অদ্ভুত আঁধার এক…

সত্যিকার অর্থে মানসিক রোগ এক বিশাল উপাখ্যান। অতলান্ত সমুদ্রের মতো এর গভীরতা এবং আকাশের মতো এর ব্যাপ্তি। জরিপ করলে দেখা যায় প্রায় প্রতিটি মানুষ কখনো-না-কখনো মানসিক বিপর্যস্ততায় পতিত হয়েছে। অনেক সুস্থ মানুষও পারিপার্শ্বিকতার শেকলে বন্দী হয়ে নিজেকে মানসিক রোগী ভেবে বসেন। সত্যিকার অর্থে মানসিক রোগী কারা? আমাদের দেশে বেশির ভাগ লোক মানসিক রোগী বলতে বুঝে থাকেন রাস্তায় নগ্ন হয়ে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে যাওয়া কোনো বদ্ধ উন্মাদ। কিন্তু বাইরের আবরণে মানসিক রোগীকে চিহ্নিত করা কি সম্ভব? রাস্তায় চিৎকাররত নগ্ন লোকটি মানসিক রোগী হতে পারে কিন্তু যে ভদ্রলোকটি ফিটফাট হয়ে অফিসে যান, লোকজনের সাথে কথা বলেন প্রাণ খুলে, কিন্তু বাসায় ফিরেই স্ত্রীকে নির্যাতন করেন, কেননা তার ধারণা তিনি বাইরে গেলেই তার স্ত্রী অন্য কোনো পুরুষের সাথে মিলিত হন

যদিও তার ধারণাটি একেবারেই মিথ্যে তাহলে তিনি কি মানসিক রোগী নন? আবেগতাড়িত হয়ে অনেকে অনেক অস্বাভাবিক কাজ করে ফেলেন কিন্তু সময়ে তা আবার সামলে নেন অর্থাৎ তার দৈনন্দিন জীবনযাত্রা ব্যাহত হয় না; কিন্তু যখন সাময়িক বা স্বাভাবিক মাত্রা ছাড়িয়ে অস্বাভাবিকত্বের মধ্যে কিছু দিন বা বহু দিন অবস্থান করে, তাকে কী বলবেন? অবশ্যই এটা মানসিক অসুস্থতা।
মানসিক রোগের প্রথম বিবরণ পাই আমরা গ্রিক মিথলজিতে। দেবরাজ জিউসের স্ত্রী হেরা গ্রিক রানী অ্যালসিমেনের গর্ভে জন্মানো জিউসের ঔরসজাত অবৈধ পুত্র হার্কিউলেসকে ঈর্ষাবশত এই রোগটি দান করেন। যখনই হার্কিউলেস মানসিক রোগে আক্রান্ত হতো তখনই সে নিজের শিশু সন্তানদের পর্যন্ত জ্বলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করত এবং রোগের ঘোর কেটে গেলে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অন্তহীন অনুশোচনায় দগ্ধ হতো। জরিপে দেখা যায়, আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিকাশের সাঙ্গে মানসিক রোগের একটি সম্পর্ক রয়েছে। গ্রামের চেয়ে শহর অঞ্চলে মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীর পরিমাণ বেশি এবং মহিলারা পুরুষদের তুলনায় মানসিক সমস্যায় বেশি ভোগেন। মানসিক অসুস্থতার সাথে বয়স, লিঙ্গ, বৈবাহিক অবস্থা, সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থা, সাংস্কৃতিক-পেশাগত ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা জড়িত। বাংলাদেশে সাধারণত মানসিক রোগ দেখা দেয় ২০-৪০ বছর বয়সে। বিবাহিত লোক, বিধবা বা বিপতনিক এবং তালাকপ্রাপ্তরা বেশি করে মানসিক সমস্যার শিকার হন।
মানসিক রোগের কারণ কী
মানসিক রোগের অনেক কারণ এখনো অজানা রয়ে গেছে। তবে যেসব কারণ জানা সম্ভব হয়েছে তার মধ্যে বংশগত কারণ, পারিপার্শ্বিক, স্নায়ুউদ্দীপক বিষ, শারীরিক অসুস্থতা, আর্থ-সামাজিক অবস্থা, আঘাতজনিত কারণ এবং শরীরের জৈব-রাসায়নিক পরিবর্তন উল্লেখযোগ্য।
বংশগত কারণ মানসিক রোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলেও বর্তমানে আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থাকেই মানসিক রোগের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়। বাবা-মায়ের আচরণ একটি শিশুর পরবর্তী সময়ে মানসিক পূর্ণতার সীমানা বেঁধে দেয়। বাবা-মা সচরাচর যে ভুলগুলো করেন তা হলো সন্তানকে অতিরিক্ত নজরে রাখা কিংবা উপেক্ষা করা অথবা কড়া শাসনে রাখা, অনেক সময় অন্য ভাইবোনদের সাথে কিংবা পরিচিতজনদের সাথে অপ্রয়োজনীয় এবং অপছন্দনীয় তুলনা করা। এই বিষয়গুলোর জন্য সন্তানের মনের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ে এবং সে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক বাবা-মা সন্তানকে ধর্ম, মৃত্যু ইত্যাদি বিষয়ে এমন সব ভয়ঙ্কর গল্প বলেন, যা সন্তানকে মানসিকভাবে অসুস্থ হতে ইন্ধন জোগায়। মনের মধ্যে চেপে রাখা ক্ষোভ মানসিক অসুস্থতার অন্যতম কারণ। অনেকের অসুস্থতা দেখা দেয় সামাজিক অসামঞ্জস্য ও বিচ্ছেদ থেকে। বেদনাদায়ক অনুভূতি থেকেও মানসিক রোগ হতে পারে। পারিবারিক জটিলতা, হতাশা, দারিদ্র্য ও অর্থনৈতিক সমস্যা, প্রবঞ্চনা, উপেক্ষা, অহেতুক ভয়, বেকারত্ব, দুশ্চিন্তা, আবেগজনিত চাপ, যৌনকাজে নিরাশ হওয়া, দাম্পত্য অশান্তি, অনুপযোগী চাকরি, মৃত্যুশোক, মানসিক আঘাত, নিরাপত্তাহীনতা, আকস্মিক দুর্ঘটনা, কুসংস্কার, যৌনব্যাধি প্রভৃতি বিষয় মানসিক রোগ সৃষ্টির সহায়ক উপকরণ। শারীরিক রোগ থেকে মানসিক রোগ হতে পারে। দীর্ঘস্থায়ী দৌর্বল্যকর অসুখ, মস্তিষ্কের রক্তপাত, জ্বর, অ্যালকোহল ও বিভিন্ন মাদকে আসক্তি, মস্তিষ্কে আঘাত প্রভৃতি কারণে মানসিক রোগ সৃষ্টি হয়। মহিলাদের কয়েকটি বিশেষ ক্ষেত্রে মানসিক অসুস্থতা দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে মাসিক, গর্ভধারণ, যৌন অতৃপ্তি, যৌনভীতি, সন্তান প্রসব, মেনোপজ ইত্যাদি।
মানসিক রোগের পূর্ব লক্ষণ কী?
যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা, দায়িত্ব গ্রহণে অক্ষমতা , বন্ধুত্ব গড়তে বা তা বজায় রাখতে অক্ষমতা , ভয় প্রকাশ করতে অক্ষমতা, আবেগ সংবরণ করতে অক্ষমতা , চলমান জীবনে অপছন্দনীয় বিষয় বা বাস্তবতা মোকাবেলা করতে অক্ষমতা অতীতের অপ্রীতিকর স্মৃতি ভুলে যেতে কিংবা অতীতের আবেগজনিত ভুল থেকে শিক্ষা নিতে অক্ষমতা, সব সময় অজানা আশঙ্কার মধ্যে থাকা , কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া নিজেকে অবিরাম অসুখী ভাবা , নিয়মিত ঘুম না হওয়া , সহজেই মেজাজ বিগড়ে যাওয়া , সব সময় বিষণতায় ভোগা।

মানসিক রোগের উপসর্গ কী?
শারীরিক অসুস্থতায় যেমন কিছু যখন প্রকাশ পায়, তেমনি মানসিক অসুস্থতায়ও যখন অনেক  প্রকাশ পায়। এসব লক্ষণ বিশ্লেষণ করলেই মানসিক রোগ নির্ণয় অনেক সহজ হয়ে ওঠে।
কথাবার্তা বা চিন্তায় অস্বাভাবিকতা ঃমানসিক রোগীদের মধ্যে একটি কথাকে বারবার বলা বা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কখনো কখনো একটি কথার সাথে পরবর্তী কথার সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। অনেক সময় তারা দুর্বোধ্য কথা বলে। একা একা কথা বলে। মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলে যা তার শিক্ষা, ব্যক্তিত্ব কিংবা পরিবেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সে কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের কথা বলে, যা অবাস্তব ও অলীক। অলীক বিশ্বাসকে বলে ডিল্যুশন। কোনো রকম যুক্তিতর্ক বা বিচার-বুদ্ধি দিয়ে তাকে সংশোধন করা যায় না। মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি তার নিজস্ব আবেগ ও অনুভূতি দ্বারা পরিচালিত হয় এবং কারো যুক্তি তারা গ্রহণ করে না। অলীক বিশ্বাসের ফলে সে আত্মহত্যা, খুন বা অন্যান্য অপরাধ সংঘটিত করতে পারে। অলীক বিশ্বাসীকে মস্তিষ্ক বিকৃতির চিহ্ন হিসেবে গণ্য করা হয়। অনেক মানসিক রোগী অলীকে বিশ্বাস করে কিন্তু অন্যকে তা বুঝতে না দিয়ে নিজের মধ্যে সাফল্যজনকভাবে লুকিয়ে রাখে। অলীক বিশ্বাস হলো এমন একটি বস্তুতে বিশ্বাস করা বাস্তবিক যার কোনো অস্তিত্ব নেই। রোগী তার চার পাশের সবাইকে শত্রু বলে গণ্য করতে পারে। তার বিশ্বাস হয় যে, অন্যেরা তাকে আক্রমণ, হয়রানি, প্রতারণা কিংবা তার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করছে। সে মনে করে কেউ তার ক্ষতি করার চেষ্টা করছে বা তার ওপর সারাক্ষণ নজর রাখছে। রোগী কোনো গল্প বা উপন্যাস পড়ে ভাবতে পারে ওই গল্প বা উপন্যাসটি তাকে উদ্দেশ করেই লেখা, এতে অন্য কারো কথা নেই, শুধু তাকে সবার কাছে হাস্যস্পদ করে তোলার প্রচেষ্টা। রোগীর মধ্যে মারাত্মক সন্দেহপ্রবণতা দেখা দেয়। তাকে খাবারের প্লেট দেয়া হলে সে তা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। তার বিশ্বাস হয়, ওই খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়া হয়েছে।
রোগী নিজেকে বিপুল সম্পদের বা অর্থের মালিক ভাবতে পারে। তার ওপর কোনো বিশেষ দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে বলেও কেউ কেউ বিশ্বাস করে।
প্রত্যক্ষকরণ বা উপলব্ধি ঃ
ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে আমরা সব কিছু প্রত্যক্ষ করে থাকি। কেউ যখন কাউকে কোনো বিষয়ের অবতারণা করেন সে ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে ওই বিষয়টি অনুধাবন করতে পারেন। এই প্রত্যক্ষকরণ বা উপলব্ধিতে অস্বাভাবিকতা প্রকাশ পেলে সেটাকে মানসিক রোগ হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। উপলব্ধিগত অস্বাভাবিকতা দু’ধরনের হতে পারে একটি ইল্যুশন, অন্যটি হ্যালুসিনেশন।
ইল্যুশনকে বাংলায় বলে বিভ্রম। একটি বস্তুকে রোগী ভুলভাবে প্রত্যক্ষ করে অর্থাৎ বাহ্যিক স্বাভাবিক বস্তুকে সে অস্বাভাবিকরূপে দেখে। যেমন রোগী তার রুমে ঝুলন্ত দড়িকে সাপ মনে করতে পারে; অন্ধকারে রাস্তার পাশে বৃক্ষের কাণ্ডকে ভূত বলে মনে করতে পারে। মানসিকভাবে সুস্থ একজন লোকের ইল্যুশন বা বিভ্রমের অভিজ্ঞতা ঘটতে পারে, কিন্তু গভীর পর্যবেক্ষণ এবং নিজস্ব বিচার ক্ষমতা দিয়ে সে ওই মিথ্যে অস্তিত্ব কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হয়। কিন্তু মানসিকভাবে অসুস্থ ব্যক্তি তা পারে না। সে বিভ্রমের ফলে যেটা দেখে সেটাই বিশ্বাস করে। তার আচরণ সেই অনুমানের ওপর ভিত্তি করে নির্মিত হয়। সে একটি কুকুরকে বাঘরূপে দেখতে পারে এবং সেভাবে তার সাথে আচরণ করে। অনেকে দৃশ্যমান বস্তুকে তার নিজস্ব আকৃতির চেয়ে বড় দেখে। অনেকে আবার ক্ষুদ্র দেখে। বিভ্রম শব্দগতও হতে পারে। এ ক্ষেত্রে রোগী স্বাভাবিক শব্দ বিকৃত, চাপা কিংবা জোরালো শোনে। বিভ্রম নিজে মানসিক রোগের চিহ্ন নয় কিন্তু মানসিক রোগের কারণে রোগী তার বিভ্রম পরীক্ষা করতে কিংবা সমাধান করতে পারে না।
হ্যালুসিনেশনকে বাংলায় বলে মতিভ্রম বা ভ্রান্ত অনুভূতি। ইল্যুশনে বাহ্যিক বস্তুর প্রয়োজন হয় কিন্তু হ্যালুসিনেশনে বাহ্যিক বস্তু বা উদ্দীপক কিছু থাকে না। কোনো কিছুর অস্তিত্ব ছাড়াই সেই জিনিসটিকে রোগী প্রত্যক্ষ করতে পারে। এটা যেকোনো একটি বা সব ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিত করে। লোকটি হয়তো তার বিছানায় অনেক ইঁদুরকে ছোটাছুটিরত অবস্থায় দেখতে পারে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সেখানে কোনো ইঁদুর নেই। কিংবা কেউ মনে করতে পারে বাঘ তাকে গোগ্রাসে গিলতে আসছে, কিন্তু সেখানে বাঘের কোনো অস্তিত্বই নেই। দৃষ্টিগত বা ভিজ্যুয়াল হ্যালুসিনেশন ছাড়া আর যেসব ইন্দ্রিয়ের অভীক্ষায় হ্যালুসিনেশন ঘটে সেসব হলোÑ
ক্স শ্রুতিগত ক্স গন্ধগত ক্স স্বাদগত ক্স স্পর্শগত।
শ্রুতিগত হ্যালুসিনেশনে রোগী অনুপস্থিত কোনো ব্যক্তির কথা শুনতে পায় এবং সেটাকে সত্য বলে মনে করে। রোগীরা একে ‘গায়েবি আওয়াজ’ বলে বর্ণনা করে। ঘর নিস্তব্ধ অথচ রোগী বিভিন্ন লোকের কণ্ঠস্বর শুনতে পায়Ñ কখনো কখনো সে কোনো মৃত ব্যক্তির কণ্ঠস্বর শুনতে পায়।
গন্ধগত হ্যালুসিনেশনে রোগী ফুলের ঘ্রাণ পায় অথচ আশপাশে কোথাও কোনো ফুল নেই। সে বিভিন্ন পারফিউমের ঘ্রাণ পেতে পারেÑ যদিও সেখানে কোনো পারফিউম নেই।
স্বাদগত হ্যালুসিনেশনে রোগী জিহ্বায় বিভিন্ন স্বাদ পেতে পারে যদিও ওই মুহূর্তে সে কোনো কিছু খাচ্ছে না।
স্পর্শগত হ্যালুসিনেশনে রোগীর অদৃশ্য কারো স্পর্শলাভের অভিজ্ঞতা ঘটে। তার মনে হয় কে যেন তার শরীরে হাত রাখছে কিংবা চুলে আঙুল বুলিয়ে দিচ্ছে।
হ্যালুসিনেশন সুখকর কিংবা অপ্রীতিকর হতে পারে। অপ্রীতিকর হ্যালুসিনেশন থেকে ডিল্যুশন বা অলীক বিশ্বাসের জন্ম নিতে পারে, যার ফলে ভুক্তভোগী আত্মহননের চিন্তা বা কাউকে খুন করতে উৎসাহবোধ করতে পারে।
আবেগের অস্বাভাবিকতা  (ঊসড়ঃরড়হধষ উরংড়ৎফবৎ)
একজন সুস্থ ব্যক্তি এবং একজন অসুস্থ ব্যক্তি একই উপায়ে তাদের আবেগ অনুভব ও প্রকাশ করতে পারে না। মানুষের আবেগ সব সময় একই রকম থাকবে তা নয়। বিভিন্ন কারণে আবেগের পরিবর্তন ঘটেÑ তবে সেই পরিবর্তনকে স্থায়ী বলা যায় না। যাদের পরিবর্তনটা স্থায়ী হয়ে পড়ে তারা মানসিকভাবে অবশ্যই বিপর্যস্ত। একজন মানসিক রোগী তার ভালোবাসা এবং ঘৃণা সুস্থ মানুষের মতো অনুভব ও প্রকাশ করতে ব্যর্থ হয়। তাদের চিন্তার সাথে আবেগের প্রকাশ সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। দেখা যায়, তাদের যখন নিপীড়ন করা হয়Ñ তখন তারা হাসে। প্রত্যেক মানুষের ভেতরেই আবেগজনিত ভালোবাসা, ভয়, দুশ্চিন্তা, কষ্ট, একাকিত্ববোধ এবং রাগ থাকার প্রয়োজন রয়েছেÑ সে তা বুদ্ধি, বিবেক দিয়ে মোকাবেলা করতে পারে। কিন্তু অনেকেই পারে না, ফলে আবেগের অস্বাভাবিকতা দেখা যায়। আর এজন্যই কাউকে একা একা মূর্তির মতো বসে থাকতে দেখা যায়। কেউ অকারণে হেসে ওঠে, কেউ কাঁদতে থাকে অকারণে। রোগী তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেÑ পারিপার্শ্বিকতার বাছবিচার করে না। সাধারণভাবে আনন্দদায়ক এমন জিনিস থেকে তারা আনন্দলাভে ব্যর্থ হয়। কিছু কিছু বিষয় আবেগের অস্বাভাবিকতার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। যেমনÑ বিষণœতা, দুশ্চিন্তা, বিরক্তি। অসুখীবোধ মানসিকভাবে মানুষকে বিপর্যস্ত করে দেয় এবং এর ফলে অনেকে আত্মহত্যা করে বসে। কারো কারো মধ্যে এমন উপসর্গ দেখা যায় যে, একই সময়ে পর্যায়ক্রমিক সে হাসে ও কাঁদে।
আবার অনেকে আছে যারা থাকে যেকোনো ব্যাপারে নির্বিকার। এরা খুব ভয়াবহ হয়। আপনি হয়তো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, এদের কেউ তখন আপনার চোখে কলমের খোঁচা দিতে পারে কিংবা নিতম্বে চাপড় মারতে পারে এবং এতে তারা কিছুই মনে করে না। অর্থাৎ কৃতকর্মের জন্য কোনো ধরনের অনুশোচনাবোধ তাদের জন্মায় না।
বুদ্ধি লোপ (গড়ৎড়হ)
মানসিক রোগীদের বুদ্ধি লোপ পায়। একটি জিনিসকে বিচার-বুদ্ধি দিয়ে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা তাদের কমে যায়। এমনকি নিজের অবস্থার অবনতি ও তার পরিণতি তারা বুঝতে পারে না। তাদের মানসিক দৃঢ়তা খুবই কম থাকে। সমাজে সন্তোষজনকভাবে খাপ খাইয়ে চলার মতো মানসিক বল তাদের থাকে না।

OLYMPUS DIGITAL CAMERA
স্মৃতিভ্রষ্ট (গবসড়ৎু উরংড়ৎফবৎ)
একটি লোক কোথা থেকে আসছে জিজ্ঞেস করলে ভিন্ন উত্তর পাওয়া যায়। সে ইচ্ছে করে মিথ্যে বলে না। আসলে সে নিজেই সব ভুলে যায়। তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয়, সে বাজার থেকে ফিরছে কি না? সে উত্তরে বলবে যে, সে তার মামাবাড়ি থেকে ফিরছে।
মুদ্রাদোষ (গধহহবৎরংস)
একই কথা বারবার বলা, একই অঙ্গ বারবার সঞ্চালন করাকে মুদ্রাদোষ বলে। মানসিক রোগীদের মধ্যে এই উপসর্গগুলো পরিলক্ষিত হয়।
মানসিক জটিলতা (ঈড়সঢ়ষবী)
কমপ্লেক্সকে মানসিক জটিলতা না বলে মনোবিকৃতি বলা শ্রেয়। এটা এমন এক অবচেতন ধারণা যা অবদমিত ইচ্ছা বা আবেগজনিত অভিজ্ঞতার সাথে সম্পৃক্ত এবং আচরণে যার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। এটা একজন ব্যক্তিকে চিন্তাভাবনা, অনুভব ও কাজ করতে পরিচালনা করে। হঠাৎ কোনো ঘটনা তার জীবনে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়া করে ফেরে। একজন অসুস্থ মানুষকে দেখলে নিজের মধ্যে সেই অসুস্থতার আশঙ্কা অনুভব করে। কমপ্লেক্স অনেক ধরনের হয়। সুপিরিওরিটি কমপ্লেক্সে যারা ভোগে তাদের মধ্যে উন্নাসিকতা কাজ করে। অন্যদের চেয়ে নিজেকে খুব হামবড়া মনে করে। ইনফিরিওরিটি কমপ্লেক্সে বা হীনম্মন্যতার রোগীরা অন্যদের চেয়ে নিজেকে সব সময় তুচ্ছ করে দেখে। ইলেকট্রা কমপ্লেক্স নামক এক ধরনের মনোবিকৃতি অনেক প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের দেখা যায়। এই মেয়েরা তাদের বাবা, বাবার বন্ধু ও বাবার বয়সী পুরুষদের প্রতি অস্বাভাবিক যৌন আকর্ষণ অনুভব করে। ‘ইলেকট্রা কমপ্লেক্স’ শব্দটি এসেছে গ্রিক রাজা আগামেননের কন্যা ইলেকট্রার নাম থেকে। ইলেকট্রা তার বাবার প্রতি অতিরিক্ত মোহে নিজের মাকে হত্যা করার জন্য হত্যাকারীকে সাহায্য করেছিল। এর ঠিক উল্টোটা হলো ইডিপাস কমপ্লেক্স। এ ক্ষেত্রে মা, মায়ের বান্ধবী বা মায়ের বয়সী মহিলার প্রতি ছেলের দৈহিক আসক্তি প্রকাশ পায়। বাবার প্রতি শিশু ছেলের ঈর্ষাবোধ এই আসক্তির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইডিপাস ছিল গ্রিক ট্র্যাজেডির এক নায়ক যে তার মায়ের সাথে অনিচ্ছাকৃত যৌন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। ঈর্ষাপ্রসূত হয়ে নিজের বাবাকে হত্যা করে ইডিপাস তার মাকে বিয়ে করে। ইডিপাস কমপ্লেক্স শব্দটি এখান থেকেই এসেছে।
সন্দেহপ্রবণতা (চধৎধহড়রফ চবৎংড়হধষরঃু উরংড়ৎফবৎ)
মানসিক রোগীদের মধ্যে মারাত্মক সন্দেহপ্রবণতা দেখা যায়। বন্ধুদের বা আশপাশের মানুষদের সে শত্রু বলে মনে করে। তার বিরুদ্ধে সবাই চক্রান্তে লিপ্ত এমনটি সে মনে করে। রাতে শোবার আগে বাথরুমের ভেন্টিলেটর পরীক্ষা করে নিশ্চিত হতে চায় সেখানে কোনো গোপন অস্ত্র তার দিকে তাক করা আছে কি না। নিজের স্ত্রীকে সন্দেহ করে অন্য কোনো পুরুষের সাথে তার গোপন সম্পর্ক আছে কি না। মহিলা স্বামীকে সন্দেহ করেÑ অন্য কোনো মেয়ের সাথে তার সম্পর্ক আছে কি না।
অহেতুক ভয় (চযড়নরধ)
মানসিক রোগীরা অহেতুক ভয়ের শিকার হতে পারে। অনেকে ছোট ও নিরীহ প্রাণী দেখে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। অন্ধকার, বজ্রগর্জন কিংবা নির্জনতায় আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কাঁকড়া, মাকড়সা দেখে অনেকে ভয়ে দিশেহারা হয়। অনেকে অন্যের সামনে কথা বলতে পারে না। অনেকে উঁচু স্থানে উঠলে মনে করে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে।
অহেতুক রোগভীতি (ঐুঢ়ড়পযড়হফৎরধংরং)
রোগী মনে করে সে কোনো দুরারোগ্য ব্যাধিতে ভুগছে। সে একের পর এক ডাক্তার পাল্টাতে থাকে সন্দেহমুক্ত হওয়ার জন্য। কিন্তু তার সন্দেহ থেকেই যায়।
শুচিবাই (ঐুংঃবৎরপধষ গধহরধ ভড়ৎ পষবধহষরহবংং)
মানসিক রোগীদের মধ্যে শুচিবায়ুগ্রস্ততা পরিলক্ষিত হয়। কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা মেঝে মুছে চলে কিন্তু তারপরও সন্তুষ্ট হতে পারে না। কেউ তার হাত ধুচ্ছে তো ধুচ্ছেইÑ মনে হয় তারপরও ঠিকমতো পরিষ্কার হচ্ছে না।
মানসিকভাবে সুস্থ লোককে কীভাবে চেনা যায়
মানসিক রোগীরা অনেক সময় সাধারণের চোখ এড়িয়ে যায় তাদের বিচক্ষণতার কারণে। কোনো কোনো মানসিক রোগীর উপসর্গ এত নগণ্য যে, কেউ বুঝে উঠতে পারে না তার অসুস্থতার মাত্রা কতটুকু। কী কী কারণে আপনি একজন লোককে মানসিকভাবে সুস্থ আখ্যায়িত করবেন? মানসিকভাবে একজন সুস্থ লোকের যেসব বৈশিষ্ট্য থাকে তা হলোÑ
ক্স নিজের সম্পর্কে তিনি স্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করেন। তিনি নিজেকে বেশি বড় কিংবা বেশি ছোট ভাবেন না।
ক্স নিজের ক্ষমতা সম্পর্কে তিনি সচেতন।
ক্স তিনি যুক্তিসঙ্গত নিরাপদবোধ করেন।
ক্স অবাঞ্ছিত কিছু মেনে নিতে তিনি প্রস্তুত থাকেন।
ক্স নিজের প্রতি এবং পারিপার্শ্বিকতার প্রতি তার আগ্রহ জন্মাতে পারে।
ক্স সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি সক্ষম। তিনি নিজস্ব আবেগ ধরে রাখতে পারেন। কেউ তার সমালোচনা করলে তিনি তা সহ্য করতে পারেন।
ক্স তিনি তার পারিপার্শ্বিকতার ব্যাপারে সচেতন এবং তার সাথে তিনি মানিয়ে চলতে পারেন।
ক্স সমাজের অংশ হিসেবে তিনি নিজেকে অন্যের প্রতি দায়িত্বসম্পন্ন ভাবেন।
ক্স তিনি প্রত্যেকের সাথে বন্ধুসুলভ ব্যবহার করেন এবং অন্যকে বিশ্বাস করেন।
ক্স তিনি দাম্পত্যজীবন উপভোগ করতে পারেন এবং সন্তান-সন্ততিদের ভালোবাসা ও স্নেহ দিয়ে ভরিয়ে তুলতে পারেন।
ক্স জীবনের বর্তমান চাহিদা সম্পর্কে তিনি সচেতন এবং সাহসের সাথে সমস্যা মোকাবেলা করতে পারেন।
ক্স তিনি কাজের মধ্যে আনন্দ খেঁাঁজেন এবং অভিযোগ বা অশ্রদ্ধা ছাড়াই সব দায়িত্ব ধে তুলে নিতে পারেন।
ক্স তিনি অতীতের কোনো বেদনাদায়ক স্মৃতি ভুলে থাকতে পারেন এবং অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারেন।
ক্স অজানা ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি ঘাবড়ে যান না।
উপসংহার
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ উইলিয়াম সি মেনিনজার যেকোনো ব্যক্তির নিজস্ব মানসিক সুস্থতা নির্ণয়ে ১৩টি প্রশ্নের উল্লেখ করেছেন। এসব প্রশ্নের মধ্যে যেকোনো একটির উত্তর নিশ্চিতভাবে ‘হ্যাঁ’ হলে বুঝতে হবে তিনি মানসিক রোগে ভুগছেন এবং অবশ্যই এ ক্ষেত্রে তাকে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবেÑ
১. আপনি কি সর্বদা আশঙ্কা বোধ করেন?
২. আপনি কি অপরিচিত কোনো বিষয়ে মনোনিবেশ করতে অক্ষম?
৩. কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই আপনি কি সর্বদা অসুখী অনুভব করেন?
৪. আপনি কি ঘন ঘন এবং সহজেই রেগে যান?
৫. আপনি কি নিয়মিত নিদ্রাহীনতার সমস্যায় ভুগছেন?
৬. আপনার মেজাজে কি ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে? অর্থাৎ বিষন্নতা থেকে প্রফুল্ল আবার বিষণœ বোধ করেন?
৭. লোকজনের সান্নিধ্য সব সময় কি আপনি অপছন্দ করেন?
৮. আপনার দৈনন্দিন জীবনে বিঘ্ন ঘটলে আপনি কি অস্থির হয়ে পড়েন?
৯. আপনার শিশুকে কি আপনার কাছে বিরক্তিকর মনে হয়?
১০. প্রকৃত কারণ ছাড়া আপনি কি ভীত সন্ত্রস্ত থাকেন?
১১. আপনি কি একঘেয়েমিতে ক্লান্ত এবং অবিরাম তিক্ততা অনুভব করেন?
১২. আপনি কি সর্বদা নিজেকে সঠিক এবং অন্যকে ভুল বিবেচনা করেন?
১৩. যেখানে চিকিৎসক আপনার শারীরিক ব্যথার কোনো কারণ খুঁজে পান না তারপরও আপনি বিপুল ব্যথা অনুভব করেন?

ডা. মিজানুর রহমান কল্লোল

লেখক : সহকারী অধ্যাপক, অর্থোপেডিকস ও ট্রমাটোলজি বিভাগ, ঢাকা ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ
চেম্বার : পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার লিঃ, ২ ইংলিশ রোড, ঢাকা।  মোবাইল : ০১৬৮৬৭২২৫৭৭