হিব্রু ভাষায় কাফকার চিঠি

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফ্রাঞ্জ কাফকা হিব্রু ভাষায় লিখেছিলেন ‘লেটার টু হিজ ফাদার’। লিখেছিলেন বেশ কিছু চিঠি। সে সব চিঠি পৌঁছেছিলো কিশোরী পুয়াহ বেন টভিম মেনজেলের ঠিকানায়। অনেক চিঠির উত্তর পাননি কাফকা। আর সেই শূন্য ডাকবাক্সের বেদনা ঝড় তুলেছিলো তাঁর মনে। এক বন্ধুকে চিঠিতে সেই কষ্টবোধের কথা জানিয়েও ছিলেন  তিনি। তখন ভয়ংকর টিবি রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর দিন গুনছেন কাফকা। ফ্রাঞ্জ কাফকার হিব্রু ভাষা শেখা এবং সেই ভাষায় লেখালেখির খবরটা এতদিন অনেকের কাছেই অজানা ছিলো।কারণ তাঁর হিব্রু চর্চার কাহিনি আটকে ছিলো জুরিখ ব্যাংকের এক ভল্টে।

পুয়াহ বেন টভিম মেনজেল

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো কাফকার হিব্রু ভাষায় লেখালেখি নিয়ে ‘হিব্রু ভাষায় লেখা কাফকার চিঠি’

কাফকার সেই মহামূল্যবান লেখাগুলো গত বছরের গোড়ার দিকে আ্ইনী মারপ্যাঁচের জাল টপকে অবশেষে পৌঁছে গেছেজেরুজালেমের ন্যাশনাল লাইব্রেরীতে।এই লেখাগুলোর মালিকানা ইজরাইলের সরকার অনেকদিন ধরেই দাবি করে আসছিলো।

কয়েক দশক ধরে কাফকার এই লেখাগুলো বন্দী ছিলো জুরিখ ব্যাংকের একটি সেফটি ভল্টে। কাফকার হিব্রু ভাষায় লেখা এই রচনাগুলো ব্যাংকের ভল্টে ঢুকলো কীভাবে? কে-ই বা মালিক ছিলো লেখাগুলোর? সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে এই গোপন ভল্টের মালিক ছিলেন কাফকার ঘনিষ্টতম বন্ধু, জীবনীকার ও লেখালেখির একান্ত সুহৃদ ম্যাক্স ব্রুডের সচিব এস্থার হফ।  এই মূল্যবান লেখাগুলো এতদিন এই মহিলাই কব্জা করে রেখেছিলেন।

ফ্রাঞ্জ কাফকা তাঁর সংক্ষিপ্ত সাহিত্য জীবনে বেশিরভাগ লেখা লিখেছিলেন চেক ও জার্মান ভাষায়। এই সময়ের মাঝে তিনি শিখতে শুরু করেন হিব্রু ভাষা। তাঁর চিঠি এবং ডায়েরিতেও প্রধান্য পেয়েছে এই দু’টি ভাষা। তবে সম্ভবত ইহুদী বন্ধুদের কথা ভেবে কাফকা শিখতে শুরু করেছিলেন হিব্রু ভাষা। ‘লেটার টু হিজ ফাদার’ নামে বাবাকে লেখা চিঠি এবং এর বাইরে বেশ কিছু পত্র তিনি লেখেন হিব্রু ভাষায়। কিছু চিঠি তিনি লেখেন তাঁর হিব্রু শিক্ষক কিশোরী পুয়াহ বেন টভিম মেনজেলকে।

ম্যাক্স ব্রুড ১৯৬৮ সালে ইজরাইলে মারা যান। তাঁর শেষ ইচ্ছা ছিলো বন্ধুর সমস্ত লেখা আর কাগজপত্র একটি আরকাইভে দিয়ে দেয়া, যেখানে সকল আগ্রহী পাঠক খুব সহজে প্রবেশ করে কাফকার লেখা পাঠ করতে পারবে। কিন্তু হফ গোলমাল বাঁধিয়েছিলেন সেখানেই। তিনি ব্রুডের কথা না শুনে কাফকার অনেক লেখা চড়া দরে নিলামে তুলে দেন। আর যে লেখাগুলো বিক্রি করতে পারেননি সেগুলো চালান করে দেন ব্যাংকের ভল্টের গোপনীয়তায়। হফের মৃত্যু হয় ২০০৭ সালে। তার দুই কন্যা ইভা এবং রুথ এই বাক্সের মালিক হয়ে বসে তাদের মায়ের মৃত্যুর পর। আর তারপরেই শুরু হয় আইনী লড়াই। ইজরাইল সরকার দাবি করে বসে কাফকার হিব্রু ভাষায় রচিত সকল লেখালেখির মালিকানা। অবশেষে লেখাগুলোর এখনকার স্থায়ী ঠিকানা হলো ইজরাইলের জাতীয় গ্রন্থাগারে।

কাফকা মেনজেলকে কীভাবে আবিষ্কার করেছিলেন? কাফকার জন্মের কুড়ি বছর পর মেনজেলের জন্ম ইজরাইলে ১৯০৩ সালে। সেখানকার এক স্কুলে মেনজেল পড়াশোনা করে। কাফকার বন্ধু বার্গম্যান ছিলেন সেখানকার শিক্ষক। মেনজেলের পড়াশোনা শেষ হলে বার্গম্যান তাকে প্রাগের জার্মান বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিষয়ে সাহায্য করেন। সেখানে বার্গম্যানের মায়ের সূত্র ধরে তরুণ কাফকার সঙ্গে পরিচয় ঘটে মেনজেলের। যুবতী মেনজেলের কাছে কাফকা শিখতে শুরু করেন হিব্রু ভাষা। যদিও মেনজেল তখনও জানতেন না এই ক্ষুরধার তরুণ লেখকটির জীবন প্রদীপ তখন ক্রমশ নিভে আসছে।

মেনজেলের কাছে বেশ কিছুদিন কাফকা ভাষা শেখার ক্লাস করেন।পরে অবশ্য মেনজেল প্রাগ থেকে আবার বার্লিনে চলে যাওয়ায় কাফকার ভাষা শেখার বিষয়টা ব্যহত হয়। কিন্তু তরুণী শিক্ষকের সঙ্গে কাফকার তখন চিঠিতে যোগাযোগ ছিলো। সেসব চিঠি হিব্রু ভাষাতেই লিখতেন কাফকা। এক সময়ে তাদের এই যোগাযোগও ক্ষীণ হয়ে আসে। কাফকা অনেক চিঠি লিখেও আর উত্তর পাননি মেনজেলের কাছ থেকে। মৃত্যুর খুব কাছাকাছি সময়েও কাফকা ভোলেননি মেনজেলকে। বন্ধু এবং চিকিৎসক রবার্ট ক্লপস্টককে চিঠিতে লিখেছেন,‘গত পাঁচ সপ্তাহে পুয়াহ‘র সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই আমার। জানো, সে আমার জীবন থেকে একেবারেই নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে। সে এখন আমার পোস্টকার্ডে লেখা চিঠিরও কোনো উত্তর দেয় না।’ আবার কয়েক মাস পরে বন্ধুকে লেখা আরেকটি চিঠিতে কাফকা মেনজেলের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লিখেছেন,‘ কয়েকমাস কেটে গেলো তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই। তাকে হয়তো আমি কোনোভাবে অপমান করেছি বলে মনে হচ্ছে।’

মেনজেল ১৯২৫ সালে বার্লিনে তার লেখাপড়া শেষ করেন। পরে তিনি হিব্রু ভাষায় লেখা কাফকার বেশকিছু নোটবই ইজরাইলের ন্যাশনাল লাইব্রেরীকে দান করেন। অনুমান করা হয়, এই নোটবইগুলো কাফকাই তাকে দিয়েছিলেন।

কাফকার বন্ধু ম্যাক্স ব্রুড  কেনো এই নোটবইগুলো প্রকাশের উদ্যোগ নেননি অথবা সেগুলো কেনো আর্কাইভে দিতে চেয়েছিলেন এমন সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া যায়নি। উল্টো তিনি সচিব হফের অবিশ্বস্ত হাতে এই মূল্যবান লেখার দায়িত্ব কেনো দিয়েছিলেন সে নিয়েও অনেকের মনে প্রশ্ন আছে।

কাফকার হিব্রু চর্চার চিহ্ন নোটবইগুলো। মেনজেলকে লেখা চিঠি ছাড়াও অনেক জায়গায় লেখা হিব্রু শব্দ, শব্দের অর্থ, প্রতিশব্দ নিয়ে কিছু কিছু নোট লিখেছেন কাফকা। এক জায়গায় তিনি একটি হিব্রু শব্দের চারপাশে গোল দাগ দিয়ে রেখেছেন। শব্দটির অর্থ হচ্ছে ‘আত্মহনন’। আবার কোথাও তিনি জানতে চেয়েছেন নৈঃশব্দ, দারিদ্র, প্রচারণা, নির্বাক চলচ্চিত্র প্রভৃতি শব্দগুলোর হিব্রু রূপ।আরেকটি নোটবইতে দেখা যায় তিনি লাভ, বিষাদ, গুপ্তচর এবং তেলাপোকার সংজ্ঞা জানতে চেয়েছেন হিব্রু ভাষায়।কোথাও তার কলম ডায়েরির সাদা পৃষ্ঠায় নানা রকমের আঁকিবুঁকি কেটে গেছে। কোথাও তিনি খসড়া করেছেন গল্পের।

১৯২০ সালে কাফকা ছুটি কাটাতে যান গ্রাগ শহরের বাইরে একটা জায়গায়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখা পান এক ইহুদী কম্বল আর চাদর ব্যবসায়ীর। তার সঙ্গেও কাফকা হিব্রু ভাষায় কথা বলেন। এই কথাবার্তার কথা তিনি বন্ধু ব্রুডকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন।

ইতিহাসবিদ অ্যান্ট পেরী কাফকার হিব্রু ভাষায় লেখালেখি নিয়ে কিছুকাল গবেষণা করেছেন। পেরীর মত হচ্ছে, এই ভাষায় কাফকার আরো কিছু লেখালেখি এখনো রয়ে গেছে পৃথিবীতে। অনাবিষ্কৃত সেসব লেখা হয়তো কোনো গোপন সংগ্রাহকের একান্ত সংগ্রহ উজ্জ্বল করছে। ব্রুডের লেখায় কাফকার কিব্রু ভাষায় লেখা আরো কিছু নোটের উল্লেখ পাওয়া যায়। পেরী মনে করেন সেগুলোর ইতিহাস কাফকার উৎসাহী পাঠকদের কাছে অজানাই থেকে যাবে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ হার্টজ
ছবিঃ গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]