৭ই মার্চের ভাষণের বিশ্বস্বীকৃতিতে অটোয়ায় বাংলাদেশ হাইকমিশনের শোভাযাত্রা​

সদেরা সুজন

(সিবিএনএ কানাডা থেকে): জাতির ​জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থা UNESCO কর্তৃক “Part of World’s Documentary Heritage” হিসেবে স্বীকৃতি প্রদানকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে উদযাপন করেছে কানাডার অটোয়াস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন । বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষণকে ইউনেস্কোর এই স্বীকৃতি উদ্‌যাপনের লক্ষ্যে ১০ই ডিসেম্বর রবিবার বাংলাদেশ হাইকমিশন কার্যালয় থেকে এক আনন্দআনন্দ শোভাযাত্রা JOY RALLY বের করা হয়। এ র‍্যালীতে নেতৃত্ব দেন কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের মান্যবর হাইকমিশনার মিজানুর রহমান। দূতাবাসের সকল কূটনীতিক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীবৃন্দ, তাঁদের পরিবারের সদস্যগণ, অটোয়াপ্রবাসী বীর মুক্তিযোদ্ধাগণ, অটোয়া আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিকবৃন্দ এবং নাগরিক সমাজের সদস্যগণ উক্ত আনন্দ শোভাযাত্রায় যোগদান করেন। -১৩ ডিগ্রী’র প্রচন্ড শীত ও তুষারপাত উপেক্ষা করে আনন্দ শোভাযাত্রায় যোগদান করতে আসা নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোরসহ বিভিন্ন জনের পদচারণায় মুখরিত হয় অটোয়ার ৩৫০ স্পার্কস স্ট্রীটে অবস্থিত বাংলাদেশ হাই কমিশন চ্যান্সেরী প্রাঙ্গণ। লাউডস্পীকারে সজোরে বাজতে থাকে বঙ্গবন্ধুর সেই অমর ভাষণ – “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম” . . . “রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেবো; এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাল্লাহ্‌”।

র‍্যালী শুরুর পূর্বে সংক্ষিপ্ত বক্তৃতাপর্বে যোগদানকারীদের থেকে বক্তব্য রাখেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি মমতা দত্ত, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক নূরুল হক, অটোয়া আওয়ামী লীগের সভাপতি অধ্যাপক ওমর সেলিম শের এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের মিনিস্টার নাঈম উদ্দিন আহমেদ।

আনন্দ শোভাযাত্রায় আগত সকলের উদ্দেশ্যে প্রদত্ত তাঁর বক্তব্যে কানাডায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মিজানুর রহমান বলেন, বাঙালী জাতির জীবনে ১৯৭১ হচ্ছে সবচাইতে গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ মাহেন্দ্রক্ষণ । স্বাধীনতা সংগ্রামের চূড়ান্ত পরিণতির ঠিক প্রাক্কালে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর সেই কালজীয় ভাষণ – “এবারের সংগ্রাম, আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম” ….. সেই ভাষনই তথা বঙ্গবন্ধুর দিক নির্দেশনা-ই ঠিক করে দিয়েছিলো আমাদের জাতির নিশ্চিত ঠিকানা – স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। তাই বাঙলী জাতি এবং বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জীবনে ৭ই মার্চ এবং বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণের গুরুত্ব এতো ব্যাপক। সেই চেতনার আলোকে তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্যম আয়ের দেশ, আর ২০৪১ সালের মধ্যে একটি উন্নত দেশ গড়ায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে সুখী, সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনে এগিয়ে আসার জন্য সকলের, বিশেষত: কানাডাপ্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রতি আহবান জানান । দূতাবাসের প্রথম সচিব (বাণিজ্যিক) দেওয়ান মাহমুদের সঞ্চালনায় র‍্যালীপূর্ব এ সংক্ষিপ্ত বক্তব্যানুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন কাউন্সিলর (পাসপোর্ট ও ভিসা) মো: সাখাওয়াত হোসেন, কাউন্সিলর (রাজনৈতিক) মো: আলাউদ্দিন ভূঁইয়া এবং প্রথম সচিব (কন্স্যুলার) অপর্ণা রাণী পাল। আরও উপস্থিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা আতিকুল ইসলাম বীর প্রতীক, মুক্তিযোদ্ধা শিকদার মতিউর রহমান, সুপরিচিত সমাজকর্মী রাশেদা নেওয়াজ, কমিউনিটি সংগঠক রিয়াজ জামান প্রমুখ। বিশেষ আমন্ত্রণে র‍্যালীতে যোগদান করেন মিসেস নিশাত রহমান, মিসেস ডালিয়া পারভীন, মিসেস আফরিন সুলতানা এবং সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ইলিয়াস হোসেন ভুঁইয়া। শিশু-কিশোররাও স্বত:স্ফুর্তভাবে যোগ দেয় এ আনন্দ শোভাযাত্রায়।

হাইকমিশনারের বক্তব্যের পরপরই বিশাল জনসমুদ্রে ৭ই মার্চ ১৯৭১ -এ বক্তৃতারত বঙ্গবন্ধুর সেই ছবিসম্বলিত বৃহৎ ব্যানারসহ সকলে একযোগে র‍্যালী নিয়ে বের হন বাংলাদেশ দূতাবাস প্রাঙ্গণ থেকে। র‍্যালীটি ৩৫০ স্পার্কস স্ট্রীট থেকে লায়ন স্ট্রীট অতিক্রম করে কানাডিয়ান ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস ভবনের পাদদেশ হয়ে কেন্ট স্ট্রীট পেরিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে। প্রচন্ড ঠান্ডার মাঝেও অংশগ্রহণকারীদের পদযাত্রা এবং মুহূর্মুহ শ্লোগানে মুখরিত হয় অটোয়ার ব্যাস্ত রাজপথ। সেই সাথে বাড়তে থাকে বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ এবং ৭ই মার্চের ভাষণকে ঘিরে পথচারী ও দর্শক কানাডীয় নাগরিকদের আগ্রহ। রয়েল কানাডিয়ান মাউন্টেড পুলিশের (আরসিএমপি) স্পেশাল কন্সটেব্‌ল স্যাম ব্রুনেটের নেতৃত্বে বিশেষ পুলিশ কর্ডন এ র‍্যালীকে সামনে এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করে। র‍্যালীতে অংশগ্রহণকারী প্রায় সকলেরই হাতে ছিলো নানান শ্লোগান সম্বলিত প্ল্যাকার্ড, যা কানাডীয়দের বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষন করে। এসব প্ল্যাকার্ডের উল্লেখযোগ্য শ্লোগানের মধ্যে ছিলো, “Bangabandhu’s 7th March Speech: A Speech Led to the Birth of Bangladesh”; “৭ই মার্চের ভাষণ, অমর হোক অমর হোক”; “Long Live 7th March Speech by Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman”; এবং “Long Live Bangladesh . . . Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman, Father of the Nation : Thanks UNESCO for Recognizing Bangabandhu’s 7th March 1971 Speech as Part of World’s Documentary Heritage”.

প্ল্যাকার্ডে লিখিত শ্লোগানের পাশাপাশি র‍্যালীতে অংশগ্রহনকারীগণ মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মহান স্বাধীনতা অর্জন এবং দেশ গঠনে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনাসমৃদ্ধ বিভিন্ন শ্লোগান সজোরে উচ্চারণ করেন, প্রকম্পিত হয় অটোয়ার রাজপথ। সকলের কণ্ঠে সমস্বরে ধ্বনিত হয়, “জাতির পিতা শেখ মুজিব, লও লও লও সালাম”; “পদ্মা, মেঘনা যমুনা, তোমার আমার ঠিকানা”; “বিজয়ের এই দিনে, মুজিব তোমায় পড়ে মনে”; “জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু”; এবং “শেখ হাসিনার দর্শন, বাংলাদেশের উন্নয়ন” প্রভৃতি শ্লোগান, যা সকলকে উজ্জীবিত করে এবং উপস্থিত কানাডীয় নাগরিকগণের মাঝে সঞ্চার করে এক ভিন্নতার মাত্রা। সৃষ্টি হয় এক ভিন্ন আবহ। কানাডীয়দের অনেককেই র‍্যালীতে অংশগ্রহণকারীদের সাথে আলাপ করে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চ ভাষণের ইউনেস্কোর স্বীকৃতির বিষয়ে এবং বাংলাদেশের মহান মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাস সম্পর্কে আগ্রহ প্রকাশ করতে দেখা যায়।

র‍্যালীর শেষ পর্যায়ে এসে আরও একবার সমবেত অংশগ্রহণকারী এবং অটোয়াপ্রবাসী বাঙালীদের আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন বাংলাদেশের হাই কমিশনার মিজানুর রহমান। প্রবাসীগণও ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে আনন্দ র‍্যালী আয়োজন, তাঁদেরকে সম্পৃক্তকরণ এবং দূর প্রবাসের মাটিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ, মহান মুক্তিযুদ্ধেরে চেতনা ও স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাসকে তুলে ধরার ও নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার এ প্রয়াসের জন্য বাংলাদেশ হাইকমিশনকে ধন্যবাদ জানান এবং এই উদ্যোগের ভুয়সী প্রশংসা করেন।

কেন্ট স্ট্রীট অতিক্রম করে স্পার্কস স্ট্রীট ও ব্যাংক স্ট্রীটের সম্মেলনস্থলে গিয়ে সমাপ্ত হয় বাংলাদেশ হাইকমিশনের এ অনুপম আনন্দ শোভাযাত্রা।