বিছানাকান্দিঃজল পাথরের বিছানায়

তাড়াহুড়ো একটু বেশিই ছিল বর্ষা শেষ হইতে চলছে, এখন ও তেমন প্রস্ততি নেই মাঝে মাঝেই একটু শূন্যতা অনুভব হয় মনের মাঝে- বর্ষা যে শেষের দিক  আর এখন না যেতে পারলে প্রকৃতির লাবণ্য ভরা রূপ যে দেখাতে পারবনা তাই ২/১ দিনের মাঝেই বেড়িয়ে পরতে হবে আমাদের । এতো ক্ষণ যে প্রকৃতির কথা বলছি সেই জায়গা আমাদের বাংলাদেশের  শেষ সীমান্তবর্তী উপজেলার কথা সেখান থেকে কয় পা গেলেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য ।

এখানে খাসিয়া পাহাড়ের অনেকগুলো ধাপ দুই পাশ থেকে এক বিন্দুতে এসে মিলেছে। পাহাড়ের খাঁজে সুউচ্চ ঝর্ণা। বর্ষায় থোকা থোকা মেঘ আটকে থাকে পাহাড়ের গায়ে বেয়ে । পূর্ব দিক থেকে পিয়াইন নদীর একটি শাখা পাহাড়ের নীচ দিয়ে চলে গেছে ভোলাগঞ্জের দিকে। পাহাড় থেকে নেমে আসা স্রোতের সাথে বড় বড় পাথর এসে জমা হয় – হম আপনারা ঠিক ভেবেছেন সিলেট এর বিছানাকান্দির কথা বলছি ।

অফিস থেকেআমরা কয়েকজন বিছানাকান্দি যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলাম । রিপনভাই,শাজাহানভাইবিছানাকান্দি১, হাসানভাই, রাজীবভাই,রাহা মনিওভাবি,এবং সাথে স্বাপন ভাই ভাবি ও আমি। আমরা রাতে সিলেট এর উদ্দেশে রওনা দিলাম এনাবাস এ । সকালে সিলেট বাস থেকে নেমে সিএনজি নিয়ে সোজা গয়াইনঘাট।

ছুটে চললাম সিলেট বিমানবন্দর রোড ধরে বিছানাকান্দির পথে। দু পাশে সবুজ চা বাগান একে একে পিছনে রেখে ছুটে চলেছি আমরা । চোখ জুড়ানো ভয়ঙ্কর সবুজের মাঝে রাস্তার কালো পিচটাকে মনে হচ্ছিল যেন একটা বড়সড় অজগর, এঁকে বেঁকে পার হয়ে ছুটে চলেছে সবুজ মাঠ পেরিয়ে অজানা কোন পথে। সফর সঙ্গিরা তখন শব্দহীন। রাজীব ভাই ও আমি  ছবি তোলা নিয়ে ভীষণ বাস্ত। সিলেট জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলার গোয়াইনঘাটের রস্তুমপুর ইউনিয়নে বিছানাকান্দি। এর পরেই ভারতের মেঘালয় রাজ্য। বর্ষার সময়ে বিছনাকান্দিতে প্রকৃতি যেন তার সৌন্দর্যের সবটুকুই ঢেলে দেয় নিরলসভাবে। চারিদিকে শুধুই সবুজ আর সবুজ। উপরে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা।নৌকা করে বিছানাকান্দি আসার পুরো পথটা অসম্ভব রোমাঞ্চকর। স্বচ্ছ আর ঠাণ্ডা পানি ঠেলে নৌকার এঁকেবেঁকে বয়ে চলা মনে এনে দেয় অদ্ভুত প্রশান্তি। তার উপর বাড়তি পাওনা হিসেবে তো আছে আশেপাশের গগনচুম্বী পাহাড় আর মাথার উপর শুভ্র শান্ত আকাশের আবরণ। পথ যত কমতে থাকে অস্পষ্ট পাহাড়গুলো স্পষ্ট নিরেট আকার নিতে থাকে আর তখন মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকতে হয়। যেন কোন শিল্পীর আঁকা ছবির মত এ দৃশ্য, প্রতিটি ভাঁজে রয়েছে অপার সৌন্দর্য আর নিখুঁত কারুকার্যের নিদর্শন। পথে চলত চলতে দুপারে দেখা মিলতে পারে কিছু আদিবাসীদের। এমনি করে চলতে চলতে কখন যে পথ শেষ হয়ে আসে তা বলা মুশকিল। কিন্তু পথ শেষ হলে হবে কি সৌন্দর্যের শেষ হবার উপায় নেই। কারন তখন আপনি চলে এসেছেন অপরূপা বিছানাকান্দিতে।

এখানে পৌঁছে যখন মনে হবে সেই পাহাড় সেই আকাশই তো এখানে। কিন্তু পা ফেলার সাথে সাথে এই ভাবনাটুকু কখন যে তলিয়ে যাবে বুঝতেই পারবেন না। পা রাখতেই টের পাওয়া যাবে কেন বিছানাকান্দিতে আসা । স্বচ্ছ আর হিমশীতল পানির নিচে যেন শত শত পাথরের মেলা বসেছে। নানা রঙের, নানা আকারের আর বিচিত্র সব উপাদানের পাথরে ভরপুর এই জায়গাটিকে পাথরের রাজ্য বললে ভুল হবে না। শুধু পা ভিজিয়ে ক্ষান্ত থাকেন না এখানে আসা মানুষগুলো। শরীর এলিয়ে দিয়ে যখন চোখ বুজে আসে তখন একে পাথরে ভরা বাথটাব বলেই মনে হয়। বর্ষার সময়টাতে পানিতে টইটুম্বুর থাকে বিছানাকান্দি আর তখন একে তুলনা করা যায় সবে কৈশোর ছেড়ে যৌবনে পা দেওয়া তরুনীর সাথে।বিছানাকান্দি৩

অনাবিল আনন্দে জলপাথরের বিছানায় শুয়ে বসে ছবি তোলা, গোসল আর হৈ-হুল্লোড়ে সময়ের হিসেব হারিয়ে ফেলার অবস্থা আমাদের ।

বিছনাকান্দি ও মুলতঃ জাফলংয়ের মতোই একটি পাথর কোয়ারী। শীতকালে যান্ত্রিক পাথর উত্তোলন- সেই সাথে পাথরবাহী নৌকা, ট্রাকের উৎপাতের কারনে পর্যটকদের জন্য এসময় উপযুক্ত নয়। কিন্তু বর্ষায় এইসব থাকেনা বলে পাহাড়, নদী, ঝর্ণা,মেঘের সমন্বয়ে বিছনাকান্দি হয়ে উঠে এক অনিন্দ্য সুন্দর গন্তব্য।

বিছনাকান্দি যাওয়ার একাধিক পথ আছে। বিমানবন্দরের দিকে এগিয়ে সিলেট গোয়াইনঘাট সড়ক ধরে হাতের বামে মোড় নিয়ে যেতে হয় হাদারপাড়। হাদারপাড় বিছনাকান্দির একেবারেই পাশে। এখান থেকে স্থানীয় নৌকা নিয়ে বিছনাকান্দি। হাদারপাড় পর্যন্ত গাড়ী যায়। সিলেট থেকে দূরত্ব বেশী না হলে ও কিন্তু রাস্তার অবস্থা একটু নরভরে হলে ও আনন্দর মাত্তারা ভুলিয়ে দিবে ওই রাস্তার কথা । (সিলেট) আম্বরখানা থেকে হাদারপাড় পর্যন্ত ভাড়ার সিএনজি পাওয়া যায়।

পর্যটকদের জন্য আরেকটি বিকল্প হচ্ছে- বিছনাকান্দি যাওয়ার জন্য পাংথুমাই চলে আসা। বড়হিল ঝর্ণার কাছ থেকেই পিয়াইন নদীর একটি শাখা পশ্চিম দিকে চলে গেছে বিছনাকান্দি। নৌকা নিয়ে পাহাড়ের নীচ দিয়ে প্রবাহমান এই পাহাড়ী নদী ধরে বিছনাকান্দি যাওয়ার মুহুর্তগুলো দারুন স্মরনীয় হয়ে থাকবে। নৌকা সময় লাগে এক ঘন্টার একটু বেশী।

ঢাকা থেকে বিছানাকান্দী যাতাযাত ও খাবার।

,ঢাকা থেকে সিলেটবিছানাকান্দি৪

ট্রেনঃ ঢাকা থেকে সিলেট যাওয়ার জন্য রাতের ট্রেন কমলাপুর থেকে ছাড়ে রাত ১০টায়। সিলেট পৌঁছায় সকাল ৭টায়। ভাড়া ২৯৫ টাকা।

বাসঃ শ্যামলী,হানিফ, গ্রীন লাইন, সোহাগ, সাউদিয়া, এস আলম, এনা (ঘোড়াশাল-টঙ্গী রুট)। ভাড়া ৪৫০ টাকা।

থাকার হোটেল :

হোটেলঃ সিলেট শহরে থাকার জন্য অনেকভালো মানের হোটেল আছে। শহরের নাইওরপুল এলাকায় হোটেল ফরচুন গার্ডেন (০৮২১-৭১৫৫৯০)।

জেল সড়কে হোটেল ডালাস (০৮২১-৭২০৯৪৫)। ভিআইপি সড়কে হোটেল হিলটাউন (০৮২১-৭১৮২৬৩)। লিঙ্ক রোডে হোটেল গার্ডেন ইন (০৮২১-৮১৪৫০৭)।

আম্বরখানায় হোটেল পলাশ (০৮২১-৭১৮৩০৯)। দরগা এলাকায় হোটেল দরগাগেইট (০৮২১-৭১৭০৬৬)। হোটেল উর্মি (০৮২১-৭১৪৫৬৩)।

জিন্দাবাজারে হোটেল মুন লাইট (০৮২১-৭১৪৮৫০)। তালতলায় গুলশান সেন্টার (০৮২১-৭১০০১৮) ইত্যাদি।

ভাড়া ৩০০ থেকে শুরু করে ৩০০০টাকা পর্যন্ত ভাল হোটেলের ভাড়া,দরগাগেটে আরো কয়েকটি ভাল হোটেল আছে।

আবার নলজুড়ি উপজেলা সরকারি ডাকবাংলোঃ পূর্ব অনুমতি সাপেক্ষে এইখানে থাকতে পারেন। সরকারি কর্মকর্তা/কর্মচারিদের জন্য প্রতিটি রুম ৫০০টাকা। আর সিভিলিয়ানদের জন্য ১৫০০টাকা।

খাবার :

খাবার রেস্তোরাঃ পানশি, পাঁচ ভাই জনপ্রিয় দুটি রেস্তোরা। এছাড়া আছে উন্দাল সহ সব নামি-দামি খাবার দোকান আছে।বিছানাকান্দি৫

সম্রাট