শুভ জন্মদিন জহির রায়হান

বাংলাদেশের সাহিত্য ও চলচ্চিত্র জগতে এক বিশিষ্ট নাম জহির রায়হান। কথাসাহিত্যের জগতে তার প্রথম পদচারণা হলেও পরবর্তী আশ্রয়স্থল হয় চলচ্চিত্র। পরবর্তী জীবনে সাংবাদিকতা, কথাসাহিত্য, রাজনৈতিক কর্মকান্ড আর চলচ্চিত্র পরিচালনা-নানা পরিচয়ে তার কর্মক্ষেত্রের পরিধি চিহ্নিত হয়।   বাহান্নর ভাষা আন্দোলন ও একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে তাঁর জীবন আজও একজন সৎ শিল্পীর দৃষ্টান্ত হয়ে অছে বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ভূগোলো।

জহির রায়হানের ৮১ তম জন্মদিন আজ ।প্রাণের বাংলার পক্ষ থেকে তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে জানাই গভীর শ্রদ্ধা। ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট তিনি ফেনী জেলার মজুপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তাঁর পিতা মওলানা মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহ কলকাতা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যাপক এবং ঢাকা আলীয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ছিলেন। জহির রায়হান কলকাতায় মিত্র ইনিস্টিউটে এবং পরে আলীয়া মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন।  তিনি ১৯৫০ সালে আমিরাবাদ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং ঢাকায় এসে কলেজে ভর্তি হন। তিনি আই.এসসি পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে বাংলায় স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি লাভ করেন। অল্প বয়সেই জহির রায়হান কম্যুনিস্ট রাজনীতিতে আকৃষ্ট হন। তখন কম্যুনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ ছিল। তিনি কুরিয়ারের দায়িত্ব পালন করতেন গোপন পার্টিতে তাঁর নাম রাখা হয় ‘রায়হান’। তাঁর আসল নাম ছিল জহিরুল্লাহ। পরবর্তী সময়ে তিনি জহির রায়হান নামে পরিচিত হন। ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনে যোগ দেন। ২১ ফেব্রুয়ারি যে  ১০ জন প্রথম ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেন তিনি তাঁদের অন্যতম। অন্যান্যদের সঙ্গে তাঁকে মিছিল থেকে গ্রেফতার করে কারারুদ্ধ করা হয়।

ছাত্রজীবনেই তাঁর লেখালেখির সূচনা। ১৩৬২ বঙ্গাব্দে তাঁর প্রথম গল্পসংগ্রহ সূর্যগ্রহণ প্রকাশিত হয়। তাঁর লিখিত অন্যান্য বইগুলি হচ্ছে শেষ বিকেলের মেয়ে, হাজার বছর ধরে, আরেক ফাল্গুন, বরফ গলা নদী এবং আর কত দিন। তিনি ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ইংরেজি পত্রিকা দ্য উইকলি এক্সপ্রেস প্রকাশের উদ্যোক্তাদের অন্যতম। এ ছাড়া তিনি কতিপয় সাহিত্য পত্রিকার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। হাজার বছর ধরে উপন্যাসের জন্য তিনি আদমজী পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৭২ সালে তাঁকে বাংলা একাডেমী পুরস্কার প্রদান করা হয়।

জহির ১৯৫২ সালে ফটোগ্রাফি শিখতে কলকাতা গমন করেন এবং প্রমথেশ বড়ুয়া মেমোরিয়াল স্কুলে ভর্তি হন। ১৯৫৬ সালে তিনি চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন। ১৯৬১ সালে তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র কখনও আসেনি মুক্তি পায়। তারপর একের পর এক তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে।

তাঁর পরিচালিত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলোঃ কাজল, কাঁচের দেয়াল, বেহুলা, জীবন থেকে নেয়া, আনোয়ারা, সঙ্গম এবং বাহানা। জীবন থেকে নেয়া ছবিতে প্রতীকী কাহিনীর মধ্য দিয়ে পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসনকে চিত্রিত করা হয় এবং জনগণকে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে উদ্বুদ্ধ করা হয়।

তিনি লেট দেয়ার বি লাইট নামে একটি ইংরেজি ছবি নির্মাণ শুরু করেন। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি তা শেষ করতে পারেন নি। ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর তিনি কলকাতায় যান। সেখান থেকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার গণহত্যার চিত্র সম্বলিত ‘স্টপ জেনোসাইড’ তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন। ছবিটি পৃথিবী জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

জহির রায়হানের উর্দু ছবি সঙ্গম ছিল পাকিস্তানের প্রথম রঙ্গীন ছবি। তাঁর অপর উর্দু ছবি বাহানা ছিল সিনেমাস্কোপ। তিনি কাঁচের দেয়াল ছবির জন্য পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬১ সালে তিনি চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সুমিতা দেবীর সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন এবং ১৯৬৮ সালে অপর চলচ্চিত্র অভিনেত্রী সুচন্দাকে দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন।

১৯৭১ সালে জহিরের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা প্রখ্যাত লেখক ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী  শহীদুল্লাহ কায়সারকে তৎকালীন কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর সদস্যরা হত্যার উদ্দেশ্যে তুলে নিয়ে যায়। ১৯৭১ সালের ৩০ ডিসেম্বর স্বধীন বাংলাদেশে ফিরে এসে জহির রায়হান খবর পান শহীদুল্লা কায়সারকে ঢাকার মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে। তিনি শহীদুল্লাহ কায়সারকে উদ্ধারের জন্য ছুটে যান মিরপুরে। সেখানেই তিনি নিহত হন।

প্রাণের বাংলা ডেস্ক

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ গুগল