সৌরমন্ডলের বাইরে আগুন জ্বাললো বিজ্ঞানীরা

গত সপ্তাহে পৃথিবী থেকে প্রায় ২,১০০ কোটি কিলোমিটার দূরে সৌরমণ্ডলের সীমানার বাইরে আগুন জ্বালালো মানুষ। এই প্রথমবার সৌরমণ্ডলের বাইরে এমন সাফল্য পেল সভ্যতা। ৩৭ বছর পর জ্বলে উঠল নাসার গ্রহসন্ধানী যান ভয়েজার ১-এর জেট থ্রাস্টার। এই থ্রাস্টার হচ্ছে স্পেস শাটলকে চালিত করার জন্য বিশেষ ধরণের তরল জ্বালানী যা মহাকাশ যানকে চলতে সাহায্য করে।

এখন পৃথিবী থেকে প্রায় ২,১০০,০০,০০,০০০ কিলোমিটার দূরে সৌরমণ্ডলের সীমানার বাইরে দুই তারার অন্তবর্তী শূন্যস্থানে অবস্থান করছে ভয়েজার। পৃথিবী থেকে সেখানে আলো পৌঁছতে সময় লাগে প্রায় ১৯ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট। সেখানে জল বা মানুষ তো বটেই জমে বরফ হয়ে যাবে হাইড্রোজেন, হিলিয়ামের মতো হালকা গ্যাসও। সেখানেই যানের অভিমুখ ঠিক করার জন্য ভয়েজার ১-এর থ্রাস্টার জ্বালালেন নাসার বিজ্ঞানীরা।

পৃথিবী থেকে ভয়েজার ১-এর দূরত্ব এতই বেশি যে বোঝাতে গেলে আলোর বেগকে তুলনা হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। কারণ ওই বেগেই বিকিরিত হয় পৃথিবী ও সৌর মণ্ডলের সংযোগকারী অন্য তড়িত্চুম্বকীয় তরঙ্গও। ভয়েজারের বর্তমান অবস্থান অনুসারে যে কোনো এক রোববার  সকাল ৭টায় ভয়েজারের উদ্দেশ্যে বার্তা পাঠালে তা ভয়েজার ১-এর কাছে পৌঁছয় সোমবার ভোর সাড়ে চারটেয়। এই বার্তার উত্তর আসতেও একই সময় লাগে। ফলে ভয়েজার ১-কে কোনও নির্দেশ দিলে কাজটি ঠিক মতো হয়েছে কি না বুঝতে বিজ্ঞানীদের সময় লাগে দেড় দিনেরও বেশি। মজার ব্যাপার হচ্ছে এই ভয়েজার আর কখনোই পৃথিবীতে ফিরে আসবে না। সে ভাবেই পরিকল্পনা করে পাঠানো হয়েছে তাই প্রতি মুহূর্তে বাড়ছে এই দূরত্ব।

২০১৩ সালে সৌরমণ্ডলের সীমা অতিক্রম করে ভয়েজার-১। সম্প্রতি ক্রমশ পৃথিবীর সঙ্গে কৌনিক দূরত্ব বাড়ছিল ভয়েজারের হাই গেইন অ্যান্টেনার। দ্রুত তার অভিমুখ পরিবর্তন না ঘটালে পৃথিবীর নজর থেকে চিরতরে হারিয়ে যেতে পারতো মহাকাশযানটি। যানটিকে নিজেদের নজরে রাখার জন্যই গত সপ্তাহে কাজটি সম্পন্ন করেছেন নাসার বিজ্ঞানীরা।

ভয়েজারের গতি পরিবর্তনের জন্য নির্দিষ্ট থ্রাস্টারগুলির জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় কক্ষ পরিবর্তনের থ্রাস্টারগুলি জ্বালিয়ে কাজ হাসিল করেছেন গবেষকরা। গত সপ্তাহের মঙ্গলবার থ্রাস্টারগুলি জ্বালানো হলেও সাফল্যের খবর পৃথিবীতে এসে পৌঁছয় বুধবার। জানা যায় ঠিকঠাক কাজ করেছে ৪টি থ্রাস্টারই। ৩৭ বছর মহাকাশের জমাট ঠান্ডায় থ্রাস্টারগুলি ফের সক্রিয় হওয়াকে নাসার বিশাল প্রযুক্তিগত সাফল্য বলে মনে করা হচ্ছে। শীতের সকালে যেখানে সাধারণ চার চাকার গাড়ি স্টার্ট দিতেই অনেক সময় বিপত্তি ঘটে সেখানে ৩৭ বছর ধরে মহাকাশের প্রতিকূল আবহাওয়ায় নিষ্ক্রিয় থাকা ইঞ্জিন ফের নিখুঁত ভাবে কাজ করা আশ্চর্য ঘটনাই বলা যায়।

৪০ বছর আগে বৃহস্পতি ও শনি গ্রহের ছবি ও তথ্য পেতে ভয়েজার ১-কে কেপ ক্যানাভেরাল থেকে পাঠিয়েছিল নাসা। প্রায় সাড়ে ৩ বছরের  সফল অভিযানের পর অনন্ত মহাকাশের দিকে ছুটে চলেছে যানটি। ১৯৯৪ সালে শেষ ছবি তোলার পর যানটির ক্যামেরা বন্ধ করে দিয়েছে নাসা। চালু রেখেই বা কী হবে? ছবি তুলতে গেলে তো আলো প্রয়োজন। আর ভয়েজার ১ যেখানে রয়েছে, সেখানে আপাতত নিকষ অন্ধকার।

অদ্বিত আহমেদ

তথ্যসূত্র ও ছবিঃ ডেইলি সায়েন্স