মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে মুখ

বচ্চন গিরি

( কলকাতা থেকে): সময়টা ছিল ২০০৮ এর শেষ| তৎকালীন সরকারের অত্যাচার ও নিপীড়নে জর্জরিত জঙ্গলমহলের আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ| মাওবাদী তকমা দিয়ে আদিবাসী ছেলেদেরকে জেলে ভরছে পুলিশ, আদিবাসী মহিলাদের উপর চলছে শারীরিক নির্যাতন -এমনটাই অভিযোগ| সহ্যের চরম সীমা অতিক্রম করেছে ততোদিনে, তাই জঙ্গল লাগোয়া আদিবাসী অধ্যুষিত গ্রামের মানুষেরা একত্রিত হয়ে পুলিশের সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে একসময়| আদিবাসীরা শান্তিপূর্ণভাবে শুরু করে ‘গিরা বন্ধন’ -আসলে গিরা বন্ধন কি সেটাও জানা খুব প্রয়োজন| আদিবাসী সমাজে আজও প্রচলিত এই প্রথা| যদি আদিবাসী মানুষেরা একবার একত্রিত হয়ে যায় কোনও কিছুর বিরুদ্ধে তখন তারা শাল গাছে শেকড় বা কাপড় জড়িয়ে শপথ নেয় কোনও অবস্থাতেই তারা নড়বে না, যতোক্ষণ পর্যন্ত না তাদের দাবীদাওয়া পূরণ করা হচ্ছে| এইভাবে বেশ কিছুদিন আন্দোলন চালিয়ে যায় জঙ্গলমহল তথা লালগড় সংলগ্ন নেড়চা, ছোটপেলিয়া, মুড়ার, লকাট, বেলপাহাড়ি, শিলদা, নয়াগ্রাম সহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলের সাঁওতাল মানুষগুলো| ঠিক সেইসময় আদিবাসীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে,

ছৌ মুখোশ

তাদের ভুল বুঝিয়ে সরকারি সম্পত্তিতে অগ্নিসংযোগ -সরকারি পুলিশ অফিসারদের খুন, কিছু কিছু রাজনীতিবিদদের খুন করতে শুরু করে অন্য রাজ্য থেকে আগত এবং এই রাজ্যে তথাকথিত সংখ্যায় কম কিছু বন্ধুকধারী মানুষ| যাদের এককথায় বলা হয় মাওবাদী|  তৎকালীন এবং বর্তমান কিছু রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সংখ্যায় বেশি ছাত্র – ছাত্রীরা যোগদেয় পরক্ষণে এই আন্দোলনে| তবে সরাসরি নয়, পরোক্ষভাবে| গ্রামের সহজ সরল সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষ প্যাঁচ সত্যিই বোঝেনা আজও|

তাই তারা সেই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে| শুরু হয় রাস্তা কেটে, গাছ ফেলে, বিদুৎ সংযোগ ছিন্ন করে অবরোধ আন্দোলন| বলতে দ্বিধা নেই কার্যত সেই সময় সাঁওতাল মানুষগুলোর কাঁধে বন্দুক রেখে শিকার করেছিল মাওবাদী, বুদ্ধিজীবী এবং রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ| ভিন রাজ্য থেকে আসা এই মাওবাদীরা আদিবাসী মানুষদের সঙ্গে যোগ দিলো তাদের আন্দোলনে| তাদের কাঁধে সবসময় থাকতো থ্রি নট থ্রি, ইনসাস, একে৪৭ -এর মতো অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র| তৎকালীন মাওবাদীদের দাবী ছিল তারা গ্রামের অত্যাচারিত গরীব মানুষদের জন্য লড়াই করছে, তাদের ন্যায্য অধিকার দিতে হবে, প্রাপ্য সন্মান দিতে হবে| সরকারও অনড় সেই দাবী মানতে|

একটা চাপা গুমোট অন্ধকার ছেয়ে যায় বাস্তব জীবনে|  প্রায় দু বছর ধরে বনধ, অবরোধে দিশেহারা হয়ে পড়ে জঙ্গলমহলের মানুষ| প্রতিদিন সকাল শুরু হতো লাশ পড়ার খবরে| গুলি বারুদের গন্ধে ভরে গেছে তখন জঙ্গলমহলের বাতাস| রাস্তায় রাস্তায় মাওবাদী লিফলেট, চাপা রক্তের দাগ -প্রায় দিনই গুলির আওয়াজ, মাইন বিস্ফোরণের শব্দ, মৃত্যু মিছিল চলতো অহরহ| তখনও আমি ছাত্র| দিনের পর দিন স্কুল কলেজ বন্ধ, কোথাও পড়ে থাকতো শিক্ষকদের লাশ| পুলিশ ধরে আনতো ছাত্রদের মাওবাদী তকমা দিয়ে| তারপরের অংশটা ছিলো আরও ভয়াবহ| থানাগুলোর গেটে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় তালা, পুলিশদেরকে কার্যত থানা বন্দি করে রাখা হয়েছিল|

করমা পূজো

এক ভয়াবহ দিন সামনে আসতে থাকে| কতো মৃত্যু মিছিল দেখেছি তখন চোখের সামনে তা বলতে গেলে শিউরে উঠি আজও| তারপর প্রবেশ করলাম সাংবাদিকতার পেশায়| ভারতবর্ষের একটি বিখ্যাত ইংরেজি দৈনিকে শুরু হয় আমার কর্মজীবন| তখনো মাওবাদী – পুলিশ – রাজনীতির সন্ত্রাস পর্ব জোরালো| কাজের সূত্রে  জঙ্গলেই বেশিরভাগ সময় কাটতো, ফেরার কোনও নির্দিষ্ট সময় ছিলনা, পরিবারের অপেক্ষা করা মানুষগুলোকে শুধু আশ্বাস দিতাম কাজ শেষ হলেই ফিরে আসবো| কিন্তু নিজেও জানতাম মিথ্যে আশ্বাস দিচ্ছি| ফিরবো কিনা কোনও গ্যারেন্টি সত্যিই ছিলোনা| এমন অনেক গ্রাম ছিলো যেখানে চার চাকা গাড়ি বা দু চাকার মোটর বাইক নিয়েও যাওয়া ছিল দুস্কর|  অন্ধকার জঙ্গলের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে অনেক সময় গাছের সঙ্গে ধাক্কা লেগে আঘাতও পেয়েছি আমরা| জঙ্গল রাস্তায় কোথায় মাইন বিছানো আছে তাও ঠাওর করা খুব মুসকিল ছিল| তবু জীবনের পথে চলতে হয় সবাইকেই| চলার পথে কিছু মানুষের সঙ্গে পরিচয় হয়ে যায়, হয়ে ওঠে আত্মার আত্মীয়| এরকমই কিছু মানুষের সঙ্গে আমারও পরিচয় ঘটেছিল -আজ তাদের মাওবাদী তকমায় কেউ জেলে, কেউবা কোর্টে চক্কর কাটছে দিনের পর দিন আবার কেউ কেউ পুলিশের এনকাউন্টারের কবলে চলে গেছে বহুদূরে পরপারে| এই জীবন হাসি – কান্নার মিশেল| এখানে তুমি কেউনা, আমিও কেউনা -শুধু সময় শেষ কথা বলে|

       তবে যতোই সন্ত্রাস হোক, গুলি বারুদের খেলায় মশগুল থাকুক জঙ্গলমহল তবু কুড়মি ও আদিবাসী সমাজের সামাজিক রীতিতে ভাটা পড়েনি কখনো| সামাজিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সত্যিই বদলে গেছে অনেক কিছুই, বদলে গেছে মানুষের চাহিদা -কিন্তু লোকাচার সত্যিই বদলায়না কখনো তার জ্বলন্ত উদাহরণ জঙ্গলমহলের ‘করম’ পুজো| করম পুজো কি এবং কেন পালন করা হয়?

আজও ‘করম’ পূজোর আচার রয়েছে গ্রাম বাংলায়| সাংবাদিকতার চাকুরি সূত্রে মাওবাদী অধ্যূষিত পুরুলিয়া জেলায় দীর্ঘ দিন থাকতে হয়েছে| তখন কতো জীবন দেখেছি মৃত্যুর কোলে ঢলে যেতে| আঘাত পেতে পেতে পাথর হয়ে গেছি ক্রমশঃ….| আজ থেকে পাঁচ বছর আগে একদিন সারাদিন জঙ্গলে কাজ সেরে ফেরার পথে ঢুকে পড়ি এক আদিবাসী গ্রামে| জীবনে প্রথম দেখলাম ‘করম’ পূজো| সেখানকার প্রবীণ মানুষদের কাছে শুনলাম এই লোক উৎসবের গল্প|

কি সেই গল্প?

ভাদ্র মাসের বাংলার দ্বিতীয় সপ্তাহের প্রথম তিনদিন পর (এগারো দিনের দিন) শুক্লা একাদশীর দিন এই পূজো হয়| কথিত আছে  একদা এক গ্রামে চাষী পরিবারে সাত ভাই ছিলো| তারা সারাদিন খুব পরিশ্রম করতেন চাষের কাজে| তাদের যাতে চাষে খাটতে কোনও অসুবিধা না হয় সেজন্য তাদের স্ত্রীগণ প্রতিদিন খাবার নিয়ে আসতেন| একদিন সাত ভাই প্রচুর খাটাখাটি করার পর ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছেন কিন্তু দীর্ঘ সময় গড়িয়ে গেলেও তাদের জন্য খাবার নিয়ে মাঠে উপস্থিত হয়নি স্ত্রীগণ| এমন সময় সাত ভাই প্রচন্ড রেগে বাড়িতে ফিরে আসে এবং লক্ষ্য করেন তাদের স্ত্রীগণ একটি গাছের ডালকে মাঝখানে গেড়ে নাচ -গানে মত্ত হয়ে উঠেছেন| এমন সময় তাদের মধ্যে একভাই প্রচন্ড রেগে গিয়ে ওই ডালটিকে উপড়ে নিয়ে গিয়ে নদীর জলে ফেলে দেন| পরদিন সকালে যখন তারা মাঠে যান দেখেন মাঠের সমস্ত চারা নষ্ট হয়ে গেছে| তখন থেকেই দিনের পর দিন তাদের পরিবারে দুর্দশা গ্রাস করে| বহুদিন অনাহারে কাটছে সাত ভাই, সাত বৌউয়ের…

পুরুলিয়া

একদিন তাদের বাড়িতে এক বাহ্মন আসেন| প্রচন্ড ক্ষুধার্ত বাহ্মন খাবার চাইলে তাদের পরিবারের চরম অসহায়তার কথা সব বলা হয় বাহ্মনকে| তখন বাহ্মন বলেন এই অবস্থা কাটানোর একটাই উপায় -করম রাণীকে সন্তুষ্ট করা| উপায়ও বাতলে দেন অতিথি বাহ্মন| একমাত্র করম রাণীকে খুঁজে এনে পুনরায় আড়ম্বরে প্রতিষ্ঠা করতে হবে তবেই এই কষ্টের দিন মুছবে| সেদিন রাতেই সাত ভাইয়ের মধ্যে একজন ঘরের দাওয়ায় বসেছিলেন এমন সময় শুনতে পেলেন গুমরে ওঠা কান্নার শব্দ| সেই কান্না যেন তার বুকে ছুরির আঘাত করছে, এফোঁড় ওফোঁড় করে দিচ্ছে বুক| ভোর হতেই বেরিয়ে পড়লেন কিন্তু বহু খোঁজাখুঁজির পরও করম রাণীকে না পেয়ে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন| তার চোখে যেন অন্ধকার নেমে আসছে| এমন সময় দৈববাণী হয় সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরোলে করমের দেখা মিলবে| দিন যায়, মাস যায়, বছর যায় করমকে খুঁজে পাওয়া যায়না| এমন সময় আবার দৈববাণী হয় ভাদ্র মাসের শুক্লা একাদশীর দিন যদি জঙ্গল থেকে করম গাছের ডাল এনে করম পূজো করা হয়, তবেই একদিন করম ফিরে আসবে| সেইমতো  আজকের দিনটিতে পূজোর ব্যবস্থা করলেন ওই পরিবারের লোকেরা| এই সংবাদ ক্রমশ দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়লো| অঞ্চল ভেদে অবশ্য এই কাহিনীর রূপ ভিন্ন ভিন্ন…..| বিশেষত সাঁওতাল ও কুড়মালি সমাজে করম পূজো আজও বহুল প্রচলিত| পুরুলিয়া ছাড়াও ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর, বাঁকুড়া, বীরভূম জেলা ছাড়াও ঝাড়খণ্ড রাজ্যে আজও করম পূজো লোক সংস্কৃতির ধারাকে বজায় রেখেছে| আজকের দিনে আদিবাসী মেয়েদের হাতে থাকে কুড়ুল,বাঁশের কুলোর মধ্যে থাকে সরষের তেল, সিঁদুর, দুর্বা ঘাঁস, গ্লাসে কাঁচা দুধ, শালপাতায় গুড়, এক আঁজলা ধান আর হাঁড়িয়া| সকালে অবিবাহিত আদিবাসী মেয়েরা গান করতে করতে জঙ্গলে যায় এবং করম গাছের ডাল কেটে আনে| চারপাশে হাঁড়িয়ার পসরা বসে| আজকের দিনেই ঢেঁকিতে ধান কুটে চাল বের করেন মহিলারা| হাঁড়িয়া খেয়ে গান ধরবে, পুরুষরা হলুদ ধুতি পরে মহিলাদের সঙ্গে কোমর দোলাবে|  এখনো ঝাড়গ্রামের মল্লদেব রাজাদের রাজবাড়িতে করম পূজোর পরের দিন ঈঁদ পূজো হয়| করম পূজো ঠিক কি সে বিষয়ে বহু মত রয়েছে| কেউ কেউ বলেন বহুকাল আগে যখন সভ্যতার বিকাশ ঠিকঠাক হয়নি তখন চারিদিক ছিল জঙ্গলে ঘেরা| কখনো কখনো সাঁওতাল সম্প্রদায়ের মানুষরা অন্নের সংস্থানের জন্য জঙ্গলে গিয়ে আর ফিরে আসেনি, তাকে করম গাছ গ্রাস করেছে| তাই জঙ্গল দেবতাকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যেই শুরু হয় করম পূজো এবং এই পূজোর মধ্যে দিয়েই ফুটে উঠেছে গাছের প্রতি মানুষের ভালোবাসা| লোকগাথা অনুযায়ী করম পূজোর দিন ‘কুয়া – কুইলি’ ডাকবে ঘরের চালে, রাত পেরিয়ে ভোর যতো হবে ততোই ঠান্ডা বাতাস বইবে…..আদিবাসী সম্প্রদায়ের অবিবাহিত মেয়েরা তখন ঘুম থেকে উঠে পড়বেন এবং করম ডালটিকে নদীতে নিয়ে গিয়ে বিসর্জন দিয়ে চোখের জলে বিদায় জানিয়ে ঘরে ফিরে আসবেন| যদিও এই উৎসব নিয়ে বিভিন্ন জনের মত ভিন্ন ভিন্ন রয়েছে| জঙ্গলমহলের লোকায়ত সংস্কৃতির আরও এক অধ্যায় ছৌ নাচ| বিশেষত পুরুলিয়া ও বীরভূম জেলায় বহুল প্রচলিত ছৌ নাচ| কবির কথায় আছে “মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে আছে মুখ” -ছৌনাচও ঠিক তেমনটাই| অন্য একটি পর্বে আলোচনা হবে ছৌনাচ নিয়ে|

ছবি: গুগল