শব

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

মুজতাবা শফিক

চার.

-আমি কিন্তু আসলেই ডাক্তার, ভাই! ইন্টার্নি করা হয়ে উঠেনি। নানান সাংসারিক ঝামেলা ! তাই ডাক্তারির সার্টিফিকেট টা আর নেয়া হয়ে উঠেনি। লোক্ টা বলেই চলেছে।

ধানমন্ডী বত্রিশের কাছে এসে বাস থেকে নেমে পড়েছে মুমিন! বাসে লোকের ভীড় বেড়ে যাচ্ছিল। লোকজন সরু চোখে সুটকেসটা দেখছিলো। বাধ্য হয়ে নেমে গেছে মুমিন। সব থেকে ভালো হতো বাসেই সুটকেসটা রেখে নেমে যেতে পারলে। চেষ্টাও করে ছিলো কিন্তু করিৎকর্মা হেল্পার ছেলেটার জন্য পারা গেলো না!

-বাই, আপনার ব্যাগ ফেলাইয়া যান কই!

ছেলেটা অবাক হয়ে বলে! মুমিন হাসে। সেই বেকুবের হাসি। স্যুটকেসটা নিয়ে টেনে হিচড়ে কোন রকমে এই লেকের পাড়ে পার্কে এসে উঠেছে। বত্রিশ নাম্বার হয়ে লোহার ব্রীজ টা পেরুলেই সুন্দর পার্ক। অসংখ্য মানুষ এই পার্কে। ঢাকা শহরে দুই কোটি মানুষের বাস হলে, এই পার্কেই এখন আছে মনে হয় দুই লাখ মানুষ। খুব যত্ন করে পার্কটা ডিজাইন করা হয়েছে। চমৎকার বসার জায়গা । মুমিন একটা জায়গা বের করে বসে পড়ে। আর পারা যাচ্ছে না। ক্ষুধায় পেট চন চন করছে। কাল রাতের পর থেকে পেটে কোনো দানা পানি পড়েনি। আর খাওয়ার মতো কোনো অবস্থাও ছিলো নাকি ? পার্কেই অনেকগুলো খাবার দোকান। মুমিন কলা আর পাউরুটি নিয়ে গোগ্রাসে গিলতে থাকে। আর ঠিক তখনই ডাক্তার আকমলের পাল্লায় পড়া!

মুমিন এখন খেয়াল করলো, কয়েকজন পার্কের মাঝে টেবিল চেয়ার পেতে রীতিমত চেম্বার বানিয়ে ফেলেছে। টেবিলের উপর স্টেথিস্কোপ, ডায়াবেটিস-প্রেশার মাপার নানা সরঞ্জাম, ওজন মাপার মেশিন, কি নেই! আবার সাইনবোর্ড আছে, এখানে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা হয়, প্রেশার মাপা হয়, আরো কত কি ! সেই রকম এক চেম্বারের মালিক ডাঃ আকমল সাহেব। কোন সময় গুটি গুটি, পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন ভদ্রলোক! সস্তা কোট-টাই পরনে। এই গরমে কোট কেনো পড়েছে বোঝে না মুমিন! বয়স ষাটের কোঠায়। হৃষ্টপুষ্ট শরীর।

-ডায়াবেটিস হইলো নীরব ঘাতক ভাইজান। কোন সময় অপনার শরীলে আইসা বাসা বানবো টেরটাও পাইবেন না। তারপর মনে করেন আপনার লীভার, কীডনি সব খায়া ফালাইবো।

মুমিন কোন্ দিকে না তাকিয়ে একমনে খেয়েই চলেছে। ডাক্তার সাহেবের মনে হয় আজকে ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না। সহজে সে পিছু ছাড়বে না!

-আমি এইখানে ডাক্তার কথাটা লিখি না। বোঝেন না , সব শিক্ষিত মাইনসের আনা গোনা। কেস হইয়া যাইতে পারে। কিন্তু রাইতে কামরাঙ্গীর চরে আমি রোগী দেখি। আমার ডিস্পেন্সারী আছে। সেখানে কিন্তু আমি মনে করেন, ডাক্তার! লোক্টা তৃপ্তির হাসি হাসে। আহা এমনেএকটা কাজ জানলেও হতো, মুমিন ভাবে! দুটো পয়সা সৎ উপায়ে আয় করা যেতো।

পার্কের গাছগুলো দেখে মুমিন! কি বিশাল পুরনো সব গাছ। উদয় মাস্টার এখানে থাকলে খুব খুশী হতেন! বলতেন, প্রকৃতির ব্যলেন্স হইতেছে! এইরকম গাছ হয়ে যদি পৃথিবীর বুকে বেঁচে থাকা যেতো! গাছই ভালো, মুমিন ভাবে। কোনো চাওয়া পাওয়া নেই, হিসেব নিকেষ নেই। শুধু বেঁচে থাকা। নীরবে শুধু দিয়ে যাওয়া। কারো কাছে কিছু পাওয়ার আশা করতে হয় না ! মুমিনের মাঝে মাঝে খুব বাঁচতে ইচ্ছা করে। অনেক দিন বাঁচতে ইচ্ছা করে ! আবার মনে হয়, তাহলে ওরা মরতে চায় কেনো? ওই যে, সাদা বালির উপর সারি সারি শুয়ে আছে হাজার হাজার বিশাল সব নীল তিমি। কেপ টাউনে, নিউজিল্যান্ডে , গ্রীনল্যান্ডে বীচের উপর উঠে এসেছে সব তিমির দল। আর পানিতে ফেরানো যায় না ওদের। তাহলে ওরা মরতে চায় কেনো ! সুন্দর এই পৃথিবী ছেড়ে ওরা কেনো চলে যেতে চায়, কি ব্যালেন্স করতে চায় ওরা?

এখন খুব সম্বভত আট-টা কি নটা বাজে ! কল্যানপুর থেকে এখানে আসতে এক ঘন্টার বেশি নিশ্চয় লাগে নি। স্যুটকেস থেকে কি কোন গন্ধ বের হচ্ছে? এখন একটু  টেনশন হয় মুমিনের। এমনিতে সে একজন অনভুতিহীন মানুষ। সালেহা বেগমের চোখে বেকুব! আসলে কম বেশী সবাই তাকে বুদ্ধিহীন ভাবে! এবং আকারে ইংগিতে সেটা প্রকাশ  করে! শুধু একজন তাকে মুখের উপর কখনো এরকম কিছু বলেনি! বরং তার এই সরলতার চরম সুযোগ নিয়েছে।পদে পদে  হাতে কলমে প্রমান করে দিয়েছে যে, আসলেই সে একজন বেকুব!

নাইমুন। মুমিনের স্ত্রী। বলা উচিত সাবেক স্ত্রী। সেপারেশন হয়ে গেলে কি সাবেক স্ত্রী বলতে হবে? অনেক ভাবে মুমিন! নাহ, আইনগত ভাবে যাই হোক না কেনো, নাইমুন হয়ত কোন দিন ও তার স্ত্রী ছিলো না! অথচ কি প্রবল ভাবেই না নাইমুন কে চেয়েছিলো মুমিন ! গ্রীস্মের খর তাপে পুরে যাওয়া ধরনী যেমন করে বর্ষার ঠান্ডা পরশ চায়!  হয়ত পেয়েও ছিলো। কিন্তু এক ঘরে থাকলে, এক সাথে থাকলে, এমন কি এক বিছানায় থাকলেও কি কাউকে পাওয়া যায়? নিজেই মনে মনে উত্তর দেয় মুমিন -পাওয়া যায় না!

প্রাণের বাংলায় প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। লেখা সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় প্রাণের বাংলা বহন করবে না। প্রাণের বাংলার কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না তবে সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করতে পারবেন । লেখা সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ অথবা নতুন লেখা পাঠাতে যোগাযোগ করুন [email protected]