১০২ বছর আগের স্প্যানিশ ফ্লু ছিলো করোনার সহোদর

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

করোনা রোগের নাগপাশে পৃথিবী এখন বন্দী। অসুখের দানব গোটা পৃথিবীজুড়ে তার আস্ফালন চালিয়ে যাচ্ছে। আর মানুষ খুঁজে ফিরছে এই অসুখের তাণ্ডব থামানোর উপায়। বৃটেনের স্বাস্থ্য বিভাগ এখন করোনার বিরুদ্ধে একটি লাগসই স্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলার চিন্তা থেকে ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছে। ১৯১৮ সালে গোটা পৃথিবীতে প্রায় ২০ থেকে ৫০ লক্ষ মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া সেই ভয়ংকর ‘স্প্যানিশ ফ্লু’-এর কালো অধ্যায় পাঠ করে তারা দেখছেন এই আধুনিক পৃথিবীতে কোভিড-১৯-এর মতোই ছিলো সেই স্প্যানিশ ফ্লু-এর গতিপ্রকৃতি। তখনও বৃটেনের স্বাস্থ্য বিভাগ মানুষকে কঠোর ভাবে ঘরে থাকার পরামর্শ দিয়েছিলো। বড় জনসমাগম আর ভিড় এড়িয়ে চলার নির্দেশনা জারি করা হয়েছিলো। তখন পৃথিবী জুড়ে বেজে উঠেছিলো প্রথম বিশ্বযদ্ধের দামামা। আর তার মাঝেই আঘাত হেনেছিলো সেই মারাত্নক জ্বর। ইংল্যান্ডের রয়্যাল সোসাইটি অফ মেডিসিনে‘র স্যার আর্থার নিউজহোম ১৯১৯ সালের প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘রোগটি সেনাপরিবহনের জন্য ব্যবহৃত গাড়ি, বাস, ট্রেন আর কারখানার ভিড়ে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে।’ পাশাপাশি ওই রিপোর্টে অসুখের ভয়াবহতার কথা ভেবে সাধারণ মানুষকে বাড়িতে থাকার এবং ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়া হয়েছিলো। তবে রিপোর্টে স্যার আর্থার এটাও লেখেন ‘স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি হলেও জরুরি প্রয়োজনে মানুষকে কাজ করে যেতেই হবে।’

এই ভয়ানক জ্বরের ভাইরাসটির নাম ইনফ্লুয়েঞ্জা ‘এ’ ভাইরাস বা এইচ-২, এন-১ ভাইরাস।

১৯১৮ সালে জ্বর অথবা নিউমনিয়ার মতো রোগ প্রতিরোধ করার মতো অ্যান্টিবায়োটিক ওষুধ ছিলো না। ফলে  স্প্যানিশ ফ্লু নামের সেই জ্বরে আক্রান্ত হয়ে প্রচুর মানুষ আশ্রয় নেয় হাসপাতালে। লক্ষ্যনীয় বিষয় হচ্ছে সেই সময়ে ইংল্যান্ডে এখনকার মতো লকডাউন ব্যবস্থা আরোপ করা না-হলেও বহু সিনেমা হল, চার্চ, নাট্যশালা বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো। কিন্তু এখনকার স্পেনের মতো তখন ইংল্যান্ডে বন্ধ হয়নি ঘরোয়া ফুটবল লীগের খেলা। মহিলাদের ফুটবল খেলাও চলছিলো স্বাভাবিক নিয়মে আর তাতে খেলা দেখতে আসা হাজার হাজার নির্বোধ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলো সেই প্রাণঘাতী অতিমারী। তবে যুদ্ধের সময় বলে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন শহরের পানশালাগুলো খোলার সময়ের উপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়। এখনকার মতো ১০২ বছর আগে কোনো শহরের রাস্তায় কিটনাশক ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়েছিলো। কোনো কোনো মানুষ রোগের দূষণ থেকে বাঁচতে মুখে মাস্ক পরতো।কিন্তু অতিমারীর সেই দুঃসহ দিনগুলিতে ইংল্যান্ডের জীবনযাত্রা বয়ে চলছিলো এক ধরণের স্বাভাবিক গতিতেই।

রোগে ভোগা বৃটেনের তখনকার সমাজেও ২০২০ সালের মতোই ছিলো গুজবের ছড়াছড়ি। বিভিন্ন পত্রিকায় তখন উদ্ভট সব খবর প্রকাশিত হতো অসুখ বিষয়ে। মানুষের মধ্যেও ছিলো স্বাস্থ্য বিষয় নিয়ে নানা ধরণের অজ্ঞতা।জ্বর ঠেকাতে কোনো কোনো কারখানার মালিক শ্রমিকদের জন্য কারখানার ভেতরে ধুমপান উন্মুক্ত করে দিয়েছিলো।পাশাপাশি বিভিন্ন ধরণের প্রচারপত্র বিলি করে জনসাধারণকে বোঝানোর চেষ্টা ছিলো অন্যের হাঁচি-কাশি থেকে সতর্ক থাকতে।

নিউজ অফ দ্য ওয়ার্ল্ড নামে একটি পত্রিকায় ১৯১৮ সালের নভেম্বর মাসে  খবর ছাপা হয়, এই জ্বর থেকে দূরে থাকতে মানুষকে নিজের নাকের ভিতরটা সাবানপানি দিয়ে পরিস্কার করতে হবে। পত্রিকাটিতে মানুষকে কাজের জায়গা থেকে হেঁটে বাসায় ফেরারও পরামর্শ দেয়া হয়।

তখন পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ছড়িয়ে পড়েছিলো স্প্যানিশ ফ্লু। সেই ভয়ংকর সময়ে আমেরিকার বেশ অনেকগুলো রাজ্যে লকডাউন ব্যবস্থা চালু হয়েছিলো, মাস্ক পড়া ছিলো নাগরিকদের জন্য বাধ্যতামূলক। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলো সিনেমা হল, পার্ক এবং বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র। সেবার সেই প্রাণঘাতী অতিমারীর মোকাবেলায় আমেরিকায় সবচাইতে ভালো অবস্থানে ছিলো নিউইয়র্ক শহরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা। এখন এই ২০২০ সালে করোনাভাইরাসের সংক্রমণে লক্ষাধিক মানুষের মৃত্যুর দুঃস্বপ্ন বুকে নিয়ে সবচাইতে নাজুক অবস্থায় আছে এই শহরটি। অথচ ১০২ বছর আগে এই শহরে মানুষের মৃত্যুহার ছিলো সবচেয়ে কম। চিকিৎসকরা মনে করছেন, তখন নিউইয়র্ক ২০ বছর ধরে যক্ষারোগের বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছিলো। ফলে এ ধরণের প্রাণঘাতী অসুখের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিরোধ ব্যবস্থা ছিলো কঠোর। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে ১৯১৮ সালের নভেম্বর মাসে নিউইয়র্ক শহরের স্বাস্থ্য কমিশনারের উপর রাজনৈতিক চাপ আসে বন্ধ করে রাখা বিভিন্ন সিনেমা হল ও বিনোদন কেন্দ্র খুলে দেয়ার জন্য।

স্প্যানিশ ফ্লু নামের জ্বরটা তখন স্পেনের মানুষকে কাবু করে ফেলেছিলো। তাই এই অদ্ভুত এবং মারাত্নক জ্বরের নাম রাখা হয়েছিলো স্পেনের নাম জুড়ে দিয়ে।এই কালান্তক জ্বরের তীব্রতা বেড়ে গেলে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষ মুখে মাস্ক পড়া শুরু করে চিকিৎসকদের পরামর্শে। কিন্তু তারপরেও এই মুখবন্ধনী পরিধান করতে তখনকার মানুষদের ছিলো আপত্তি। এক জরীপে দেখা গেছে পুরুষরা নারীদের চাইতে বেশি আপত্তি জানাতো মাস্ক পরার বেলায়। এ জন্য তখন বিভিন্ন দেশের সরকার পত্রপত্রিকা এবং প্রচারণাপত্রে বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহারের নির্দেশনা দিচ্ছিল।মদেশের নাগরিকদের কাছে যত্রতত্র থুতু ফেলা বন্ধ করার জন্যও নির্দেশ দেয়া হচ্ছিল। তখন আমেরিকার বিভিন্ন রাজ্যে এক শ্রেণীর মানুষ এই মাস্কের বিরুদ্ধে ক্ষেপে ওঠে। তাদের কথা চিলো, বাধ্যতামূলক মাস্ক ব্যবহার তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে হরণ করছে।

তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে ফিরে আসা সৈনিকরাও ব্যাপক ভাবে এ রোগটির সংক্রমণ ঘটিয়েছিলো নিজেদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ বিবিসি

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]