হেমন্তে ফুরিয়ে যাওয়া

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

হেমন্তকাল মনে হয় ফুরিয়ে যাওয়ার সময়? কে বললো? ওই যে, হেমন্তের কথা কাউকে সহজে বলতে শোনা যায় না তাই মনে হলো।বসন্তের বন্দনায় সবাই মুখর। শীতের অপেক্ষা আর বর্ষার মুখরতা নিয়েও কত শব্দ পুড়ে যায় কবিদের কবিতায়। কিন্তু হেমন্তের বিকেলে যে কী ম্লান হলুদ আলো জ্বেলে একটু একটু করে মরে যেতে থাকে তার খবর কে রাখে? সন্ধ্যার আকাশে সবকিছুকে একা করে দিয়ে মৃগশিরা নক্ষত্রের দেখা মেলে চাঁদের পাশে তার উপস্থিতির কথাও অবহেলার খাতায় রয়ে যায়।তবু পৃথিবীতে হেমন্ত আসে। আসে আমাদের এই নগরেও। কিন্তু বিশাল ফ্লাইওভার, ছুটে চলা গাড়ির হর্নের আর্তনাদ,জনতার জঘন্য মিতালিতে ভরে ওঠা এই মহানগরে কোথায় বসবে হেমন্তকাল। তার জন্য তো কোনো আসন পাতা হয়নি।

কে জানে হেমন্তের সময়কে? নিভু নিভু হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের চেম্বারের বেঞ্চিতে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি মনে রাখেন হেমন্তের কথা? তাকে তো আসন্ন শীতের আগেই গুছিয়ে রাখতে হবে নিজের সামান্য কাপড়, কাঁথা, গত বছরের রোদের গন্ধমাখা বাঁদরটুপি। যে লোকটা ওষুধের দোকানের সামনের সিঁড়িতে ঘুমায় তারও মাথায় নানান ভাবনা জমা হয় হেমন্তকালে। হেমন্তের রাতগুলি একা, একটু বেশি দীর্ঘ জানে সে খবর চায়ের দোকানের একটু বেশি কাছে বসে থাকা পথের কুকুর।অনেক রাতে একা বাড়ি ফেরা মানুষটির মতো তাকেও জানতে হয় এইসব রাত ভুতুড়ে আর মায়াময়। হেমন্তের মাস বৃষ্টি-ফুরানো মাস। তাই থেকে থেকে অকারণে হুহু করে মন। অকারণ পোড়ে।

ট্রেনস্টেশনে এত এত লোহার তৈরি আয়োজন নিয়ে পড়ে থাকে রেললাইন। দুপুরের দিকে গরম ভেদ করে উত্তর দিক থেকে হাওয়া দেয়। প্ল্যাটফর্ম ছুঁয়ে বেড়ে ওঠা নিমগাছটার পাতায় পাতায় সে হাওয়া বুনে যায় শীত আসার গল্প। রেললাইনের মতো হেমন্তে কোথায় চলে যেতে চায় মানুষের মন স্মৃতিবিদ্ধ হয়ে?কাজ ফুরানো গরীব চায়ের দোকান, ভীড় ছাড়া ডিসপেন্সারিতে তিনদিনের পুরনো পত্রিকা, সেলুনে কাঁচি চলার কুটকুট শব্দ তাকে কী মনে করিয়ে দেয় কেউ রেডিও শুনছে অতীতকালে? সাইকেলে চেপে বাড়ি ফিরছে কেউ সুদূর কোনো হেমন্তকালে?

হেমন্ত তো শহর থেকে দূরে, অনেক দূরে ধানক্ষেতের উপর কুয়াশার আবছায়া চাদর, পুরনো রাস্তা পার হতে গিয়ে নাকে আসা কাঠ অথবা পাতা জ্বালানোর ভুষো গন্ধ। শীতের মতো তার নেই উৎসবের আয়োজন, নেই বসন্তের হাঁকডাক।সে ক্ষণস্থায়ী; কাফকার লেখাগুলোর মতো। বুকের ভেতরে কেমন টান ধরে থাকে, কিন্তু মনে হয় কতকিছুই তো চোখ এড়িয়ে থেকে গেলো।জীবনানন্দ দাশের কবিতা পড়তে পড়তে যেমন মনে হয় সব কবিতাই তিনি হয়তো হেমন্তকালে বসে লিখেছিলেন।

হেমন্তকালের কোনো এক ভোরবেলা বের হয়ে পড়ি আমরা কেউ কেউ। বাস আমাদের উড়িয়ে নিয়ে যায় শহর থেকে দূরে। সেখানে জলের সবুজ ঘ্রাণ মাখা পুকুরে দলবেঁধে নেমে যায় হাঁসের দল, ভেসে আসে কীর্তন গান দূর থেকে।কাদের উঠানে উদাসী আলোয় শুকায় কার শাড়ি? আমরাও কি পথ হেঁটে যেতে যেতে থমকে যাই মৃত পাখি আর সাপের খোলস দেখে?হেমন্তকাল ফুরিয়ে যাওয়ার-ই সময়।

ইরাজ আহমেদ
ছবিঃ গুগল        

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]