গাছতলায় চিত্রকলা

FB_IMG_1459062093762

সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক গাছতলার পরিচয় তুলে ধরেন এভাবে ছন্দে ছন্দে

এবার দেশে শিল্পকলা-

গুলশান এবং গাছতলা-

এরই ছায়ায় সড়ক ৬-এ চর্চা।

ফি শনিবার বিকেল বেলা

ফুটপাথের এই চিত্রমেলা-

আসুন, দেখুন–পুরোটাই নিখরচা !

পুরনো আর নতুনদের

তুলিতে ছবি এখানে ঢের-

এলেই চোখে পড়বে প্রদর্শনী।

চলার পথে থেমে পড়ুন,

চলছে আঁকা চোখেই দেখুন-

ইচ্ছে হলে ছবি কিনুন তখনি।।

বাংলাদেশে এ দৃশ্য বিরল। গুলশানে অবস্থিত এটি একটি ছবির উন্মুক্ত গ্যালারি, নাম গাছতলা। একই সঙ্গে এটি  গ্যালারি, বিক্রয় কেন্দ্র আবার ছবি আঁকার স্থান। আপনি চিত্র প্রেমিক হলে ছবির প্রদর্শনী দেখবেন, ক্রেতা হলে ছবি কিনবেন, শিল্পীদের আঁকাআঁকি দেখতে চাইলে তাও দেখতে পাবেন গুলশান ১ নম্বরে স্পেকট্রা কনভেনশন পার করে আরও খানিকটা সামনে এগিয়ে গেলেই। আপনি যদি নিছক পথচারী হন,শনিবারে গাছতলাতে থাকছে আপনার জন্য প্রদর্শনীর ব্যবস্থা বিকেল ৪ টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত।  ফুটপাতে সারি সারি ছবি সাজিয়ে রাখা আর পাশের দেয়ালে ছবি ঝোলানো এমন দৃশ্য সত্যিই খুবই দৃষ্টিনন্দন।এ দৃশ্য অতিক্রম করে ফটক দিয়ে আপনি প্রবেশ করবেন মূল আঙ্গিনায়। খানিকটা খোলা পরিসর। আশেপাশে শিল্পীদের কাজের নানা নিদর্শন, ভাস্কর্য, অসম্পূর্ন কাজ। দেখতে দেখতে গ্যালারি অভিমুখে ছোট করিডোর, কমপিউটার, টেবিল, রঙ, ক্যানভাস, রঙ করা গাছের শুকনো ফল, পাথর যা শিল্পকর্ম হয়ে উঠার অপেক্ষায়। আপনি যদি চিত্রশিল্পী হন, চাইলে আপনিও অংশ নিতে পারবেন ছবি আঁকায় ও ছবির প্রদর্শনীতে- কিছু শর্ত মেনে। এমন একটি উদ্যোগ যাদের প্রচেষ্টায়, তারা হলেন-চিত্রশিল্পী ওয়াদুদ কাফিল, কামরুজ্জামান

স্বাধীন , ভাস্কর জাহানার পারভীন, ও ফটোগ্রাফার সালমা জামাল মৌসুম।

এক শনিবারে গাছতলায় ঢু মারতেই দেখা গেল-  রাস্তার পাশে ফুটপাথে সারি সারি আঁকা ছবি দেশের নামকরা অনেক চিত্রশিল্পীর। বয়োজেষ্ঠদের মধ্যে  সমরজিৎ রায় চৌধুরী, আব্দুশ শাকুর শাহ, শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল প্রমুখ আর নবীনদের মধ্যে বিপুল শাহ, ওয়াদুদ কাফিল,  কামরুজ্জামান স্বাধীন, জাহানারা পারভীন,নাজমুল আহসান, সালমা জাকিয়া বৃষ্টিসহ আরো অনেক অনেক শিল্পী।পথচারীরা ব্যস্ত পায়ে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছেন, কেউ বা দু’দণ্ড থেমে দেখে নিচ্ছেন মনোযোগ কেড়ে নেয়া ছবিটার রঙ, ঢং, আর সৌন্দর্য। পথে থেমে কেউ কেউ দু মিনিট ভাবে্ন, নিজের মতো কিছু একটা ভেবে নেন কিংবা একটা মন্তব্য করে চলে যান নিজের পথে। আবার চিত্রকলার টানে দামি গাড়ি থেকে নেমেও আসেন অনেকে। ছবি দেখেন, ছবি কেনেন।

গাছতলা এখানেই তৃপ্ত। এখানেই গাছতলার সার্থকতা। যে পথিক কোনদিন হয়ত কোন আর্ট গ্যালারি, চিত্র প্রদর্শনীতে যান নি, জাদুঘর, শিল্পকলার মতো বড় চিত্রশালায় যাবার মতো কোন কারণ হয়ত তার জীবনে কখনও ঘটতো না, তিনিও চলতি পথে শিল্পের দিকে চোখ ফিরিয়ে তাকাতে বাধ্য হবেন।ছবির পাশাপাশি তারা শিল্পিকেও সামনে দেখতে পাবেন।প্রদর্শনীতে যায় নি, জাদুঘর, শিল্পকলার মতো বড় চিত্রশালায় যাবার মতো কোন কারণ হয়ত তার জীবনে কখনও ঘটতো না, সেও চলতি পথে শিল্পের দিকে চোখ ফিরিয়ে তাকাতে বাধ্য হয়।এখানেই গাছতলার সার্থকতা।

FB_IMG_1459062295422

 একটু একটু করে মানুষের মন, মনন, বোধ পাল্টায়।কীভাবে রঙ ও চিন্তার বিন্যাসে ক্যানভাসে চিত্র ফুটে ওঠে, তা প্রদর্শীত হয়, প্রদর্শনী শেষে আবার গ্যালারি বন্দ্বি হয়- সবই দেখতে পারেন আপনি এসে এ খোলা ময়দানে। শিল্প আর শিল্পীর সঙ্গে হয় সামনা সামনিই তাদের পরিচয় ঘটবে। চিত্রকলাই তো একমাত্র শিল্প যেখানে শিল্পটিকে সামনা সামনিই দেখতে হয় তার পূর্ণ স্বাদ পেতে। (সঙ্গীত, চলচিত্র এর ব্যতিক্রম।) গাছতলা চায় তাদের এই প্রয়াসের মাধ্যমে নীরবে শিল্প-বিপ্লব ঘটাতে।ধীরে ধীরে একটি শিল্পবোদ্ধা জাতি গড়ে তুলতে।

মূলত এই বিপ্লব শুরু হয়েছিল ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের ই বি হেবেল কর্তৃক ১৯১২ সালে।হেবেল, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রমুখ ব্যক্তিরা উপলব্ধি করেন যে এদেশকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যেতে হলে কেবল লেখাপড়া দিয়ে হবে না। শিল্প-সংস্কৃতির অন্যান্য শাখাতেও ভালো করতে হবে। তখন থেকে মডার্ন আর্ট বা আধুনিক চিত্রকলার চর্চা শুরু এই উপমহাদেশে। তারই ধারাবাহিকতা বলতে হবে এই গাছতলাকে। কেননা শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখে দর্শক। ভালো দর্শক বা শিল্প-মন ছাড়া একা শিল্প বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। গাছতলা শিল্পী ও সাধারণ দর্শকের এই ব্যবধান ঘোচাতে চায়। গাছতলার মতো এমন প্রয়াস ফ্রান্স, লন্ডনে থাকলেও বাংলাদেশে এটাই প্রথম। এখানে তাই জেনে শুনে আসেন অনেক চিত্রপ্রেমিক, চিত্রশিল্পী, চিত্রসমালোচক, চিত্রবোদ্ধা এবং শিল্পী। এভাবেই জমে উঠেছে গাছতলা । ছবি আঁকাআঁকি আর ছবি দেখাদেখির পাশাপাশি হয়ে উঠে এটি আড্ডাতলা, শিল্পীদের দুদণ্ড বসবার স্থান। চিত্রশিল্পিরাও অনেকেই আসেন নিয়মিত। এমন অনেক  শিল্পী আছেন যারা চারুকলা পাশ করে আর কোনদিনই ছবি আঁকতে বসতে পারেন নি, আর কোনদিন পারবেন বলেও ভাবেন নি।তাদেরকেও সুযোগ করে দিয়েছে গাছতলা। কাগজ, পেন্সিল, রঙ, তুলি হাতে দিয়ে বলেছে আঁক, ঝুলিয়ে দাও, বিক্রেতা পেলে- বেচে দাও।তাদের অনেকেই এখন আবার নিয়মিত ছবি আঁকছেন, আসছেন। এশিয়, জাতীয় প্রদর্শনীতে প্রদর্শিত হচ্ছে তাদের ছবি নিয়মিত। এই দু বছরে এটাও  গাছতলার সার্থকতা।  নতুন পুরাতনদের মেলবন্ধন-ওয়ার্কশপও হয়েছে, সামনে আরও হবে। আরও বড় হবে পরিসর, একসময় চিত্রকলাকে ছাড়িয়েও শিল্পের অন্যান্য মাধ্যম- নৃত্য, নাট্য, সঙ্গীতের জন্যও একটি স্থান করে দেয়া হবে এখানে-আর গাছতলা হয়ে উঠবে শিল্পীদের মিলনমেলা -এমনটাই স্বপ্ন দেখেন উদ্যোক্তাদের অন্যতম একজন জাহানারা পারভীন।FB_IMG_1459062307635

২০১৪ সালের ১৬ই জানুয়ারি চিত্রশিল্পী ওয়াদুদ কাফিল, কামরুজ্জামান স্বাধীন , ভাস্কর জাহানার পারভীন, ও ফটোগ্রাফার সালমা জামাল মৌসুম- এই চারজনের উদ্যোগে লেখক সৈয়দ শামসুল হক ও ডাঃ আনোয়ারা সৈয়দ হকের বাড়ির সামনের উঠোন ও একটি ঘর নিয়ে গড়ে ওঠে গাছতলার গ্যালারি, প্রদর্শনী, আড্ডাবাজি ও ছবি আঁকার স্থান। যে কেউ চাইলে এখানে প্রদর্শনী করতে পারেন তাদের নিজস্ব ছবি- কিছু শর্ত মেনে, আর ছবি দেখার পাশাপাশি শিল্পী, লেখকদের সান্নিধ্যও পেয়ে যেতে পারেন পড়ন্ত বিকেলটাতে। বাসা-৮, রাস্তা-৬, গুলশান ১ নম্বরে প্রতি শনিবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বাসার সামনের ফুটপাথে পথচারীদের জন্য দেখার ব্যাবস্থা আর গ্যালারি খোলা প্রতিদিন সকাল ১২ টা থেকে রাত ৮টা অব্দি। ঘুরে আসতে পারেন আপনিও। ভালো যে লাগবে নিশ্চিন্তে এই প্রতিশ্রুতি দিতে পারি  আমি।

যোগাযোগ- ওয়াদুদ কাফিল-০১৭১১৬১৬১৮৫।

ইভা আফরোজ খান