হে জীবনসঙ্গী, জেনে রেখো আমি তোমার দ্বিতীয় সত্তা

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

শিল্পী কনকচাঁপা এবার গানের পাশাপাশি প্রাণের বাংলার পাতায় নিয়মিত লিখছেন তার জীবনের কথা। কাটাঘুড়ির মতো কিছুটা আনমনা সেসব কথা, হয়তো কিছুটা অভিমানিও। কিছুটা রৌদ্রের মতো, খানিকটা উজ্জ্বল হাসির মতো।

জন্মের পর থেকেই বাবা যেদিন জানতে পারলেন আমি গাইতে পারি তখন থেকেই আমার আর নিস্তার ছিলো না।আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার ও কোন ব্যাপার ছিলো না।গানের জন্য ছিলো আব্বা আর বড় মামার চাপ আর পড়াশোনার বাইরেও আরও পড়াশোনা, ইহজাগতিক অত্যাবশকীয় জ্ঞান ও ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন ও প্রয়োগ এর জন্য ছিলো আম্মার চাপ।চাপে চাপে আমার চ্যাপ্টা হওয়ার জোগাড় কিন্তু আমি লোহার মতো শক্ত, আমাকে চিড়েচ্যাপ্টা করা এতো সোজা ছিলো না।ভেতরে ভেতরে অনেক কষ্ট হলেও হাসিমুখে সব চাপ সয়ে গেছি।তারপরে পড়েছি জীবনসঙ্গীর চাপে। তিনি আরও বেশি কঠিন। কাটা কম্পাস এর মতো সুক্ষ্ম তার হিসাব। অনেক সময় তাকে অনেক বেশি গার্জিয়ান মনে হয়েছে যতটা না তিনি স্বামী ছিলেন। আমি যেন এক তাল কাদামাটি। সবাই তার মতো করে গড়ে নিতে চায়। কিন্তু আমি আমার নিত্যকার জীবনের হাসি আনন্দ কোন কিছু থেকেই নিজেকে সরিয়ে নেইনি।যতটুকু পেরেছি সংসার করার আনন্দও শুষে নিয়েছি।মাঝেমধ্যে মনে হয়েছে আমি যেন এক টুকরো স্পঞ্জ।আশপাশের সব কিন্তু শুষে নিজের করে নেই। পঁচানব্বই সালে শ্রদ্ধেয় গীতিকবি সুরকার আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাই আমাকে দিয়ে গাইয়েছিলেন লাভস্টোরী ছবিতে ‘কত মানুষ ভবের বাজারে’।

গানটা তিনি প্রডিউসার ডিরেক্টরদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জ হিসেবে আমাকে দিয়ে গাইয়েছিলেন। ফোক ধাঁচের এই গানটি নাকি আমি গাইতেই পারবো না! বুলবুল ভাই বলেছিলেন ভাবী দম থাকবে তো? আমি হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়িয়ে নীরব ছিলাম কিন্তু ভাবছিলাম সেই যে জন্ম নিয়ে দম নিয়েছিলাম বাবা মা ওস্তাদজী আর স্বামীর নজরদারিতে আর কি দম ছেড়েছি আমি! তারমধ্যে আস্ত সংসার, থালাবাটি, আদা রশুন, কেউ কি কখনো বুঝতে পারে আমি আদৌ কেমন আছি! এক দুই টেকেই গেয়ে দিয়েছিলাম। তার বিনিময়ে নির্দিষ্ট কিছু সম্মানী ছাড়া আর কিছু আশাও করিনি।

৯৮ সালের মাঝামাঝি, দিন তারিখ আমার মনে নেই। ভোরের আলো ফুটেছে অনেক আগেই, রান্নাঘর থেকে ডিম পরোটা ভাজার গন্ধ নাকে আসছে।ভাবছি আর একটু গড়াগড়ি করবো নাকি উঠে পড়বো! বাপের বাড়িতে সারাজীবন আব্বার যন্ত্রণায় সুবহে সাদিক এ জাগা মানুষ স্বামীর করতলে এসে ভালোই অবনতি হয়েছে। আমি নিয়মিতই ঘুম থেকে উঠি বেলা দশটায়।শুধু আরাম করে ঘুমানোর জন্যই ছেলেমেয়েদের ডে শিফট এ ভর্তি করিয়েছি।কি করবো! মঞ্চানুষ্ঠান হোক, রেকর্ডিং হোক ঘুমাতে ঘুমাতে সব দিনই রাত একটা দুইটা বাজেই।আর একজন কণ্ঠশিল্পীর কণ্ঠের মাখনের জন্য বাড়তি ঘুম খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

যাইহোক, আড়মোড়া দিতেই সস্নেহে একটি চুমু আমার ঠোঁটে! আমি বিস্মিত! কি হইলো! চোখ মেলে দেখি অসম্ভব আনন্দিত মুখ আমার জীবনসঙ্গীর।ঘুম থেকে জেগে পেপার পড়ে তিনি প্রথম আলোতে জানতে পেরেছেন যে ৯৫ সালের লাভস্টোরী ছবিতে কতো মানুষ ভবের বাজারে গান গাওয়ার জন্য আমি শ্রেষ্ঠ গায়িকা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছি। আমি স্পষ্ট দেখলাম আমার জীবনসঙ্গীর গাল ব্লাশ করছে।আনন্দে চোখ ছল ছল করছে তাঁর। আমি জাতীয় পুরষ্কার এর চেয়ে তার এই স্নেহ চুম্বনটাকেই বড় পুরষ্কার গন্য করে ঝিম মেরে গেলাম। উনি বলে চলেছেন তুমি কি বুঝতে পারছো কি পেয়েছো? আমি বুঝতে পেরেছি,এবং এটাও বুঝতে পেরেছি আমি আর তিনি দুই দেহ একপ্রাণ, কিন্তু আমি আসলে ওনার আনন্দে বিস্মিত, একটা মানুষ কতটা ভালোবাসলে নিজের ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করে আরেকজনকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে তার সাফল্যে এভাবে উদ্ভাসিত হতে পারেন! অথচ শুধু এই ক্যারিয়ারের সাফল্যের পারস্পরিক বিরোধে একই প্রফেশনে থাকা কতো জুটি ভেঙে যায়! দুপুরের মধ্যেই শুভাকাঙ্ক্ষী, ভক্তদের, শিল্পীদের ভালোবাসায় ফুলে ফুলে মিষ্টি, কেক দিয়ে আমার ঘর ভরে গেলো। শাকিলা আপা খুব সুন্দর ফুল শাড়ি পারফিউম পাঠিয়ে ফোন দিয়ে অন্তরের অন্তস্থল থেকে ভালোবাসা জানালেন। আম্মা আব্বা রত্নাপা, আমার ভাশুর- জা, সবাইকে দিয়ে আমার ঘর ভরে গেলো। আব্বা এসে আমার মাথা তাঁর বুকে চেপে অনর্গল সুরা পড়ছিলেন আর কতক্ষণ পর পর বলছিলেন “আমার গানের পাখি আমার গানের পাখি ” আমার চোখের নোনা পানিতে আব্বার দাড়ি বুক ভিজে একাকার। আমার আনন্দ জাতীয় পুরষ্কার এর জন্য নয় আমার আনন্দ তাঁদের সবার কষ্ট লাঘব করে আনন্দাশ্রু এনে দিতে পেরেছি বলে! আমার মনে হলো গানটা গেয়ে ইথারে একটা প্রশ্ন রেখেছিলাম আজ তার প্রতিউত্তর পেলাম। যদিও প্রতিউত্তর না পেলেও দায়িত্ব পালন হিসেবে গান আমি গেয়েই যেতাম। তারপর ও একজন শিল্পীর জীবনে জাতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্রের গানের জন্য সর্বোচ্চ পুরষ্কার সব শিল্পীরই আরাধ্য।আমি মোটামুটি গানের পেশাদার জীবনের প্রথম দিকেই তা পেয়ে গেলাম আলহামদুলিল্লাহ।আমাদের কতো গুনী শিল্পী আছেন যারা সারাজীবন গান গেয়েও এই পুরষ্কার তাঁদের পাওয়া হয়ে ওঠেনি সে দিক থেকে আমি বেশি ভাগ্যবান। কিন্তু আমি তারচেয়েও আমার জীবনসঙ্গীর উচ্ছ্বাস, বাবার কান্না আর পুরো পরিবারের সমর্থন উপলব্ধি করে নিজেকে ভীষণ ভাগ্যবান বলে আবিষ্কার করলাম।আলহামদুলিল্লাহ।

ছবি: লেখকের ফেইসবুক থেকে

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]