001100…পাসওয়ার্ড…

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

আরব্য রজনীর গল্প ‘আলী বাবা আর চল্লিশ চোর’। গল্পের চেয়েও বিখ্যাত সেই সংলাপটি-খুল যা সিম সিম অথবা চিচিং ফাঁক…ডাকা্তদের গুহার দরজা খোলার গোপন মন্ত্র। কতকাল আগে রূপকথায় উঠে এসেছে পাসওয়ার্ডের ধারণা! তখন কে ভেবেছিলো এই একবিংশ শতাব্দীর যন্ত্রশাসিত মানব জীবনে এই গোপন মন্ত্র পাসওয়ার্ড হয়ে শাসন করবে?

ডাকাতদের গুহার দরজা খুলতে আলী বাবা এই মন্ত্রই উচ্চারণ করেছিলো। এখন সেই মন্ত্রটাই কয়েকটি শব্দ বা নম্বর হয়ে আঙুলের টোকায় খুলে দিচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে শুরু করে ই-মেইলের দরজা। অদ্ভুত এক সূত্র এই পাসওয়ার্ড। সহজে তৈরি করা যায় আবার মানুষের মন সহজে তা ভুলেও যায়। একবিংশ শতাব্দীতে একজন মানুষের বহু গোপনীয়তার আবরণ এই পাসওয়ার্ড। তবে  অন্তর্জালের তস্করদের হাতে  কখনো কখনো এই পাসওয়ার্ডের গোপনীয়তা লুট হয়ে যায়। উধাও হয় অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা, চুরি যায় উধাও হয় ফোনে বা কম্পিউটারে রক্ষিত গোপনীয়তার আড়ালটুকু।

প্রতিদিন পৃথিবীতে এখন লক্ষ লক্ষ পাসওয়ার্ড তৈরি হয়। আবার আমাদের হারানো জুতা, বই, কলম, অফিসের জরুরি ফাইল, সেলফোনের মতো এই পাসওয়ার্ডও মন থেকে মুছে যায়। পাসওয়ার্ড কোথায় লেখা ছিলো কিছুতেই মনে পড়ে না। কখনো সামান্য একটি শব্দ বা নম্বরের গোলমালে দরজা খুলতে চায় না অোপনার সেই গোপন গুহার। এই পাসওয়ার্ড এখন আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে, শাসন করে। তাকে ছাড়া আমাদের জীবনের বড় একটি অংশ অচল।

এবার প্রাণের বাংলার প্রচ্ছদ আয়োজনে রইলো পাসওয়ার্ড ‍নিয়ে ‘001100…পাসওয়ার্ড’

সকালে ঘুম ভাঙার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাবার আগ পর্যন্ত এই পাসওয়ার্ডের শাসনব্যবস্থায় মানুষ কিন্তু প্রজা। অফিসে গিয়ে নিজের কম্পিউটার খুলতে পাসওয়ার্ড, ফোনে পাসওয়ার্ড, ব্যাংকের কার্ডে পাসওয়ার্ড…জীবনে কোথায় নেই কয়েকটি সামান্য সংখ্যা আর বর্ণ মিলে তৈরি হওয়া এই গোপন মন্ত্রের দাপট? যারা পাসওয়ার্ড নিয়ে গবেষণা করেন তারা জানিয়েছেন, একজন মানুষ তার গড় আয়ুর মধ্যে ৮০টি পাসওয়ার্ড তৈরি করে। এগুলোর বেশিরভাগই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। কিন্তু পাসওয়ার্ডের অস্তিত্ব কিন্তু প্রাচীনকাল থেকেই ছিলো। আলী বাবার গল্পে কিছু শব্দ মিলিয়ে রোমান সাম্রাজ্যে সেনাবাহিনীর সদস্যরা রাতে এবং দিনে পাহারা বদলের সময় সাংকেতিক শব্দ ব্যবহার করতো। এই সাংকেতিক শব্দের ব্যবহারই বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে আজকের আধুনিক পৃথিবীতে হয়ে উঠেছে অমোঘ পাসওয়ার্ড।

ফার্নান্দো করবাটো

ইংরেজ শাসনামলে সিপাহী বিদ্রোহের সময় সিপাহীরা হাতে বানানো বড় বড় রুটির ভেতরে করে গোপন সাংকেতিক বার্তা পাঠাতো এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। এই বার্তার মাধ্যমেই এক দল আরেক দলের কাছ থেকে সংকেত পেতো বিদ্রোহে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য। বিপ্লবী আর বিদ্রোহীদের মধ্যে এই সাংকেতিক বার্তা তাদের গোপন বৈঠক, অভিযান আর একে অপরের সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে গোপন চাবি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। গোপন চরমপন্থী দলের নেতাদেরও ছিলো ছদ্মনাম। এই নাম দিয়েই তারা পরিচিত হতেন দলের ভেতরে। এই ছদ্মনামের আড়ালে কখনো হারিয়ে যেতো তাদের আসল নাম। দলের ভেতরে এই নামগুলোই কখনো হয়ে উঠতো পাসওয়ার্ড। ধরা পড়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেতে তারা এ ধরণের নাম বা সংকেত ব্যবহার করতেন।

যান্ত্রিক পাসওয়ার্ড অবশ্য একেবারেই ভিন্ন বিষয়। এই সাংকেতিক কৌশল ব্যবহার করে একজন মানুষ অন্যদের কাছ থেকে একান্ত নিজস্ব বিষয়গুলো আড়াল করে রাখে। দিনে দিনে প্রযুক্তি যত এগিয়েছে এ ধরণের কৌশলের ঘেরাটোপে আটকা পড়েছে যন্ত্রের ব্যবহারকারীরা। এটিএম মেশিন থেকে টাকা তুলতে পাসওয়ার্ড প্রয়োজন। আবার হাতের সেল ফোনও থাকে পাসওয়ার্ডের সুরক্ষায়। একটি পাসওয়ার্ড নির্ধারণ করতে একজন মানুষের কতটা সময় লাগে? তারা সাধারণত কী ধরণের পাসওয়ার্ড তৈরি করেন? পাসওয়ার্ড নিয়ে গবেষণা করেন পশ্চিমা অধ্যাপক লোরি ক্রা্নর। তার মতে সবচাইতে কার্যকর পাসওয়ার্ড হচ্ছে সহজ শব্দ বা সংখ্যার সমন্বয়ে যেটা তৈরি করা হয়। এগুলো মনে রাখা সহজ। এক জরিপে দেখা গেছে ২০১৭ সালে আমেরিকার আইটি হেল্পডেস্কগুলোতে ২০ থেকে ৫৭ শতাংশ মানুষ ফোন করেছেন তাদের পাসওয়ার্ড রিসেট করার কাজে।

মানুষ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে তার নিজের সুবিধার জন্য। কিন্তু এই প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে সুবিধা নিতে নিতে সে নিজেও যন্ত্রের হাতে, নানান যান্ত্রিক কৌশলের হাতে বন্দী হয়ে গেছে। আমেরিকার কম্পিউটার বিজ্ঞানী ফার্নান্দো করবাটো ছিলেন এই পাসওয়ার্ডের আবিষ্কার কর্তা। তিনিই প্রথম কম্পিউটারকে একটি পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণের কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন। কম্পিউটারের জনপ্রিয়তা দেখে তার মাথায় প্রথম বুদ্ধি আসে সকল ডাটা এবং ব্যক্তিগত বিষয়গুলোকে একটি পাসওওয়ার্ডের মাধ্যমে সুরক্ষা দেয়ার চিন্তা। কিন্তু করবাটো‘র পাসওয়ার্ড কি রক্ষা করতে পেরেছে সবকিছু? সম্প্রতি খবর প্রকাশিত হয়েছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়েছে ৩০০ কোটির বেশি ই-মেইল ও পাসওয়ার্ড। আর তার পর থেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করেছেন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীরা। রীতিমতো আতঙ্কে সবাই। এক অনলাইন হ্যাকিং ফোরামে ৩.২ বিলিয়নের বেশি ই-মেইল ও পাসওয়ার্ড ফাঁস হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই COMB (Compilation of Many Breaches) ডেটার মধ্যে রয়েছে Netflix, LinkedIn, Bitcoin-সহ একাধিক অ্যাপের ইউজার নেম, ই-মেইল ও পাসওয়ার্ড। পরিস্থিতির মোকাবিলায় এ নিয়ে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু হয়েছে। সাইবার বিভাগের তরফে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে। সূত্রে খবর, আগামী একমাসের মধ্যে এ নিয়ে বিস্তারিত রিপোর্ট পেশ করবে সংশ্লিষ্ট কমিটি।

এ যেন এক অদৃশ্য প্রতিযোগিতা। একদল নানা কৌশলে সব আড়াল করতে চাইছে আর অন্য দল তা জেনে ফেলার কাজে ব্যস্ত। হ্যাকারদের দাপটে কম্পমান নেটদুনিয়া।

প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, এক্ষেত্রে বড়সড় সমস্যায় পড়তে পারেন ব্যবহারকারীরা। অনেক ব্যবহারকারী রয়েছেন, যাঁরা সমস্ত সাইট, অ্যাপ, সোশাল মিডিয়ার জন্য একই পাসওয়ার্ড ব্যবহার করেন। অর্থাৎ Google-এ যেই লগ-ইন পাসওয়ার্ড রয়েছে, Netflix-এ সেই একই পাসওয়ার্ড। এক্ষেত্রে হ্যাকাররা একবার একটি পাসওয়ার্ড জেনে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীর বাকি অ্যাকাউন্টগুলিও সহজেই হ্যাক করে নেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের বিপদ থেকে বাঁচার জন্য যতটা সম্ভব আলাদা ও ভিন্ন ধরনের পাসওয়ার্ড রাখা উচিত।

পৃথিবীতে বহু বড় বড় তাণ্ডব ঘটিয়েছে এই পাসওয়ার্ড। অর্থ, তথ্য হাওয়া হয়ে গেছে। গোপনয়য়তা ফাঁস হয়ে মানুওষের ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক জীবনে উঠেছে ঝড়। যা একদিন মনের মধ্যে অজানা পাসওয়ার্ডে সুরক্ষিত ছিলো আজ যন্ত্রের কারণে বেহাত হয়ে যাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত খেলা হয়তো। মানুষ নিজেই এই সুরক্ষা নীতি তৈরি করেছে। আবার তারাই সেখান থেকে চুরি করার কৌশল আবিষ্কার করতে ব্যস্ত।হয়তো মানুষ নিজেই বুঝতে অক্ষম তার মন কী চায়। সে নিজেই এখন যন্ত্রের অরণ্যে পথ হারিয়ে ভুলে গেছে তার মনের পাসওয়ার্ডটা কী ছিলো?

প্রাণের বাংলা ডেস্ক
তথ্যসূত্রঃ দ্য গার্ডিয়ান, ইন্টারনেট
ছবিঃ গুগল


প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না, তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]


Facebook Comments