হেমন্তে ফুরিয়ে যাওয়া সেই প্রেম

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ফ্যানি ব্রনের সঙ্গে জন কিটসের দেখা হয়েছিলো ১৮১৯ সালের মার্চে। তখন ইংল্যান্ডে শীতের আড়ামোড়া কাটেনি পুরোপুরি। কখনো বৃষ্টিও ঝরছে।কখনো মেঘ কেটে ভেসে উঠছে রোদ।জন কিটসের ছোট ভাই টমকে কিছুদিন আগে কেড়ে নিয়েছে যক্ষ্মা।একমাত্র ভাইকে হারিয়ে কবি তখন শোকে বিহ্বল।  ১৮১৮-র ডিসেম্বর মাসে নিঃসঙ্গ শোকাতুর জনকে বন্ধু ব্রাউন প্রস্তাব দিলেন তাঁর বাড়িতে এসে থাকার। দুঃখ ভুলতে বন্ধুর ভাড়াটে হিসেবেই থাকতে এলেন কিটস। কবি হিসেবে শুরু করলেন নতুন জীবন। এর আগে প্রকাশিত ‘এন্ডাইমিয়ন’-এর ওপর রক্ষণশীল সমালোচকদের কুৎসিত আক্রমণের স্মৃতি ঝেড়ে ফেলে আবার লিখতে শুরু করলেন। মাসচারেক পর ওখানকারই এক প্রতিবেশীর বাড়িতে ভাড়াটে হিসেবে উঠে এলেন বিধবা মা, ভাই আর বোনের সঙ্গে— ফ্যানি। দেখা হলো দু’জনের। তখনই দু’জনের প্রেমের সূচনা হয়নি। মাঝে মাঝে দেখা হলে কথা বলতেন ফ্যানি ব্রন এই তরুণ কবির সঙ্গে। সেই আলাপ ধীরে ধীরে গড়ালো প্রেমে। উচ্ছল আর মধুর বসন্তে কিট্‌সের হৃদয়ে উজাড় করে এলো প্রেম আর কবিতা। কিটস লিখলেন তাঁর কালজয়ী কবিতাগুলি, বিখ্যাত ‘ওড’গুলিও। ১৮১৯-এর এই সৃষ্টিসম্ভার পরবর্তী সময়ে তাঁকে ইংরেজিতে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক কবিদের অন্যতম হিসেবে স্থান দিয়েছে।

কিন্তু তাদের ভালোবাসায় শুধু গোলাপ ফোটেনি। চেতনায় ফুটেছিলো গোলাপের কাঁটাও। সন্দেহের, ঈর্ষার কাঁটা। অনুরাগীর অভাব ছিলো না ফ্যানির। তাদের প্রতি চঞ্চল ফ্যানির মনোযোগ, স্থানীয় মিলিটারি ব্যারাকে নাচের অনুষ্ঠানে তার নিয়মিত যোগদান কিট্‌সের চোখ এড়ায়নি তখন।  কবির হৃদয়ে ঘনিয়ে এলো গভীর বেদনার মেঘ। হৃদয়ের এই রক্তক্ষরণ যাতে কবিতা চর্চায় বাধা হয়ে না-দাঁড়ায় তাই হঠাৎ লন্ডন ছাড়লেন। গেলেন পোর্টসমাউথ, উইনচেস্টার ও আরও কয়েকটি জায়গায়। কবিতার সঞ্চয় বাড়লো। তবে দূরে থেকেও প্রিয়ার উদ্দেশে চিঠি লেখা বন্ধ হয়নি।

ফ্যানিকে লেখা কিট্‌সের প্রেমপত্রগুলি তাঁর মৃত্যুর ৫৭ বছর পর, ১৮৭৮ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। তত দিনে জন কিটস কবি হিসেবে বিখ্যাত। বই প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে হইহই পড়ে যায় ইংল্যান্ড ও আমেরিকায়। অকালপ্রয়াত কবির অজানা প্রেমকাহিনি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। সমালোচকরা বলতে শুরু করে, ভিক্টোরীয় রুচির বিচারে এই বই কি প্রকাশযোগ্য! কবির একান্ত ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি জনসমক্ষে এনে ফেলার জন্য নিদারুণ আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয় বইটিকে। ফ্যানি ১৮৬৫-তে মারা গিয়েছেন।তবে ছাড় পেলেন না তিনিও। অনেকে কিট্‌সের রুচি সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেন। ১৮৮৫ সালে বিখ্যাত নিলাম সংস্থা সুদবি-র নিলামে উঠল চিঠিগুলো। দাম হাঁকা হলো ৫৪৩ পাউন্ড। ক্ষুব্ধ অস্কার ওয়াইল্ড তাঁর এক কবিতায় এই নিলামকে এক কবির অন্তরের স্ফটিকপাত্র ভেঙে ফেলার সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবেষকদের কাছে চিঠিগুলো আলাদা গুরুত্ব পায়। কিট্‌সের চিঠিগুলোর মধ্যে ব্যক্তিগত মালিকানায় থেকে যাওয়া শেষ চিঠিটি ২০১১ সালে লন্ডনের সিটি কর্পোরেশন কিনে নেয় ৯৬,০০০ পাউন্ড দিয়ে।

ফ্যানিকে লেখা চিঠিগুলো অমর হয়েছে তাঁর অনুভূতির তীব্রতার জন্য, যা ছিলো কিটসের কবিতারও বৈশিষ্ট্য। একটি চিঠিতে কিটস লিখছেন, ‘‘আমরা যদি প্রজাপতি হতাম আর শুধু তিনটে গ্রীষ্মের দিন বেঁচে থাকতাম! তোমার সঙ্গে তিনটে তেমন দিন ভরিয়ে ফেলতাম এমন আনন্দে, পঞ্চাশটা সাধারণ বছরেও যে আনন্দ মিলত না।’’ আর-একটি চিঠির ভাষা আরও আবেগকম্পিত: ‘আমি তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকতে পারব না।… মানুষ ধর্মের জন্য মরতে পারে ভেবে আমি অবাক হয়ে গেছি… কেঁপে উঠেছি। এখন আমি আর কেঁপে উঠি না। আমিও মরতে পারি আমার ধর্মের জন্য। প্রেম আমার ধর্ম, আমি তার জন্য মরতে পারি। আমি তোমার জন্য মরতে পারি। এই ভালবাসা ছাড়া আমি শ্বাস নিতেও পারি না।’

১৮২০ সালে যক্ষ্মার লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরে তার চিঠিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে সন্দেহকাতর প্রেমিকের অস্থিরতা— ‘‘যে দিন থেকে তোমার সঙ্গে পরিচয়, সে দিন থেকে একটা আশঙ্কা আমার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার কারণ— তুমি যদি ক্রেসিডার মতো হও!’’ শেক্সপিয়রের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন কিটস। ট্রয়ের যুদ্ধের পর লেখা শেক্সপিয়রের কবিতা ‘ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা’ থেকে বিশ্বাসভঙ্গকারী ক্রেসিডার উদাহরণ দিয়েছিলেন তিনি। ফ্যানিকে লেখা তাঁর শেষ চিঠিতে নিজেকে তিনি হতভাগ্য হ্যামলেটের সঙ্গে তুলনা করেন। চিঠিটা লেখা হয়েছিলো ১৮২০-র ৮ আগস্ট।

কিটস হ্যাম্পস্টেডে ফিরে আসেন একই বছরের অক্টোবর মাসে। আবারও তাঁর দেখা হয় ফ্যানির সঙ্গে। ভালোবাসার ভাঙা আয়নায় যুগল আবারও নিজেদের ছায়া দেখেন। কিটস বিয়ে করতে চান ফ্যানিকে। কিন্তু ফ্যানির মা চালচুলোহীন এক কবির হাতে মেয়েকে তুলে দিতে রাজি নন। শেষে জয় হয় ভালোবাসার। এক ধূসর হেমন্ত উজ্জ্বল হয়ে ওঠে দু’জনের কাছে আসার গল্পে। বাগদান সম্পন্ন হয়ে যায় কিটস আর ফ্যানি ব্রনের।

বাগ্‌দানের ক’দিন পরেই নিশ্চিত মৃত্যুর ছায়া এসে দাঁড়ালো কিটসের শিয়রে। অপূর্ণ প্রেমের বেদনা মনে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করলো কবির।  সঙ্গী শারীরিক অসুস্থতা। সংক্রামক ব্যাধি, তাই ডাক্তার এবং বন্ধুবান্ধবরা পরামর্শ দিলেন ফ্যানির সঙ্গে যথাসম্ভব কম দেখা করতে। কিন্তু হৃদয়ের আকুতি নিষেধ মানবে কেন? মা ও ব্রাউনের আপত্তি সত্ত্বেও ফ্যানি প্রতিদিন পাশের বাড়িতে মুহূর্তের জন্য হলেও এক বার দেখা দেবেই। হাতে দু’-একটি কথা লেখা ছোট্ট চিরকুট। উল্টো দিক থেকেও পৌঁছত চিরকুট। কিটসকে লেখা ফ্যানির চিঠিগুলোও হারিয়ে গেছে, অকালে শেষ হয়ে যাওয়া কবির জীবনের মতোই।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ আনন্দবাজার, দ্য গার্ডিয়ান
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments