হৃদয়ের খুব কাছে গভীর কষ্টের বাড়িতে থাকেন আবুল হাসান

লুৎফুল কবির রনি

‘এখন আবার ক্লান্তি নিয়ে ঘরে ফেরার দিন ঘনিয়ে এসেছে। ঘরে ফিরব, কিন্তু ঘরের যা অবস্থা, সেখানে থাকব কী করে! তার দরজা–জানালায় এখনো খুনের গন্ধ, তার খাটে রাজনীতির আবোল-তাবোল আবর্জনা।’

শ্রদ্ধেয় ঔপন্যাসিক শওকত ওসমানকে বার্লিন থেকে লেখা এক চিঠিতে আবুল হাসান এ উচ্চারণ করেছিলেন। ঘরে তিনি ফিরেছিলেন ঠিকই, তবে সেই ঘর অনন্তের। মাত্র আটাশ বছর বয়সে লোকান্তরিত হয়েছেন কবি আবুল হাসান।

‘অবশেষে জেনেছি মানুষ একা।
জেনেছি মানুষ তার চিবুকের কাছে ভীষণ অচেনা ও একা
দৃশ্যের বিপরীতে সে পারে না একাত্ম হতে এই পৃথিবীর সাথে কোনো দিন’

‘ঝিনুক নীরবে সহো/ ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও/ ভিতরে বিষের বালি, মুখ বুঁজে মুক্তা ফলাও।’

এমন কবিতার পংক্তি যিনি লিখতে পারেন, তিনি আজন্ম কবি ছাড়া আর কিছুই নন। তাঁর জন্ম হয়েছিল বোধহয় কবিতা লেখার জন্য, তাই মাত্র ২৮ বছর বয়সে তিনি পৃথিবী থেকে চলে যান মহাপৃথিবীর নিঃসঙ্গ যাত্রায়।

কবি হওয়া যায় না কবি হয়ে জন্মাতে হয়। আবুল হাসান তেমনি কবি হয়ে জন্মেছিলেন। কবিতা বা কাব্য কোন সতীন পছন্দ করে না। আমরা সকলেই জানি জীবন খরচ করে কবিতা লিখতে হয়, তবেই কবির কবিতা স্বার্থকতা লাভ করে। আবুল হাসান তাই জীবন খরচ করে কবিতা লিখেছেন, তাঁর প্রতিটি কবিতায় আছে প্রচন্ড রকম ধ্যান ও মগ্নতা, আছে রাত্রির নিবব্ধতার অন্তর্গত প্রতিটি মুহূর্তের কান্না। তীব্রতর কষ্ট ও বেদনা ছাড়া কবিতা কবির কলমে ধরা দেয় না। তাই তো সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।

কবি শামসুর রাহমান কবি আবুল হাসান সর্ম্পকে বলেছেন, ‘আবুল হাসান মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত কবি, কবি ছাড়া আর কিছুই নয়। তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে বয়ে গেছে কবিতা। আবুল হাসানের এলোমেলো জীবনের ছাপ পড়েছে তার কবিতাতেও।’

চূড়ান্ত ব্যবচ্ছেদ করলে তার ভেতরে মায়া ও মমতা, মানুষের জন্য দুঃখবোধ ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যাবে না।কবি আবুল হাসান তার এক কবিতায় বলেছেন, ‘শিল্প তো নিরাশ্রয় করে না। কাউকে দুঃখ দেয় না।’ সেই একই কবিতায় তিনি লেখেন ‘শিল্প তো স্বাতীর বুকে মানবিক হৃৎপিন্ড, তাই / আমি তার হৃৎপিন্ডে যাই চিরকাল রক্তে আমি / শান্তি আর শিল্পের মানুষ।’

আবু্ল হাসান যে শুধু কবিতা লিখতে পারতেন । তিনি ছিলেন শুধুই কবি । মানুষের দুঃখকে ধারন করতে পেরেছেন আর মায়ামমতায় আচ্ছন্ন হয়েছেন । তাঁর কবিতায় আবেগ ছাড়িয়ে ফুটে উঠেছে সমকালীন প্রসঙ্গ। শ্লোগানধর্মী ভাষা এড়িয়ে তিনি লিখেছেন। বাস্তবতার নিরিখে হেঁটেছেন । মধ্যষাটের দিকে আধুনিক বাংলা কবিতার যুবরাজ কবি আবুল হাসান।

আবুল হাসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়তেন, প্রেম করতেন ইংরেজি বিভাগেরই তরুণ প্রভাষিকার সঙ্গে। দুর্দান্ত এক আত্মসংহারী জীবন ছিলো তার, মাত্র ২৮ বছরের সুরাইয়া খানম নামে এক মিথ হয়ে ওঠা প্রভাষিকা তাই হাসানের অকাল মৃত্যুর পর লিখেছিলেন, ‘হাসান ছিল এক আহত ক্ষুধার্ত সিংহ, আমি ছাড়া আর ওকে কে বুঝত?’

আজন্ম বিশুদ্ধ কবিই জীবন জ্বালিয়ে নিঃশেষ করে এমন কবিতা লিখতে পারে।

পাতা কুড়োনির মেয়ে তুমি কী কুড়োচ্ছো? মানুষ, আমি মানুষ কুড়োই। আহত সব নিহত সব মানুষ কারা বাকস খুলে ঝরায় তাদের রাস্তাঘাটে, পুষ্প – তবু পুষ্পেভরা পুষ্প : তাদের কুড়োই আমি – দুঃখ কুড়োই! কবি আবুল হাসানের অপর নাম দুঃখের কবি । নিদারুণ কষ্টে কেটেছে জীবন ।

আমার এখন চাঁদ দেখলে খারাপ লাগে
পাখির জুলুম, মেঘের জুলুম, খারাপ লাগে
কথাবর্তায় দয়ালু আর পোশাকে বেশ ভদ্র মানুষ
খারাপ লাগে,
এই যে মানুষ মুখে একটা মনে একটা. . .
খারাপ লাগে
খারাপ লাগে
(আমি অনেক কষ্টে আছি)

আবুল হাসান ছিলেন হৃদয়ের ‘অনিচ্ছুক দাস’। তার কবিতার পংক্তিতে পংক্তিতে ছড়িয়ে রয়েছে আবেগ। যে আবেগের মধ্যে ধরা থাকে, ‘লাবণ্য, উজ্জ্বলতা আর মায়া’। আর এ সবের মিলিত নাম আবুল হাসান। তিনি ভালবেসেছিলেন, ‘ফুল, মোমবাতি, শিরস্ত্রাণ, আর আলোর ইশকুল’। তিনি কবিতায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগিয়েছেন, সেই বেদনা ছুঁয়ে গেছে পাঠককে।

আমি পকেটে দুর্ভিক্ষ নিয়ে একা একা অভাবের রক্তের রাস্তায় ঘুরছি,
জীবনের অস্তিত্বে ক্ষুধায় মরছি রাজনীতি, তাও রাজনীতি !

— আবুল হাসান

আজ ২৬শে নভেম্বর প্রতিভাবান এই কবির মৃত্যুবার্ষিকী। মাত্র ২৮ বছর বয়সে যিনি চলে গিয়েছিলেন আমাদের ছেড়ে!আবুল হাসানের মতো কবি যায়ও না, আসেও না; তারা রয়ে যায়। মানুষের হৃদয়ের কাছে খুব গভীর কষ্টের মতোই আবুল হাসান রয়ে যায়!

ছবি: গুগল