ক্লাস এইটে পড়ার সময় থেকে ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে উঠি।সেই ঘরের স্বাধীনতা আমার নৈশকালীন ধূমপান আরো অবাধ করে তুললো। মনে আছে, তখনও বেশী রাত করে বাড়ির বাইরে থাকার অনুমতি ছিলো না। কিছু বন্ধু সেই স্বাধীনতার ছাড়পত্র লাভ করেছিলো। ফলে বেশ রাতে আমার জানালার সামনে জমে উঠতো আমাদের গোপন আড্ডা।বসবার ঘরের ওই আলাদা বসবাস আমাকে প্রথম কবিতা পড়িয়ে নিয়েছিলো (আর দশজন বাঙালী ছেলের মতো ফুল,পাখি মার্কা কবিতা নয়)।

সেখানে এক রাতের বেলা আমি প্রথম পড়লাম পশ্চিম বাংলার কবি নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর কবিতা ‘কলঘরে চিলের কান্না’। পড়লাম ‘উলঙ্গ রাজা’।অবশ্য আমাদের বাড়িতে কবিতা অথবা অন্য ধরণের সাহিত্য পাঠ নিয়ে কোনো বাধার প্রাচীর টপকাতে হতো না। কিন্তু তবুও কোনো অজানা কারণে সেই রাত্রির নির্জনতায় কবিতাগুলো পড়ে ভিন্ন এক অনুভূতি তৈরী হয়েছিলো। আর ওই একা ঘরের রাত্রিগুলোই আমাকে ঠেলে দিয়েছিলো কাব্যচর্চার দিকে।

বসবার ঘরে সেই অস্থায়ী নিবাস আমাকে আড্ডা দেয়া আর সিগারেট খাওয়ার পাশাপাশি বই পড়ার জন্য এনে দিয়েছিলো অফুরন্ত অবসর। ওই ঘরেই আমি প্রথম পড়ে ফেলি শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’, এরিক শাগালের ‘লাভ স্টোরি’, নিকোলাই অস্ত্রভোস্কির ‘ইস্পাত’ আর ‘মাসুদ রানা’। সেই ঘরে বসে প্রথম দেশীয় ‘চটি বই’ পড়েছিলাম।

ওই বয়সে একটা টেবিল আর আলাদা বিছানা পেয়ে যাওয়ার আনন্দটাই ছিলো বিপুল। টেবিলে আলাদা ড্রয়ারের গোপন জগতের চাহিদা তখনো মাথা তোলেনি। টেবিলে একটা ড্রয়ার ছিলো কিন্তু তাতে তালা লাগানোর ব্যবস্থা ছিলো না। তাই ওই বসবার ঘরের বইয়ের সেলফ আমার গোপন জিনিসপত্র ধারণ করতো। বইয়ের পেছনে গুঁজে রাখতাম আধপোড়া সিগারেট, মাসুদ রানা সিরিজের বই। রাখতাম ছোরা, পোস্ট না করা প্রেমপত্র।

সেই ঘরের দুদিকে ছিলো কাঠের জানালা। খুলে দিলে একদিকে বারান্দা অন্যদিকে রাস্তা। আমার পড়ার টেবিলটা ছিলো রাস্তার দিকের জানালা ঘেঁষা। বাড়িতে কোনো অতিথি এলে সেই ঘর এবং বিছানা থেকে উচ্ছেদ হতে হতো আমাকে। কখনো কোনো আত্নীয়-স্বজন একটু বেশী সময়ের জন্য থাকতে এলে আমি আমার বিছানাটাও হারাতাম। ঠাঁই হতো অন্য ঘরের মেঝেতে। এখন এই আধুনিক রাজধানীতে এরকম অস্থায়ী নিবাসের কথা হয়তো কোনো তরুণ বা কিশোর ভাবতেই পারে না। ছোটবেলা থেকেই তার জন্য বাড়িতে বরাদ্দ থাকে একটা সম্পূর্ণ ঘর। আমার সেই নিজস্ব নির্জন ঘরটা ছিলো এজমালী সম্পত্তির মতো। বিভিন্ন মানুষ বিভিন্ন সময়ে দখল নিতে চাইতো। তবে সে ঘরে স্থায়ী বাসিন্দা আমি ছাড়া থাকতো আমার পোষা কুকুর টমি। সে রাতে আমার বিছানাটার পাশে ঘুমিয়ে থাকতো।

সেই ঘরটা ছিলো আমার বয়স বাড়ার সাক্ষী। এমন সব ঘরগুলো আমার মতো আরো অনেকেরই অনেক কিছুর সাক্ষী হয়তো সময়ের সেই সুদূর পারে। আমাদের সেই শহরে মধ্যবিত্ত বাড়ির বসবার ঘরের ছিলো এমনি বহুমাত্রিক ব্যবহার। তখন সব বাড়িতে ওই ঘরটাতে বিছানা থাকাটা ছিলো খুবই সাধারণ ব্যাপার। বসবার ঘর তখনো লিভিং রুম অথবা ফ্যামেলি রুমের ধাক্কায় পিছু হটে যায় নি।

আমার সেই অস্থায়ী অবাসের দেয়ালে ঝোলানো ছিলো একটা ছুটন্ত ঘোড়ার ছবি। ছিলো বুক সেলফ ভর্তি বই। আমি একা দুপুর অথবা রাতে ঘোড়ার ছবির দিকে তাকিয়ে শিল্পী হবার কথা ভাবতাম। স্বপ্ন দেখতাম আমেরিকারি ওয়াইল্ড ওয়েস্টে কাউবয় হওয়ার। ঘরটা এক ধরণের স্বপ্ন নির্মাণ করেছিলো আমার ভেতরে। বহুকাল পরে একদিন দেখতে গিয়েছিলাম সিদ্ধেশ্বরীর সেই পাড়ায় আমাদের বাড়িটা। গিয়ে দেখি অনেকটা খালি জায়গা পড়ে আছে। বাড়িটা ভাঙ্গা হয়ে গেছে। এতোদিনে হয়তো সেখানে কোনো বিশাল ইমারত মাথা তুলেছে আকাশের দিকে।হারিয়ে গেছে আমার বসবার ঘরের অস্থায়ী বিছানার স্মৃতি।

ছবিঃ গুগল