হৃদয় বৃত্তান্ত…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফাল্গুনের এই খালি খালি লাগা দিনে কত ভাবনা যে মনের মধ্যে ভেসে আসে। আরেকটি শীত পার হয়ে মন এসে পৌঁছালো আবার বসন্তের দরজায়। আবার এই ভুবন জুড়ে পাতা ঝরে যাচ্ছে বৃষ্টির মতোন। শূণ্য হয়ে যাচ্ছে গাছ নতুন পত্রালীর আশায়। মাঝে মাঝে মনে হয় শীত পার হয়ে ফের পৌছানো  যাবে তো এই নবাগত বসন্তের দিন? প্রতিদিন মরে যেতে যেতে উপেক্ষা করা যাবে অমরত্বকে? নাকি শীতের সেইসব হিম সন্ধ্যাবেলা ক্ষয় হয়ে যাওয়া আত্না নিয়ে পড়ে থাকবে কেউ কেউ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় পেরেছিলেন সেই অমরত্বকে উপেক্ষা করতে। আমরা কি পারবো?এই সময়টা কি আগের মতোই আছে নাকি আজ তার হাতের মুঠোয় ধরা আছে অন্য এক ম্যাজিক? যার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে আরেকটি সময়ের মানুষেরা যাদের হৃদয়ে ভর করেছে শীত আজ?
প্রাণের বাংলার এবারের প্রচ্ছদ রচনার বিষয় হৃদয় বৃত্তান্ত। দ্রুত পাল্টে যাওয়া এক সময়ে পাল্টে গেছে কী হৃদয়ের ভাষা, তার নির্জনতার গঠন? উত্তর খোঁজার একটা চেষ্টা মাত্র। তবে উত্তরটা হয়তো অনেকেরই জানা। দিন পাল্টেছে, ভালবাসার ভাষা পাল্টেছে, বাংলা কবিতাও পাল্টেছে। কখনও আর্তি, কখনও দাবি, কখনও আড়াল, কখনও খোলামেলা… কবি বিনয় মজুমদারের আশ্রয় নিয়ে হয়তো তুলে দেয়া যায় সেই লাইনগুলো, ‘সকল ফুলের কাছে মোহময় মন নিয়ে যাবার পরেও/ মানুষেরা কিন্তু মাংস রন্ধনকালীন ঘ্রাণ সবচেয়ে বেশি ভালবাসে’।
ভালবাসা কি ফুল আর মাংসের মাঝখানে আটকে থাকে কোথাও? এ বড় জটিল প্রশ্ন। সময়ের ভাষা বদলে গেলে পেছনে পড়ে থাকে কিছু মানুষ, সঙ্গে তাদের মনটাও। সময়ের সঙ্গী হয়ে বদলে যায় আমাদের মনের ভাষা, হৃদয় বৃত্তান্ত। আসলে আমাদের সবার জীবন যে কত কত অন্য জীবনে মিশে আছে… তার হিসেব হয় না। ষাটের দশক থেকে নব্বইয়ের দশক, ভয়ের দশক থেকে ক্ষয়ের দশক, কত রকম বদলই তো দেখেছি আমরা। কত রকম জীবনে বেঁচেছি  এক জীবনে। কত রকম প্রেমের রঙে আঁকা হয়েছে আমাদের প্রচ্ছদ।বদলাতে বদলাতে সব তোলাপাড় হয়ে গিয়ে আবার ফিরে আসা অথবা ভেসে যাওয়া।
কৈশোর মানে তো অনেক পেছনে ফেলে আসা দিন। মনে পড়ে তখন প্রায় অলৌকিক কোন মানবীর হাত ধরতে চেয়ে একমাস আগে থেকে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠাতে হয়েছে। মনের সেই মন্ত্রণালয় অনুমোদন করলে তারপর দিনক্ষণ ঠিক করে একদিন গলির মোড়ে দাঁড়ানো। অপেক্ষা করা সেই হাতের মালিকের জন্য। হয়তো এসেছেও সে, কিন্তু ধরা হয় নি সেই হাত। ভয় আর সংকোচ পাহাড়সম বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সামনে।প্রেমে পৌঁছনোর রাস্তায় কতশত পরীক্ষার তুষারপাত। আজ কিন্তু একজনের হাত ধরেও তিন জনের সঙ্গে কথা বলা যায়। সংযোগের জাল হৃদয় পেতে আমাদের ধরেছে। প্রতি মুহূর্তে সংযুক্ত থাকার, নিজের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার অবুঝ হাওয়া বয়ে যাচ্ছে চারপাশে।
আমরা বলি তাৎক্ষণিকের প্রেম। ইন্টারনেটের যুগে সেই হৃদয় পোড়ানো সময় আর কোথায় ফিরে পাওয়া যাবে! ভালবাসা তার ডাকনাম থেকে ডাকঘর সবই বদলে ফেলেছে। এখন চাইলেই স্মার্ট ফোনে বলে নেয়া যায় কথা, ফোনের পর্দায় ভাসিয়ে তোলা যায় প্রিয় মুখ। গলির মোড়ে এক মাসের পরিকল্পনা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না। বুক পকেটে নতজানু একটি চিঠি ভিজে যায় না অক্ষমতার ঘামে।তাহলে কি প্রেম নেই?নেই রাতভর ঘুম না আসা, অস্থিরতার পায়ে মাথা কূটে মরা? উত্তরে বলতে হয় আছে নিশ্চই। কারণ প্রেম তো আছেই। এখনকার তরুণ তরুণীদের মনের মধ্যে প্রেম আছে। তারা প্রেমে পড়ছে। ভালোবাসার বীজ পরিপক্ক হয়ে শিমুল তুলার মতো ছড়িয়ে পড়ছে চারপাশে। সব অভিযোগের দায় মাথায় নিয়ে বেঁচে আছে প্রেম আজও। কিন্তু সে প্রেম প্রকাশের ভাষাটা বদলে গেছে। তাই পেছনের সেই শীতে পড়ে থাকা আমাদের হৃদয়ের এতো হাহাকার।
রসিক লোকেরা দুষ্টামি করে বলে, আজকের প্রেমিক-প্রেমিকারা, শর্ট মেমোরি সিস্টেম জেনারেশন। এরা একে তুষ্ট নহে, তুষ্ট বহুজনে। বাঙালির প্রেমের ইতিহাস হাজার বছরের। গত পঞ্চাশ বছরের প্রেমের বিবর্তন ঘটেছে। একটা সময়ে পুকুরঘাট, বারান্দা, ছাদ আর জানালা ছিল ভাব-ভালোবাসা বিনিময়ের জায়গা। এখন সেসব জায়গা ডাইনোসরদের মতো বিলুপ্তই বলা চলে। তার বদলে চলে এসেছে কফি জয়েন্ট, রেস্তোরাঁ আর রিসোর্টের নির্জনতা। তর্ক উঠেছে প্রেমের মধ্যে শুধু মন থাকবে কেন, শরীর অনুপস্থিত কেন? ভালোবাসা আর সেই নতমুখ বালক নেই, বয়ঃপ্রাপ্তি ঘটে সে এখন শরীরের প্রধান্য বুঝতে চাইছে। দুনিয়াজুড়ে তো সেটাই এখন ভাষা।  
এই সময় বদলের হাওয়া জেগে উঠেছিল সত্তরের দশকে পৃথিবীজুড়ে হিপি কালচারের সূচনায়। তখনই বোধ হয় প্রেমের মন বদলাতে শুরু করে। আর বিংশ শতাব্দীতে প্রবেশ করে প্রেম তার খোলনলচে বদল করলো। বদলে গেল আবেগ প্রকাশের ভাষা, ডাক। হয়তো তাই ‘প্রিয়তমাষু’ সম্বোধনের জায়গা দখল করে নিয়েছে ‘হাই হট’। ভালোবাসি শব্দের বদলে ফেসবুকে লাইক চিহ্নটাই হয়ে উঠেছে প্রেমের ধ্রুবতারা।
তাহলে এই একবিংশ শতাব্দীতে হৃদয় বৃত্তান্ত কি শেষ হয়ে গেল? মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের নায়িকা কুসুমকে শশী প্রশ্ন করেছিল,‘তোমার কি মন নাই কুসুম?’এখনো কি এই সময়ে দাঁড়িয়ে আমাদের ভালোবাসার দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিতে হবে ‘তোমার কি মন নাই?’ হয়তো আছে মন। অবিশ্বাস আর সামাজিক অবক্ষয়ের চোরাস্রোতে পড়ে সে মন কঠিন শিলার আকৃতি ধারণ করেছে। এই ‘শপিং মল’ কালচারের ঝলমলে আলো আর কফি জয়েন্টে কফির ঘ্রাণে ভাসতে ভাসতে এই ভালোবাসার শরীরেও নেমেছে অন্য ধরণের শীত। একদিন হয়তো কোন এক বসন্তের দিনে খালি খালি লাগা সন্ধ্যায় হৃদয় আবার খুঁজে পাবে তার নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব নির্জন।

নয়ন আহমেদ
তথ্যসূত্রঃ ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments Box