৫০-এ ফেলুদা অ্যান্ড জেমস বন্ড

দুজনেই এ বছর ছুঁয়ে দিয়েছে ৫০-এর ফিনিশিং লাইন। কিন্তু শিল্পীর তুলিতে অথবা সিনেমার পর্দায় দুজনেরই মুখে নেই বয়সের ছাপ, আছে বুদ্ধির ধার, ঝকঝকে দৃষ্টি, এক ধরণের নিষ্ঠুরতা আর ব্যক্তিত্ব। দুজনেই গোয়েন্দা। বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে অমরত্ব কব্জা করে নিয়েছে। বলছি ফেলুদা আর জেমস বন্ডের কথা। একজন অনন্য চলচ্চিত্রকার এবং লেখক সত্যজিৎ রায়ের সৃষ্টি, বাঙালী পাঠকের পাশের বাড়ির গোয়েন্দা চরিত্র প্রদোষচন্দ্র মিত্র ওরফে ফেলুদা আর অন্যজন সারা দুনিয়ার স্পাই থ্রিলার গল্পের পাঠকদের হিরো জেমস বন্ড।
এ বছর গল্পের সূচনার সূত্রে এই দুই অনন্য চরিত্র ৫০ বছর বয়স অতিক্রম করলো। বাংলা মাসের হিসেবে পৌষ-মাঘ মাসের মধ্যবর্তী কোন এক সময়ে এই দুটি গোয়েন্দা-স্পাই চরিত্রের জন্ম হয়।
এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ রচনার আয়োজন এই দুই অসাধারণ চরিত্রকে নিয়ে। যারা গোয়েন্দা উপন্যাস এবং সিনেমার চরিত্র হয়েও পাঠকের হৃদয়ে বাস্তবের চাইতেই বেশী কোন মানুষে পরিণত হয়েছে। ভালোবাসা কুড়িয়েছে।

back2ফেলুদার ৫০ বছর উপলক্ষ্যে ইতিমধ্যে কলকাতায় সন্দিপ রায়ের পরিচালনায় মুক্তি পেয়েছে ফেলুদা সিরিজের নতুন ছবি ‘ডবল ফেলুদা’। ফেলুদার দুটি রহস্য কাহিনি নিয়ে এই সিনেমা তৈরী হয়েছে। এই ছবিতে শেষ বারের মতো ফেলুদা চরিতেও্র অভিনয় করছেন খ্যাতিমান অভিনেতা সব্যসাচী চক্রবর্তী।
অন্যদিকে জেমস বন্ড নিয়েও কিন্তু মাতামাতি শুরু হয়েছে। দুবাইয়ে  গেল নভেম্বর থেকে শুরু হয়েছে ‘ফিফটি ইয়ারস অফ বন্ড স্টাইল’ নামে এক প্রদর্শনী। চলবে আগামী বছরের ফেব্রুয়ারী মাস পর্যন্ত। প্রদর্শনীতে ‘ম্যান উইথ দ্য গোল্ডেন গান’ উপন্যাসের সেই ভয়ঙ্কর ভিলেন স্ক্যারমাঙাগার ব্যবহৃত সোনার পিস্তল, ‘ক্যাসিনো রয়্যাল’ ছবিতে ড্যানিয়েল ক্রেগের ব্যবহৃত আকাশী নীল পোশাক আর বন্ড চরিত্রের ব্যবহৃত ‘অ্যাসটোনা মার্টিন’ গাড়ি সহ আরও অনেক কিছু প্রদর্শিত হবে। এর আগে জাপান, চায়না, রাশিয়া, স্পেন, লন্ডন আর মেক্সিকোতেও এই প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছিল। বারবিক্যান ও ইওএন নামে দুটি প্রতিষ্ঠান যৌথ উদ্যোগে এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে।

ফেলু মিত্তির আর জেমস বন্ড

সারা দুনিয়ায় এই জেমস বন্ড আর শার্লক হোমসের মতো দাপুটে গোয়েন্দা-স্পাইরা যখন ভয়ঙ্কর মিশন আর রহস্য সমাধানে ব্যস্ত তখন বাঙালী পাঠকের কাছে গোয়েন্দা ব্যোমকেশের পর সত্যজিৎ রায় উপস্থাপন করলেন গোয়েন্দা ফেলুদাকে। এক বাঙালী তরুণ যার প্রিয় পোশাক পাঞ্জাবী, জিন্সের প্যান্ট। কাঁধে ঝোলা ব্যাগ আর আঙুলের ফাঁকে জ্বলন্ত চারমিনার সিগারেট।ব্যাস, সঙ্গে সঙ্গে বাংলা ভাষায় গোয়েন্দা গল্পের পাঠকরা লুফে নিল এই চরিত্রকে।বেশ একটু ড্যাশি-ডেয়ারিং কিন্তু রহস্যের জট খুলতে রিভলবারের চাইতে মগজাস্ত্রের ওপর  বেশী নির্ভর করা এই গোয়েন্দা আত্নপ্রকাশের পর থেকেই পাঠকদের ভালোবাসা কেড়ে নিল।
ফেলুদার ৫০ বছরে পদার্পন উপলক্ষ্যে একটি তথ্যচিত্র তৈরী হচ্ছে পশ্চিম বাংলায়। পরিচালক সাগ্নিক গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, ‘একেবারে নতুন প্রজন্মের দৃষ্টিকোণ থেকে তথ্যচিত্রটি বানানো হচ্ছে। ফেলুদা কী করে ফেলুদা হলো, সেটাই তুলে ধরার চেষ্টা হবে এ প্রজন্মের কাছে। দ্বিতীয়ত, ফেলুদার অবাঙালি ভক্তের সংখ্যা বহু। কিন্তু তাদের কাছেও সত্যজিত রায়ের লেখক সত্তার অনেকটাই অজানা। ইংরেজি ভাষায় এই তথ্যচিত্রের মাধ্যমে সেটাও তুলে ধরার চেষ্টা করা হবে।’
এ তথ্যচিত্রে ফেলুদা’র গল্প ছাড়াও থাকবে বলিউড, টালিউড এমনকী দক্ষিণি ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিরও বিভিন্ন নামজাদা ‘ফেলুদা-ভক্ত’দের সাক্ষাৎকার। এই তালিকায় আছেন অমিতাভ বচ্চনও। টিভিতে ‘সত্যজিৎ রায় প্রেজেন্টস’ সিরিজে শশী কপুরের বদলে তারই তো প্রথম হিন্দিভাষী ফেলুদা হওয়ার কথা ছিল।
ভারতের বিভিন্ন সিনেমা হলে মুক্তি পাবে এই তথ্যচিত্রটি। তার আগে আগামী বছর ‘ফেলু-চরিত’ নামে তথ্যচিত্রটি দেখানো হবে আমস্টারডামের আন্তর্জাতিক তথ্যচিত্র উৎসব, কান ও টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসবে।
আয়ান ফ্লেমিং সাহেব দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বৃটিশ গোয়েন্দা বিভাগে কাজ করতেন। যুদ্ধের পর সম্ভবত গোয়েন্দা দফতরে কাজ করার অভিজ্ঞতার ফসল জেমস বন্ড চরিত্রটি। কিন্তু ফেলুদা? সত্যজিৎ রায় হঠাৎ জাদুকরের মতো নেই-থেকে নিয়ে এলেন এই অনন্য চরিত্রটি।তাঁর ছেলে পরিচালক সন্দীপ রায়ের ভাষ্য অনুযায়ী আসলে তার বাবাই ছিলেন ফেলুদা। সত্যজিৎ রায়ের অনেক অভ্যাস এবং স্বভাব এই ফেলুদা চরিত্রের মধ্যে মিশে আছে।দৃষ্টান্ত হিসেবে সন্দীপ রায় জানান, তার বাবা প্রয়াত সত্যজিৎ রায় চানাচুর খেতে পছন্দ করতেন। আমাদের নায়ক ফেলুদাও তাই। আবার তাঁর দাবা খেলা, বই পড়ার নেশাটাও ফেলুদাকে জড়িয়ে আছে। আবার ফেলুদার পাজামা পাঞ্জাবি পড়া অবয়ব দেখলে পড়ুয়া যে কোন বাঙালীর চোখের সামনে ফুটে উঠতে বাধ্য সত্যজিৎ রায়ের চেহারাটা।
ফ্লেমিং সাহেব অবশ্য চেয়েছিলেন তার উপন্যাসের নায়ক জেমস বন্ড হবে দুর্ধর্ষ চরিত্রের মানুষ। তবে তিনি তার উপন্যাসে ‘জেমস বন্ড’ এর কোনো বয়স উল্লেখ করেন নি। মুভিতে যে ‘জেমস বন্ড’কে দেখা গিয়েছে তার বয়স ৪০ এর উপরে এবং ব্যক্তি হিসেবে তিনি সাহসী , বুদ্ধিমান এবং নারীদের কাছে যৌনাবেদনময়ী পুরুষ। তার পোষাক-পরিচ্ছদে দেখা যায় বেশিরভাগ সময় তিনি ডিনার জ্যাকেট পড়েন। এছাড়া তার হাতে শোভা পায় রোলেক্স সাবমেরিন ঘড়ি। নৌ বাহিনীর গুপ্তচর হিসেবে যখন ইয়ান ফ্লেমিং কাজ করতেন তখন এক ব্রিটিশ গুপ্তচর ‘দুস্কো পোপোভ’ এর বিভিন্ন গুণ তাকে আকৃষ্ট করে। ব্রিটিশ এজেন্ট হিসেবে তিনি গোপনে নাৎসি গুপ্তচরদের সঙ্গে মিশে যেতেন, সংগ্রহ করতেন জার্মানদের সব গোপন খবর। ব্রিটিশদের সম্বন্ধে ভুল খবর দিয়ে নাৎসি বাহিনীকে উলটোপথে পরিচালিত করতেন। উপন্যাসের বন্ডের মতো বাস্তবের এই বন্ড দুস্কো পোপোভ খুব বিপজ্জনকভাবে বাঁচতেন। রাজকীয় জীবন যাপন করতেন। আর তার কর্মদক্ষতা ছিলো অসাধারণ। আশ্চর্য্যরকম দক্ষতায় তিনি সব বাধা দূর করতেন। ইয়ান ফ্লেমিং তার ‘জেমস বন্ড’ চরিত্রে ফুটিয়ে তোলেন সেই ‘দুস্কো পোপোভ’কে। উপন্যাসে বন্ডকে দেখানো হয় রয়্যাল নেভির একজন কমান্ডার হিসেবে, পরে যাকে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের গোয়েন্দা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিসের নাম পরিবর্তন করে এমআই৬ রাখা হয়, যার মানে অন হার ম্যাজেস্টিস সিক্রেট সার্ভিস। জেমস বন্ডের কোড হচ্ছে ০০৭। ০০ কোড শুধু সেসব এজেন্টকেই দেওয়া হয় যারা প্রয়োজনে হত্যা করার লাইসেন্সপ্রাপ্ত।
ফ্লেমিং জেমস বন্ডকে নিয়ে লিখেছেন ১২টি উপন্যাস আর দুটি ছোটগল্পের সংকলন। ফ্লেমিংয়ের মৃত্যুর পর জেমস বন্ড চরিত্রটিকে নিয়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য বই, চলচ্চিত্র, কমিকস, ভিডিও গেমস ইত্যাদি । এছাড়া জেমস বন্ড চরিত্রটিকে নিয়ে এ পর্যন্ত ২৩ টি ছবি নির্মাণ করা হয়েছে।

আড়ালের দুই নায়ক

জেমস বন্ড চরিত্রটির নামকরণ নিয়ে রয়েছে মজার গল্প। আয়ান ফ্লেমিং গোয়েন্দা গল্প লেখার সিদ্ধান্ত নেয়ার পর খুঁজতে শুরু করেন একটা যুৎসই নাম। কিন্তু খুব বেশী দৃষ্টি আকর্ষণী কোন নামও তিনি রাখতে চাচ্ছিলেন না নায়কের জন্য। শেষে হঠাৎ করেই তাঁর এক বন্ধু পাখি বিশেষজ্ঞ জেমস বন্ডের নামটা মনে ধরে গেল। খুব সাধারণ একটা ব্যাপার আছে নামের মধ্যে। এরকমটাই চাচ্ছিলেন তিনি। তখন বোধ হয় ফ্লেমিং সাহেবও ভাবেন নি এই অতি সাধারণ নামটি একদিন গোটা দুনিয়ায় এতোটাই অসাধারণ হয়ে উঠবে।
রায় পরিবারের সম্পাদনায় প্রকাশিত হওয়া প্রখ্যাত শিশু পত্রিকা ‘সন্দেশ’-এ ১৯৬৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় ফেলুদা সিরিজের প্রথম গল্প ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’।১৯৬৫ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত এই সিরিজের মোট ৩৫টি সম্পূর্ণ ও চারটি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে।
অনেকেই প্রশ্ন তোলেন, সত্যজিৎ রায় কি আসলে ফেলুদা না ফেলুদাই বহন করে নিয়ে চলেছে সত্যজিতের ছায়া? এমনিতে ফেলুদা চরিত্রটি পাঞ্জাবি-প্যান্ট পড়তে পছন্দ করে। কিন্তু বাইরে গেলে তার পোশাক হয় শার্ট ও প্যান্ট, কখনো জিন্সের জ্যাকেট। মজার ব্যাপার হচ্ছে সত্যহিৎ রায়ও এই পোশাকগুলো পছন্দ করতেন। ফিল্মের শ্যুটিংয়ে তাকেও বেশীরভাগ সময় এরকম কাপড় পড়তে দেখা যেত। এই স্রষ্টা আর তার সৃষ্টির মধ্যে আরেকটি মিল হচ্ছে সত্যজিৎ রায় তার বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের নখ কাটতেন না। একই স্বভাব দেখা যায় ফেলুদার মধ্যেও। দৈহিক গড়নের দিক থেকেও লেখক আর তাঁর সৃষ্টির মাঝে মিল পাওয়া যায়। সত্যজিৎ রায়ের উচ্চতা ছিল ছয় ফুট সাড়ে চার ইঞ্চি আর ফেলুদা লেখককের বিবরণ অনুযায়ী ছয় ফুট দুই। সত্যজিৎ রায় নিজের মাথায় গোটা দুনিয়ার খবর নিয়ে বসে থাকতেন আর লিখতেন। আমাদের ফেলুদাকেও আমরা সেই ভূমিকাতে দেখি। ফেলুদার জানার বাইরে কোন বিষয় নেই। সত্যজিৎ রায়ের পর্যটক মানসিকতার ছায়াটাও ফেলুদার মাঝে গভীর ভাবে প্রতিফলিত হতে দেখা যায়।
তবে এই কল্পনা আর বাস্তবের দুটো মানুষের মধ্যে পোশাকে একটি অমিল ছিল। সত্যজিৎ রায় কখনো চিন্সের প্যান্ট পড়তেন না। কিন্তু ফেলুদা জিন্সের প্যান্ট পড়ে।

ফেলুদার চানাচুর আর বন্ডের নারী13

গোয়েন্দা ফেলুদার সমস্ত কাহিনিই লেখা হয়েছে তার সহকারী কাম আত্নীয় শ্রীমান তপেশরঞ্জন মিত্রে‘র জবানিতে। গল্পে যাকে ফেলুদা ডাকে ‘তোপসে’ বলে। এই তোপসের মুখে ফেলুদার বিবরণ এরকম, ফেলুদা আমা্র মাসতুত দাদা। আমার বয়স চৌদ্দ আর ওর সাতাশ। ওকে কেউ কেউ বলে আধপাগলা, কেউ কেউ বলে খামখেয়ালি, আবার কেউ কেউ বলে কুঁড়ে। আমি জানি ওই বয়েসে ফেলুদার মতো বুদ্ধি খুব কম লোকের হয় আর ওর মনের মতো কাজ পেলে ওর মতো খাটতে খুব কম লোকে পারে।
তা ছাড়া ও ভালো ক্রিকেট জানে, প্রায় একশ রকম ইনডোর গেম জানে, তাসের ম্যাজিক জানে, একটু একটু হিপনোটিজম জানে, ডান হাত আর বাঁ হাত দুহাতেই লিখতে জানে।
কিন্তু ফেলুদার যেটা সবচাইতে আশ্চর্য ক্ষমতা, সেটা হলো ও বিলিতি বই পড়ে আর নিজের বুদ্ধিতে ডিটেকটিভের কাজ শিখে নিয়েছে। ও হলো-যাকে বলে শখের ডিটেকটিভ।
কিন্তু অন্যদিকে জেমস বন্ড? শত্রু ঘেরাও এই পৃথিবীতে সে একা। তার কোন সহকারীও নেই প্রাইভেট গোয়েন্দাদের মতো। বিপদের মুখে জেমস বন্ড একেবারে একা। জেমস বন্ডের গল্পে আরেকটি অবধারিত উপাদান হচ্ছে সুন্দরী নারী। বলা যায় কাহিনী ও সিনেমার বিশেষ আকর্ষণ। যেটা ফেলুদার বেলায় একেবারেই অনুপস্থিত।
জেমস বন্ডের এই নারী সঙ্গও তার মতোই খ্যাতিমান। দুনিয়া জুড়ে গণমাধ্যম এই নারীদের নাম দিয়েছে ‘বন্ড গার্ল’। সিনেমায় এই ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য তাবৎ সুন্দরী অভিনেত্রীদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পড়ে যায়। তবে এখন পর্যন্ত গণমাধ্যমের জরিপে প্রথম বন্ড মুভির নায়িকা অভিনেত্রী উরসুলা অ্যানেস্ড্রসই আবেদনময়ী হিসেবে তালিকার এক নম্বর আসন দখল করে রেখেছেন। যেমন নায়কের আসন দখল করে রেখেছেন শ্যান কনোরী। তার পাশাপাশি অবশ্য জনপ্রিয়তার পাল্লা ভারী রজার মুর ও পিয়ার্স ব্রসননের।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, রায় বাবু চানাচুর খেতে পছন্দ করতেন। তাই ফেলুদার খাবার তালিকাতেও চানাচুর ঘুরেফিরে এসেছে। এসেছে চা। বন্ড মহাশয় অবশ্য এদিক থেকে অন্য রুচির মানুষ। নারী আর বন্দুক প্রিয়তার পাশাপাশি মদ খেতে সে পছন্দ করে।বন্ডের প্রিয় পানীয়ের তালিকায় আছে আলজেরিয়ান ওয়াইন, শ্যাম্পেইন, বুরবন আর জ্যাক ড্যানিয়েলস নামে আমেরিকান হুইস্কী। ফেলুদার গল্পে পাওয়া যায় এই বাঙালী তরুণ মাছ-ভাত খেতেই বেশী পছন্দ করে। কিন্তু বন্ডের প্রিয় খাবার হচ্ছে ‘কোল্ড রোস্ট বিফ উইথ পটাটু স্যালাদ’। আয়ান ফ্লেমিংয়ের প্রিয় একটি খাবার ছিল ডিম ভাজা। ফলে বহু কাহিনিতে বন্ডকে দেখা গেছে ডিম খেতে।
সত্যজিৎ রায় নিজে ধূমপান না করলেও তাঁর এই ফেলুদা চরিত্রটির ব্র্যান্ড হচ্ছে চারমিনার। জেমস বন্ড অবশ্য ধূমপানের ব্যাপারেও বেশ রাজসিক। প্রতিদিন প্রায় ৭০ টি সিগারেট পান করে এই গুপ্তচর প্রবর। বিশেষ ভাবে বাড়তি মাত্রায় নিকোটিন মেশানো টার্কিশ টোবাকো মিশ্রিত সিগারেট তার প্রিয়। একসঙ্গে পঞ্চাশটি সিগারেট রাখা যায় এমন একটি কেস বন্ড ব্যবহার করে বন্ড, সঙ্গে কালো রঙের রনসন লাইটার। জানা যায়, ফ্লেমিং সাহেব স্বয়ং দিনে ৮০টি সিগারেট খেতেন।
ফেলুদার গল্পে রহস্য রোমাঞ্চ লেখক লালমোহন গাঙ্গুলি এক অনন্য চরিত্র বাংলা সাহিত্যের। এমন রসবোধে পরিপূর্ণ চরিত্র কম চোখে পড়ে গোয়েন্দা গল্পে। এই চরিত্রটিও ফেলুদার বন্ধু। জেমস বন্ডের কাহিনিতে অবশ্য এমন চরিত্রের কথা ভাবাই যায় না। আমাদের ফেলুদা কখনো বিয়ে করেনি। করার বোধ হয় প্রশ্নও ওঠে না। কিন্তু ভয়ঙ্কর মানুষ জেমস বন্ড একবারই পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হয়েছিল ‘অন হার ম্যাসেস্টিস সিক্রেট সার্ভিস’ উপন্যাসে। কন্যার নাম ‘ট্রেসি’। তবে বিয়ের দিনই তার জীবনপ্রদীপ নির্বাপিত হয় আততায়ীর গুলিতে।

প্রেমটা কোথায়

সাহিত্যপ্রেমী এমন কোন বাঙ্গালী খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যে ফেলুদায় মজেনি। কি নেই ফেলুদা সিরিজে? শুধুকি গোয়েন্দাগিরি? না, এতে আছে ভ্রমনের মজা, সঙ্গে ইতিহাস, সাহিত্য, সাংস্কৃতি, দর্শন.. আরো কত কি। ফেলুদার গল্পগুলো পাঠক কিংবা দর্শককে যেন থ্রি মাস্কেটিয়ার্স ফেলুদা-তোপসে-জটায়ু’র এক একটা অভিযানের অংশ বানিয়ে নেয়।আর ফেলুদার মধ্যে বাঙালীর অতি পরিচিত সেই তরুণটি তো রয়েই যায়, যার প্রতি সব ধরণের পাঠকেরই রয়েছে এক অদ্ভূত আকর্ষণ।
একই ভাবে জেমস বন্ড চরিত্রটিকে নিয়েও চলে গবেষণা। কেন বিশ্বজুড়ে পাঠক আর সিনেমাপ্রেমীরা পাগল এই চরিত্রের জন্য। কোটি কোটি ডলার ব্যয়ে কেন তৈরী হচ্ছে বন্ডের সুপারহিট সিনেমা?
আসলে বন্ড এমন একটি চরিত্র যাকে বলা চলে ‘একের ভিতর অনেক’। সিনেমা বা গল্পের অন্যান্য যেসব সুপার হিরো আছে যেমন – ব্যাটম্যান, সুপারম্যান, স্পাইডারম্যান, তাদের মধ্যে ফ্যান্টাসির পরিমাণ বেশী। আবার গোয়েন্দা শার্লক হোমস আর হারকুল পয়রোর মধ্যে কেবল রহস্যের জট ছাড়ানো। কিন্তু জেমস বন্ড একেবারেই আলাদা। তার মধ্যে আছে নারীর প্রতি আকর্ষণ, আছে নেশা, আছে সাহস, আছে বুদ্ধি। সব মিলিয়ে এক সুপার প্যাকেজ। তাই বোধ হয় তাকে নিয়ে দুনিয়া জুড়ে এতো হৈ চৈ। গল্পের চরিত্র হয়েও জেমস বন্ড পঞ্চাশেও ঝকঝকে, বিদ্ধংসী তার ব্যবহৃত ওয়ালথার পিপিকে পিস্তলের মতোই।

অথৈ আহমেদ,ছবি: ইন্টারনেট