হিস্যা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

পোস্টবক্স। ফেইসবুকের একটি জনপ্রিয় গ্রুপ। এবার প্রাণের বাংলার সঙ্গে তারা গাঁটছড়া বাঁধলেন। প্রাণের বাংলার নিয়মিত বিভাগের সঙ্গে এখন থাকছে  পোস্টবক্স-এর রকমারী বিভাগ। আপনারা লেখা পাঠান পোস্টবক্স-এ। ওখান থেকেই বাছাইকৃত লেখা নিয়েই হচ্ছে আমাদের এই আয়োজন। আপনারা আমাদের সঙ্গে আছেন। থাকুন পোস্টবক্স-এর সঙ্গেও।

শাহ্ রিয়ার খালেদ

ডায়াবেটিক হাসপাতালের তেত্রিশ নম্বর রুমের সামনে এসে দাঁড়ান জমির সাহেব।  হাসপাতালে রোগীর ভীড় লেগে আছে। একমাত্র হাসপাতালে আসলেই যেন বোঝা যায় মানুষ কি বিচিত্র রোগে আক্রান্ত। মাঝে  মাঝে তাঁর মনে হয় হাসপাতাল হলো গাড়ির ওয়ার্কশপের মত মানুষ মেরামতের কারখানা।  কারো একটা স্ক্রু দরকার, কারো নাট ভেঙে গেছে, কারো দরকার পুরোদস্তুর ওভারহলিং। কারো ব্রেক নষ্ট, নষ্ট এলাইনমেন্ট, এমনি আরো কতো কি।

তেত্রিশ নাম্বার রুমের কাছে আসার আগে কাঁধের ব্যাগটা তিনি রেখে এসেছেন চেয়ারের উপর যাতে সেটা দখল না হয়ে যায়।  অল্প কয়েকটা আসন আর অসংখ্য রোগী দাঁড়িয়ে আছে জায়গা না পেয়ে। সবাই সঙ্গে কাউকে নিয়ে এসেছে। কারো সঙ্গে ছোট বাচ্চা। জমির সাহেবের খুব ইচ্ছে হয় নিজের আসনটা ছেড়ে দিতে। কিন্তু তাঁর অবস্থাও সঙ্গীন। তিনি এসেছেন একা। তাঁর পায়ের ক্ষতের ড্রেসিং দরকার আর তার সঙ্গে নতুন যোগ হওয়া কিছু উপসর্গ, যা তিনি ডাক্তারকে বলবেন।

ডাক্তারের কক্ষের সামনে একটা রঙ চিটচিটে হলুদ রঙের টেবিল, সঙ্গে একটা হাতলযুক্ত চেয়ার। সেই চেয়ারের পিছনে একটা উৎকট রঙের চেক-কাটা তোয়ালে। ছোকরা মতো এক সহযোগী রোগীদের সঙ্গে ডাক্তারের যোগাযোগ ঘটিয়ে দেবার দায়িত্বে নিয়োজিত।

এইটুকু হেঁটে আসতেই জমির সাহেবের নিশ্বাস ঘন হয়ে এলো। ছোকরা সহযোগী জানালো ডাক্তার এখনও আসেনি। আজ নাকি মন্ত্রী হাসপাতাল পরিদর্শনে আসবেন। গাঁয়ের ইস্কুলে সফরে আসা মন্ত্রী মহোদয়কে সম্বর্ধনা জানাতে বাচ্চা ছেলেমেয়েদের যেমন কাঠ ফাটা রৌদ্রে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়, ডাক্তাররাও বুঝি তেমনি দাঁড়িয়ে আছেন।

ছোকরা সহযোগী তাঁকে দেখে বিরক্তিতে ভুরু কোঁচকায়। এইসব তার ঢের জানা আছে। সবাই চায় তার অসুখটাকে গুরুতর বাহানা করে আগে ডাক্তার দেখাতে। প্রথম প্রথম তার মায়া জাগলেও আজ এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেছে সে। একটা কঠিন কথা বলার জন্য প্রস্তুতি নিতেই হৈ হল্লা শুরু হয়ে যায়। নিরাপত্তা কর্মী, ছোট বড় ডাক্তার সহ অনেকে ছুটে আসে। মন্ত্রী মহোদয় চলে এসেছেন। রোগীরা তাদের ব্যথা ভুলে মন্ত্রী মহোদয়কে এক নজর দেখার জন্য তাকিয়ে থাকে।

জমির সাহেব তাড়াতাড়ি নিজের আসনে ফিরে যাবার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে চান। কিন্তু পায়ের ক্ষতটা তাঁর সঙ্গে বৈরীতা শুরু করে। একজন এসে ধরেন তাঁর কাঁধ, ভালো আছেন আপনি? চিকিৎসা কেমন চলছে? জমির সাহেব একনজর তাকিয়েই বুঝতে পারেন, এটা আকমল। সেই চুল, সেই তীব্র প্রখর অন্তরভেদী দৃষ্টি। সেই গমগমে গলা,  তাঁদের চোখ আটকে থাকে পরস্পরের দৃষ্টিতে।

আকমল পড়তো জমির সাহেবের ইস্কুলে। প্রতিভাবান, মেধাবী সদা উতফুল্ল সাহসী এক যুবক। সবাই আশা করেছিল আকমল খুব ভালো ফল করে একদিন ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বনে যাবে। কিন্তু আকমল সেদিকে গেলো না। শুনেছিলেন ও রাজনীতিতে ঢুকেছে। শোনা কথায় শুনেছিলেন আকমল মন্ত্রীও হয়েছে। বিশ্বাস করেন নি। কিন্ত এখন দেখছেন তাই সত্যি।

কড়া একটা দৃষ্টি দিয়ে হাসপাতালের পরিচালক সব কর্মচারীকে ভস্ম করে দেবেন এমন ভাবে তাকিয়ে ছুটে গেলেন জমির সাহেবের দিকে। কিন্তু ততক্ষণে মন্ত্রী মহোদয় হাত দিয়ে জমির সাহেবের পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিচ্ছেন। স্যার আপনি? বলে মন্ত্রী মহোদয় হাত জোর করে দাঁড়িয়ে থাকেন। জমির সাহেব এর ভালো লাগে কিন্তু এমন পরিস্থিতে তাঁর আকমলের মুখোমুখি হতে ইচ্ছা করে না। চারদিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারেন তিনি এখন একটা দর্শনীয় বস্তুতে পরিণত হয়েছেন। সবগুলো চোখ তাকিয়ে আছে তাঁর  দিকে। দু-একটা কুশলাদি শেষ করে মন্ত্রী মহোদয় কাকে ডেকে বললেন তাড়াতাড়ি জমির সাহেবকে দেখে দেবার জন্য। তারপর বললেন, স্যার, সচিবালয়ে একটা মিটিং আছে। যদি একটু অপেক্ষা করেন আমি যাবার সময় আপনাকে নামিয়ে দিয়ে যাবো। তার গমগমে ভারী কণ্ঠ কক্ষের এ দেয়াল সে দেয়ালে বাড়ি খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো। তারপর তিনি চললেন বাকী পরিদর্শনে।

চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ছোকরা সহযোগী এসে বিগলিত হাসি দিয়ে তাঁর হাত ধরে করমর্দন করতে থাকলো। জমির সাহেবকে দেখে সবাই আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেলো। জমির সাহেব জোর করে হাত ছাড়িয়ে করিডরের মুখের দিকে এগুলেন। শূন্য থেকেই যেন ভোজবাজির মতো একটা খালি হুইল চেয়ার নিয়ে পেছন পেছন আসতে আসতে সহযোগী  জিজ্ঞেস করলো, স্যার কোথায় যান? আঙুলের ইশারায় জমির  সাহেব সামনের দিকে দেখিয়ে এগিয়ে গেলেন। সবগুলো চোখ তাকিয়ে রইলো তাঁর দিকে।

করিডোরের শেষ প্রান্তে দরজা। দরজা  পেরোলেই নতুন অ্যাপয়েনমেন্ট করার কাউন্টার। যে ভীড় আজকে মনে তো হয় ডাক্তার দেখানো যাবেনা, বলে নতুন একটা তারিখ চাইলেন তিনি। তারপর মূল দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন রাস্তায়। প্রজাতন্ত্রের নাগরিক হিসেবে গণ মানুষের জন্য নির্দিষ্ট করা নিয়মের ভেতর দিয়েই চিকিৎসা সেবা নিতে চান তিনি।

ছবি: গুগল

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]