হায় রে মানুষ, রঙীন ফানুস…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ড.সেলিম জাহান

(আমেরিকা থেকে): সন্ধ্যা নেমেছিলবেশ জমকালো ভাবে। হাঁটতে বেরিয়েছিলাম আমাদের দ্বীপটিতে। হেঁটে হেঁটে চলে গিয়েছিলাম একেবারে উত্তরের বাতিঘর পর্যন্ত। ছলাৎ ছলাৎ করে জলের শব্দ, আকাশে গাঙচিলদের ক্যাঁক ক্যাঁক চিৎকার, উত্তরের ঠান্ডা হাওয়া মিলিয়ে কেমন যেন আনমনা হয়ে পড়েছিলাম। কিছুক্ষন বাদে চমক ভাঙ্গলে লক্ষ্য করলাম, সারা বাতিঘর এলাকায় আমি একা, আকাশে মেঘ জমাতে শুরু করেছে এবং সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। উল্টোমুখো হয়ে আবার বাড়ীর পথ ধরলাম।

বাতিঘরের ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড়ে ঢাকা বাগানের পাশ দিয়ে হেঁটে আসার সময়ে সেই ঘনায়মান অন্ধকারে চোখ গেল একটি বার্চ গাছের গোড়ায়। না, এমন কিছু নয় – একটি সাপের খোলস পড়ে আছে। দেখে মনে হল সাপটি যেন এইমাত্র খোলসটি ছেড়ে বেরিয়ে এসেছে। কেমন যেন গা শিরশির করা শীতল একটা অনুভূতি মেরুদন্ড পেয়ে নেমে গেল। কেন জানি দ্রুত পা চালালাম জায়গাটা পেরিয়ে যেতে।

হাঁটতে হাঁটতে মনে হলো, আসলে সাপের মতো মানুষেরও তো খোলস আছে। সাপ খোলস ছেড়ে চলে যায় – মানুষ খোলস ধারন করে থাকে। সাপ খোলস ছেড়ে নিজেকে প্রকাশ করে, মানুষ খোলস ধরে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। সাপ খোলস বদলায় প্রতিবছর, মানুষ খোলস ধরে রাখে সারা জীবন। সাপের খোলস বলা যায় কেমন হবে, মানুষের খোলসের অগ্রকথন সম্ভব নয়। কত রকমের খোলস ধরে মানুষ – ভালো মানুষীর, ভদ্রতার, মানবিকতার। আবার অনেক সময়ে নানান কৃত্রিম আবরনে ঢেকে থাকার কারনে বহু মানুষের মানবিক রূপটি আমরা দেখতে পাই না – তা’ও তো সত্য।

নিজেকে লুকিয়ে রেখে নিজের স্বার্থসিদ্ধির জন্য অনবরত ভালো মানুষীর খোলস ধরতে দেখি মানুষকে। ভালো মানুষ সেজে অন্যের ক্ষতি করতে মানুষের জুড়ি নেই। যে মানুষটি বন্ধুত্বের খোলস ধরে হাত বাড়ায়, তার অন্য হাতে যে  শাণিত ছুরি, তা অনেক সময়ে আমরা দেখতে পাই নি। আস্হাভাজনের আবরনে যে নির্ভরতার আশ্বাস দেয়, বিশ্বাসভঙ্গ করতেও তার আটকায় না। যাকে দেবতুল্য মনে হয়, তার খোলস খুলে গেলে তাকে শয়তানেরও অধম মনে হয়। আমার এক অপরাধবিজ্ঞানী বন্ধু একবার আমার বলেছিলেন যে, সবচেয়ে পাকা ও জঘন্য অপরাধীদের মুখে, চালচলন, ব্যবহারে এমন একটা খোলস থাকে যে তাদের আর পাঁচজন থেকে তো আলাদা করাই যায় না, বরং তাদেরকেই সবচেয়ে ভালো মানুষ বলে মনে হয় আপাতদৃষ্টিতে। তারপর এ জাতীয় মানুষদের দ্বারা সংঘটিত কিছু অপরাধের তিনি বিবরন দিয়েছিলেন। সে সব অপরাধের ন্যাক্কারজনতা আর বীভৎসতায় শিউরে উঠেছিলাম।

ভদ্রতার খোলস যে কত দেখেছি। প্রচন্ড বিরক্তি কারো প্রতি – কিন্তু দেখা হলেই উষ্ণ করমর্দনের সঙ্গে বলেছি, ‘কি যে ভালো লাগল, আপনাকে দেখে’। সহকর্মীর পিতৃবিয়োগ ঘটেছে, কিচ্ছু আসে যায় না আমার তাতে, কিন্তু চিঠি লিখে শোকে মূহ্যমান এই ব্যক্তিটিকে বলছি, ‘কি যে দু:খ পেয়েছি আপনার এ অপূরনীয় ক্ষতিতে। আন্তরিক সমবেদনা জানবেন’। পাশের বাড়ীর প্রতিবেশীর পুত্রটি পরীক্ষার প্রথম স্হান অধিকার করেছে – হিংসায় বুকটা ফেটে যাচ্ছে। কিন্তু সবার সামনে ছেলেটিকে জড়িয়ে ধরে বলছি, ‘এ হচ্ছে আমাদের গর্ব’। বড়দের ভদ্রতার মেকী খোলস সবচেয়ে বিভ্রান্ত করে শিশুদের। এবং তাদের সরলতার অপমৃত্য ঘটে ওখানেই। ভদ্রতার খোলস আবার শ্রেনী বিভাজনের ওপরে নির্ভর করে। আমাদের ভদ্রতার মেকী খোলসটা খুলে যায় যখন আমরা দরিদ্র শ্রেনীর সঙ্গে কথা-বার্তায় রত হই।

মানবিকতার খোলসটি বেশী দেখা যায় গোষ্ঠীগত জীবনে। নিপীড়িত মানুষের জন্য কেঁদে ভাসিয়ে দেয়ার পরে বহু মানুষকে দেখি পাঁচতারা হোটেলের ভোজন কক্ষে। ধর্মের মানবতার কথা শেষে নানান দুর্নীতি আর ন্যাক্কারজনক কাজে লিপ্ত হন ধর্মীয় নেতারা। ধর্মীয় খোলসের বর্মতো বারংবার ব্যবহৃত হতে দেখেছি নানান সমাজে, নানান ধর্মে। মানবতার নামে, মানবিকতার খোলসে কত জায়গায় কত অর্থ তোলা হয়েছে, হিসেব মেলেনি সে সব সম্পদের নানান সময়ে।কুম্ভীরাশ্রু হচ্ছে মানবিকতার খোলসের বড় অস্ত্র।

কিন্তু মানুষের আবরনের আর একটি সুনন্দ দিকও তো আছে – আভরণই বলা চলে তাকে। অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা আপাতদৃষ্টিতে রাগী মানুষের আবরন পরে থাকেন, কিন্তু অন্তরের ভেতরে তাঁদের মমতা আর স্নেহের ফল্গুধারা বয়ে যায়। আমার এক বাহ্যত হেঁয়ালী খেয়ালী বন্ধু আছে, যার হৃদয়টা বুঝতে পারলে একজন অত্যন্ত মমতাময় অনিন্দ্যসুন্দর মানুষের দেখা পাওয়া যায়। কিন্তু ওটা ভেতরের, বাইরের নয়; ওটা ছুঁতে পারার, দেখার নয়; ওটা বোধের, প্রকাশের নয়। বহু গুনীকে দেখেছি যে নিজেকে লুকিয়ে রাখেন, নির্গুনের আবরন পরে থাকেন। যখন তাঁদের লুকিয়ে রাখা গুনের একটু নিদর্শন পাই, তখন হতবাক হয়ে যাওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প থাকে না।

বহুকাল আগে আমাদের এক সহকর্মীর বাড়ীতে এক নৈশভোজের আমন্ত্রণ ছিলো। ভোজ শেষে কফির কাপ হাতে আমরা সবাই বসার ঘরে। সেখানে গৃহকর্ত্রী জানালেন যে আমাদের জার্মান সহকর্মীটি চমৎকার পিয়ানো বাজান। তিনি সরাসরি অস্বীকার করলেন। কিন্ত জনতা তাঁকে ছাড়বে কেন? অনেকটা টেনে-হিঁচড়ে তাঁকে পিয়ানোর সামনে বসিয় দিলো বন্ধুরা। আধা মিনিটের মধ্যেই বোঝা গেল যে, এ পাকা হাত। বাজালেন মিনিট পাঁচেকের মতো – বেটোফেনের ‘ফ্যুর এঁলিস’। সারা ঘরে একটা নিস্তব্ধত নেমে এসেছিলো। বাজনা যখন শেষ হলো, তখন বহুক্ষন আমরা কথা বলতে পারিনি – এমনই ছিলো তাঁর বাদনের অনুরণন। নির্গুনের আবরনে নিজেকে ঢেকে রেখেছিলেন কতকাল আমাদের কাছে।

চূড়ান্ত বিচারে মানুষ হয়তো আসলেই খোলস। এই যে আমাদের প্রত্যেকের মাঝে নানান মানুষ আছে – তার আধার তো নানান খোলসই বটে।তাই হয়তো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে, ‘আমার মাঝের আসল আমিটি উঁঠে দাঁড়াবেন কি?’ আর মাঝে মাঝে ঐ যে সেই গানটি হৃদয়ের কোন গহীন কোন থেকে উঠে আসে – ‘হায় রে মানুষ, রঙীন ফানুস, দম ফুরাইলেই ঠুস’। তখন নিজেকে একটা খোলস ছাড়া কি ই বা ভাবা যায়?

ছবি : লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]