৫০ বছরে শৈল্পিক নগ্নতার ক্যালেন্ডার ‘পেরলি’

1620ছিল রুমাল হয়ে গেল বেড়াল-সুকুমার রায় লিখেছিলেন হযবরলতে। লাইনটা কিন্তু বিখ্যাত ‘পেরলি ক্যালেন্ডার’-এর বেলায় ঠিকঠাক লেগে যায়। এই পেরলি ক্যালেন্ডার বিষয়টা কী? ইতিহাসটা বেশ মজাদার।  ১৯৬৩ সালে বৃটেনে গাড়ির চাকার ব্যবসা করতে আসে ইতালীর পেরলি নামে এক কোম্পানী। বৃটেনের প্রতিদ্বন্দ্বীতায় টিকে থাকতে হঠাৎ করেই তারা পরিকল্পনা করে নতুন বছরে ক্যালেন্ডার বের করার। তারা ডেরিক ফরসাইথ নামে এক শিল্প নির্দেশককে জোগাড় করে কাজটা করে দেয়ার জন্য। এই ডেরিক সাহেব হাজির করেন রবার্ট ফ্রিম্যান নামে এক ক্যামেরা শিল্পীকে। এই ফ্রিম্যান তখন বিখ্যাত ‘বিটলস’ ব্যান্ডের ছবি তুলে খ্যাতিমান। ব্যাস, শুরু হলো ছবি তোলা কয়েকজন বৃটিশ মডেল জোগাড় করে। বেশ খোলামেলা আর উত্তেজক সেই ছবি সম্বলিত ক্যালেন্ডার আলোচনায় উঠে এলো ইংল্যান্ডে। ‘পেরলি’ কোম্পানীকে আর পায় কে? তাদের চাকার ক্রেতা আর বিভিন্ন বাণিজ্যিক কোম্পানীতে বিলি করলো তারা। রাতারাতি সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো। তারপরের ইতিহাস কিন্তু অন্যরকম। এই ক্যালেন্ডার সাফল্যের সিঁড়ি বেয়ে এ বছর পা রাখলো প্রকাশনার ৫০ বছরে।
কে পোজ দেননি এই ক্যালেন্ডারের জন্য? সোফিয় লরেন থেকে শুরু করে ইউমা থেরন হয়ে নিকল কিডম্যান পর্যন্ত বাঘা বাঘা সব অভিনেত্রী আর মডেল স্বল্প বসনা হয়ে দাঁড়িয়েছেন ক্যামেরার সামনে। মডেলদের শরীরী সৌন্দর্য়ের ছবি সম্বলিত উত্তেজক এই ক্যালেন্ডার এখন ইউরোপের মডেলিং ফটোগ্রাফিতে যুক্ত করেছে ভিন্ন এক মাত্রা। এখন এই কোম্পানীর হয়ে ছবি তোলার জন্য এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকেন নামকরা আলোকচিত্রশিল্পীরা।
জিওভান্নি পেরলি নামে এক ইতালীয় ভদ্রলোক ১৮৭২ সালে গোড়াপত্তন করেছিলেন এই টায়ার কোম্পানীর। কর্মী ছিল মাত্র ৪৫ জন। এখন সেই কোম্পানীতে কাজ করে হাজার হাজার কর্মী। বছরে আয় হয় কোটি কোটি টাকা। সোফিয়া লরেন ২০০৭ সালে স্বল্প পোশাক পড়ে ৭২ বছর বয়সে এই ক্যালেন্ডারের মডেল হতে রাজি হয়ে মহা শোরগোল ফেলে দিয়েছিলেন। বেশ সমালোচনাও PIRELLI_CALENDARহয়েছিল তাঁর পত্রপত্রিকায়। কিন্তু তার ছবিগুলো যে যথেষ্ট পরিমাণে উত্তেজনার বাষ্প ছড়িয়েছিল তাতে কোন সন্দেহ নেই।
খ্যাতির সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ‘পেরলি’ কোম্পানীর কর্তারা আলোকচিত্রী আর মডেল নির্বাচনে মনযোগী হয়ে পড়লেন। সারা পৃথিবী খুঁজে নাম করা ফটোগ্রাফার আর মডেলদের নির্বাচন করতে শুরু করলেন তারা। ছবি তোলার জন্য জায়গা নির্বাচন করা হলো ভূমধ্য সাগরের দ্বীপ আর চীন দেশের নয়নাভিরাম সব লোকেশন। এখন বছরে এই ক্যালেন্ডারের মাত্র ৪০ হাজার কপি ছাপানো হয়। সেগুলো বিতরণ ও করা হয় তাদের টায়ার কোম্পানীর বড় বড় মক্কেলদের কাছে। এই ক্যালেন্ডারের বিশেষত্ব হচ্ছে এটি একেবারেই বাজারী পণ্য নয়। সাধারণ ক্রেতারা এর নাগাল পান না কখনোই। ক্যালেন্ডারের ছবি তোলার জন্য কোম্পানীটি রিচার্ড অ্যাভেডন, প্যাট্রিক মারিও টেসটিনো আর প্যাট্রিক ডিমারখেইলারের মতো সাড়া জাগানো আলোকচিত্রীদের নিযুক্ত করেন। তাদের ঝলসে উঠা ক্যামেরার সামনে পরনের পোশাক খুলে দাঁড়ান সিনডি ক্রফোর্ড, কেট মস আর হেলেনা ক্রিস্টিয়ানসেনের মতো দামী তারকা মডেলরা। তবে এই ক্যালেন্ডারের যাত্রাপথ সবসময় মসৃণ ছিল না। ১৯৭৪ সালে এসে তেলের বাজারে ধ্বস নামায় ‘পেরলি’ কোম্পানী অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় ক্যালেন্ডারের প্রকাশনা। এরপর প্রায় ১০ বছর আর আলোর মুখ দেখনি ক্যালেন্ডার। ১৯৮৪ সালে এসে আবার নতুন করে আত্নপ্রকাশ করে উত্তেজক ছবির এই ক্যালেন্ডার।
এ বছর অবশ্য ‘পেরলি’ ক্যালেন্ডারের ভোলই পাল্টে দিয়েছে শিল্প নির্দেশকরা। গেল সপ্তাহে মহা ধূমধাম করে প্যারিসে মোড়ক উন্মোচন করা হয় ক্যালেন্ডারটির। আলোকচিত্রী পৃথিবী খ্যাত পিটার লিন্ডেনবার্গ। তবে এ বছর যৌনতা আর উন্মোচীত শরীরের ধামাকাটাই অনুপস্থিত ছবিতে। লিন্ডেনবার্গ একেবারেই উল্টোপথে হেঁটেছেন। নারীর ভেতরকার সৌন্দর্য এবার তার ছবির বিষয়। তাই পোশাকে শরীর ঢেকে পৃথিবী খ্যাত মডেলরা পোজ দিয়েছেন তার ক্যামেরার সামনে। এই মিছিলে আছেন, পেনোলপি ক্রুজ, নিকোল কিডম্যান, রুনি মেরা, জুলিয়াস মুর, ইউমা থরম্যান, অভিনেত্রী কেট উইন্সলেট প্রমূখ। আছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের এক অধ্যাপিকাও। একটু বয়ষ্ক মুখশ্রীর ওপরও এবারের ছবিতে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে ছবিতে। ‘পেরলি’ আশা করছে এই ভিন্ন ধরণের আলোকচিত্র তাদের ক্যালেন্ডারকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে। ২০১৭ সালের এই ক্যালেন্ডারে পেরলি তাদের কোন পণ্যের ছবি মডেলদের সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছে না।

মনসুর রহমান
তথ্যসূত্র: ভ্যানেটি ফেয়ার
ছবিঃ পেরলি ক্যালেন্ডার